সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্ম পূণ্যতিথিতে কালনা সিএডিপি এফএসসিএস লিঃ-এর সভাঘরে বাংলার সওদাগর এবং কালনা সিএডিপি এফএসসিএস লিঃ (সমবায়) এর যৌথ প্রচেষ্টায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের মর্যাদাপূর্ণ রোজগার ও হাতে ধরে ব্যবসা পরিস্থিতি তৈরি করার লক্ষ্যে, ক্ষুদ্র কুটির ও হস্তশিল্পের হাব গঠনের উদ্দেশ্যে এক অভিনব ও প্রতিশ্রুতিপূর্ণ উদ্যোগের সূচনা হল। এই অনুষ্ঠানে স্বনির্গোষ্ঠীর ১৫০ জন মহিলা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিধায়ক দেবপ্রসাদ বাগ। তিনি প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্যে দিয়ে হাবের যাত্রার সূচনা করেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ব্লক সভাপতি প্রণব রায়। উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিলীমা কোপ্তি, সহ-সভাপতি মাননীয় সুভাষ বোস, বলরামা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মুনমুন বাগ, — বৈদ্যপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মিজানুর রহমান, অকালপৌষ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বিজয় পাত্র। এই তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েত অঞ্চল নিয়ে কালনা-২ সিএডিপি গঠিত। এছাড়া পঞ্চায়েত সমিতির কয়েকজন কর্মাধ্যক্ষও উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠনের পরে অনুষ্ঠানে মহিলাদের তৈরি স্যানিটাইজার এবং ফিনাইল উপস্থিত অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিধায়ক দেবপ্রসাদ বাগ বলেন, আমি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই, তবে এর আগেও বেশ কয়েকটি সংস্থা অনুরূপ উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা চিন্তা করে তারা প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ না করে মাঝপথে ছেড়ে চলে যায়। আশারাখি এইবারের অভিনব উদ্যোগ সফল হবে।

উদ্যোক্তাদের পক্ষে প্রণব রায় বলেন গ্রামীন গোষ্ঠীগুলো দিশাহীন অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় বাংলার সওদাগর এবং কালনা সিএডিপির যৌথ উদ্যোগে যে হস্ত এবং কুটিরশিল্প হাব আজকে উদ্বোধন হল, তার ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমি খুবই আশাবাদী। সঠিকভাবে পথ দেখাতে পারলে গোষ্ঠীর মহিলাদের রোজগার বাড়ানো সম্ভব এবং তারা এর মধ্যে দিয়ে গ্রামীন হস্তশিল্প, কুটির শিল্পকে মহিলারাই তুলে ধরতে পারবে। তাদের উৎপন্ন দ্রব্য বাজার জাত হবে এবং সেগুলো বিক্রির ব্যবস্থা হবে। গ্রামে কুটির শিল্প উজ্জীবন করার জন্যে যথেষ্ট কাঁচামাল রয়েছে। এগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করা যায় না। বাজার চেনার অভাবে এই সম্পদগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কালনায় আমাদের মা-বোনেরা পিঠেপুলি উৎসব করেন। কিন্তু এই পিঠে যে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যায় সেই ধারণা মা-বোনেদের নেই। বাড়িতে তারা নানান ফলের আচার বানান, কিন্তু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আচার বানাবার উপায় দেখানোর মানুষ নেই। অথচ এর থেকে আয় হতে পারে, স্থানীয় অঞ্চলেরও উন্নতি হতে পারে। এই রাস্তাটা তাদের দেখানো দরকার। বাংলার সওদাগর আজকে সেই বন্ধ রাস্তাটা খুলে দিচ্ছে। বাজারটাকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। আমাদের এই হাবে ২০০০ মহিলা কাজ করবেন এবং তাদের প্রত্যেকের রুটিরুজি এই হাব থেকেই অর্জন করবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর হাতে অর্থ আসুক। বাঙলা তথা ভারতে মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না বলেই তারা আজ নির্যাতিত। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করছেন লক্ষ্মীভাণ্ডারের মাধ্যমে তাদের হাতে অর্থ তুলে দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করাতে। কিন্তু অনুদান পাওয়ার থেকে যদি দেখা যায় তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে রোজগার করছে, পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ বাড়াচ্ছে, সেটা তাদের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে, নারী নির্যাতন, বধু নির্যাতন প্রভূত পরিমানে কমে যাবে। আজকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার মহিলাদের লক্ষ্মীভাণ্ডারে যে অর্থ দিচ্ছেন, তারা যদি সেই অর্থ যৌথভাবে মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করেন, তাহলে মাসিক এই ১০০০ টাকাটা ৫০০০ টাকায় পরিণত হতে পারে। ভবিষ্যতে এটা মডেল হতে পারে।

