শীতের আমেজ শুরু হওয়ার সঙ্গে বেড়েছে শীতের পোশাকে ফ্যাশন সচেতনতা। সেই পোশাকের তালিকায় শাল সেকেলে হলেও, এর আবেদন ফুরানোর নয়। ঐতিহ্য এবং বাঙালিয়ানা সমৃদ্ধ করেছে শীতের শালকে। তাই আজো শীতের আদরে নিজেকে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করে শাল বা চাদরে। কখনো আলোয়ান, কখনো দোশালা, ফ্যাশন জগতে শালের ব্যবহার করা হচ্ছে নব আঙ্গিকে।
আঠের শতকের মাঝামাঝি থেকে শালের বিশদ প্রচলন। শুরুতে রাজা-বাদশাহদের মতো প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিবিশেষ ব্যবহার করতেন। যদিও বলা হয়, চতুর্দশ শতকে সাইয়িদ আলী হামাদাদী যখন লাদাখে এসেছিলেন, লক্ষ্য করেন লাদাখী কাশ্মীরি ছাগলের পশম খুবই নরম। কিছু পশম নিয়ে কাশ্মীরের রাজা সুলতান কুতুবউদ্দিনের জন্য একজোড়া মোজা তৈরি করলেন। শুরু হয় কাশ্মীরি শাল শিল্পের ইতিহাস।

শাল ব্যবহারের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন মোঘল সম্রাট আকবর।
শীতের দিনে ফুল, পাতা অথবা কল্কার সূক্ষ নক্সা করা শাল গিলে করা পাঞ্জাবী, ময়ূর পেখম ধুতির সঙ্গে সৌখিন বাঙালি গায়ে দিতেন শাল। উৎসব বা নিমন্ত্রণে কাঁধ অবধি বাবরি কাটা চুল, গোঁফের সরু দুটি প্রান্তে তা দিয়ে, পায়ে নাগরা বা অ্যালবার্ট বা পাম্পশ্যু, গলায় মুক্তার মালা, আঙুলে হীরের আংটির পাশাপাশি দামি জামেয়ার শাল গায়ে দেওয়া ছিলো সেকেলের ধনী মানুষদের অর্থ্যকৌলিন্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক।
শাল নিয়ে বড়লোকি চালের অনেক গল্পকথা ছড়ানো রয়েছে পুরোন দিনের নানান লেখালেখিতে।

রাজা নবকৃষ্ণ দেব ছিলেন নতুন গড়ে ওঠা কলকাতার প্রসিদ্ধ ধনী ব্যক্তি। সম্ভ্রান্ত এই ধনী পরিবারের বড়োমেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন রাজা-মহারাজদের মতো ব্যক্তিরা। রাজশাহী জেলার নবাবের প্রধান উজির রায়দূর্লভের পুত্র রাজবল্লভ বিবাহসভায় বসেছিলেন সগৌরবে নির্দিষ্ট সিংহাসনে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এবং ত্রিলোকচন্দ্র সভায় উপস্থিত হয়ে রাজবল্লভের সঙ্গে সৌজন্যতা বিনিময় করলেও, রাজবল্লভ বেশ উদাসীন ও তাচ্ছিল্য ভাব দেখান। তাঁর এই ব্যবহারে ক্ষুব্ধ-অপমানিত হয়ে কৃষ্ণচন্দ্র এবং ত্রিলোকচন্দ্র বিবাহসভা ত্যাগ করতে উদ্যত হলে, নবকৃষ্ণ নিজের গায়ের বহুমূল্য শাল দু’টুকরো করে মছলন্দে পেতে দিয়ে সবিনিময়ে বলেন, ‘আপনারা যাবেন না, আপনাদের জন্যও সিংহাসন পাতা আছে।’
পূর্বপুরুষদের জামেয়ার শাল এখনো অনেক পরিবারের স্মৃতি সঞ্চয়। কিছু বাঙালি পরিবারে জামেয়ার শাল ছিলো বংশগৌরব আর বনেদিয়ানার প্রতীক।
নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী তাঁর স্ত্রী অমিয়া চৌধুরানীকে ১৯৩৮ সালে সাদা দোরোখো পশমিনার, অতিশয় সূক্ষ হাতের কাজে তৈরি খুব সুন্দর দেখতে একটি শাল কিনে দিয়েছিলেন দেড়শো টাকা দিয়ে। ১৯৬৪ সালে এক শালওয়ালা সেই শালখানির জন্য পাঁচহাজার টাকা দিতে চেয়েছিলো।

