| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ছোটগল্প ‘কাঁটাতারে রক্তগোলাপ’

Reporter
সসীমকুমার বাড়ৈ / ১২৮৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২০ জুন, ২০২৫

ডিউটি রোস্টার দেখেই তার চক্ষু চড়কগাছ। তাকে ওপারে যেতে হবে। এই নয় যে দৈনন্দিন ডিউটি বাটা হয়েছে, এ এক ধরনের বদলিই। ক্যাম্প থেকে সীমান্ত চৌকিতে পাঠানো। ওপারের চৌকিতে একবার ঢুকলে আর বেরনো রাস্তা নেই, কমছে কম এক বছরের বন্দ্যোবস্ত। খান্দোয়া বি এস এফ ক্যাম্পের কমান্ডান্ট স্বয়ং এই বদলি রোস্টার বানায়। কোনো নড়ন চড়ন হওয়ার জো নেই, ট্যাঁ-ফুঁ একেবারে চলবে না। ইউনিফর্ম সার্ভিসে এটাই দস্তুর, হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না।যে কমান্ডান্ট হাকিম তিনিই ক্যাম্প অফিসে কার্যকর্তা। টিনের বাক্স তোরঙ্গ নিয়ে ব্যাজার মুখে বিক্রম মণ্ডল স্পিড বোটে চেপে বসল। পাইলট খগপতি সিংয়ের চোখ এড়াল না, এমন ব্যাজার মুখ দেখলে বুঝে যায় নতুন একজনকে মুরগি করেছে কমান্ডান্ট। সে বলল-ইতো মন খারপ করো কেনে ভাই, দেখতি দেখতি বছর ঘুরি যাবেক। আবার দিশে ফিরবেন বটে।

আবার দেশে ফিরবে, কথাটা শোনায় বিক্রমের বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল।

খান্দোয়া বি.এস.এফ. ক্যাম্পে পোস্টিং হওয়াতক খগপতি স্পিড বোটের চালক। জল স্থল নিয়ে তার ডিউটি। ওপারে কারো পোস্টিং হলেই সে একই সান্ত্বনা বাক্য আওড়ে যায়, সাহস যোগাতে চেষ্টা করে। সে জানে বিচ্ছিন্নতা মানুষকে কতটা হতাশার গাঢ় অন্ধকারে চুবিয়ে দেয়। কেউ কেউ খাবি খেতে খেতে নিজের কাছে পরাজয় মানে।

কখন যে পদ্মা অতিক্রম এসেছে, বিক্রম খেয়াল করেনি। অন্য সময় পদ্মায় পেট্রোলে বিস্তির্ণ দু’পারের মাঝে জলরাশি তাকে মুগ্ধ করত। জল ছুঁতে ছুঁতে উড়ে চলে জলযান। প্রাণে তিরতির করে বইত আনন্দ হাওয়া। স্পিড বোট থেমেছে চরে। বাক্স তোরঙ্গ নামিয়ে বিক্রম দেখল চরে কালচে সবুজ রঙের একটি জিপ দাঁড়িয়ে আছে। কাশবনের মধ্য দিয়ে মেঠোপথে এসেছে জিপটা। স্পিড বোটে তার সঙ্গে এসেছে কনস্টেবল বলবিন্দর সিং। বিক্রমের বন্ধু। বলবিন্দরের সঙ্গে বন্ধুত্ব না হলে বুঝত না পাঞ্জাবিদের দিল কত চওড়া। বিশালাকারে বপুর আড়ালে চাপা থাকে দিলদার মিশুকে মানুষটি। আগে বিক্রম পাঞ্জাবিদের চেহারা দেখে ভয় পেত। ক্যাম্পে বলবিন্দরই ছিল একমাত্র জিগরি দোস্ত। সে হাত লাগাল বাক্স তোরঙ্গে। জিপে তুলে দিয়ে বলবিন্দর বিক্রমকে বুকে টেনে নিয়ে বলল-এইসে হি জিন্দেগি হ্যায় মেরে দোস্ত। হাম তুম কো লিয়ে যাহাঁ হেইন। চিনতা মাত করো জন্দ বাপাস আওঁগা। ম্যায় তুমহারা ইন্তেজার করুঙ্গা।

বলবিন্দর সিং স্পিড বোটের দিকে পা বাড়াতেই জিপটা স্টার্ট দিল। কাশবনের বুক ফেরে যাতায়াতের এক জোড়া সমান্তরাল রেখা ক্রমশ মূল ভূমির দিকে উঠে গেছে। মিনিট কয়েক চলার পর গাড়িটা দুম করে ডান দিকে অর্ধবৃত্তাকারে বাঁক নিয়ে আবার পূর্বের রেক ধরে চলল। পড়তে পড়তে বিক্রম কোনোক্রমে টাল সামলে নিল। সামনে একটি পিরামিড আকৃতি পিলারকে পাশ কাটিয়েছে ডাইভার। ডাইভার বলল-বুঝলে ভাইয়া, কয়েক সেকেন্ড বাংলাদেশ ঘুরে এলে।

— মানে?

