| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কন্যা যখন হ্রী কন্যা যখন শ্রী : লিখেছেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় / ১০৮৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১

‘ছেলের মুতে কড়ি / মেয়ের গলায় দড়ি’—এ প্রবাদ গ্রাম-বাংলা থেকে উঠে এলেও এর প্রভাব নগর সভ্যতায় আরও প্রকট, পুত্র-সন্তান এমন একটি সম্পদ যা প্রস্রাব করলেও, সে-ই বর্জ্য-পদার্থের ভিতরও আর্থ সম্পদ থাকে, পরন্তু কন্যাসন্তান এতই অবাঞ্ছিত যে তার গলায় দড়ি অর্থাৎ তার মৃত্যু কামনায় পরিবার সতত রত। মেয়ে-মানুষের এই জীবন এ বৈষম্য বিদ্যাসাগর মহাশয় থেকে বিবেকানন্দ পর্যন্ত সকল মনীষীকেই কাঁদিয়ে এসেছে, বহুযুগ ধরে। মনীষীদের চেষ্টায় অধ্যবসায়ে নারীশিক্ষা-র প্রচলন ঘটেছে। নারীশিক্ষা প্রচলনে যে কতটা বাধা তা প্রমাণ করে ঈশ্বর গুপ্ত-র ব্যঙ্গ কবিতা—‘যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে/এরা এ বি শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল কবেই কবে।’ বিদ্যাসাগর মহাশয়-কে কম তিরস্কার শুনতে হয়নি অবাঞ্ছিতদের কাছ থেকে, যারা চাইছিল না মেয়েদের শিক্ষা, তাদের মনে হচ্ছিল লেখাপড়া শিখলেই মেয়েরা বাইরে বেরুতে শিখবে, স্বাধীন হবে এবং সংসার বিকল হবে।

এই চিন্তা প্রবাদে ছাপ ফেলেছে—‘মা পায় না কাঁথা সেলাই-এর সুতো!/ ছেলের পা-এ চোদ্দো সিকের জুতো!’—এ প্রবাদে মায়ের অর্থনৈতিক অবস্থার করুণ পরিণতি, সমাজ ব্যবস্থাকেই ব্যক্ত করে। মা যে সেলাই-ফোঁড়াই করেন সেটি মা নিজের জন্য করেন না, করেন সংসারের পুরুষ সদস্যদের জন্য, তবুও সেই সেলাই-এর অর্থবরাদ্দ সংসারের পুরুষরা করেন না, নারীকেই সামান্য সামান্য অর্থ রোজগার করে নিজের চুপড়ির জন্য দ্রব্যাদি কিনতে হয়।

প্রবাদ-এর মধ্য দিয়েই ধরা পড়ে আমাদের জীবনের চলমানতার ধারাবাহিকতা। ‘মরবে নারী উড়বে ছাই/তবে নারীর গুণ গাই।’ মহিলারা শুধু মরলেই হবে না, মরার পর সেই মৃতদেহ পুড়বে এবং পোড়ার পর ছাই উড়বে, তবে নারীর কিছু কৃতিত্ব স্বীকৃতি পাবে, তার আগে নয়।

‘সতীন’ শব্দের কোনও বিপরীতার্থক শব্দ নেই হয়তো একারণেই। অথচ,আমাদের দুর্গাপুজো আছে, দুর্গামূর্তির মধ্যে লৌকিক পারিবারিক ছবি আছে। মা দুর্গা তাঁর পুরো পরিবার নিয়ে ধরাধামে পিত্রালয়ে আসেন, এই আসাটাই উৎসব, শাক্তপদাবলিতে লৌকিক-পারিবারিক চিত্রে দেখি হিমালয়-মেনকার কন্যা উমা-র বাপের বাড়ি আসা নিয়ে, মা-বাবার মধ্যেকার মান-অভিমান, যা ছিল আসলে আগমনী গান। এ গান শাক্তসংগীত, শাক্তপদাবলি, যে পদাবলি একেবারে বাংলার মাটিতে গড়ে ওঠা। নারীর যখন শিক্ষার অধিকার ছিল না, তখনও নারী শিক্ষিত ছিল। সে ইতিহাস আমরা ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেখতে পাই।

