কালীর পূর্বাভাস।। ১০
কালী ঘোরদংষ্ট্রা দন্তুরা প্রকটিতরসনা।
কালীর জিভ রক্তবর্ণ। লেলিহান। নিজের জিভ দংশন করে থাকেন কালী। ঝকঝকে শ্বেত শুভ্র দাঁত– স্বপ্রকাশসত্ত্বগুণসূচক। তদুপরি ঘোর বা বিশাল দন্ত সত্ত্বগুণের আধিক্যসূচক। রক্তবর্ণ লোল রসনা রজোগুণসূচক। দেবী কালী প্রথমে রজোগুণের বৃদ্ধি করে তমোগুণ নাশ করেন। তাঁর লেলিহান জিভ এই তত্ত্বের সূচক। তারপর সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি করে রজঃ ও তমঃ– দুইকেই নাশ করেন। জিভ দংশন এই তিনটি কারণকে চিহ্নিত করছে।
আবার কালীকে আমরা দেখছি যে, তাঁর দুই ওষ্ঠপ্রান্ত রক্তধারা বিগলিত। রক্তধারা রজোগুণসূচক। রক্তধারা বেরিয়ে এসেছে, এর অর্থ দেবী রজোগুণরহিতা শুদ্ধসত্ত্বাত্মিকা বিরজা।
কালীর কর্ণভূষণ দুটো শবশিশু। এর তত্ত্ব হল, মহেশ্বরের মতো নির্বিকার নিষ্কাম বালকস্বভাব সাধক ব্রহ্মরূপিণী কালীর অতীব প্রিয়।
কালীর গলায় মুণ্ডমালা। এই মালা পঞ্চাশ, মতান্তরে একপঞ্চাশৎ মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। দেবী শব্দব্রহ্মময়ী পঞ্চাশদ্বর্ণরূপিণী। মাতৃকাবর্ণগুলি নামরূপাত্মক। অর্থাৎ, শব্দার্থময় জগতের প্রতিনিধি। মহাপ্রলয়ের সময় কালী জগৎকে আপনার মধ্যে প্রতিসংহার করেন। পঞ্চাশদ্বর্ণময়ী কালীর থেকে শব্দার্থময় জগতের উদ্ভব হয়ে আবার তাতেই লয় হয়ে যায়।
আবার এমনও বলা হয়েছে যে, কালী শব্দব্রহ্মময়ী। প্রত্যেকটা মাতৃকাবর্ণই একটা না একটা বীজমন্ত্র, অর্থাৎ কোনও না কোনও দেবতার সূক্ষ্মরূপ, মুণ্ডমালা ওই মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। এর অর্থ হল, সব দেবতাই কালীর থেকে উদ্ভূত।
আরেক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কালী দানবদলনী। দেবীর গলায় দানবের মুণ্ডমালা।
কালী ত্রিজগৎকে স্তন্যরূপ অন্নাদি দিয়ে পালন করেন। এইজন্যই তিনি পীনোন্নতোপয়োধরা। এই হল তত্ত্ব।
দক্ষিণাকালী চতুর্ভুজা। এই চতুর্ভুজের ব্যাখ্যা এই রকম–
বৃত্তের ৩৬০ ডিগ্রি। ৯০ ডিগ্রি করে চারভাগে বৃত্তকে ভাগ করা যায়। এই চারভাগ বৃত্তের চার ভুজ। অর্থাৎ পূর্ণবৃত্ত চতুর্ভুজ। মহাকাশকে পূর্ণবৃত্ত কল্পনা করলে কালী তাই চতুর্ভুজা।
দেবীর বাঁদিকের উপরের হাতে খড়্গ আর নিচের হাতে সদ্যশ্ছিন্ন মুণ্ড। দেবী জ্ঞানখড়্গের কোপে নিষ্কাম সাধকের মোহপাশ ছিন্ন করেন।
মুণ্ড কেন হাতে? মস্তক হল তত্ত্বজ্ঞানের আধার। নিরাসক্ত মোহমুক্ত সাধককে তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেন কালী। এবং সাধককে কখনও কাছ ছাড়া করেন না।
দেবীর অভয়মুদ্রা এবং অভীষ্টমুদ্রাও সাধকের জন্য।
দক্ষিণাকালী আলীঢ়পাদা এবং প্রত্যালীঢ়পাদা– এই দুই রূপেই বর্ণিত হয়েছেন। বাঁ পা বাড়িয়ে দিলে কালী আলীঢ়পাদা। ডান পা বাড়িয়ে দিলেন প্রত্যালীঢ়পাদা। এই হল তত্ত্ব।
কালীর কটিদেশে শবহস্তনির্মিত কাঞ্চী। কেন?
হাত মানুষের কাজ করার প্রধান যন্ত্র। হাত কর্মের প্রতীক। কল্পাবসানে সমস্ত জীবকে তাদের স্থূলদেহ ছেড়ে নিজ নিজ কর্মসহ লিঙ্গদেহ আশ্রয় করে সগুণব্রহ্মরূপিণী কালীর কারণদেহের অবিদ্যাময় অংশে পুনরায় কল্পারম্ভ পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়। এইজন্যই মৃতজীবদের প্রধানকর্মসাধনভূত হাতের তৈরি কাঞ্চী বিরাটরূপিণী দেবী কালীর গর্ভধারণযোগ্য যোনির ঊর্ধ্বস্থিত কটিদেশে কল্পিত হয়েছে। এই হল তত্ত্ব।
কালী শবরূপী শিবের বুকের উপর অবস্থিত। শব নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক। গায়ত্রীমন্ত্রে বলা হয়েছে, শব শব্দের দ্বারা প্রেতরূপ ব্রহ্ম বোঝায়। পরশিব শুদ্ধ চিৎস্বরূপ, নির্গুণ ব্রহ্ম। তিনি এবং শব দুইই নিষ্ক্রিয়। তাই শব নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক। আবার পরাশিব এবং পরাশক্তি অভিন্ন। তাই শবরূপী শিবকে বলা হয়েছে কালীর নির্গুণব্রহ্মরূপ স্বীয়পদ। যিনি স্বরূপত নির্গুণ ব্রহ্ম তিনিই সগুণব্রহ্মরূপে গুণময়ী সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়কারিণী মহাশক্তি। তিনি কখনও নির্গুণব্রহ্মস্বরূপবিচ্যুত হন না। কালীর শিবরূপ নির্গুণস্বরূপই তাঁর ত্রিগুগাণত্মক রূপের আধার। এই হল ‘শবরূপ-মহাদেবহৃদয়পরিসংস্থিতা’ রূপ রহস্য।
কালী ভয়ঙ্করী। মহাশক্তির সংহার থামে না। তাই সংহারকারী রূপ ভয়ঙ্করী। কিন্তু সাধকের কাছে কালী ভয়ঙ্করী নন। তিনি আনন্দময়ী জননী।
এই প্রসঙ্গে বলা যায়, বিষ্ণুযামলে আছে, দেবীকে বিষ্ণু বলছেন, মা তোমার পরম রূপ কেমন তা কেউ জানে না। সেই জন্যই দেবতারা তোমার কাল্যাদি স্থূল রূপের অর্চনা করেন।
এই বাক্যে প্রতীয়মান হয় যে, ধ্যানাদিতে কালীর যে রূপ দেখা যায়, তা তাঁর স্থূলরূপ। কালীর সূক্ষ্মরূপ সাধকের কাছে অবাঙমনসগোচর।
সমাপ্ত