কালীর পূর্বাভাস।।৮
কালী স্বরূপত এক হলেও তন্ত্রে তাঁর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা আছে। কালীর এই বিভিন্নতা আসলে, সাধকের অধিকার এবং অভীষ্ট— এই দুই অনুসারেই বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে, কালমাতা মহাপ্রভাময়ী অরূপা কালিকার রূপকল্পনা হয় গুণক্রিয়ানুসারে।
তোড়লতন্ত্র বলেছে, কালী অষ্টধা—
দক্ষিণাকালিকা।
সিদ্ধকালিকা।
গুহ্যকালিকা।
শ্রীকালিকা।
ভদ্রকালী।
চামুণ্ডাকালিকা।
শ্মশানকালিকা এবং—
মহাকালী।
মহাকালসংহিতায় কালীর নয় রূপের নাম আছে—
আদ্যা দক্ষিণাকালী।
দ্বিতীয়া ভদ্রকালী।
তৃতীয়া শ্মশানকালী।
চতুর্থী কালকালী।
পঞ্চমী গুহ্যকালী।
ষষ্ঠী কামকলাকালী।
সপ্তমী ধনকালিকা।
অষ্টমী সিদ্ধিকালী।
নবমী চণ্ডিকালিকা।
জয়দ্রথযামলে কালীর আরও কিছু নাম পাওয়া যায়। যেমন—
কালিকা। ডম্বরকালী। রক্ষাকালী। ইন্দীবরকালিকা। ধনদকালিকা। রমণীকালিকা।ঈশানকালিকা। জীবকালী। প্রজ্ঞাকালী। এবং সপ্তার্ণকালী।
এছাড়াও, শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে বশীকরণ-কালিকা এবং হংসকালী— এই দুই নাম পাওয়া গেছে।
এই যে এতো নাম পাওয়া যায়, এবিষয়ে উপেন্দ্রকুমার দাস তাঁর ‘শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বলেছেন, ‘তাঁদের সবার ধ্যান ও মন্ত্রাদি প্রচলিত মুদ্রিত তন্ত্রাদিতে পাওয়া যায় না। কাজেই প্রত্যেকের পৃথক সাধনা আছে কিনা বলা কঠিন। কেননা, মুদ্রিত তন্ত্রে নাই বলেই যে কোনও তন্ত্রে নাই এমন কথা বলা যায় না। করণ, তন্ত্রগ্রন্থ সামান্যই মুদ্রিত হয়েছে, আবার অনেক গ্রন্থ লোপ পেয়েও গেছে।’
কালীর সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হল দক্ষিণাকালী। এই নামের বর্ণনায় আছে, দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান। কালী নামে ভীত হয়ে সে ছুটে পালায়। ত্রিজগতে এই জন্যই কালী উপাসকদের কাছে দক্ষিণাকালী। নির্বাণতন্ত্র মতে আরও বলা হয়, পুরুষ অর্থাৎ শিব হলেন দক্ষিণ। আর শক্তি হলেন বামা। বামা দক্ষিণকে জয় করে মহামোক্ষপ্রদায়িনী হন। এই জন্যই কালী দক্ষিণা। এই বিষয়ে তন্ত্রতত্ত্বে বলা হয়েছে, পুরুষের নাম দক্ষিণ (দক্ষিণাঙ্গস্বরূপ), শক্তির নাম বামা(বামাঙ্গস্বরূপ)। যতদিন এই বাম ও দক্ষিণ, স্ত্রী ও পুরুষ সমবলে অবস্থিত, ততদিন সংসারবন্ধন। এর ব্যাখ্যা এই রকম, মহাশক্তির পুরুষ-অংশ সংসার-প্রবৃত্তিময় বন্ধনের কারণ এবং শক্তি-অংশই সংসার-নিবৃত্তিময় মুক্তির কারণ।
সুতরাং, ‘সাধনার প্রখর প্রভাবে বামাশক্তি জাগরিতা হইলে তিনি তখন দক্ষিণশক্তি পুরুষকে জয় করিয়া তদুপরি স্বয়ং দক্ষিণানন্দে নিমগ্না হন। অর্থাৎ, কি বাম, কি দক্ষিণ উভয় অংশই যখন, তাঁহার প্রভাবে পূর্ণ হইয়া যায়, তখনই সেই কেবলানন্দরূপিণী জীবের মহামোক্ষ প্রদান করেন। তাই ত্রৈলোক্যমোক্ষদা মায়ের নাম দক্ষিণাকালী।’
কামাখ্যাতন্ত্র মতে আবার অন্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শিব বলছেন— যজ্ঞাদি কর্মের শেষে দক্ষিণা যেমন যজ্ঞাদিকে সফল করে তেমনি কালিকা সকলকে বাঞ্ছিত ফল এবং মুক্তি দেন বলে সেই বরবর্ণিনীকে দক্ষিণাকালী বলা হয়।
কেউ কেউ মনে করেন, দক্ষিণাকালী নাম হয়েছে দেবী দক্ষিণমূর্তি নামের ভৈরবের আধারিতা বলে।
এই দক্ষিণাকালীকেই শ্যামা বলা হয়। তন্ত্রান্তরে আছে, কালিকা দ্বিবিধা। কৃষ্ণা আর রক্তা। কৃষ্ণাকে বলা হয় দক্ষিণা আর রক্তাকে বলা হয় সুন্দরী।