রবীন্দ্র উপন্যাসে ‘গোরা’-র মা অনন্দময়ী বা শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজের জ্যাঠাইমা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তাঁরা এমন এক একটি প্রতিষ্ঠান, যাঁরা প্রমাণ করেন সংসার-সমাজে সুশাসনের ইতিবৃত্তান্ত তাঁদের জন্যই রক্ষিত হয়। কন্যাসন্তানকে তার পরেও সইতে হয়েছে বহু যন্ত্রণা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঊনবিংশ শতাব্দীতে নারীশিক্ষার যে প্রদীপ প্রজ্বলন করেছিলেন বিংশ শতকের গোড়ার দিকেও তা তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, বিবেকানন্দ-র ইচ্ছেকে ফলবতী করতে রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুসন্ন্যাসীদের হিমশিম খেতে হয়েছে। শুধু এই একটি বিষয়ে ‘স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তার’। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে জন্মগ্রহণ করেও আশাপূর্ণা দেবী তাঁর পিতৃ-পরিবারের লেখাপড়া শেখার সুযোগই পাননি যদিও আশাপূর্ণা শিক্ষিত অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। লেখাপড়া শিখলে মেয়েরা বিধবা হবে—এমন একটি লোকবিশ্বাস তখন প্রচলিত ছিল। তখন মানে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও। এই চ্যালেঞ্জ ছিল না, বিধবা হলে কী হয়? তখন কিন্তু এ প্রবাদ খুব জনপ্রিয় ছিল,—‘ভাগ্যবানের বউ মরে’! যে পুরুষের বউ মারা যাবেন, সে পুরুষ অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ তিনি আরও একটি নতুন বউ পাবেন এবং সঙ্গে যৌতুক-সামগ্রী। কুলীন প্রথা-র ঐতিহাসিক গল্প এখনও কি খুব ম্লান হয়েছে? এখনও কি বন্ধ হয়েছে ‘প্রকৃত সুন্দরী ছাড়া পত্রালাপ নিষ্প্রয়োজন’ গোছের বিজ্ঞাপন?

একবিংশ শতাব্দীতে আমরা অনেকটা এগিয়েছি ফেসবুক, টুইটারে, অ্যাপস্‌-এ, অনেকটা পিছিয়েছিও বটে? ‘গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে/ মৈত্র মহাশয় যাবেন সাগর সঙ্গমে।’ এখন আর বার্তা ক্রমে ক্রমে আস্তে আস্তে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ছড়ায় না, এক ঝটকায় একটি টুইট খবর কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত টলিয়ে দিতে পারে। এমন সময়েও ‘সাধী ডট কম’ আপডেটেড হয়েছে অবলুপ্ত হয়নি কিন্তু! মেয়েদের স্যানেটারি ন্যাপকিন বিপ্লব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেয়েদের অন্তর্বাস পরে জিম-শরীর পুরুষ ছাত্র নগ্ন শরীরে শুধুমাত্র বহির্বাস হিসেবে মেয়েদের অর্ন্তবাস পরে বিচিত্র ভঙ্গিতে বিপ্লব করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা প্রমাণ করেছে এত কেমিক্যাল সিভিলাইজেশন, এত টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপড্ সভ্যতার পরও মেয়েদের আভরণ নিয়েই, যত টানাটানি, ‘ছেড়ে দাও রেশমি চুড়ি।’

রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতাটি মনে পড়ে আমাদের, যে মেয়েটি শরৎবাবুর মানে শরৎচন্দ্রের কাছে আকুল আর্তি জানিয়েছিল, তাকে নিয়ে একটি গল্প লিখতে। যে গল্পে মেয়েটিকে জিতিয়ে দিতে হবে, মেয়েটিকে উচ্চশিক্ষিত করতে হবে, বিদেশি ডিগ্রি-র জন্য বিদেশে পাঠাতে হবে এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেহেতু লেখক সেহেতু তাঁর পক্ষে কোনও অসম্ভবই হবে না, মেয়েটিকে জিতিয়ে দিতে, গল্পে গোরু গাছে ওঠে। লেখকের কল্প লেখার গল্পে সাধারণ মেয়েকে অসাধারণ করে দেখানো যাবে, বাস্তবে যা সম্ভব নয়, গল্পে তা সম্ভব হবে!

