“ডিডিং ডিডিং দ্যাংলা, কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা,
একবার আসেন মায়ের সাথে, একবার আসেন একলা।”
দুর্গা পুজোয় শুধু কার্তিক নন, মা দুর্গার সঙ্গে পূজিত হয় লক্ষ্মী-সরস্বতী-গনেশ। কিন্তু প্রচলিত কবিতায় বদনাম দেওয়া হয় শুধু কার্তিকের নামে। হ্যাংলামো দেখিয়ে তিনি মোটেও আসেন না, রীতিমতো একটি নামের মাস তাঁর নামে রয়েছে, যার শেষ দিনে পুজো হয় কার্তিকের। এমনকি নব বিবাহিত বা নিঃসন্তান দম্পতিদের বাড়ির দরজায় লুকিয়ে রেখে আসা হয় কার্তিক ঠাকুরের মুর্তি। পরিবারের সন্তান কামনা আর ভুরিভোজ পাওনার আশায় এই আয়োজন।
পুরাণে, কল্পকথায়, লোকাচারে কার্তিককে নিয়ে অনেক কাহিনী চলে আসছে। নারী, কার্তিকের রূপে ও বীরত্বগাঁথায় তুষ্ট হয়েছে যুগযুগধরে। তাইতো আজো বাঙালি সৌম্যদর্শন যে কোনও পুরুষকে কার্তিকের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
দেব সেনাপতি কার্তিক পৌরাণিক দেবতা। মা দুর্গা ও দেবাদিদেব শিবের সন্তান কার্তিকের জন্ম হয় তারকাসুরকে বধ করার জন্য।

সতীর মৃত্যুর পর শিব যখন তপস্যায় মগ্ন দেবতারা শলাপরামর্শ করে মহামায়ার ছায়া নিয়ে শিবের সন্তান পাবার আশায় পার্বতীকে সৃষ্টি করলেন। পার্বতীও গভীর তপস্যায় মহাদেব-কে তুষ্ট করে তার ঘরণী হয়ে গেলেন। কিন্তু বাধ সাধলো শিবের মহাযোগ। বাধ্য হয়ে কামদেবের সাহায্য নিতে হলো। শর নিক্ষেপণ করায় শিব তো রেগে আগুন। ফলস্বরূপ কামদেব ভস্মীভূত হলেন। এদিকে শর ততক্ষণে কাম জাগিয়েছে শিবের শরীরে। শিব পার্বতীর মিলন হলো। কেটে গেল দীর্ঘ বত্রিশ বছর। এই পরিস্থিতিতে পার্বতীর সন্তান ধারণ সম্ভব হবে না। তখন বাধ্য হয়ে দেবতারা অগ্নিকে পাঠালেন শিবকে বিরক্ত করার জন্য। অগ্নি হাঁসের রূপ ধরে শিবের কাছে গিয়ে কানে কানে বললেন ‘এবার ওঠো নাথ ‘।
শিবের আবেশ কেটে গেল, তখন রেতঃপাত হলো। সেই রেত শিব স্থাপন করলেন অগ্নির ঠোঁটে। অগ্নি সেই তেজ ধারনে অক্ষম হলেন ও নিক্ষেপ করলেন আকাশগঙ্গার কোলে। গঙ্গাও বইতে না পেরে সেই তেজোপিণ্ডকে শর বনে নিক্ষেপ করলেন। সেই শরবনে জন্ম নিল এক শিশু।
যার কান্না শুনে ছজন কৃত্তিকা ছুটে এলেন। আর সেই ছয়জনই শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। অবশেষে শিশুটিও ছটি মুখে ছজনের দুধ পান করলেন। এই ছয়জনের স্তন্য পান করেছিলেন বলে, তাঁর নাম হলো “ষড়ানন”। শরবনে জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর নাম হলো “সারস্বত”।
এরপর পার্বতী কার্তিককে নিয়ে চলে আসেন দেবলোকে। পিতা তাকে দেবসেনাপতির পদ দিলেন, গরুর দিলেন বাহন ময়ূর। নানাভাবে নানা অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কার্তিক তারকাসুরকে বধ করলেন।
মহাভারত অনুসারে, যুদ্ধ থেকে ফিরেই ইন্দ্রের মেয়ে দেবসেনার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় কার্তিকের । সেই দেবসেনা পরে মা ষষ্ঠী রূপে পরিচিত হলেন যদিও এর পেছনে অন্য এক গল্প আছে। এ দিকে কৃত্তিকা মায়েদের ঋষি পতিরা বউদের সন্দেহ শুরু করেছিলেন। তারা ভাবছিলেন অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে কার্তিকের জন্ম তারা দিয়েছেন। সেই সন্দেহের বশে ঋষিরা ওনাদের তাড়িয়ে দেয়। কার্তিক সেই কৃত্তিকা মায়েদের সম্মান দিয়ে বরণ করে আনেন।এরপর তাদেরকে কার্তিক নিজের পুজোর প্রচারের জন্য কাজে লাগান। সেই থেকেই স্ত্রী দেবসেনা (মা ষষ্ঠী) ও কার্তিক পূজার মাধ্যমে দম্পতিরা সুন্দর ও বলিষ্ঠ চেহারার সন্তান প্রার্থনা করেন। দেখা যাচ্ছে অভিসন্ধি আর ষড়যন্ত্র এই দুইই রয়েছে এই গল্পে।

