মানুষের একাদশ ইন্দ্রের অধিষ্ঠাত্রী একাদশী দেবী। দেবীর নাম অনুসারে এক একটি তিথির নাম। শাস্ত্র বলে, একাদশী ব্রত পালনে একাদশ ইন্দ্রিয়ের সংযম হয়। ইন্দ্রিয় সংযত হলে জাগতিক রিপু আমাদের বশে থাকে। ফলে সংযত হয় লোভ, ঈর্ষা, দম্ভ, অহংকার ইত্যাদি — আজকের দিনে যা অত্যন্ত প্রয়োজন।
আজ অর্থাৎ ৩১ জুলাই শ্রাবণ মাসের প্রথম একাদশী। শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের এই একাদশী তিথিকে বলা হয় ‘কামিকা’ বা ‘কামদা একাদশী’। শ্রীশ্রীকামিকা একাদশী দেবী তাঁর অনুগত ও আশ্রয় প্রার্থীদের মনের যাবতীয় পার্থীব বিষয়ের কামনা বাসনা দূর করে প্রদান করেন দিব্য চেতনা।
দেহাদির বিষয়ে অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয়গণ। ইন্দ্রিয়গণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মন, আবার মন অপেক্ষা বুদ্ধির শ্রেষ্ঠ। যিনি বুদ্ধি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ–তিনি আত্মা। মূল কথাটি হচ্ছে আত্মিক উন্নতিকল্পে ইন্দ্রিয়গণকে বশীভূত বা জয় করার জন্যই করা একাদশী ব্রত পালন করা হয়।
মানুষের একাদশ ইন্দ্রিয়গুলি হলো — পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় (হস্ত, পদ, বাক, পায়ু, উপস্থ), পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় (কর্ণ, ত্বক, চক্ষু, জিহ্বা ও নাসিকা) এবং একটি অন্তরিন্দ্রিয় মন। একাদশ ইন্দ্রিয় যা দিয়ে গঠিত আমাদের পঞ্চ ভৌতিক দেহ আর রূপ গন্ধ শব্দ রস ও স্পর্শ এই পাঁচটি হলো জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয় মাত্র। তবে মনের সবটাই ইন্দ্রিয় নয়। মনের যে অংশ জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয়ামুখী, তাই ইন্দ্রিয়। আবার অন্য দশ ইন্দ্রিয়ের কর্তা মন কিন্তু মনের যে অংশ বুদ্ধি বা মহত্ত্বের অভিমুখী তাকে ইন্দ্রিয় বলা যাবে না। সেই অংশে চৈতন্যের প্রকাশ।
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে পাণ্ডবেরা এ তিথি প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।প্রত্যুত্তরে ভক্ত বৎসল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, পূর্বে দেবর্ষি নারদ প্রজাপতি ব্রহ্মাকে এই প্রশ্নই করলে তিনি যে উওর দিয়েছিলেন তাই তিনি বলবেন–
“শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া একাদশী ‘কামিকা’ নামে জগতে প্রসিদ্ধা। এই একাদশীর মাহাত্ম্য শ্রবণে বাজপেয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়। গঙ্গা গোদাবরী কাশী নৈমিষ্যারণ্য পুষ্কর ইত্যাদি তীর্থ দর্শনের সমস্ত ফল একমাত্র কৃষ্ণ পূজার মাধ্যমে কোটি গুন লাভ করা সম্ভব। সাগর ও অরণ্য যুক্ত পৃথিবী দানের ফল, দুগ্ধবতী গাভী দানের ফল অনায়াসে এই ব্রত পালনে লাভ হয়। যারা পাপপূর্ণ সাগরে নিমগ্ন এই ব্রতই তাদের উদ্ধারের একমাত্র সহজ উপায়। এই রকম পবিত্র পাপনাশক শ্রেষ্ঠ ব্রত আর জগতে নেই।”
“রাত্রি জাগরণ করে যারা এই ব্রত পালন করেন তাঁরা কখনও দুঃখ দুর্দশাগ্রস্ত হন না। এই ব্রত পালনকারী কখনও নিম্ন যোনি প্রাপ্ত হন না।”

কামিকা একাদশীর ব্রতকথা : পুরাকালে কোন এক গ্রামে অত্যন্ত শক্তিশালী এক ক্ষত্রিয় বাস করতেন। নিয়মিত তিনি বিষ্ণুর আরাধনা করতেন। ধর্মীয় প্রভাব তার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও অহংকার তার মধ্যে বাসা বেঁধে ছিলো। একদিন গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে রাস্তায় বেড়ানোর সময় এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে পথে তার সাক্ষাৎ হয়। কোন কারনে তাদের মধ্যে বাদবিবাদও ঘটে। বিবাদ হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যায়। দূর্বল হওয়ার দরুন, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়র আঘাত সহ্য করতে পারে না এবং তৎক্ষণাৎ মারা যায়।