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ‘সাধারণ মেয়ে’-র উপলব্ধি দিয়ে দেখিয়েছিলেন, একটি ‘মেয়ে’ তার নিয়তির কাছে কী নিষ্ঠুরভাবে বন্দি! ‘নারীকে আপনভাগ্য জয় করিবার/কেন নাহি দিবে অধিকার/হে বিধাতা।’—রবীন্দ্রনাথের এ আক্ষেপ বিধাতার কাছে, এ অসহায়তা, নিরুপায়তা সবই ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করা।

আবহমান শতকের অসহায়তা নিরুপায়তা মুক্তি পেলে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পে, কন্যা যে শ্রী, বিশ্রী নয়, এ বোধও আমাদের লুপ্ত হয়েছিল। আমরা দেখেছি একটি মাত্র পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষায় যখন একের পর এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে, হতাশ পরিবার শেষের দিকে কন্যার নাম রেখেছেন ‘আন্নাকালী’ অর্থাৎ আর না কালী। সবচেয়ে প্রহসন কালীর মতো একজন মহিলা দেবতাকে বলা হচ্ছে কালী আর কন্যাসন্তান দিও না।

এখনও যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দিলে জননীকে বাপের বাড়িতে নির্বাসিত করা হয়. বারংবার কন্যাসন্তানের জন্ম শ্বশুরবাড়িকে তিতিবিরক্ত করায়, পুত্রের আবার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে-র মধ্যে ধরা থাকে বংশধারার বহমানতাকে ধরে রাখার অন্ধ বাসনা। পুরুষের জিন-ই শুধু বংশধারাকে ধরে রাখে এমন ভুল তথ্যে বিশ্বাস করার দায় আর্থ-সামাজিকভাবে বর্তায়, নাকি মানুষের অন্ধ সংস্কারে যুগের পর যুগ বিশ্বাস চলতে থাকে তা বলবে ভাবিকাল।

আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করা মুখ্যমন্ত্রী কন্যাশ্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের উপহার দিয়েছেন কন্যাশ্রী কন্যা যে ফেলে দেওয়ার নয়, কন্যা যে মাতৃস্বরূপা, কন্যা যে দেবী দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, অন্নপূর্ণা আমাদের নতুন করে চেনালেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী প্রাণপ্রিয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বিবাহ’ নামক প্রথার মধ্য দিয়ে একজন পুরুষ একজন নারীকে বহন করে চলেন—বিশেষভাবে বহন করার জন্যই ‘বিবাহ’ প্রথার উদ্ভব। অথচ দেখা যায় বিবাহ এই চিরাচরিত পদ্ধতিতে নারীকেই বহন করতে হয়, একটি অর্থহীন গ্লানিময় দুর্বহ জীবন!

নারীকে এই প্রথার দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতেই কন্যাশ্রী। শুধু বোধহয় নারীকে নয়, আমরা প্রত্যেকেই একটি ভুল সিদ্ধান্তের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাব। মা-সারদাকেও নাবালিকা অবস্থায় বিবাহ প্রথায় প্রবেশ করতে হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের রেনেসাঁ-র যুগেও আশাপূর্ণাকে বালিকাবধূ হয়ে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করতে হয়েছিল। প্রবাদে আছে মেয়েরা নাকি ‘কুড়িতেই বুড়ি’ প্রবাদে আছে কুড়ি বছর বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া মানেই কন্যার বুড়ি হয়ে যাওয়া, কন্যার আয়ুষ্কাল কত কম, এ আয়ুষ্কাল সংসারে তার উপযোগিতার আয়ুষ্কাল, হয়তো প্রবাদটি এমন ছিল ‘কুড়িতেই বুড়ি’—যে ফুল না ফুটিতে ঝরিছে ধরণীতে—সে ঝরা ফুলও যে হয়নি হারা তার প্রমাণের ভার ভবিষ্যতের কন্যাশ্রীদের হাতে।

