কবি কাজী নজরুল ইসলামের পুত্রবধূ ও কবিপুত্র অনিরুদ্ধের স্ত্রী সংগীতশিল্পী কল্যাণী কাজী প্রয়াত হয়েছেন আজ ১২ মে শুক্রবার ভোরে। তার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার স্মৃতিচারণা করছি।
কল্যাণী কাজী তার স্বামী অনিরুদ্ধ কাজীর উদ্দেশ্যে তাঁরই স্মৃতিতর্পণ ‘অন্তরঙ্গ-অনিরুদ্ধ’ বইটির উৎসর্গ পর্বে লিখেছিলেন,
“যিনি আমার মনে ‘অনির্বাণ’ প্রেম দীপশিখা জ্বেলে সত্য পথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন, যাঁর ভালবাসার জোরে আমি সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে পেরেছি–সেই অনিরুদ্ধ।
কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আর পাঁচজন ছেলেমেয়ের মতোই কবিতার বইয়ের পাতার ঘ্রাণ নিয়ে। যেখানে ‘ভোর হল দোর খোল’ পড়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন। স্কুলে গণ্ডি সবটা সঙ্গী করে সকলের মতো দিনযাপন। এরপর খুব কম বয়সেই কাজী পরিবারের ছোট ছেলে প্রখ্যাত গীটার বাদক কাজী অনিরূদ্ধের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর যে কবিকে ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হওয়া, তাঁকে সামনে থেকে দেখবার ইচ্ছে নিয়ে একবার দেখতেও গিয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে একবার স্মৃতিচারণা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘বাবা নিজের মতো একটা ঘরে থাকতেন। শাশুড়ি মাও থাকতেন সেই ঘরে। মা নিজেও অসুস্থ ছিলেন।’
সেদিন দেখতে গিয়ে প্রথম দেখায় যেন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। প্রনাম করেছিলেন সেদিন। একটা কাগজ সেদিন এগিয়ে দিয়েছিলেন যদি একটা অটোগ্রাফ পাওয়া যায়। প্রথমে তিনি যে নারাজ তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর ছেলের অনুরোধেই খানিক রেগে গিয়েই সই করে দিয়েছিলেন।
কল্যাণী কাজীর লেখা ‘অন্তরঙ্গ-অনিরুদ্ধ’ বইয়ের আলোকে আমি আমার লেখা উপস্থাপন করতে চেষ্টা করব।
শুরুতে উঠে এসেছে কল্যাণী কাজীর বাল্য জীবনের কথা। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে রাঁচিতে বেড়াতে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবেই কাজী অনিরুদ্ধর সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপ। কল্যাণী কাজীর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেই দিনগুলি- “স্টেশন-এ সপ্রতিভভাবে আমাদের কাছে এসে তিনি আবার আমায় একটা মোটা খাম দিয়ে বললেন — ‘আপনার বাকি গানগুলো এতে আছে’ বোকার মত হেসে বললাম ‘ধন্যবাদ’। খামটা তাড়াতাড়ি হাত ব্যাগে রেখে দিলাম। কেননা ট্রেনে ওঠার আগে গান লেখা যে খাম তিনি আমায় দিয়েছিলেন, তা পড়ে আমার প্রাণ যাবার উপক্রম হয়েছিল। হ্যাঁ, তাতে লেখা ছিল তিনি গভীরভাবে আমায় ভালোবেসে ফেলেছেন। আমার মত একজন সাধারণ মেয়ের কাছে এ খবর ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত। তাই প্রথমে বিশ্বাস করতে মন চাইছিল না। একে শিল্পীর নিছক একটা খেয়াল বলেই মনে হয়েছিল। তাছাড়া রক্ষণশীল পরিবারের কঠোর অনুশাসন উপেক্ষা করে, আমি এ ধরনের সম্পর্ককে কতটা পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারবো, সে বিষয়ে মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। তাই প্রথম দর্শনে ভালবাসলেও তাঁকে সযত্নে এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলাম। বুঝেছিলাম তিনি রূপে, গুনে, বুদ্ধি-বিবেচনায় আমার চেয়ে অনেক বড়। কাছাকাছি হলেই তাঁর কথায় সংঘর্ষ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তাঁর সাথে পরিচয়ের মধুর স্মৃতিটা মনের কোণে লুকিয়ে রেখে বন্ধুত্ব পাতাতে চেয়েছিলাম।