— আরে বাবা দেখলে না, পিলারটাকে কাটাতে গিয়ে গাড়িটা পুরো বাংলাদেশর মধ্যে ঢুকে গেল। ওই যে সামনে একত্রিশ বাই আট নম্বর পিলারটা দেখছে, ওটার পূব দিকটা বাংলাদেশ আর পশ্চিম পাশে ভারত লেখা। ভালো করে দেখো, গাড়ির দুটো চাকা বাংলাদেশে আর দুটো আমাদের দেশে। গাড়িটা চলছে বর্ডার লাইনকে মাঝে রেখে। এখনে কাঁটাতার নেই তো, প্রথম এলে বুঝতে একটু সময় লাগে। চিন্তা করো না, গাড়ির চাকার দাগ দেখে নাড়ুখাকির চৌহাদ্দি চিনে যাবে। এই চরে আমার জিপের চাকাটাই যা ঘোরে। আর সব অচল।

বিক্রম সামনে তাকিয়ে দেখল সত্যিই সীমান্তরেখাকে মাঝে রেখে জিপটা এগোচ্ছে। দেশ-বিদেশের মাটিতে দুটি করে চাকা ঘুরছে এক সঙ্গে। সামনে কয়েকশো গজ পর পর সীমান্তস্তম্ভ। তার মনে হলে এই সব কংক্রিটের সীমানন্তস্তম্ভ যদি না থাকত তবে কেমন হতো? গোটা সীমান্তরেখাটাই মুছে গেলে তো আর অস্ত্রের ঝনঝনানি থাকত না। তার বুক থেকে কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল, আরে র‍্যাডক্লিফ দাগ টেনেছে বলেই কি তাকে মানতে হবে? দুই বাংলার বাঙালি একদিন পায়ে পায়ে মুছে দিক নাজিরো লাইন ঠাইন। ইয়াবা পাচার, নারী পাচার, অনুপ্রবেশ কেমন ফুৎকারে উবে যাবে। সাতচল্লিশের আগে গরু পাচার নামে কোনো শব্দ ছিল বাংলা অভিধানে? পরক্ষণেই মনে হলো, ধুত সে কি সব ইতিহাস জানে? ওসব জানে লঙ্কা ভাগের নেতারা। জানে নেহেরু পণ্ডিত। সে শুধু সীমান্তের প্রহরী। মারতে পারে অথবা মরতে পারে। অনন্ত নৈঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কাঁটাতারে আর্তনাদ শোনার জন্য।

জিপটি চৌকি চত্বরে ঢুকতেই একটি পঁচিশ ছাব্বিশের যুবতি গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে বলল-কোই গো বি অ্যস এফ বাবু তোমার নাকি মোইন খারাপ। এপারের নোক এত খারাপ লয়।

বিক্রম ভড়কে গেল। মনে মনে বলল-কিরে বাবা, চৌকিতে এমন একটা ধাড়ি মেয়ে এলো কোত্থেকে। ঢলে পড়া স্বভাব। সে জানে বি.এস.এফ. ক্যাম্প, সেনা ছাউনি, পুলিশ লাইনের আশেপাশে এমন অনেক অলীকঘর থাকে। উপোসী পুরুষের শুকনো দিনের রসদ। নইলে যৌন অরাজকতায় ঘুরে যেতে পারে বন্দুকের নল। রিপুর মৃত্যু নেই, দেহপেশা মরে? বহাল তবিয়াতে বেঁচে আছে আদিম পেশাটা। ধনি গরীব সব দেশেই অবলীলায় তার শ্রীবৃদ্ধি। তাই বলে একেবারে ক্যাম্পে এসে তাড়া করবে মেয়েছেলে? কোন জঙ্গলে সে এলোরে বাবা। বেশি অবাক করল, তার মন খারাপ তা ধাড়ি মেয়েটা জানল কেমনে? নদী ভাসা হাওয়া কি ওর কানে কানে বলে গেল মনের কথা? না সর্ষের মধ্যেই ভূত!

তরুণী হাসতে হাততে বাক্স তোরঙ্গ নামাতে গেল। বিক্রম বলল — না, না, থাক আমি নামিয়ে নিতে পারব।

— কেনো গো সিপাই বাবু, মুই ছুঁলি তোমার মাল পত্তরের জাঁত যাবি নাকি? আমারি ছোঁওয়ার নাগি তো গোটা বডার চৌকি ছুকছুক করে। আমার বয়েই গ্যাছে তাগো ছুঁতি। তরুণী উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ট্রাঙ্কটি জিপের পিছন থেকে নামিয়ে সোজা ব্যারাকের দিকে হাঁটা লাগাল।

বিক্রম তাজ্জব, ডাহা বজ্জাত মেয়ে তো। তার ধরণা ক্রমশ বদ্ধমুল হলো, নাবিকরা বন্দরে বন্দরে যৌনপল্লীতে বিবি রাখে, দারোগার রক্ষিতা পোষে থানার আশেপাশে। এমন বিচ্ছিন্ন চরে পরিজন থেকে দূরে থাকা জওয়ানদের রাঁড় থাকবে না তা হয়? বাংলাদেশের গায়ে ঝুলে থাকা মৌচাকের মতো ভারতীয় চরভূমি বিদেশ বিভূঁইয়ে পোতাশ্রয়ের মতোই তো। বিক্রম হা করে সর্পিল গতিতে বেণী দুলিয়ে চলে যাওয়া যুবতীকে দেখল। কেমন যেন একটা তরঙ্গায়িত গতি। মনে রাগ হলো না কী যে সে একটা হলো?

