।। ভূমিকা।।
‘ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্তসাহিত্য’ (১৩৬৭) গ্রন্থের ‘নিবেদন’-এ লেখক শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলছেন, ‘ঐতিহাসিক দৃষ্টি অবলম্বন করিলেই যে আধ্যাত্মিক সকল সত্যকে অস্বীকার করিতে হইবে এমন কথার তাৎপর্য আমি উপলব্ধি করিতে পারি না; আবার ঐতিহাসিক তথ্য সকলই অধ্যাত্মসাধনা বা উপলব্ধির পরিপন্থী এ-কথাকেও সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। ঐতিহাসিক দৃষ্টির উপরে যাঁহারা জোর দিতে চান তাঁহাদিগকে মনে রাখিতে হইবে, ইতিহাস শুধু তথ্যকে ঘটায় না, তথ্য-ঘটনা দ্বারা সে জাগাইয়া তোলে ভাব-ব্যঞ্জনা, সেই ভাব-ব্যঞ্জনা ঘনীভূত হইয়াই অধ্যাত্ম দৃষ্টির রূপ লাভ করে। এ-ক্ষেত্রে তথ্যের ঘটনাটাই সত্য—মানুষের চিত্তভূমিতে তাহার যত রকমের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তাহার কোনই মূল্য নাই, আশা করি এমন কথা কোন ঐতিহাসিকই বলিবেন না। আবার যাঁহারা অধ্যাত্ম দৃষ্টির উপরে জোর দিতে চান, তাঁহাদিগকে মনে রাখিতে হইবে, অধ্যাত্মসত্য যদি নিত্য এবং পূর্ণও হয়, তথাপি কালে কালে যেসব তথ্যের ভিতর দিয়া তাহার উদ্ভাস ও আত্মপ্রকাশ তাহাকে আমরা উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করিতে পারি না।’
এই উপলব্ধি সদাই কার্যকর রেখে কালীবৃত্তান্ত হাজির করব। পার্বতী, উমা, সতী, দুর্গা, চন্ডিকা—এইসব দেবী কাহিনি বা দেবী মাহাত্ম্য পুরাণ-তন্ত্রে মিলেমিশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এক মহাদেবীর বিবর্তনের নানা উপাখ্যান হাজির করেছে। এরই পাশাপাশি গোচরে আসে আরও একটি শক্তিশালী কাহিনি বা উপাখ্যানের ধারা। তা হল কালীবৃত্তান্ত। আমাদের বঙ্গদেশে শক্তিসাধনার ক্ষেত্রে কালীই একেশ্বরী, কালীই সর্বেশ্বরী হয়ে আছে। কালীকে নিয়েই বাংলাদেশের শক্তিসাধনা এবং বাংলাদেশের শাক্তসাহিত্য একেবারে মাখামাখি। দুর্গা আমাদের বঙ্গদেশের সাধনা কিন্তু কালী আমাদের বঙ্গদেশের ভক্তি। এই দেবী কালী বা কালিকার বৃত্তান্তের এই যে ধারা, প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান করে বহু পুরাণের মধ্যে একেই খুঁজে ফেরার প্রক্রিয়া আজও চলছে।
বাঙালির একটা স্বভাববৈচিত্র্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চমৎকারভাবে শব্দবদ্ধ করেছিলেন, ‘সবই ব্যাদে আছে’। কালী প্রসঙ্গে এই একই রকম উপলব্ধি দেখছি শশিভূষণ দাশগুপ্তের লেখায়, ‘সব দেবীর ইতিহাসই বেদের মধ্যে আবিষ্কার করিবার আমাদের প্রবণতা’। বেদ ছাড়া আমরা কিছু ভাবতেই পারি না, অথচ কেউই বেদ পড়ে না, অথচ সকলেই ধারণা করে সব বেদে আছে—সে বিজ্ঞান থেকে শুরু করে কালী অবধি, সবকিছু। দেবী কালী এবং কালীপুজোর ইতিহাস পড়তে বসে এই দুই উপলব্ধির কথা মাথায় রাখা জরুরি। শুরু হচ্ছে কালীবৃত্তান্ত। আগামী কয়েক পর্বে আপনাদের কাছে কালীর ইতিহাস হাজির করব।
যে ভাল করেছ কালী, আর ভালতে কাজ নাই,
ভালয় ভালয় বিদায় দে মা, আলোয় আলোয় চলে যাই।
মা তোমার করুণা যত, বুঝিলাম অবিরত,
জানিলাম শত শত, কপাল ছাড়া পথ নাই।
জঠরে দিয়াছ স্থান, ক’র না মা অপমান,
কিসে হবে পরিত্রাণ, নরচন্দ্র ভাবে তাই।।
—কুমার নরচন্দ্র রায়