বাংলার সওদাগর সংগঠনের পক্ষে দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য বলেন — সরকারি তো বটেই বেসরকারি সংস্থায় চাকরির সুযোগ সুবিধা দিন দিন কমে আসছে। এমন অবস্থায় বাঙালির চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক আগামী প্রজন্মের সামনে কোন দুর্দিন অপেক্ষা করছে! মহিলাদের নেতৃত্বে এই হাব কর্মকান্ড বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতির সহায়ক হবে যা ভারতীয় অর্থনীতির এই ভীষণ দুর্দিনে বিকল্প গ্রামভিত্তিক পথের গুরুত্ব হাতে কলমে দেখাতে সক্ষম হবে। গ্রামের যেমন আয় বাড়াবে, তেমনি একইসাথে গ্রামের অর্থ গ্রামেই ব্যবহার ও সঞ্চয়ের অধিকতর সুযোগ করে দেবে। আবার উন্নত স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক উৎপাদনের ব্যবহার ইত্যাদিকে বাস্তবায়িত করার ব্যবস্থা করবে। মুষ্টিমেয় পরিবারের সীমাহীন ধনার্জনের বিপরীতে বিপুল জনসাধারনের মধ্যে উৎপাদন ও সম্পদ বন্টনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সমাজকাঠামো উন্নত হবে। সাধারণত ব্যবসাবিমুখ বলে পরিচিত বাঙালির অধিকাংশের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। অথচ, বাংলার ব্যবসা ও ব্যবসায়িক পণ্যের এক সময় ছিল জগতজোড়া খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা ও প্রাচুর্য! বাঙালিকে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সবার প্রথম তার আত্মবিশ্বাস জাগাতে হবে, নিজেদের অতীত গৌরব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতে হবে ও জড়তা ছেড়ে ব্যবসায় ঝাঁপাতে হবে। যার যত সামর্থ্য সেই নিয়েই এগিয়ে আসতে হবে। আজ দরকার বাঙালি ব্যবসায়িক ভাতৃত্ববোধের! একে অন্যকে সাহায্য করেও বড় ব্যবসা করা যায়!

আমরা “বাংলার সওদাগর” সামাজিক উদ্যমে এ বিশ্বাসী। এক্ষেত্রে হাতে হাত ধরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের মর্যাদাপূর্ণ রোজগারের যেমন ব্যবস্থা করা হচ্ছে সেরকম ঘরে ঘরে অতিক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র উদ্যোগী তৈরির পথও সুগম করা হচ্ছে। ঔপনিবেশিক নিস্পেশন ও লুঠপাটের কুপ্রভাব ও ধ্যানধারনা থেকে সমাজ এখনও কত বের হতে পেরেছে? এই চর্চা আমাদের ভাবায়। এই গবেষণামূলক রচনাগুলোর মধ্যে বিশ্বেন্দু নন্দ মহাশয় এবং সমমনস্ক বিভিন্ন চিন্তাশীল মানুষের বহুমূল্যবান কাজ আমাদের এই কর্ম প্রয়াসের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেছে বলতে পারেন!
মনসা মঙ্গল কাব্যের পরতে পরতে যে ইতিহাস উঁকি দেয় তা থেকে আমরা জানি, যে অঞ্চলের উপর দিয়ে জলপথে বেহুলা গিয়েছিলেন তার অনেকটা এই সুজলা সুফলা জনপদ ছিল! এই অঞ্চলে আমাদের উদ্যোগের মডেল নির্মাণের শুভ সূচনা করতে পেরে আমরা গর্ব অনুভব করছি।

উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এর আগে হাব তৈরির প্রস্তুতি মিটিং হয়েছে দুটো; এখন দুদিন ট্রেনিং হল; মহিলা গোষ্ঠীর সদস্যদের উৎসাহ উদ্দীপনা চোখেপড়ার মত। গোষ্ঠীর মেয়েরা নিজেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই ফিনাইল এবং স্যানিটাইজার উৎপাদন করেছে। অতীব আশার কথা, আজকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠনে উপস্থিত র্যাশন ডিলারদের সংগঠনের সদস্য ১২০০ লিটারের ফিনাইল তৈরি বরাত মেয়েদের গোষ্ঠীকে দিয়েছেন। কালনার সরস্বতী পুজো খুব বিখ্যাত। কালনা প্রশাসনের পক্ষে প্রতিটি পুজো কমিটিকে জানানো হয়েছে প্যান্ডেল স্যানিটাইজ করার জন্যে। মাননীয় বিধায়ক প্রস্তাব দিয়েছেন যাতে প্রতিটা পুজো প্যান্ডেলে ৫ লিটার করে স্যানিটাইজার মহিলা উদ্যোগীদের থেকে নেয় সেটা তিনি দেখবেন। কালনা ২এর যে সব পঞ্চায়েত সমিতি আছে সেগুলোতেও স্যানিটাইজার ইত্যাদি এই মহিলা উদ্যোগীদের থেকে যাবে।