চৌকি অফিসের সামনে সিনিয়র কনস্টেবল পুনিত যাদব ডিউটি করছিল। কাঁধে অ্যাসাল্ট রাইফেল। ছোট একটা চৌকি ব্যারাক। মাথায় কয়েকটা সৌর প্যানেল। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ওয়ারলেস টাওয়ার। এপার ওপারের জীবনরেখা। ফোন এখানে অর্ধ্বমৃত। কোরামিন দেওয়া মুমূর্ষু রোগীর মতো ফোনের প্রাণ কখনও দপ করে ওঠে, পরক্ষণেই আবার মুকবধির। স্পন্দনহীন। ওয়ারলেসে শুধু এপার- ওপার খবর আদান প্রদান হয় না, এ ওর ফ্রিকোয়েন্সিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ইথারে ভেসে আসে-বড় মিঞা, ছক্কা বড় ঠাকুর ভাসে। …কার? হরিণ সেখ। ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ওয়ারলেস ওপারেটার পুরো কথন রেকর্ড করে পাঠিয়ে দেয় ওপারে। এসব সাংকেতিক কথা ডিকোড করার লোক আছে ক্যম্পে। ওয়ারলেস অপারেটর এটুকু বোঝে, রাতে পদ্মা সাঁতরে বড় একটা গরুর চালান ঢুকেছে। হরিণ সেখ কোনো নাম নয়, গরু পাচারকারীর প্রতীক মাত্র। টোকেনের গায়ে হরিণ আঁকা আর আরবি হরপে সেখ লেখা, দুটো মিলিয়েই অদৃশ্য মাথা। বড় বাজারে হুণ্ডিতে লেনদেন। পুনিত যাদব অবস্থান বদল না করে হাঁক দিল-ক্যা দেখতে হেঁ? আউর গুলাবী, আলেয়া হরিন পানজন সে জ্বলেগী।

গুলাবী আসলে গোলাপি। গোলাপি খাতুন। সে কিছু সময় পর পাখির মতো উড়তে উড়তে ফিরে এলো। এসেই বিক্রমকে ডানা ধরে ছিনিয়ে নিল-আরে হা করি দ্যাখো কী সিপাইবাবু, চলো চলো। তোমার ঘর দুয়ার গুছাইয়া দিছি। তোমার হরিচাঁদের ছবি দেওয়ালে টানাই দিছি, তারি নমো করি ঘরে ঢুকবা, সব বিপদ কাটি যাবে আল্লার দোয়ায়।

বিক্রম বিড়বিড় করে উঠল-হরিবোল! হরিবোল!

পুনিত যাদব হাসল।

***

রাতে রাউন্ডে বেরিয়েছে পেট্রোল পার্টি। সবেধন নীলমণির মত একটি মাত্র জিপ তাদের সম্বল। তিনটি মৌজা নাডুখাকি, পশ্চিম চারঘোতা, পশ্চিম খান্দুয়া নিয়ে বাংলাদেশের গায়ে ঝুলে থাকা নাড়ুখাকি সীমান্ত-চৌকির কতৃত্ব। নাড়ুখাকি মৌজা বেশির ভাগ গেছে পদ্মার পেটে। বাংলাদেশীদের বিশ্বাস, ফারাক্কা ব্যারাজের পানি ড্রাগনের মতো হামুখে গিলতে গিলতে নিচে নামে। পদ্মা ওপার ভাঙে আল্লার গজবে। এপার ভাঙে ইন্ডিয়ার শয়তানিতে। বর্ষা এলে শয়তানের কামড় বাড়ে। গরমে পদ্মা শুকিয়ে মারে। নাড়ুখাকি চৌকির প্রায় চল্লিশ মিটারের মধ্যে জলের ফণা ড্রাগনের মতো জীভ দোলায়। কোনো দিন চৌকি চলে যাবে পদ্মার হামুখে। জলে টান ধরলে ধপাস ধপাস করে পদ্মার কূল ভাঙে। রাইফেল হাতে প্রহরীদের প্রহর গোণা ছাড়া কোন ভূমিকা নেই। পুজোর আগে চরে পদ্মা ছড়িয়ে দেয় কাশফুলের আঁচল, ওপারের ঢাকের বাদ্যে এপারে কাশফুলের মাথা দোলে। ঢাকের বাদ্য সান্ধ্য আজান মগরিবে মেশে নাড়ুখাকি চরে। শীতে সে শান্ত বহতা পদ্মাসুন্দরী। এই সব নিয়ে নাড়ুখাকির যাপন। জিপটা যথারীতি সীমান্তরেখা মাঝে রেখে চলছে। হেডলাইটের আলো না হলেও চলে, আকাশে গোধূলী জ্যোৎস্না। হঠাৎ করে জিপটার গতি প্রায় ডেড স্লো নেমে গেল, একজন কনস্টেবল জিজ্ঞেস করল-কেয়া হুয়া ডাইভার সাব?