ঠাকুর পরিবারে শালের চল ছিল খুবই। দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এক দরাজদিল শৌখিন পুরুষ। ফরাসি রাজা লুই ফিলিপ কে এক সান্ধ্য মজলিসে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই মজলিসের ঘর দামি সুন্দর কাশ্মীরি শাল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। নিমন্ত্রিত প্রত্যেক অভিজাত মহিলা দ্বারকানাথের কাছ থেকে পেয়েছিলেন একটি করে বহুমূল্য শাল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবাহ হয় অগ্রহায়ণ মাসে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ঘরোয়াভাবে। পারিবারিক বেনারসি শাল গায়ে জড়িয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
বারমহলে পুরুষদের শাল ব্যবহার থাকলেও অন্দরমহলে মহিলাদের ছবিটা ছিলো আলাদা। সারাদিন শুধু শাড়িতেই কাটাতো। সন্ধ্যাবেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতো দোলাই বা সুতির চাদর।

তবে ক্রমে ক্রমে যখন মেয়েদের বাইরে বেরোনোর প্রয়োজন হলো, বিশেষ করে ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টান পরিবারের, তখন গরম শেমিজ, জ্যাকেট ব্লাউজের চল হলো সেই সঙ্গে শালের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’য় বিশ শতকের প্রথমদিকে উপর মহলের শিক্ষিত মেয়েদের শীতের সাজের একটি চিত্র পাওয়া যায়।
যুগের পরিবর্তনে বাঙালিদের শীতের সাজেও অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, কুর্তি, টপস, ফতুয়া-জিনস, টি-শার্ট ও শার্ট…সবের সঙ্গেই নেওয়া যায় একটি মানানসই শাল। কাশ্মীরি শালের নাম তালিকায় শীর্ষে থাকলেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ভেলভেটের শাল। এছাড়াও সংযোজনে রয়েছে লুধিয়ানা, জয়পুরি, চায়নিজ, বার্মিজ-সহ আরো নানা ধরনের শাল। শুধুমাত্র দেখনদারিতেই নয়, শালের উষ্ণতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাই এই শীতের আমেজে নিজেকে জড়িয়ে রাখুন শালের উষ্ণ ওমে।
খুব ভালো লেখা।অনেক তথ্য জানতে পারলাম।
ধন্যবাদ❤️
*শাল* আভিজাতপূর্ণ সৌখিন সৌন্দর্যের প্রতীক
ছিল এবং ভনে আজও আছে।আপনার হামেশার মত সুন্দর প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেককিছু জানতে বুঝতে পারাযায়,আপনার প্রতিবেদনে থাকে ইতিহাস ভিত্তিক গল্পগাথা আর সহজ ভাষা
শব্দের ব্যবহারে পাঠক আকৃৃষ্ট হয়।এই লেখায়
*শাল* বেমিশাল হয়ে উঠলো পাঠেও শালের উষ্ণতা অনুভব করা গেল।পরবর্তী পরিবেশনের
অপেক্ষায় থাকলাম।প্রীতি শুভেচ্ছা ভানাই।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে সুচিন্তিত মতামতের জন্য????
Really fantastic.kato kichu janlam….eto study koro tumi ami abar hoye jai..I salute u…
অনেক ধন্যবাদ????