পৃথিবীর পরিক্রমার কম্পিটিশনে বুদ্ধি করে গণেশ যখন জিতে গেলেন তখন এক লহমায় একরাশ অভিমান নিয়ে স্ত্রী দেবসেনাকে নিয়ে কার্তিক চলে গেলেন দক্ষিণ ভারতে। সেখানকার উপজাতি তাকে বরণ করে নেন এবং ময়ূর বাহন বা মুরুগান নামে অভিষিক্ত করেন।
এই সময় একদিন সেখানকার এক কালো মেয়েকে দেখে আকৃষ্ট হন কার্তিক। মেয়েটি স্থানীয় উপজাতি রাজার মেয়ে বল্লী। কার্তিক বল্লীর মন জয় করতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অবশেষে দাদা গণেশের সাহায্য নেন ভাই। গণেশ এক পাগলা হাতির রূপ ধরে এসে বল্লীর পথ আটকায়। ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে কার্তিককেই জড়িয়ে ধরে বল্লী। তখন কার্তিক মেয়েটির কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে হাতী তাড়াতে পারলে তাকে বিয়ে করবে বল্লী। শেষ পর্যন্ত কার্তিকের সঙ্গে বিয়ে হয় বল্লীর।
দাদা গণেশ এই সাহায্যের জন্য চোরেদের ডিপার্টমেন্ট কার্তিকের ঘাড়ে চাপিয়ে চলে যায়। যেহেতু বল্লীকে একপ্রকার চুরি করেই বিয়ে করেছেন কার্তিক তাই এই যুক্তিতে এই ব্যবস্থা। অতএব দেখা যাচ্ছে কার্তিক চিরকুমার মোটেও নন, দু-দুটি তিনি বিয়েও করেছেন।
হুগলির বাঁশবেড়িয়ায়, চুঁচুড়ায় জামাই কার্তিক, হালিশহরের ‘জ্যাংড়া কার্তিক’ ও ‘ধুমো কার্তিক’ পূজা, কাটোয়ার দীর্ঘদেহী কার্তিকের পুজো বিখ্যাত। প্রতিবছর সুঠাম গড়নের বস্ত্রহীন (ল্যাংটো কার্তিক) কার্তিক লড়াই দেখতে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে কাটোয়ায়।এক পুজোর সঙ্গে অন্য পুজোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাতে রীতিমতো লাঠিসোটা, এমনকি তরোয়াল নিয়ে দেখা যায় এক অভিনব লড়াই হয়।

লর্ড মুরুগান
পশ্চিম বর্ধমান জেলায় পাণ্ডবেশ্বর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে ১৬৬ বছরে ধরে কার্তিক পুজো হয়ে আসছে। কথিত আছে, জমিদার জয়নারায়ণ পাল, শ্যাম পাল ও লক্ষী নারায়ন পাল তিনভাই সন্তানহীন ছিলেন। প্রবল দুশ্চিন্তার মধ্যে এক রাতে জয়নারায়ণ পাল তিন ভাইকে নিয়ে কার্তিক পূজা করার স্বপ্নাদেশ পান। পরে লক্ষ্মীনারায়ণ পালের এক পুত্র সন্তান এবং বাকি দুই ভাইয়ের একটি করে কন্যা সন্তান হয়। সেই থেকেই এই পূজায় বড় কার্তিক, মেজ কার্তিক ও ছোট কার্তিক এর মূর্তি পুজো হয়ে থাকে।
মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে বেশ কয়েকটি স্কন্ধ বা কার্তিক মন্দির রয়েছে। গুপ্ত যুগেও কার্তিক আরাধনা খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বরাক উপত্যকায়ও কার্তিক পূজার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
লোকসংস্কৃতিতে ছোটখাটো বিষয়-এর মধ্যেও অনেক বড় ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। কার্তিক দেব সেনাপতি হলেও তাকে ফসল বা শস্যরক্ষার দেবতা হিসেবে মানেন কৃষিজীবী মানুষ। পুরানে কার্তিকের রূপ হচ্ছে ষড়ানন অর্থাৎ ছয় মুখ বিশিষ্ট। বলা হয় মানুষের মনের ছয়টি স্তর — যুক্তি, আবেগ, চিন্তা, জ্ঞান, বুদ্ধি ও সচেতনতা। আর এদের শত্রু হলো ছয়টি রিপু — কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এই পাঁচ প্লাস এক ছটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা ছয়টি রিপুকে দমন করতে পারলে তবেই মনের ছয়টি গুণ জেগে উঠবে। মানুষের জীবনে এটাই যুদ্ধ — ছয়টি রিপুর সঙ্গে ছয়টি চেতনার। এবং এই যুদ্ধের প্রতীকী হলেন দেবতা কার্তিক। এইভাবেই যুদ্ধ আর সন্তান উৎপাদন দুয়ের অনুষঙ্গেই প্রতিবছর অতি সমারোহে কার্তিক পুজো হয়ে থাকে।।
বেশ লাগলো কথাগুলো
থ্যাঙ্ক ইউ ❤️
বাহ! বেশ ভালো লাগল।
ধন্যবাদ জানাই ????
অনেক তথ্য জানলাম
ধন্যবাদ জানাই,❤️
ভালো লাগলো, সমৃদ্ধ হলাম।
অনেক ধন্যবাদ ????