— বাংলাদেশী শিয়াল।

বিক্রম হেসে উঠল-বাংলাদেশী শিয়াল বুঝলা কেমনে দাদা।

— আরে দেখলা না, হেডলাইটের আলোয় কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। স্লো না করলে শ্লা শিয়ালের বাচ্চা গাড়ি চাঁপা পড়ত। তারপর কেমন বেল্লিকের মতো বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে গেল। তা হলে বাংলাদেশের শিয়ালই হবে নাকি, তুমি কও সিপাই দা। ওগো তো আর পাশপোর্ট লাগে না। এখানে মানুষেরও কিচ্ছু লাগে না, বাংলাদেশী জেলেরা ভারতের চরটুকু টপকে জাল-নৌকা নিয়ে পদ্মায় নামে। আমরা দেখি, দেখি না। দেখার মালিক যে সেই দেখে না, নইলে এমন বেয়ারা জায়গায় ভারতের চর গজায়?

বিক্রম ভাবল, বাঃ ভালো যুক্তি তো, সীমান্তরেখা টপবে যে দিকে যাবে সেই দেশের শিয়াল! সে বলল-শিয়াল তো তাড়ালা দাদা, বি.জে.বি. যদি আমাগো তাড়াতে আসে, আমরা সামলাতে পাড়ব?

ডাইভার হা হা করে হেসে উঠল-কেডা সামলাইতে কইছে? এই চৌকিতে তোমরা হাতে গোনা কয়ডা অ্যাসাল্ট রাইফেল নিয়া ডিউটি করো, খুব বেশি হলে দুই চারটা সাব-মেসিনগান। আরে বাবা, ওর থেকে বেশি ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র আজকাল মুন্না গ্যাংয়ের কাছেও থাকে। আমরা এখানে আছি, শুধু জাহির করতে, এটুকু ভারতের মাটি। খুব বেশি হলে চৌকিদার। তোমার হাতের অস্ত্রটা একটা জলঢোঁড়া সাপের মতো। বুঝলা জওয়ান ভাই, সব শক্তি দিল্লীর হাতে। তুমি আমি বাল চুলকানো বোড়ে। থাকো কয় বছর, বুঝবা সব।

— আমার তো কেমন সারাক্ষণ ভয় করে। বিক্রম চাপাস্বরে বলল।

— শোনো বাইরে এসব কথা কবা না, লোকে হাসবে। আর বেশি ভাববাও না। এই ধরো গাঁজাবিড়ি টানো। শিকারপুরী মাল, খাসা। কষাইয়া টান মারো দেখবে ভয় ভীতি খালাস হইয়া যাবে। ড্রাইভার বাঁহাত বাড়িয়ে বিক্রমকে একটা গাঁজাবিড়ি দিল।

জিপটা চলে এসে একেবারে নদীর কিনারায়। এসে খানিকক্ষণ দাঁড়ায়। এটাই রোজকার রুটিন। জ্যোৎস্নায় ভাসা নদীতে কিছু জেলে নৌকায় টিম টিম করে হ্যারিকেন জ্বলছে। সব নৌকাই মেছো নৌকা। রাতে নৌকার চরিত্র বদলে যায়। কারো কারো। ইয়াবা, ফেন্সিড্রিল, চরস, সোনায় খোল ভরে থাকে। কোনো নৌকার পাটাতনের নিচে মুখ বেঁধে বসিয়ে রাখা হয় নারী-শিশু, পাচার হয়ে যাবে হয়তো মধ্য প্রাচ্যে। বা যৌনপল্লীতে। আটকেও আটকানো যায় না, ফাঁক ফোকর গলে পাচার চলতেই থাকে। সাপের মতো বাঁকাত্যাড়া নদীর ওপারেও নাড়ুখাকির মতো বাংলাদেশি চর জেগেছে। পাচারকারীরা তালুর মতো নদীর বাঁক চেনে, বাঁধা এলেই সুরুৎ করে নিরাপদ এলাকায় পালায়। তারা জানে, সীমান্তরক্ষীরা চট করে সীমান্ত ডিঙ্গোবে না। অহেতুক অন্যের সীমানায় ঢুকে কে চায় গোল বাঁধাতে? নদী পাড়ে দাঁড়ালে বিক্রমের বুকের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বোধ তীব্র হয়। চাঁপা ভয়টা বুকের মধ্যে চাগাড় দিয়ে ওঠে, এমনটা আগে কখনই হতো না। পিছনের বলটাই তো আসল শক্তি। সীমান্ত যদি মানতেই হয়, নদীটাকে সীমান্তরেখা মানলেই হয়, দু’পারে এমন খণ্ড খণ্ড মৌচাকভূমি রেখে কী লাভ? বিক্রমের দীর্ঘশ্বাস পড়ল। নদী আইন কি তার কথা শুনবে, যতই শত্রুতার উৎসগুলো জিইয়ে রাখুক কেন। চর জাগলেই হকদার গজাবে। ঘুরে বেড়াবে মৃত র‍্যাডক্লিফর ছায়াভূত। ছায়াভূত দ্রুত একটা নিষ্পত্তিহীন খানাপুরী বুঝারত করতে চাইবে, দেশে ফেরার তার যে বড় তাড়া।

