সম্রাট আকবর একবার বীরবলের বুদ্ধির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বীরবলকে পাশের রাজ্যের রাজার কাছে একটি চিঠি পৌঁছে দেবার আদেশ দিলেন, শর্ত হলো রাজদরবারে গিয়ে আসল রাজার হাতে চিঠিটি দিতে হবে কিন্তু কোনও প্রশ্ন করা চলবে না। আসল রাজাকে খুঁজে নিতে হবে। বীরবল তো চিঠি নিয়ে রাজদরবারে হাজির হয়ে দেখেন মহাবিপদ। রাজসভায় দু-জন রাজা, একই রকমের সিংহাসন, একই রকমের রাজমুকুট, একই রকমের পোশাক! বীরবল কিছুটা থমকে গেলেন, কাউকে জিজ্ঞেসও করা যাবে না আসল রাজা কে! কিছুক্ষণ পর গটগট করে হেঁটে আসল রাজার হাতে চিঠিটা দিয়ে বললেন, আমাদের সম্রাট আপনাকে এই চিঠি পাঠিয়েছেন— গ্রহণ করুন। সভাসুদ্ধ লোক তো অবাক, কি করে বীরবল চিনলো কে আসল— কে নকল রাজা! বীরবল বললেন, খুব সোজা। দু-জন রাজাকে দেখেই বুঝেছি একজন আসল, একজন নকল। দু-জনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলাম, একজন স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দে রয়েছেন, আরেক জন আড়চোখে মাঝে মাঝে পাশের রাজাকে দেখে তিনি যা যা করছেন, তা অনুকরণ করছেন। আসলে রাজদরবারের আদবকায়দা তো আর জানা নেই। সেই দেখে বীরবল বুঝে গেলেন— কে আসল, কে নকল। তেমনই সরকার চালাতে গিয়ে কাদের দিকে তাকাচ্ছে সরকার, তাতেই বোঝা যায়— এ সরকার কাদের? মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, শত বাধা আসুক, কেন্দ্র যতই বাধা দিক, প্রাপ্য অর্থ থেকে রাজ্যকে বঞ্চিত করুক, রাজ্য মাথা নোয়াবে না, আর গরিব মানুষের জন্য চালু হওয়া একটা প্রকল্প থেকেও পিছিয়ে আসবে না— এ এক অন্য লড়াই। রাজ্যের মানুষ হৃদয় দিয়ে তা প্রত্যক্ষ করছেন। আর এই জন্যই তো খুব দ্রুত পশ্চিমবাংলা উন্নয়নের নিরিখে এগিয়ে আসছে প্রথম সারিতে।
জ্যোৎস্না বাউরি— বাঁকুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের দিনমজুর পরিবারের বউ। পরপর দুই মেয়ে হওয়ার অভিযোগে যাঁকে ১৫ বছর আগে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হয়। জেদ চাপে মেয়েদের মানুষ করবেনই। লোকের বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝি-এর কাজ করে, ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ করে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেয়েদের স্কুলে পাঠান, বড়ো মেয়ে এখন ক্লাস নাইনে, ছোটো সেভেনে, সরকারি অফিসাররা বাড়িতে এসে বড়ো মেয়ের নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে ২৫,০০০ টাকা দিয়ে গেছেন। ছোটো মেয়ের নামধাম নিয়ে গেছে, বালা পেয়েছে, জেনেছে উচ্চ মাধ্যমিকে আবারও ২৫,০০০ টাকা, কলেজে গেলে ২৫,০০০ হাজার টাকা, আর বিয়ের জন্য ২৫,০০০ টাকা দেবে রাজ্য সরকার— এখন কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর কল্যাণে মেয়েরা আর বোঝা নয়, সম্পদ। আর হ্যাঁ, ওঁর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও এখন জ্যোৎস্নাকে ঘরে নিয়ে গেছেন, ভাঙা সংসার জোড়া লেগেছে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর কল্যাণে মেয়েরা এখন বোঝা নয়—সম্পদ।
হরেন বাগদি— ৬০ বছরের খেতমজুর। সারা জীবন ধরে মানুষের মুখে ভাত জোগাড়ের কাজে লেগেছেন— অন্নদাতা। কঠিন অসুখে পড়েছেন, চিকিৎসা? না, কোনও সমস্যা না, পঞ্চায়েতের দেওয়া স্বাস্থ্য বিমার কার্ড নিয়ে সে সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থায় সবেচেয়ে ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ নিতে পারছেন— স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প— যে হরেন বাগদি নিজের চোখে নিজের বাবাকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরতে দেখেছেন, এখন নিজে চিকিৎসা করাচ্ছেন, ওষুধ পাচ্ছেন, যা আগে ছিল স্বপ্ন— এখন তা বাস্তব।
গত দশ বছরে স্কুল-কলেজের পরিকাঠামোর কী বিকাশ ঘটেছে, সবাই জানেন। সম্ভবত এমন কোনও স্কুল-কলেজ পাওয়া যাবে না যেখানে বিগত আট বছরে পরিকাঠামোগত কোনও না কোনও উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষার সর্বস্তরে এনরোলমেন্ট, ছাত্র-ভর্তি বেড়েছে। ড্রপ আউট কমেছে, প্রাথমিকে ছাত্র-ভর্তি এখন প্রায় ৯৯ শতাংশ। এই সময়ে সারা রাজ্যে রাস্তাঘাটের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। পরিবহণ ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে। সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্যকরী হয়েছে। চিকিৎসার সুযোগ বিকেন্দ্রীকৃত বিস্তৃত হয়েছে। বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে আমাদের রাজ্য প্রথম সারিতে, শৌচাগার আন্দোলনের ব্যাপক সাফল্য এসেছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভারতের প্রতি পাঁচটি নির্মল গ্রামের একটি হচ্ছে পশ্চিমবাংলায়। বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা সর্বত্র করা গেছে। যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের প্রত্যেকের জন্য ২ টাকা কেজি দরে চাল, গম সরবরাহ করা যাচ্ছে। সামগ্রিক এই বিকল্প উন্নয়নের নিরিখেই পশ্চিমবাংলার মানুষ উন্নয়নের পক্ষেই তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করতে সংকল্পবদ্ধ— যত দিন যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত এক নেতা বলছিলেন, ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্প যখন ঘোষিত হলো, কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদান, ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে মৃত্যু হলে ২ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য, কৃষি বিমার সব টাকা সরকার দেবে। অনেকে ভেবেছিলেন শুধু ঘোষণা। আর ২ লাখ টাকার দাবি তো কৃষক সংগঠনগুলির স্লোগান ফর ক্যাম্পেনেও ছিল না— কৃষক বন্ধু সরকার যা ঘোষণা করে বাংলাকে এগিয়ে দিলো। আসলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়— এই প্রবাদটিকে বাস্তব করছে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার। সরকারি সুযোগসুবিধা বঞ্চিত-অবহেলিত-পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য— এই অভিমুখ ঠিক আছে।