কন্যাশ্রীর অনেক ভাগ কে-১, কে-২, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য কে-৩। শর্ত একটাই কন্যাকে কন্যা থাকতে হবে। বাবা-মা একমাত্র কন্যাকেই অন্যের হাতে সঁপে দিয়ে দায়মুক্ত, ভারমুক্ত চাপমুক্ত হতেন। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতা কন্যার বিবাহে নিমন্ত্রিতদের নিমন্ত্রণ কার্ডেও লিখতেন—কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতাকে দায়মুক্ত করার করুণ আর্তি—যা ব্যক্তি কন্যার কাছে নিদারুণ এক যন্ত্রণা। একজন কন্যাসন্তান পরিপূর্ণ একজন মানুষ, তারও নিজস্ব ইচ্ছে পছন্দ রুচি আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে, সে যে বাল্যে পিতার দ্বারা পালিত, যৌবনে স্বামীর দ্বারা পোষিত এবং বার্ধক্যে সন্তানের (পুত্র) আশ্রিতা নয় তার প্রমাণ মিলবে কন্যাশ্রীর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ জীবনে।

মেয়েরা যে বোঝা নয়, মেয়েরা যে কারও গলগ্রহ নয়, বিবাহ নামক সামাজিকীকরণের নামে মেয়েদের যে আসলে চিরদাসত্বে বেঁধে দেওয়া হয়—সংস্কারের এ নিগড় পরম্পরা থেকে মেয়েদের মুক্তি দেওয়া আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষেও দুরূহ ছিল। লেখাপড়া শেখার পরও একটি মেয়েকে সংসারের দাসত্ব করতে হয়েছে—তবু শুনতে হয়েছে ‘মেয়েদের বারো হাত কাপড়ে কাছা হয় না’—এ প্রবাদের অর্থ মেয়েরা বোকা বুদ্ধিহীন।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি মেয়ে বিবাহ নামক নারীমেধ যজ্ঞ থেকে দূরে থাকলে তার নিজস্ব ভাবনা চিন্তা বোধ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তৈরি হবে। রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে শিক্ষিতা বিনোদিনীকেও স্বামী-সংসার করার আকুলতা ছুটিয়ে মারে। ‘চতুরঙ্গ’-র দামিনী শচীশের প্রতি তীব্র অনুরাগ বুকের বেদনার মতো চেপে ধরে শ্রীবিলাসকে বলেছে, জন্মজন্মান্তরে যেন তোমার মতো স্বামী পাই। ‘স্ত্রী চরিত্রম দেবা ন জানন্তি কু তো মনুষ্যা’—এ রচনা পুরুষের। নারী চরিত্র বেজায় জটিল কিছুই বুঝতে পারবে না/ওরা কোনো ল-মানে না তাই ওদের নাম ললনা। কত হাস্যকর পুরুষ প্রবচন মেয়েদের শুনতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে আমৃত্যু। লরি-র পেট্রল ট্যাঙ্কের গায়ে লেখা থাকে জন্ম থেকেই জ্বলছি। রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’-য় মৃণাল প্রশ্ন তুলেছিল আগুন কেন শুধু মেয়েদের কাপড়ের কুচিতেই লাগে কেন পুরুষের কাছায় লাগে না?

রামায়ণ-মহাভারত-বাল্মীকি-ব্যাসদেব নারী-কে সীতা-দ্রৌপদীকে যেভাবে এঁকেছেন সেভাবেই নারী জন্ম থেকেই এক অভিশপ্ত জীবন বহন করে চলত। এবার এলো নতুন ডাক কন্যাশ্রী।