***

— গুলাবী। গুলাবী। পুনিত যাদব যখন গোলাপিকে ডাকে তখন কলের গানের মতো বিরামহীনভাবে ডাকতেই থাকে। সে আবার ডাকল-গুলাবী, গুলাবী, তু কাঁহা হ্যায় রে?

গোলাপি কোমরে কাপড় বেঁধে ছুটতে ছুটতে এলো-কন সিপাই বাবা।

— আরে কাঁহা থে?

— দেখছেন না, বৃষ্টি পড়ছে। স্কুলের দিদিমণিরা কেউ আসে নাই, আদ্ধেক দিনই আসে না। আর ঝড় বৃষ্টি হলি তো কথা নাই। আসবেই বা ক্যামনে, নদীতে বাও উঠলি মাঝি বেপাত্তা হয়ি যায়। মুই ত্যামন নেখাপড়া করি নাই, তউ যা পারি চালাই দিই। পোলাপানগুলা নইলে ঘাটের দিকে তাকাই থাকে, দুষ্টামি করে।

কথার মধ্যেই বিক্রম এসে দাঁড়িয়েছে। সে বিস্মিত হলো-তুমি প্রাইমারি স্কুলেও পড়াও?

— কেডা কইল পড়াই, দিদিমণিরা ওপারের রঘুনাথগঞ্জ থেকে আহে, সব দিন তো আর আইতে পারে না। তখন মুই ভাঙা কুলার মতো ঠ্যাকনা দিই। পরণকথা কইয়া ছেইলে ভুলাই।

পুনিত যাদক বলল-ওরে জিতনা দেখোগি ইতনা জাদা অবাক হোবে। আই সি ডি এস বোলতে গেইলি তো গুলাবীই চালায়।

— তা হলে তুমি সর্বঘটের কলা। বিক্রম মুগ্ধ চোখে বলল।

— হ্‌ হ্‌ সহি কহা।

গোলাপি লজ্জা পেল-ও সব থাউক, কন সিপাই বাবা, কী করতে হবে কন?

— গুলাবী, পূজাকে লিয়ে পদ্মা সে থোড়া পানি লেকর আও।

গোলাপি খুশি মনে ব্যারাকে গিয়ে পুনিত যাদবের পূজার ঘট নিয়ে পদ্মার দিকে ছুটল। পদ্মা ভাঙতে ভাঙতে সীমান্ত চৌকির কাছাকাছি চলে এসেছে, জল আনতে খুব একটা বেশি দূর যেতে হয় না। তবে ফাঁটল ধরা পাড় এড়িয়ে সাবধানে জল আনতে হবে। পায়ের নিচে আলগা বেলেমাটি ধপাস করে পড়ে গেলে বিপদ, স্রোতের ঘূর্ণিজলে সাঁতার জানার আলাদা কোনো মানে নেই। অনেক সময় উপর দিয়ে বোঝা যায় না ভিতরে ঘাপলা। গোলাপি জানে কোথায় বিপদ ওঁত পেতে থাকে, সে এড়িয়ে চলে। পদ্মাকে করজোড়ে প্রণাম করে সিপাই বাবুদের জন্যশুদ্ধ চিত্তে পূজার জল তোলে গোলাপি খাতুন।

বিক্রম হা করে সিনিয়র পুনিত যাদবের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার নাকি পাক্কা ছয় মাস নিয়েছিল ফারাক্কা ব্যারাজের ওপাশে যা গঙ্গা তাই এপাশে পদ্মা, এই সত্য মেনে নিতে। সে ভাবত, পদ্মার জল বাংলাদেশ ছুঁলে পূজার অযোগ্য হয়ে যায়। পুনিত এখন গোলাপির আনা পদ্মার পানি আর দুর্বায় পূজা করতে আপত্তি করে না। এখানে মসজিদ নেই, বাংলাদেশের সাখিলপুর জামে মসজিতের আজানের আওয়াজ চলে আসে ভারতে। মৌচাক ভূখণ্ড নাড়ুখাকিতে। গোলাপি পারলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। তার হাতের পুজার জলে পুনিত যাদবের ছটি মাইয়ার পূজা হয়। লোকটার গোলাপির উপর কোথায় যে একটা দুর্বলাতা, বিক্রম বোঝার চেষ্টা করে। মানুষটা পারতপক্ষে দেশে যায় না, নাড়ুখাকি রয়ে গেছে অনেকদিন। বিক্রমের অবাক লাগে, বুনো গোলাপ কার মনে যে কেমন করে ফোঁটে।

