ঘন্টা তিনেক পরে অদেখা এক নদীর কাছে দাঁড়ালাম। ইছামতীর শাখা ডাসা। নাম কর্কশ হলেও যৌবনে টগবগ করছে। বিকেলের সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলাম। আরো চল্লিশ মিনিটের পথ। শিক্ষক হিসেবে শুরু হল কর্মজীবন ২০০৫ সালে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক স্কুল। প্রকৃতির সব রূপ এখানে আছে। যেমন আছে প্রচুর রুজি রুটি নিয়ে প্রতিদিন লড়াই করে চলা মানুষ। এতো দূরের পথ একটি অভিযানের মতো , অভিমানও কম ছিল না। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে ভালো এক বোঝাপড়া হয়ে গেল। অভিমান রইল না কিন্তু দীর্ঘ পথের অভিযান থেকে গেল।
একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে কালীবাড়ির তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। সারাদিনের ক্লান্তি তখন শরীরময় পাক খাচ্ছে। হঠাৎ দেখলাম ট্রাক্টরের ট্রলিতে সদ্য বিবাহিত বর আর বউ। আসে পাশের লোকজন, ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ভীড় করে ফেলেছে চারপাশ। সঙ্গে বাজনদার বাহিনীর রকমারি বাজনা ও শরীরের বিচিত্র অঙ্গ ভঙ্গি। বউয়ের মুখটা দেখেই চিনে ফেললাম। সেকেণ্ড বেঞ্চেই বসতো না মেয়েটা! সেদিনই তো গলা চড়িয়ে বলেছিলাম সামনে কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। পড়াশোনা করো মন দিয়ে। কই সেদিন তো কিছু বুঝিনি! কত প্রত্যয় ছিল ওর গলায়। কত হাসি খুশি। আজ সারা মুখে কেমন যেন বিষন্নতার ছাপ। এ কি করলো মেয়েটা? মনে মনে রাগ হোল। কেন বলতে পারলি না এখন বিয়ে করবি না? কেন বলতে পারিস না নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাস?
প্রথম প্রথম এ রকম বিবাহ অহরহ ঘটতে দেখেছি চোখের সামনে। আজ স্কুলে এসেছে কাল ফুরুত। অন্য কোনও ছাত্রী ফিশ ফিশ করে বলেছে, স্যার ওর বিয়ে। একদশ বা দ্বাদশ শ্রেণিতে মোটামুটি চল্লিশ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে এটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা দায় মুক্ত হবেন, মেয়ের একটা হিল্লে হয়ে গেল, এলাকার লোকজন কবজি ডুবিয়ে খেলেন। সে এক মোচ্ছব।
মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে ঘাড় থেকে যেন ভূত নেমে গেল, আর মেয়েটিরও যেন জীবন ধন্য হয়ে গেল। গরিব পরিবারে একটি মুখের অন্ন সংস্থানের দায় যে কমে গেল—এ ভাবনাও ভাবতে হয় হতভাগ্য বাপকে। কিন্তু মেয়েটির জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ও গতি রুদ্ধ হয়ে গেল আর পড়াশোনার প্রদীপও নিভে যেতে থাকল—এরকম ভাবনা মজদুর বাপের কাছে অতি সৌখিন ভাবাবেগ।
ওই গ্রামে ২০০৫ থেকে ২০১৩ কিংবা ২০১৪ অব্দি এরকম প্রচুর বাল্যবিবাহের নিরব সাক্ষী হতে হয়েছে। পথে ঘাটে, স্কুলে, ট্রেনে দেখা হয়েছে। বুঝতে পারতাম না কে কার থেকে মুখ লুকিয়ে রাখছি?

যদি এরকম একটি পৃথিবী ভাবা যেত যেখানে সবকিছু মোবাইলের টক টাইমের মতো নিয়ম করে হোত। রিচার্জ সাকসেসফুল, ভ্যলিড থাকবে ৭ মার্চ ২০১৩। রূপকথার গল্পে সবকিছু পরিপাটি। সুখ বা দুঃখ। কিন্তু আমাদের জীবন একে বারেই আলাদা। কোন কিছুই সময় মেনে হয় না। যেমন জন্ম, দাঁত পড়া, দাঁত ওঠা, কথা শেখা, চাকরি, ধার শোধ করা, মৃত্যু, ইনসিওরেন্স ইত্যাদি। সময় মেনে হওয়ানোর কোনও দায়ও কেউ নিতে চায় না। বুলি আওড়ে সবাইকে যদি বুঝিয়ে রাখা যায়, তো ক্ষতি কি? বরং করলেই বিপদ, তখন শুনতে হবে এটা তো করলেন তবে ওটা হোল না কেন? বা ওরকম দরকার ছিল না, এরকম হলে বেশি ভালো হতো। এতো সব ঝক্কি না নিয়ে ভবিষ্যত কালের উপর কালক্ষেপ করতেই অনেকে ব্যস্ত।
যাক সেই রূপকথার গল্পে ফেরা যাক। টক টাইম শেষ, বাবা মার ট্যাকে টান। আদরের মেয়ে এখন চিন্তার কারণ। আমাদের সামাজিক ও মানসিক উন্নয়ন বা ঔদার্য নারীদের প্রতি কতটা সংবেদনশীল বা স্নেহশীল তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। লিঙ্গ বৈষম্য, নারী নির্যাতন, নারী পাচার, দারিদ্র্য এই বিষয়ে সেমিনার, চিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র নির্মাণও এখন পুরানো ফ্যাশন। এতো কিছুর পরেও কানে জল যাইনি আমাদের। ৮ মার্চ ২০১৩ কন্যাশ্রী প্রকল্পটি রূপায়িত হয়। যার সুদূর প্রসারী প্রভাব ছাত্রীদের ও তাদের বাবা মায়ের চিন্তা ভাবনাকে অনুরণিত করেছে। মায়ের স্বাস্থ্যে যেমন শিশুর সুস্থতা তেমনি নারীর সমৃদ্ধিতে সমাজের কল্যাণ, সাফল্য। রূপকথার সেই মেয়েটি এখন বাস্তবে নেমে এসেও পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারছে। গরিব পরিবারে এই সাহায্য মেয়েটির মর্যাদা অলক্ষ্যে বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ দরিদ্র হতশ্রী ঘরে সে এখন একটি খুঁটি।
কন্যাশ্রী প্রকল্প লাগু হওয়ার আগে ও পরে নিজের স্কুল সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার পরিবর্তন অনুভব করতে পারি। ভালো লাগে এটা ভেবে যে, এখন কোনও মেয়ের মুখে শুনতে হয় না—
—স্যার, ও আর আসবে না স্কুলে।
—আর পড়বে না।
—ওর বাবা গরীব তো ।
—পাত্র হাত ছাড়া করেনি।
—ওর আরো দুটো বোন আছে।
শহরের ইমারতের ভীড়ে বা রাতের চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যে বাস করে গ্রামের ছোট ছোট ঘরে বাস করা মেয়েগুলোর লড়াই বোঝ যায় না। এই অংকের টাকা হয়তো কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারে কিন্তু এটাই কারো কারো কাছে যক্ষের ধন। এই অর্থনৈতিক আশ্বাস মেয়েগুলোর প্রাণ প্রদীপের শিখা।
অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যে হিম্মত তারা পেয়েছে তা আপামর গ্রাম ও শহরের মেয়েদের সমাজে সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঁচতে শেখাবে। এটা অন্য এক রূপকথার কালজয়ী সূচনা।