কালীর পূর্বাভাস ।। ৯
দক্ষিণাকালী করালবদনা। ঘোরা। মুক্তকেশী। চতুর্ভুজা। দেবী মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বাঁদিকের নিচের হাতে সদ্যশ্ছিন্ন মুণ্ড। উপরের হাতে খড়্গ। ডানদিকের উপরের হাতে অভয়মুদ্রা। নিচের হাতে বরমুদ্রা। দেবী মহামেঘপ্রভা। শ্যামা। দিগম্বরী। তাঁর গলায় ঝুলন্ত মুণ্ডমালা থেকে বিগলিত রক্তধারায় দেহ চর্চিত। দুটো শবশিশু দেবীর কর্ণভূষণ হওয়াতে তাঁকে ভয়ঙ্করী দেখাচ্ছে । তিনি ঘোরদংষ্ট্রা, করালাস্যা, পীনোন্নতোপয়োধরা। তাঁর কাঞ্চী শবহস্তনির্মিত। তিনি হাস্যমুখী। দেবীর দুই ঠোঁটের প্রান্ত থেকে রক্তধারা বিগলিত হওয়ায় তিনি দীপ্তবসনা। মহারৌদ্রী শ্মশানবাসিনী দেবী ঘোররবকারিণী। তিনি ত্রিনয়না। প্রাতঃসূর্যের মতো তাঁর নয়ন। তিনি দন্তুরা। তাঁর কেশরাশি ডানদিকে এলায়িত এবং তাতে মুক্তা খচিত। দেবী শবরূপী মহাদেবের হৃদয়োপরি অধিষ্ঠিত তাঁর চারপাশে ঘোররবকারী শিবাদল। দেবী মহাকালের সঙ্গে বিপরীতরতিনিরতা। তিনি সুপ্রসন্নবদনা এবং তাঁর মুখপদ্ম ঈষদহাস্যযুক্ত। সর্বকামনা-পূর্ণকারিণী এবং সমৃদ্ধিদায়িনী কালীর এইরকম ধ্যান করার কথা বলা হয়েছে কালীতন্ত্রে।
নিরুত্তরতন্ত্রে, মহানির্বাণতন্ত্রেও কালীর ধ্যান বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন ধ্যানে কালীর যে মূর্তি সামনে আসে তার তত্ত্ব গভীর। এই মূর্তি সাধকের জন্য এবং সাধকের কাছেই তা চরম সত্য। সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় এর কোনও অর্থই প্রতিভাত হয় না।
দক্ষিণাকালী কৃষ্ণা। ধ্যানে তাঁকে মহামেঘপ্রভা শ্যামা এবং অঞ্জনাদ্রিনিভা বলা হয়েছে। কামাখ্যাতন্ত্র মতে কালী সদাই কৃষ্ণবর্ণা, এ কথা আগমে বলে। কেন কালীর বর্ণ কৃষ্ণ? মহানির্বাণতন্ত্রে এর ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়েছে যে, শ্বেত পীতাদি বর্ণ যেমন কৃষ্ণবর্ণে বিলীন হয়ে যায় তেমনই সর্বভূত কালীর মধ্যে প্রবেশ করে অর্থাৎ বিলীন হয়। আরও বলা হয়েছে, যাঁরা মোক্ষের উপায় ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন তাঁরা নির্গুণ নিরাকার কল্যাণময়ী কালশক্তির কৃষ্ণবর্ণ নিরূপণ করেছেন।
কর্পূরাদিস্তোত্রের প্রথম শ্লোকে বলা হয়েছে কালী নীলমেঘের মতো মনজ্ঞা।
কালী দিগম্বরী বা দিগবস্ত্রা। বস্ত্র আবরণ। সব চেয়ে সূক্ষ্ম আবরণ মায়া। কালী পূর্ণব্রহ্মময়ী বলে মায়াতীতা। এইজন্যই তিনি আবরণশূন্যা দিগম্বরী।
কালী মুক্তকেশী। তাঁর মুক্তকেশজাল মায়াপাশের প্রতীক। আবার কালী ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং শিবেরও মুক্তিবিধান করেন বলেই মুক্তকেশী। যেমন, ক+অ+ঈশ=কেশ। ক=ব্রহ্মা, অ=বিষ্ণু, ঈশ=শিব। অতএব কেশ বলতে বোঝানো হয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। দেবী মুক্তকেশী, কারণ তিনি কেশকে মুক্ত করেন।
কালী ত্রিনয়না। চন্দ্র সূর্য এবং অগ্নি– এই তিন নিত্য নয়নের দ্বারা কালসম্ভূত অখিল জগৎ দর্শন করেন।
মহাকালরূপে তিনি সমস্ত বিশ্বকে গ্রাস করেন আবার মহাকালকেও গ্রাস করেন, তাই কালী করালবদনা।