***

সীমান্ত চৌকি থেকে কয়েকশো গজ দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল বিক্রম। চৌকির চৌহাদ্দিটুকু ভাসছে সৌর আলোয়। বাকি এলাকা অন্ধকারে স্থবির। এদিকটায় চরবস্তি। হাজার বারোশো মানুষের বাস। গোলাপিদের ঘর। সব শূন্যতার মধ্যে এদিক এলে বিক্রমের মন একটু শান্ত হয়, গোলাপিকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন একটা ভাব হয় আজকাল। সে বোঝে না। দিনের বেলা কঁচিকাচার কল্লোলে অন্তত জেগে থাকে নাড়ুখাকি। আই.সি.ডি.এস, প্রাইমারি-র বাচ্চারা দাপিয়ে বেড়ায়। আম গাছের মগডালে উঠে পা দোলায়। সন্ধ্যা নামতে না নামতে চরবস্তি ঢুকে যায় নৈঃশব্দের অন্তরালে। জেগে থাকে কিছু সিপাই। তারা নাড়ুখাকি আগলায়। এখানে থানা পুলিশ নেই। থানা রঘুনাথগঞ্জে। এপারে লাশ পড়লে পুলিশ আসে ওপার থেকে। অনেক সমইয় পুলিশও জানে কোন দেশের লাশ। ব্যস ওইটুকুই তাদের কাজ। নাড়ুখাকিকে বাঁচালে বি.এস.এফ বাঁচায়, মারলেও তারা মারে। বাঁচার রসদ চাল ডাল শাড়ি লুঙ্গি বাংলাদেশী হাট বাজারের। চরের মাটিতে খেসরির ডাল জব্বর ফলে। ঠিকঠাক এক মরশুমে ফলাতে পারলে দুই মরশুমের খোরাকি নিশ্চিত। সীমান্তের ফয়দাও নেয় কেউ কেউ। কাঁচা পয়সা ওড়ে নাড়ুখাকি চরবস্তিতে। বিক্রমের ধাঁধা লাগে নাড়ুখাকির বাসিন্দারা আসলে কোন দেশের নাগরিক? দুই দেশেরই নাকি ভোটার কার্ড আছে। কোথা থেকে মানুষগুলো এসে ভেসে ওঠা চরে বসতি গড়ল তার ইতিহাস নেই।সে ভেবে পায় না, তাহলে কি মানুষগুলোকে মাথায় নিয়ে চর গজাল? নিজের প্রশ্নে নিজেই হাসে-ধুত, তাই হয় নাকি। তখনই ঝপাত করে একটা কিছু ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ হলো। বিকট শব্দ। বিক্রম তড়িৎ গতিতে কার্বাইন উঁচিয়ে আতঙ্কে চিৎকার উঠল-কে! কে ওখানে?

চিৎকারে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো গোলাপি-কী হইল সিপাই বাবু?

— কী-ই, কী একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল।

গোলাপি জমাট বাঁধা অন্ধকার ভেঙে খিলখিল করে উঠল-তুমি মিঞা একটা ভীতুর ডিমা।

— ক্যান, ক্যান, অন্ধকারে অমন ঝাঁপান শব্দে তো ভয় লাগবেই।

গোলাপির হাসির মাত্রা বাড়ল-ইস্‌ তুমি না পুরুষ সিপাই বি.অ্যস.এফ.?

— বাঃ পুরুষের বুঝি জানের ভয় থাকতে নাই?

— সিপাই বাবু যাবা নাকি কেডা ঝাঁপাই পড়ল দেখতি? বলেই সে বিক্রমের এক হাত ধরে টানতে টানতে চলল পদ্মার দিকে।

— আরে গোলাপি, এই রাতে একটা পুরুষের সঙ্গে নদী পারে যাবে!

— বিক্রম একটা ভ্যান্তা বিলাই, মুই জানি কেডা মাইয়া খাওয়া বাঘ। চলো চলো গাঙের পাড়ে যাই।

হাত ছাড়েনি গোলাপি খাতুন। সামনে হাঁটছে সে। ফাঁকা জায়গায় অন্ধকার অনেকটাই ফিকে, মায়াবী আবছা অন্ধকার। নদীর কিনারা থেকে খানিক দূরে ধমকে গেল গোলাপি-দ্যাখো, দ্যাখো, কত বড় চাঙড় ঝাঁপাইছে! লদীতে চাঙড় ঝাঁপাইয়া পড়ি আত্মহত্যা করছে গো। আত্মহত্যা। আগে আইলে পানির ঘুল্লির মধ্যি ভাঙা পাড়ের গোঙানি শুনতি পাইতা জওয়ান বাবু। আমারে হেইডা কও, তোমার হাতে এমন একটা দামড়ামার্কা অস্ত্র থাকতি ভয় পাও ক্যান?

— ভয় মানুষের বুকের মধ্যে ঘাপটি মেরে থেকে তাই ভয় পাই।

নএ্যমনি এ্যমনি ভয় বুকে ঘাপটি মারছে কেনে।

— নাড়ুখাকিতে আসার পর থেকে আমার কেবলই মনে হয় বিজিবি আমাগো ঘেরের মধ্যে ফেলি পোলো চাঁপা দিয়ে মারবে।

— ধ্যাত, সিডা আবার হয় নাকি?

