পটুয়াদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, বিশেষ করে প্রথম দিকের পটুয়াদের সম্পর্কে। তবে নীলমণি দাস, বলরাম দাস, গোপাল দাস এঁদের নাম জানা যায় (১৮৯২-১৯৬৬)। পরবর্তী কালের পটুয়া রজনী চিত্রকর, খুবই সংক্ষিপ্ত একটি জীবনী লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর জন্ম মেদিনীপুরের আকুবপুর গ্রামে এক কুমোর পরিবারে। ‘আমরা পুরুষানুক্রমে ছবি আঁকা প্রতিমা নির্মাণ, পটচিত্র লেখা প্রভৃতি যাবতীয় বৃত্তি অবলম্বন করিয়া পূর্বপুরুষের ভিটা আকুবপুর গ্রামে আজ প্রায় দুইশত বৎসর বসবাস করিতেছি’ (রজনী চিত্রকর, অন্বিষ্ট-পট সংখ্যা)। এ থেকে দেখা যায় কুমোর বা মৃৎশিল্পীরা পুরুষানুক্রমে ছবি বা পট আঁকতেন। রজনী চিত্রকর, বলরাম ঘোষ, নিবারণ দাস প্রমুখ প্রখ্যাত পটুয়াদের কাছে পট আঁকা শিখেছেন আবার ‘প্রখ্যাত শিল্পী চিন্ময়ীলাল চিত্রকরের সহকর্মীরূপে বেহালার সাধন চৌধুরীদের রথে আন্দুল মৌড়ীর জমিদারদের রথে ছবি লিখিয়া প্রশংসা অর্জন’ করার কথা বলেছেন, ময়ূরভঞ্জের মণ্ডপ সজ্জা, প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুরের বাগানবাড়ি ‘চিত্রপুরী’র কুঠিতে বহুদিন চিত্রাঙ্কন ও প্রতিমা নির্মাণ করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র পট এঁকে এঁদের জীবিকা নির্বাহ হত না, এর আগেকার কালীঘাটের পটুয়াদের ক্ষেত্রেও এইরকম বিবিধ শিল্পকর্ম করে থাকা সম্ভব।

এ দেশের চিত্রকলায় কালীঘাটের পটুয়ারাই প্রথম নাগরিক জীবনযাপন তুলে আনলেন। আগে জাতপটুয়াদের পটে, পুথিচিত্রে, বিষ্ণুপুরি চৌকা পটে, দেবদেবী, পৌরাণিক উপাখ্যান, জাদু ও লোকায়ত কিছু বিশ্বাস দেখা গেছে, নাগরিক জীবন বা দৈনন্দিন জীবনের চিত্র নেই। অবশ্য মন্দির গাত্রের টেরাকোটায় কিছু কিছু সমকালীন বিষয়— যেমন সাহেব বিবি, নানান নৌকা ইত্যাদি দেখা গেছে। উনিশ শতকের গোড়ায় কলকাতা শহরে দ্রুত নগরায়ণ শুরু হল, বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এসে বসতি স্থাপন করল, এলেন ভিন্ন প্রদেশের লোক ও প্রচুর ইওরোপীয়। এরই অভিঘাত পড়ল কালীঘাটের পটে। বাংলার ব্যঙ্গ চিত্রের সূচনাও কালীঘাটের পটে – বাবু কর্তৃক বিবির পদ সেবা, ভণ্ড বৈষ্ণবের মাথায় একটা পাখি – এরকম অনেকগুলি ছবি দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু ছবিতে রয়েছে ‘বাবু কালচার’কে বিদ্রূপ করার লক্ষণ।
অনবদ্য পরম্পরাগত পৌরাণিক চিত্র অনেকগুলি দেখা গেছে। একটি গোষ্ঠলীলা পটের বিবরণ দিচ্ছেন অজিত ঘোষ, ‘প্রায় একশত বৎসর পূর্বে আঁকা এই ছবিখানি আকারে বড়ো, রূপকল্পনায় ও বর্ণসুষমায় চমৎকারজনক। রবিকরোজ্জ্বল আকাশের তলে নীল যমুনার ধারা আর উন্মুক্ত ছত্রাকারে দণ্ডায়মান পুষ্পিত তিনটি কদম বৃক্ষ— নীল ও সাদার নিপুণ প্রয়োগে বিকশিত পুষ্পস্তবক ও ঘনশ্যাম প্রচুর পল্লব যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা বিশেষভাবে মনোহারী— এই পটভূমিতে গোধন ও রাখাল সখাগণে পরিবৃত কৃষ্ণ-বলরামের গোষ্ঠলীলার সজীব সুন্দর একখানি আলেখ্য। বিলাতি জলরঙে ছাপা ছবি বা এনগ্রেভিং শিল্পী দেখে থাকবেন, তারই স্মৃতি থেকে সন্দেহ নেই, ছায়া সুষমারও প্রয়োগ করেছেন এওন বুঝে-সুঝে আর এত নিপুণভাবে যে, এই চিত্র রূপকল্পনার এই উর্ধ্বস্তরে উন্নীত হয়েছে। চিরাগত রেখাছন্দ আর রূপসন্নিবেশের দক্ষতা তো আছেই।’ (বিশ্বভারতী পত্রিকা) ছবিটি ইংল্যান্ডে আছে। এই বর্ণনায় বোঝা যায় সাদাকালোর সাবলীল রেখাছন্দের মধ্যে এসে গেছে অনুচিত্রের সূক্ষ্মতা। অবশ্যই এটি পরবর্তীকালের।

ভারতীয় চিত্রকলায় রেখার প্রাধান্য ও সাবলীলতার কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। অজন্তা থেকে সমস্ত ভারতীয় চিত্রকলার ঐতিহ্যে এটি চলে আসছে। কালীঘাটের পটুয়ারাও পরম্পরাগত পুরুষানুক্রমিক শিল্প শিক্ষা থেকে এ গুণ আয়ত্ত করেছেন।
কালীঘাট পট চিত্রের গৌরব ১৮৮১ থেকেই যে অস্তমিত তা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন। ছবির বাজারে চলে এসেছে লিথো, বিদেশে ছাপা ওলিওগ্রাফ যা দামে আরও সস্তা। লোকে ক্রমে সেগুলিই সংগ্রহ করতে শুরু করল, তবুও কালীঘাটের পট তার ‘অস্তঙ্গত মহিমা’ নিয়ে চলছিল, ১৯৩০ নাগাদ তা প্রায় বিলুপ্ত হল। যদিও ১৯৩০-এর পরও কিছু পট আঁকা হয়েছে। তার শিল্পগুণ থাকলেও নেই সমাদর ও বাজার। শ্রীশচন্দ্র চিত্রকর এরকম সময়ের এক গুণী শিল্পী।
উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক চিন্তায় আচ্ছন্ন বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা যে শিল্পের মূল্য বোঝেননি, বিংশ শতকের গোড়া থেকে তার মূল্য কিছু কিছু শিল্পরসিক বুঝতে পেরেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ, গুরুসদয় দত্ত, নন্দলাল বসু, অজিত ঘোষ প্রমুখ। কালীঘাটের পট অবলম্বন করে সে সময়ে সুনয়নী দেবী ও যামিনী রায় ছবি এঁকেছেন। এসময়ের বিখ্যাত চিত্রকর যোগেন চৌধুরীর মধ্যেও কালীঘাটের পটের কিছু বৈশিষ্ট্য ক্ষীণভাবে দেখা যায়।