তিনি তাতেও রাজী হননি।তিনি এটাকে আমার অহংকার মনে করে একবার লিখলেন —‘Pearl S.Buck’-এর This Proud heart পড়ছিলাম। ওর মধ্যে একজায়গায় আছে — ‘At first I want to break your pride and then fall in love with you’ খুব সুন্দর লাগল। সত্যি কথা। হঠাৎ আচমকাই তাঁর বন্ধ মনের দরজা অকপটে আমার সামনে খুলে দিয়ে আমার দ্বিধাগ্রস্ত, অর্ধচেতন মনকে চমক দিয়ে জাগিয়ে দিলেন। তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেললাম। মনের দিক দিয়ে অসহায় মানুষটার কাছে থেকে তাঁর সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবার জন্যে মন-প্রাণ উন্মুখ হয়ে থাকতো।
কিন্তু সে সুযোগ পেলাম অনেক পরে। অনিরুদ্ধ জোর করে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে চাইলে কোন শক্তিই আমাকে আটকাতে পারত না। কিন্তু তিনি আমায় যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে কাছে পেতে চেয়েছিলেন, এখানেই তিনি অন্যের থেকে আলাদা, অনেক বড় মাপের মানুষ।
অনেক বাধা পেরিয়ে অবশেষে এই প্রেম পরিণতি পায়।
কিন্তু তখনকার দিনে দুই পৃথক ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ভালোবাসার কি সুদৃঢ়বন্ধন থাকলে তবেই এই প্রতিকূল পরিবেশকে অতিক্রম করা যায়।
কল্যাণীর বাবা কিন্তু উঠে পড়ে লাগলেন মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার জন্য।
অবশেষে এলো সেই শুভ দিন — কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ হয়ে কাজী পরিবারে পদার্পণ করলেন- কল্যানী কাজী। কলকাতার ১৬ নম্বর, রাজেন্দ্রলাল স্ট্রিটের বাড়িতে শুরু হলো তাঁদের বিবাহিত জীবন।
সে এক কাহিনি, ১৯৫৫ সনের ২৪ ডিসেম্বর শনিবার দুপুর ২-১৫ মিনিট। কল্যাণী কাজে লিখেছেন, দক্ষিণেশ্বরে বিরজাসুন্দরী দেবীর মেয়ে অঞ্জলি সেনগুপ্ত (জটুমাসিমা) এবং জামাই অনন্ত সেনগুপ্তর বাড়িতে রেজিস্টার B. K. Roy আমাদের দুজনের পূর্ণ সম্মতিতে বিয়ে দেন। সাক্ষী ছিলেন বীরেন সেনগুপ্ত, অনন্ত সেনগুপ্ত এবং শিবনাথ চট্টোপাধ্যায়। বিয়ের পর আমরা দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে পূজো দিতে গিয়েছিলাম। নিনি এগুলো খুব মানতেন। হাওয়াতে পূজোর ডালা থেকে মালা পড়ে যায়। নিনির খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী জীবনে যখনই কোনো অঘটন আমাদের সংসারে ঘটেছে তখনই তিনি ঐ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। নিনি আর আমার মধ্যে বোঝাপড়া এমনই ছিল যে, আমরা অনেকের অশুভ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে পেরেছিলাম।
রাঁচি থেকে কাজী অনিরুদ্ধকে লেখা প্রমীলা দেবীর দুটি চিঠি বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে। ‘নিনি’ সম্বোধন করে লেখা এ চিঠি দুটি পড়লেই বোঝা যায় যে — সেই সময় প্রমীলা দেবী তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের উপর কতখানি নির্ভর করতেন। “এই চোখের জলের সঙ্গে নিয়ত প্রার্থনা করছি, তোমার সকল অশান্তি, সব বিঘ্ন দূর হোক। বাবা, হতাশ হয়ো না। কায় মনে ওঁকে স্মরণ কর, যার কৃপায় অলৌকিক ঘটনা ঘটে। আমাদের ব্যাধির জন্যে কষ্ট কোরো না। অনেকদিন গত হয়েছে। এতে প্রাণ ভয় নেই। তুমি ছাড়া শান্তি পাওয়ার আর কিছু নাই জীবনে। তোমাকে ভালো দেখতে না পেলে এই মৃত্যুহীন প্রাণ অসহায় হয়ে ওঠে। আমারই জন্য এবং যাঁর ছেলে তুমি তাঁর প্রতি কর্তব্যবোধে মন কে সবল রাখো। ওঁর অসুখের প্রথম অবস্থায় তোমারই জন্য কেবল ব্যাকুল হতেন এবং তোমার নাম করতেন। ওঁর প্রতি সকলেরই কর্তব্য আছে, কিন্তু যে তার অর্থ না বোঝে তাকে বলা বৃথা।”