বিক্রম চুপ করে রইল।

— কী হইল, কথা কও না ক্যানে সিপাই বাবু।

— কত কিছু যে ঘটে জগতে। বুঝলে গোলাপি, দুই হাজার এক সালে মেঘালয় লাগোয়া পাদুয়ায় বি.ডি.আর এমন এক ভারতীয় ছিট জমির মধ্যে ঘিরে ফেলে ষোলটা জওয়ানের নরলি কেটে দিয়েছিল। চাপা রাগে বেয়নেট দিয়ে খুঁচে খুঁচে চোখ উপড়ে নিয়েছিল। বেঘোরে পরান গেছিল এতগুলো জওয়ানের। ওই জমি নিয়া নাকি দুই দেশের কাইজগা ছিল। বাংলাদেশের বাহিনীতে এখনও পাকিস্তানি প্রেতাত্মা আছে। মাঝে মাঝে সেইসব ভূতের আত্মা মাথাচাড়া দেয়। আর নাড়ুখাকি তো পদ্মার এপারে চরগ্রাম। ওপার থেকে সাপোর্ট আসার আগেই খেইল খতম। ফরাক্কার জলে ভেসে যাবে লাশ। বুকের মধ্যে একটা চাঁপা ত্রাস চুপিসাড়ে ঘুরে বেড়ায়।

— মুই কি আর এ্যত ইতিহাস জানি। তবে সিপাই বাবু, তোমার মুখের কালাভাব দেখি বুঝি, তুমি সারাক্ষণ কী য্যান ভাবো। কিন্তু তোমার ডর নাগবে কেন, বাংলাদ্যাশ তো ইন্ডিয়ার বন্ধু দ্যাশ। আর ইন্ডিয়া কত বড় দ্যাশ, হেইডা ভাবো দেকিনি। সবাই মিলি একলগে মুতি দিলে এ দ্যাশ ভাসি যাবে।

গোলাপির কথায় বিক্রম বুঝে উঠতে পারে না, সে কোন দেশের মানুষ। সে জিজ্ঞেস করল -তুমি কোন দেশের গোলাপি?

— মুই চরের মাইয়া। যার দখলে থাকে মুই হেই দ্যাশের। এখন তো ইন্ডিয়ারই।

আবছা আলোয় গোলাপির মুখ দেখার চেষ্টা করল বিক্রম-জন্ম এই চরে?

চরে হঠাৎ করে নেমে এসেছে করাল নিস্তব্ধতা, অন্তরালে ঢাকা অনুভূতির প্রকাশ নেই। কেউ কথা বলছে না। নদীবাতাস যেন থম মেরে আছে। দূরে পিরোজপুর-বাজিতপুর চরের দিকে জেলে নৌকায় টিমটিম করে জ্বলছে দু’চারটে আলো। তারাও যেন জিনে ধরা মুর্তি, অন্য সময় হলে জেলে-মাঝিরা ভাটিয়ালি গাইত। কাশবনের ওধারে শিয়াল ডাকত।

বিক্রম তাড়া দিল-বললে না তো, তোমার জন্ম কোথায়?

— আমার জন্ম কোথায় আমি জানি না সিপাই বাবু।

— মানে, তোমার মা সাবিনা বেওয়াও জানে না?

— না, মুই হ্যার প্যাটের ছেমরি হলি তো জানবে। যে বিয়ালই না সে জানবে ক্যামনে মুই কোথায় হইছি।

— মানে! বিক্রম অবাক চোখে তার দিকে তাকাল।

— মানে আবার কী, আমারি নাকি ন্যাংটা বয়সে পাচার করে নিয়া যাইতে ছিল পাচারকারীরা। আরবে নিত, না ভারতে বেশ্যা বানানোর তালিম দিত হেডা কেডা জানে? পাচারের সময় বি.এস.এফ. স্পিট বোটে তাড়া করল। নৌকার মধ্যি আমারি রাখি বেডাগুলান নদী সাঁতরাই পালাইছিল। এট্টুখানি মাইয়া পাইয়া সিপাইগুলানের কী যে বেপদ, না পারে ফ্যালতি, না পারে রাখতে। বাপ মায়েরও কোনো খবর নাই। তারা বেইচ্যা দিছে না মুই চোরাই মাল তাই জানত না কেউ। শ্যাষে বড় সিপাই মোরে আম্মার কোলে দিছিল। মোর আম্মারে তো সবাই ভালবাসে। চৌকির সব পুরুষ নাকি আমার আম্মা সাবিনা বেওয়ার নাঙ। চৌকি ভাল থাকলে মা যাচ্ছে তাই রকমের ভাল থাকে। যারে লোক বারো ভাতারি বলি খিল্লি করে, সে আমারি বাজ পাখির মতো আগলায়। বডারের পুরুষ উপাসি, তাগো নজরে খিদা বেশি। আবার পুনিত যাদবের মতন সিপাইও আছে।

— সিনিয়র কনস্টেবল আবার কী করল?