ব্রাহ্মণকে মৃত অবস্থায় দেখে ক্ষত্রিয় তার সম্বিত ফিরে পায় এবং পশ্চাতাপের আগুনে জ্বলতে থাকে। গ্রামবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ব্রাহ্মণের অন্তেষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন। পন্ডিতদের কাছে ওই ক্ষত্রিয় ব্রহ্মহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করার উপায় জিগ্যেস করেন।
পন্ডিতগণ তাঁকে শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে বিষ্ণু পুজো, ব্রাহ্মণদের ভোজন ও দানদক্ষিণা করার উপদেশ দেন। তাঁদের কথা অনুযায়ী ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণের অন্ত্যেষ্টির পর শ্রদ্ধা-ভক্তিভরে কামিকা একাদশীর ব্রত পালন করেন। বিষ্ণুর কৃপায় ব্রহ্মহত্যার দোষ থেকে মুক্তি পান।
আজ, ৩১ জুলাই, কামিকা একাদশীর পুজো ও উপবাস করতে হবে। ব্রতভঙ্গ হবে কাল (১ অগাস্ট) ভোর ৫টা ৪৩ মিনিট থেকে শুরু করে সকাল ৮টা ২৪ মিনিটের মধ্যে। কাল দুপুর ৩টে ২৮ মিনিটে দ্বাদশী তিথি সমাপ্ত হবে।
পদ্মপুরাণে বর্ণিত আছে কামিকা একাদশীর উপবাস ও ব্রত পালন করলে ব্রতী ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে শিবেরও আশীর্বাদ লাভ করেন। সংসারে সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। পুরাণমতে —
১) একাদশীর দিন তুলসীমঞ্জরি দিয়ে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করলে সর্বপাপক্ষয় হয়।
২) পুজোর সময় ভগবান বিষ্ণুর সম্মুখে তিলের তেল বা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালান। এতে পিতৃজগতে পূর্বপুরুষরা সন্তুষ্ট হন।
৩) এদিন শ্রীকৃষ্ণের লীলা পাঠ, বিষ্ণু সহস্রনাম, বিষ্ণু চল্লিশা পাঠ করুন।
৪) হলুদ মিশ্রিত জল ছিটিয়ে স্বস্তিক তৈরি করুন, এতে ঘরে দেবী লক্ষ্মীর অধিবাস হয়।
৫) ভগবান বিষ্ণুর আরাধনার পাশাপাশি ভগবান শিবকে পঞ্চামৃত দিয়ে অভিষেক করা উচিত।
৬) এদিন ব্রাহ্মণভোজন করান। এটি সম্ভব না হলে অভাবীদের সাহায্য করুন সাধ্যমত।
শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে ভোজন একবারই নিষিদ্ধ, জল পর্যন্ত গ্রহণ করা চলে না। তবে কলিযুগে উপবাস নিষিদ্ধ। তাই অন্ন ছাড়া আর যা কিছু নিরামিষ, তা গ্রহণ করা যাবে। স্মৃতিশাস্ত্রে চাল, ডাল, আটা, ময়দা ও সুজিকে বলা হয়েছে অন্ন। এর কোনটি গ্রহণ করলে একাদশী ব্রত ভঙ্গ হয়।
মহাভারত এবং বিভিন্ন পুরানে একাদশী তিথি পালনের অসংখ্য শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ ও পুজো পাঠের কথা বলা হয়েছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন, ‘কলিতে অন্নগত প্রাণী, উপবাসি থাকলে ঈশ্বরের দিকে মন যায় না।’ মিছরি জল, শরবত খেতে বলতেন তিনি। বলতেন, ‘একাদশী করা ভালো তবে খই, দুধ খাবে কেমন। খই, দুধ সাত্ত্বিক আহার, খুব ভালো’।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ব্রতের কথা সবিস্তারে বলেছিলেন পাণ্ডবদের। ভগবান এই একাদশী ব্রতের পালন মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে পাণ্ডবদের বললেন, যারা ঈশ্বরের চিন্তাভাবনা নিয়ে ইহলোক ও পরলোকে আনন্দে থাকতে চান, তারা নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তি ভরে শাস্ত্রবিধি মেনে এই ব্রত পালন করবেন।এই ব্রতের মাহাত্ম্য যিনি শ্রদ্ধা সহকারে শ্রবণ করবেন, তিনি সর্বপাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করবেন।
“অশ্বমেধসহস্ত্রাণি রাজসূয়শতানি চ,
একাদশ্যূপবাসস্য কলম নহরন্তি ষোড়শীম”।
এই মন্ত্রটির অর্থ হল এক হাজার ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’ বা একশ’ ‘রাজসুয় যজ্ঞ’ করলে যে ফল পাওয়া যায়, একাদশীর দিনে উপবাস করলে যে আশীর্বাদ পাবেন তার সঙ্গে সমান।