গত নভেম্বর মাস থেকেই শারীরিক কষ্টে ভুগছিলেন কল্যাণী কাজী। ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছিল তাঁর। সেই সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রথমে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে এক বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন। তারপর তাঁকে এসএসকেএমএ স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মাল্টিঅর্গান ফেলিওর হয় তাঁর। শুক্রবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শিল্পী কল্যাণী কাজী।
কল্যাণী কাজীর একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার পাশাপাশি এই বইটিতে স্থান পেয়েছে বিশিষ্ট যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের স্মৃতিচারণা — তাঁরা কেউ কাজী অনিরুদ্ধকে পেয়েছেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান ও মনোযোগী ছাত্র হিসেবে, আবার কেউ পেয়েছেন সহশিল্পী হিসেবে, অন্যতম গুরু হিসেবে। কাজী অরিন্দমের ‘আমার বাবা’ শীর্ষক লেখাটি নিঃসন্দেহে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে।লেখাটি শুরু হয় এভাবে — “কাজী অনিরুদ্ধ নামটা উচ্চারণের সাথে সাথে সদা হাস্যময় এক সুপুরুষের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অজাতশত্রু এই শিল্পী নিপুণ দক্ষতায় বিদেশী যন্ত্র গীটার কে স্বদেশের ঘরে-ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ভাবতে গর্ব হয় এমন একজন মহান শিল্পীর ছেলে আমি…।”
শুধুমাত্র পারিবারিক জীবন নয়, কাজী অনিরুদ্ধর শিল্পী জীবনের কথাও অত্যন্ত সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই বইটিতে। পরিশেষে তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে — “গীটারযন্ত্রের শিল্প সাধনায় যে ক’জন শিল্পী আজ বাংলার সুরের আকাশে আপন প্রতিভার কিরণে নিজেদের আলোকিত করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কাজী অনিরুদ্ধ। সাহিত্য ও সংগীত জগতের অবিস্মরণীয় প্রাণপুরুষ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠপুত্র কাজী অনিরুদ্ধ নিজের প্রতিভা বলে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদেশী যন্ত্র গীটারকে স্বদেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছিলেন। জন্ম – ১৯৩১ সনের ২৪শে ডিসেম্বর, মৃত্যু – ১৯৭৪ সনের ২২শে ফেব্রুয়ারি। মাত্র ৪৩ বছরের জীবনে তিনি সঙ্গীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। তাঁরই স্মৃতিতর্পণ ‘অন্তরঙ্গ-অনিরুদ্ধ’।”
শিল্পীর দুই পুত্র ও এক কন্যা বর্তমান। পরিবার সূত্রে খবর, কল্যাণী কাজীর দেহ পাইকপাড়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর পিস ওয়াল্ডে রাখার হতে পারে। আগামীকাল কন্যা অনিন্দিতা কাজী আমেরিকা থেকে ফিরলে পার্ক সার্কাসে কল্যাণীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে জানা গিয়েছে।
পরিশেষে, প্রয়াত কল্যাণী কাজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষ করি।
তথ্যসূত্র: সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা,বাংলাদেশ।