এইতো কিছুদিন আগেও দিল্লির রাজ্য-রাজনীতি ঘনঘন উত্তাল হত জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সভাপতি কানহাইয়া কুমারের গ্রেফতারের ঘটনায়। কেবল তিনি নন, পাতিদার সম্প্রদায়ের নেতা তথা গুজরাতের নির্দল বিধায়ক জিশনেশ মেবাণীকে নিয়েও বিতর্ক কিছু কম হয়নি। বলা ভাল বিগত কয়েক বছরে গোটা দেশেই মোদী বিরোধী জনপ্রিয় মুখেদের তালিকায় অনায়াসেই সামনের সারিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন বিহারের বেগুসরাইয়ের কানহাইয়া। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র কানহাইয়া কুমার দীর্ঘদিন ধরেই খবরের শিরোনামে।
‘দেশবিরোধী’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। তখন থেকেই কানহাইয়া যেমন ছাত্ররাজনীতির অন্যতম আইকনে পরিণত হয়েছেন পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির মানচিত্রে বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছুটা উত্থান ঘটে বামেদের। অন্যদিকে গুজরাত হোক বা ভারত সারা দেশেই দলিত আন্দোলনে একটা বড়সড় ছাপ রেখেছিলেন গুজরাতের জিগনেশ মেবানী।
শেষ পর্যন্ত লালঝাণ্ডা ছেড়ে তেরঙ্গা পতাকা হাতে তুলে নিলেন কানহাইয়া কুমার। মঙ্গলবার দুপুরে দিল্লিতে কংগ্রেস হেডকোয়ার্টারে রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে কংগ্রেস শিবিরে যোগ দিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গেই এদিন কংগ্রেসে যোগ দিলেন গুজরাটের নির্দল বিধায়ক জিগনেশ মেওয়ানি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি থাকাকালীনই কানহাইয়ার দেখানো ‘আজাদি’র স্বপ্নের অন্যতম সঙ্গী ছিলেন জিগনেশ। ‘দাদার অনুগামী’ হয়ে তিনিও ভিড়লেন সোনিয়ার দলে।
কিছুদিন ধরেই জল্পনা চলছিল। সেই জল্পনায় অতিরিক্ত মাত্রা চড়িয়েছিলেন কানহাইয়া কুমার নিজেই। তিনি কংগ্রেস নেতা রাহুল গাঁন্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। সেই সাক্ষাতের পরেই সিপিআই নেতা কানহাইয়া কুমারকে ঘিরে জল্পনা আরও বেড়ে যায়। সিপিআই দলে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সভাপতির দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আর কোনওভাবে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তবে সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা জানিয়েছেন যে কানহাইয়া চলতি মাসেও দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি তিনি সেখানে বক্তব্যও রেখেছিলেন। কানহাইয়া কুমারের ঘনিষ্ঠ মহল বেশ কিছুদিন ধরেই জানাচ্ছিল, তিনি সিপিআই দলে কোণঠাসা। তার মানে সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে নিজেকে ঝালিয়ে নিতেই তিনি কংগ্রেসে যোগ দিতে চাইছিলেন।
কানহাইয়া কুমার যে কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকছেন সেটা বোঝা যাচ্ছিল। আর তারপর থেকেই দেশের জনপ্রিয় তরুণ নেতাদের মধ্যে অন্যতম কানহাইয়া কুমারকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রশ্ন ওঠে কেন কানহাইয়া কুমার কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকছেন? তাহলে কি কানহাইয়া কুমার বাম আদর্শ ছেড়ে ভোট রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিলেন? কিন্তু তিনি বেগুসরাইয়ে বিজেপির কাছে হেরে বলছিলেন, নির্বাচনে হেরে আমি দুঃখিত নই। তিনি এও বলেছিলেন, তাঁর লড়াই ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। সেই লড়াইয়ের জন্য তিনি জনগনের সমর্থন পেয়েছেন। একজন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর পুত্র হিসেবে ভোট লড়তে পেরেই তিনি খুশি। তাহলে দেশজুড়ে বামপন্থার যখন চরম সংকট, তখন তাঁর মতো তরুণ তুর্কি নেতা কেন বামপন্থা ছেড়ে কেন যোগ দিলেন কংগ্রেসে?
এই ঘটনায় যে বাম শিবিরে বড় ধাক্কা লাগবে বিশেষত বাম শিবিড়ে সেকথা বলাই বাহুল্য। তিনি সিপিআই বা ছাত্র সংগঠন এআইএসএফ করলেও কমবেশি প্রায় সমস্ত বাম ছাত্র শিবিরে বরাবরই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন কানহাইয়া। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিহারের বেগুসরাইয়ের সিপিআই প্রার্থী জিততে না পারলেও সিপিআইয়ের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পেয়েছিলেন। তবে, সম্প্রতি দলের সঙ্গে তাঁর দুরত্ব বাড়ছিল। তাঁর কাজের পদ্ধতি, উদ্ধত আচরণের জন্য দল তাঁকে সতর্কও করেছিল। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে সুবক্তা হিসেবে কানহাইয়া কুমার এখনও জনপ্রিয়। অবশ্য সম্প্রতি কিছুটা হলেও পেছনের সারিতে চলে গিয়েছেন তিনি। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন করে তার কংগ্রেস দলে যোগদান নিঃসন্দেহে একটা বড় ঘটনা।
সাম্প্রতিককালে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, সুস্মিতা দেব, প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, জিতিন প্রসাদের মতো একাধিক কংগ্রেস নেতা দলত্যাগ করেছেন। কংগ্রেস দলের মধ্যে যে তারুণ্যের একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে কানহাইয়া কুমার এবং জিগ্নেশ মেবাণীর মতো জনপ্রিয় তরুণ রাজনিতিক কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় কংগ্রেস অনেকটাই লাভবান হল। তার ওপর বছর ঘুরলেই দেশের একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং মণিপুরের বিধানসভা নির্বাচন গায়ে গায়ে। তারপরও তালিকায় যোগ হবে আরও কয়েকটি রাজ্য। জাতীয় রাজনীতির অন্যতম তরুণ মুখ এবং বাগ্মী কানহাইয়া কুমার এবং জিগ্নেশ মেবানি ওই রাজ্যগুলির নির্বাচনের আগেই রাহুল গান্ধির হাত ধরায় জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস কিছুটা হলেও সাফল্য দেখতে পারে। কংগ্রেস বিহারে গত কয়েক দশক সেভাব প্রভাব বাড়াতে ব্যর্থ। গত বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডি এবং সিপিআইএম(এল)-এর সঙ্গে জোট বেঁধেও মাত্র ১৯টি আসন ঘরে তুলতে পেরেছে। কংগ্রেস মনেপ্রাণে চাইবে কানহাইয়া দলে এসে বিহারের সংগঠনকে চাঙ্গা করুক।