— না কিছু করে নাই, লোকটার মধ্যে স্নেহ মমতা আছে। আমারে সে মাইয়ার মতো দেখে। আমার জীবনে আসা ঝাঁপটাগুলা সামলে দেয়। মুই নাকি চৌকির মাইয়া। আমার আনা পদ্মা-পানির ছোঁয়ায় তার দেশের গোলা ভরি ধান-পান দেয় ছটি মাইয়া।

— কিন্তু গোলাপি, এভাবে চরে বাঁচতে পারবে?

গোলাপির দীর্ঘশ্বাস পড়ল। বলল-চলো ফিরে যাই। মা আবার এক্ষুনি চিল চিৎকার করে পাড়া জাগাবে। সিপাইগো নিয়া মাইয়া খুঁজতি বারাবে।

— আমার কথা এড়াতে চাইছ কেন?

— আমার কি কথা থাকতে পারে? পাচার হইয়া তো যাইতাম, নক্ষা পাইয়াও বাপ-মায়ের কোলে ফিরতে পারলাম না। চরের ঘেরে বন্দি হইয়া গেলাম। সিপাই বাবু, সামনে চাও ঘুল্লিডার দিগে, ওইখানে ছিল জোতবিশ্বনাথ নামে এট্টা গেরাম। ধনি মানি মাইনসের বাস ছিল। ভাঙতে ভাঙতে একদিন নদী হয়ে গেল। মানুষগুলা কেডা কোথায় যে উবি গেল কেউ জানে না। মোর আর কী হতি পারে? মুই জন্ম থাকি পাড় ভাঙা মাটির নাহান। জোতবিশ্বনাথের মতো ঝপাত করি ঘুল্লির পানিতে হারাইয়া যামু একদিন। এই চরের মাটির বাঁধনডা বড় আলগা সিপাই বাবু। ভিতরে ভিতরে ঘোগ…

গোলাপি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সীমান্ত চৌকির দিক থেকে কলের গানের মতো সেই ডাকটা এগিয়ে এলো-গুলাবী, গুলাবী।

— চলো সিপাই বাবু, আম্মা তার বড় নাঙরি খোঁচাই তুলছে। এক্ষণি গরু খোঁজার মতো আমারি খুঁজতে বারাবে।

তারা পদ্মাকে পিছনে রেখে ফিরছে সীমান্ত চৌকির দিকে। সামনে কনস্টেবল বিক্রম মণ্ডল। গোলাপি চলতে চলতে ডাকল-সিপাই বাবু, তোমার দেখতে দেখতে নাড়ুখাকিতে পেরায় এক বছর হয়ি গেইল। আর তের দিন বাকি। এবার তোমার ফেরার সময় আইল, তাই না?

বিক্রম বিস্মিত হলো-গোলাপি, তুমি আমার নাড়ি নক্ষত্রের খবর রাখো নাকি?

তারা নীরবে হাঁটছে ক্রম ছোট হয়ে আসা পথটুকু ধরে। গোলাপি বলল-এই চরখণ্ডে দিন তো হাতে গোনা যায়।

— তাই বলে এমন তীথিনক্ষত্র কী করে মুখস্ত রাখলে?

— মানুষটা ভীতুর ডিমা। তার দিকে এট্টু খেয়াল তো রাখতেই হয়।

— কোন মানুষটা?

— গোলাপি ধূসর অন্ধকারে মুখ টিপে হাসল-সে নামেই বিক্রম, ঝামেলায় পড়লে সবার আগে বন্দুক ফেলি পালাবে।

— এর সমাধান জানো গোলাপি?

— মুই কালাসাপে খাওয়া বডার চরের একটা ফেলনা মাইয়া। মুই ওঝাও না সাপুড়েও না। মিত্যু পর্যন্তন্‌ বিষ বইয়ে বেড়ানো ছাড়া আর কিছু জানি না গো সিপাই বাবু।

বিক্রম গলাপির কাঁধে হাত রাখল। গোলাপি চমকে উঠল-আন্ধার রাইতে একলা মেইয়ে মাইনসের গায়ে যে হাত দেও সিপাই বাবু।

বিক্রম হাত সরালো না। সে গোলাপির আরো খানিকটা নিবিড় হয়ে এলো — র‍্যাডক্লিফের পোষা সাপ মারার ক্ষমতা আমার নাই। থাকলে ওটাই তাড়াতাম সবার আগে। কিন্তু গোলাপির বিষটুকু নামানো ওঝাগিরি মুই জানি।

— রক্ত ঝড়বে সিপাই বাবু।

— কাঁটাতারে গোলাপ তুলতে গেলে একটু রক্ত ঝড়বে বইকি, ঝড়ুক না।

— গোলাপির বুকের মধ্যে থেকে নিংগড়ে এলো অবোধ কান্না। সে বিক্রমের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিল-তা’লি ওঝা হয়ে ঝাড়ো কালা। পেরানে বাঁচার বড় সাধ জাগে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev