জীবন জীবিকার লড়াইয়ে আজকের সমাজের মহিলারা যে পুরুষদের তুলনায় কোন অংশে কম যান না,তা আবার নতুন করে প্রমাণ করে দিচ্ছেন কাঁথির তৃপ্তি দাস। টোটো চালিয়ে শুধু নিজের নয়, আত্মজ দুই মেয়ের ভাতকাপড় থেকে লেখাপড়া শেখানোর যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে বহন করে চলেছেন গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে। পূর্ব মেদিনীপুরের মহকুমা শহর কাঁথির প্রথম মহিলা টোটো চালক হিসেবে তৃপ্তি দাসের নামটা ইতিমধ্যেই নিজের ওয়ার্ড ছাড়াও কাঁথি পুরশহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যাতায়াত থেকে ঘরের বাইরের যে কোন প্রয়োজনে তৃপ্তির উপর ভরসা রাখেন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
মদ্যপ স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১৩ সালে চার বছরের বড় মেয়ে দোলা আর আট মাস বয়সী ছোট মেয়ে শীলাকে কোলে নিয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে এসে ওঠেন। কাঁথি পুর শহরের ৩নং ওয়ার্ডের উত্তর দারুয়ার কপালকুন্ডলায় তৃপ্তির বাবা সৃষ্টিধর বেরার বাড়ি। ওয়ার্ডের অনেকেই সৃষ্টিধর বেরার বাড়ি আগে না জানলেও মহিলা টোটো চালক তৃপ্তি দাসের বাড়ি বললে এখন সকলেই তৃপ্তির বাবা সৃষ্টিধর বেরার বাড়ি দেখিয়ে দেবেন। বাবা সৃষ্টিধর বেরার বাড়িতেই তৃপ্তি তার দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়েই থাকেন। তৃপ্তির বড় মেয়ে দোলা ক্লাস টেন আর ছোট মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। দুজনেই কাঁথি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। টোটো চালিয়ে সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বাড়ি ফিরে রাতে দুই মেয়েকে দেখে হাসি খেলে যায় মা তৃপ্তি দাসের চোখে মুখে।

মহিলা হয়েও কেন বেছে নিলেন টোটো চালানোর কাজ? প্রশ্ন শুনে তৃপ্তির দু’চোখের কোন চিকচিক করে জলে ভরে উঠে। দু-হাজার আট সালে বিয়ের পর অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে কাঁথির সাতমাইলে শ্বশুর বাড়িতে যান তৃপ্তি। শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না দিতেই স্বপ্নে ধাক্কা খেলেন। টের পেলেন যে স্বামী মানুষটি পাঁড় মাতাল। দিনের বেশিরভাগ সময়ই মদে চুর হয়ে থাকা ছাড়াও বউ পেটাতে সিদ্ধহস্ত। দিনের পর দিন মদ্যপ স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেই স্বামীর ভিটেতে পাঁচ বছর কাটানোর পরেও স্বামীর অত্যাচারের মাত্রা দিনের পর দিন ক্রমশই বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যেই তৃপ্তির কোল আলো করে এসেছে দুই মেয়ে দোলা আর শীলা। ২০১৩ সালে একদিন স্বামীর অত্যাচারের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে দুই মেয়ে দোলা আর শীলাকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে সাতমাইল থেকে কাঁথিতে বাবার বাড়িতে চলে আসেন।

বাবা সৃষ্টিধর বেরার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার জন্য তৃপ্তিকে রোজগারের জন্য বাড়ির বাইরে কাজে নামতে হয়। প্রথম দিকে কাজুবাদামের বিচি ভাঙার কাজ আর পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন বাড়িতে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে থাকেন। সংসার চালানোর জন্য তৃপ্তিকে প্রতিদিন কাকভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে দেখে তৃপ্তিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন মেয়েদের গৃহশিক্ষিকা ও ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা অতসী মাইতি। অতসী দেবীর পরামর্শ আর আর্থিক সহযোগিতা আর নিজের কিছু সঞ্চয় মিলিয়ে কিনে ফেললেন একটা টোটো রিকশা। ২০২১ সালে কাঁথির প্রথম মহিলা টোটো চালক হিসেবে তৃপ্তি দাসের শুরু হল জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস।

বছর আড়াই আগে ওয়ার্ডের মহিলা পুর ওয়ার্ড কাউন্সিলার সঞ্চিতা জানার সহযোগিতায় ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি ব্যর্জ আবর্জনা পরিষ্কার করার ভ্যাট গাড়ি চালানোর কাজও পান তৃপ্তি।
প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত পুরসভার ভ্যাট গাড়ি চালানোর পর নিজের টোটো নিয়ে শহরে বেরিয়ে পড়েন। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসে টোটো চালানোর পরিশ্রমের রোজগারে দুই সন্তানের পঠনপাঠন ও সংসার চালানোর পাশাপাশি বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া একচিলতে জায়গার উপর দোতলা বাড়ি বানানো ছাড়াও মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার জন্য টাকাও জমাচ্ছেন তৃপ্তি। টোটো চালাতে গিয়ে মহিলা হিসেবে একটু অস্বস্তি হলেও এখন সয়ে গেছে বলে সলজ্জ হাসি হেসে বলে উঠেন, “আমার এখন একটাই লক্ষ্য দুই মেয়েকে মানুষ করে তোলা।” নিজের জীবন সংগ্রামের লড়াইয়ে হারতে নারাজ কাঁথির প্রথম মহিলা টোটো চালক তৃপ্তি দাস। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তি বলে ওঠেন, “মেয়েরা এখন জীবন জীবিকার জন্য কত কিছুই না করছে। আমিই বা কম কিসে?”