কন্যার ললিত-লাবণ্য এখন বজ্র-কলুষ হয়ে দেখা দেবে। যে কোনও একজন মানুষের পরিপূর্ণ বোধ আনতে পারে একমাত্র শিক্ষা। সেই শিক্ষায় অপারগ বাবা-মা-কে আর ভার নিতে হবে না, ভার নেবে সরকার। শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ নয়, কন্যা-র শ্রী বিকাশ—এ বিকাশ কন্যার বিবাহযোগ্য হয়ে ওঠা নয়, এ বিকাশ কন্যার মনুষ্যযোগ্য হয়ে ওঠার পরিকল্পনা। বাষট্টিটি দেশের মধ্যে পাঁচশো বাহান্নটি প্রোজেক্টের মধ্যে কন্যাশ্রী বিশ্বশ্রী হয়ে প্রমাণ করেছে কতটা আধুনিক, কতটা বৈজ্ঞানিক, কতটা মানবিক এ প্রকল্প। মেয়েরা ‘মেয়েমানুষ’ নয়, মেয়েরা মানুষ। পুরুষের মতোই একটি মেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সে কারও অর্ধাঙ্গী সহধর্মিণী হয়ে পূর্ণাজ্ঞ হয়ে ওঠে না। এক নারী একজন পুরুষের থেকেও শ্রেষ্ঠ হতে পারেন তাঁর নিজস্ব চিন্তায়, চেতনায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে, পরিকল্পনা রূপায়ণে—কিন্তু এ সত্য প্রমাণিত হলেও এ সত্যকে স্বীকৃতি দিতে আজও কোথাও কুণ্ঠিত হয় সমাজ।

আজও কন্যাকে স্বামীর ঘরে গিয়ে ফুলশয্যা-য় কুমারীত্ব ঘুচিয়ে স্বামী সোহাগী হয়ে কাঁধে সংসারের চাবির গোছা ঝুলিয়ে দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। অন্যদিকে অবশ্যই কিছু মেয়ে একা একা জীবনযুদ্ধে জয়ী হচ্ছে—এভারেস্টের চূড়ায় উঠছে, ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হচ্ছে, অথবা ক্রিকেট ব্যাটে ডিউজ বলকে কব্জির জোরে দিগন্তে পাঠিয়ে গোটা মাঠের দর্শকদের হাততালিতে অভিনন্দিত হচ্ছে। মেয়েরা অনেক দিন আগেই যাত্রা শুরু করেছিল, কন্যাশ্রী তাদের সে উৎসাহ অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। যখন শুধু কে-ওয়ান, কে-টু ছিল নিন্দুকেরা রটিয়ে ছিলেন কন্যাশ্রীর টাকায় কন্যাদান করছেন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতারা। নিন্দুকেরা বেলুন ফুটো করতে অত্যন্ত দৃঢ়, আজ কে-থ্রি-কে কী বলবেন? ঐ নিন্দুকেরা? যে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন তাঁদের বিশ্বরূপ দর্শন হবে, মহাপৃথিবীর সকল মেয়েরা তাঁদের সমস্যা নিয়ে মিলিত হবেন অন্য এক জগৎসভায়। যেখানে মেয়েরা মানবীবিদ্যা চর্চায় সমান্তরালে খুলে ফেলবেন মানব-পুরুষ বিদ্যাচর্চা বা মেন-স্টাডিজ। নারীকে পিছিয়ে রাখার মূলে তো পুরুষতন্ত্র। নারীকে কোনও কোনও রাষ্ট্রে ভোটাধিকার পেতে হয়েছে প্রভূত পরিশ্রমে, লড়াইয়ের মাধ্যমে। ভোটাধিকার প্রাপ্তিই যেখানে সংগ্রামের কারণ, সেখানে রাষ্ট্রপরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ সে-ও তো গভীর অন্ধকারে নিরন্তর চকমকি ঠোকা।

কন্যাশ্রী মেয়েদের মুক্তি দিলো কান্নাশ্রী থেকে। মেয়ে মানেই নাকি ঘরকন্না আর কান্না। মেয়ে মানেই দমকল। কতরকম বিদ্রূপ, এখন মেয়ে মানে লক্ষ্মী। মেয়ে মানে আর শাল গাছের চারা নয়, শাল কবে মহিরুহ হবে। শাল গাছ কাঠ হয়ে বিক্রি হবে। সেই টাকায় মেয়ের বিয়ে হবে। এখন পুরো উল্টোপুরাণ, কন্যাশ্রী নগদ টাকায় কন্যাকে শালপ্রাংশুর মতো শিক্ষাদীক্ষায় উপার্জনে স্বাবলম্বী করে তুলবে। কন্যা হয়ে উঠবেন পিতা-মাতার বার্ধক্যে প্রধান অবলম্বন।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev