উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় গত কয়েক দিন ধরে ঢাকায় সফিক আহমেদ। যে আশার বীজ বুনে এসেছেন সেটি ক্রমেই নিভে যাওয়ার উপক্রম এখন, বুঝতে পারছেন। তবুও অপেক্ষা করছেন শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখবার জন্যে। এসেছেন উত্তরের চায়ের শহর পঞ্চগড় থেকে। অবশ্য তিনি শহরের মানুষ নন। বাস করেন শহর থেকে ছয় কি.মি. দূরে অবস্থিত নিজ গ্রাম বিলাসপুরে। পরিসংখ্যান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসে। ভার্সিটির পাঠ সম্পন্ন করবার পরপরই চাকরি পেয়েছিলেন। নিজ গ্রামে অবস্থানের প্রবল অভিপ্রায় থেকে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো চাকরিতে আবেদন করেন নি। আট বছর যাবৎ উপজেলাতেই কর্মরত আছেন। সততার সাথে সেবা প্রদানের মাধ্যমে অনেকের প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বয়স চৌত্রিশ পেরিয়ে গেলেও বিয়ে করা হয়ে ওঠে নি এখনও। সংসারে রয়েছেন মা ও ছোট বোন। মায়ের বয়স ষাট পেরিয়েছে। ছোট বোন পড়াশুনা করছে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরে। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য সম্পত্তির পরিমাণ আরও স্ফীত হয়েছে তার প্রজ্ঞাপূর্ণ নিবিড় তত্ত্বাবধানে। মাছ, মাংস, শাক সবজি জাতীয় প্রতিটি দ্রব্যের যোগান আসে নিজস্ব ক্ষেত খামার থেকে।
শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা পরিশীলতার ছাপটি ধরে রেখেছেন এখনও। চেহারা দেখলে সহজেই বোঝা যায়। স্বাভাবিকতার তুলনায় ওজন সামান্য বেশি। উচ্চতা কম হওয়ায় তুলনামূলকভাবে অতিরিক্ত স্থুলকায় মনে হয়। মাথাভর্তি চুল, ঘন কালো গোঁফ এবং সমৃদ্ধ শ্যামলা মুখম-লে সুদৃশ্য কালো ফ্রেমের চশমা পরেন সবসময়। ইস্ত্রি করা শার্ট, প্যান্ট ও জুতো পরিধান করে যখন মোটর সাইকেলে অফিসের দিকে যাত্রা করেন তখন কমবেশি অনেকেই তার দিকে মুগ্ধতা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থাকবার নেপথ্যে অবশ্য যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গ্রামের কারো কোনো সমস্যা হলে ত্রাতা হিসেবে সবার আগে তাকেই পাওয়া যায়। বিশেষত শিক্ষাসহ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক সমস্যাগুলোয়। কিছু দিন পূর্বেও গ্রামের এক শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু আর্থিক দীনতার কারণে তার বাবা ভর্তি করাতে মোটেও রাজি ছিলেন না। পড়াতে চেয়েছিলেন পঞ্চগড় সরকারি কলেজে। অনেক কষ্টে বাবাকে বোঝানোর পর নিজেই ব্যয় নির্বাহ করে সেই মেয়েটিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয় হলে অবস্থানের ব্যবস্থা করবার পাশাপাশি টিউশনিরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। গ্রামে আসবার পর থেকেই দিনের পর দিন এমন অজস্র উদাহরণ সৃষ্টি করে গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ আস্থা অর্জন করে চলেছেন সফিক। তার এই ইতিবাচক প্রয়াসটি চর্চার সূচনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময় থেকেই। পড়াশুনার পাশাপাশি শীতার্তদের শীতবস্ত্র প্রদান করা, বন্যাদূর্গতদের সহায়তা করা, রক্তদান ও সংগ্রহসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যাপৃত থাকতে খুবই সন্তুষ্টি বোধ করতেন তিনি।
ঘড়ির কাঁটা সাত সংখ্যাটিকে ছাড়িয়ে গেছে। বিছানায় শুয়েই ছিলেন সফিক। এক প্রচ্ছন্ন ইতিবাচক ভাবনায় নিজেকে আবৃত রাখবার মাধ্যমে। পলাশীতে অবস্থিত কর্মজীবী হোস্টেলের একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। কক্ষটির পরিধি অত্যন্ত সংকীর্ণ। এই ছোট্ট পরিধির মাঝেই গাদাগাদি করে বসানো রয়েছে দুটো বিছানা। আয়তনে অত্যন্ত ক্ষুদ্র। কোনোরকমে একজন মানুষ শুতে পারবেন। তবে খুব বেশি লম্বা হলে সেই মানুষটিকে অবশ্যই দু’পা ভাজ করে রাখতে হবে। দুটো বিছানার একটি ফাঁকাই রয়ে গেছে। অন্যটিতে আছেন সফিক। প্রতিদিনের মতো আজও একটু পরেই উঠতে হবে তাকে। যেতে হবে আগারগাঁয়ে। দশটার মধ্যেই। হেড অফিসে। পলাশী থেকে আগারগাঁয়ের দূরত্বটি অনুমান করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায়-কত সময় লাগতে পারে। আর যানজটে পড়লে সেই সময়টি যে বৃদ্ধি পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যানজটের বিভীষিকাপূর্ণ তীব্রতা এড়াতে প্রতিদিন সকাল সাতটাতেই যাত্রা করেন সফিক। আজও নাস্তা সেরে তাই করলেন। চাকরির বয়স আট পেরিয়েছে গত ডিসেম্বরে। এ বছরের ডিসেম্বর প্রায় নাকের ডগায়। কিন্তু সিলেকশন গ্রেডের গেজেট এখনও প্রকাশিত হয় নি, কবে নাগাদ হতে পারে সেটিও স্পষ্ট নয়। অথচ গ্রেড প্রাপ্তির সব শর্তই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পূরণ করেছেন সফিক। তাই কোনো উপায় না দেখে ঢাকায় আসা। ছুটি ছিল তিন দিনের। ইতোমধ্যে চার দিন পেরিয়ে গেছে। নিয়ত প্রত্যাশার প্রদীপটি নিজের মনের উঠোনে প্রজ্বলিত রেখে আসা-যাওয়া করছেন। কিন্তু চার দিনে তেমন কোনো শুভ ইঙ্গিত মেলে নি। সামনে আরও কতদিন যে অপেক্ষা করতে হবে তা অনুমান করতে পারছেন না।
যানজটের বিরক্তিকর অধ্যায়টুকু সম্পন্ন করে আজ সৌভাগ্যবশত দশটায় চলে এলেন আগারগাঁয়ে। কিছুটা ক্লান্ত। স্ট্যান্ড থেকে সামান্য দূরত্বেই হেড অফিস। জনাকীর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে হাঁটতে থাকলেন। অফিসের সামনে এসেই ব্যাগটি গুছিয়ে নিলেন। ভীড়ের মাঝে ঠিকমতো কাঁধে রাখতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, ব্যাগটি না থাকলেই ভালো হতো। বিশাল বিল্ডিং। উদাস দৃষ্টি মেলে তাকালেন অফিসের সাইনবোর্ডটির দিকে। প্রাপ্তির প্রত্যাশায় এগিয়ে চললেন। ছন্দোবদ্ধভাবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকলেন। অফিসের সামনেই অনেক লোক সমাগম। অতি সন্তর্পণে ডিউটি অফিসার ইশতিয়াক মুসায়েবের কক্ষে প্রবেশ করতে পারলেন তিনি। প্রথম দিন শুধু অপেক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, সাক্ষাৎ করতে পারেন নি। দ্বিতীয় দিনে সক্ষম হয়েছিলেন। হয়ত অফিসের বাইরে অপেক্ষমান লোকগুলিরও একই অবস্থা।
কক্ষটিতে প্রবেশের পরপরই ইশতিয়াক সাহেবের স্বতঃস্ফূর্ততায় এক ধরনের প্রফুল্লতা বোধ করলেন সফিক। ‘আসুন আসুন, বসুন। কেমন লাগছে হেড অফিসের পরিবেশ।’ সালাম দেয়ার সুযোগ না দিয়েই সফিককে বসতে বললেন ইশতিয়াক। প্রথম দিকে তার গম্ভীর ভাব বেশ ভাবনায় ফেলেছিল সফিককে। সমস্যাটি নিয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনা করতে পারবেন কিনা এ নিয়েই দ্বিধায় ছিলেন। চারদিনে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে তার আচরণ। মোটা ফ্রেমের চশমা, ধূসর হলুদ রঙের টি-শার্ট পরিহিত দীর্ঘদেহী ইশতিয়াক সাহেবের হাস্যদীপ্ত প্রতিমূর্তি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তার অন্তর্মন জুড়ে এত জটিলতা। সাধারণ ভঙ্গিতে সফিকের জবাব, ‘ভালোই তো যাচ্ছে, তবে আমার কাজটা হয়ে গেলে আরও ভালো যেত। দেখুন আজ চারদিন হচ্ছে ঢাকায় আছি, বোঝেনই তো, থাকা খাওয়া, যাতায়াত, আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ এসব আমার কাছে এখন সহনশীলতার বাইরে চলে গেছে।’
‘তা বুঝতে পারছি, কিন্তু কেবলই তো যাওয়া আসা শুরু করলেন, কিছুদিন ঘোরাফেরা করুন, অফিসের ভাবটা বুঝবার চেষ্টা করুন। হয়ে যাবে। যা চান তাই হবে। আজ আসুন।’ মোটা লোমশ হাত দুটি টেবিলের উপর রেখে আয়েশের ভঙ্গিতে উত্তর প্রদান করলেন ইশতিয়াক। পুনরায় হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর কিছু বলবার সুযোগ পেলেন না সফিক। চায়ের বেশিরভাগ অংশ পান না করেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মেঘে ঢাকা আকাশে হঠাৎ করে আজ কিঞ্চিৎ শুভ্র আলোর স্ফুরণ দেখা গেলেও তার স্থিতি খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না। বুঝতে পারলেন ইশতিয়াক সাহেবের কাছ থেকে প্রাপ্ত স্বল্পায়ু আলোর দ্বারা বিশাল বিস্তীর্ণ মেঘের কালো আস্তরণ দূর করা মোটেই সম্ভব নয়। কীভাবে সেই আলোর স্ফুরণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে সেটিই ভাবনার মূল বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হতে থাকলো তার চিত্তজুড়ে।
এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে ধীরে ধীরে অফিস থেকে বের হলেন সফিক। মেঘমুক্ত নীল আকাশ, যানজটও সহনীয় পর্যায়ের, ব্যস্ততাও সকালের তুলনায় কিছুটা কম। আজকের জন্যে নিজেও এখন পুরোপুরি কর্মমুক্ত। সিদ্ধান্ত নিলেন হেঁটে হেঁটেই কিছুটা পথ এগুবেন। বেতার ভবন এবং কপিরাইট অফিস পেরিয়ে ফার্মগেট অভিমুখে এগিয়ে চললেন। রাস্তার দু’ধার বেশ পরিচ্ছন্ন। বা দিক থেকে মৃদু বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। অনবরত হেঁটেই চলেছেন তিনি। নির্মল বাতাসের কারণে হাঁটবার সময় বেশ প্রশান্তি অনুভব করছেন। ডিভাইডারের মাঝে রোপণকৃত সুদৃশ্য বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ করেছে ঢাকার সৌন্দর্য। এই মুহূর্তে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না যে- এটি ঢাকা শহর। কিছুটা পথ এগিয়ে এসে আবার ভীড়ের মধ্যে পড়লেন। হেঁটে হেঁটে সামনের দিকে এগুনো অসম্ভব বিরক্তিকর। তাছাড়া হাঁটাহাঁটিতে খুব একটা অভ্যস্ত নন তিনি। কোনোরকমে বাকি পথটুকু পাড়ি দিলেন। ফার্মগেট চক্ষু হাসপাতালের সামনে এসেই থমকে দাঁড়ালেন। হাঁপাতে থাকলেন। সমস্ত শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেল। শার্টের উপরের বোতামটি খুললেন। মাথা খানিকটা নিচু করে বুকের ভেজা খোলা অংশটুকু দেখে নিলেন। অনেক কষ্টে ধীর পায়ে হেঁটে এসে ফার্মগেট ওভারব্রিজের ঠিক পাশেই অবস্থিত বিশাল বৃক্ষটির ছায়ার নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। লক্ষ্য- কিছুটা স্বস্তি প্রাপ্তির আকুলতা। পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে আসা বিরিয়ানির সুঘ্রাণ তার ক্ষুধা নিবৃত্তির আগ্রহটিকে বাড়িয়ে দিলো। মনস্থ করলেন দুপুরের খাবারটা এখানেই খেয়ে নেবেন। যদিও এ ধরনের খাবারে মোটেও অভ্যস্ত নন তিনি। তাছাড়া টানা চারদিন রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে অস্বস্তির চরম সীমায় এসে পৌঁছেছেন। বড় বেশি সমস্যায় না পড়লে রেস্টুরেন্টের খাবারে খুব একটা আগ্রহ বোধ করেন না তিনি। তবুও স্থির করলেন- খেয়ে নেবেন। সে অভিপ্রায়েই রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি এলেন। আকারে ছোট রেস্টুরেন্টটির এক কোণার সিটে গিয়ে বসলেন। ছোট টেবিলের উপর দু’হাত রেখে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। ধূলিবালিযুক্ত ফ্যানের পাখা ধীর গতিতে ঘুরলেও কিছুটা প্রশান্তি বোধ করছেন এ কারণে যে, তিনি ঠিক ফ্যানের নিচেই বসেছেন। যদি আরো কিছুদিন থাকতে হয় তবে নিয়মিত রেস্টুরেন্টের খাবার গ্রহণ করা তার শরীরের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। মনে মনে ভাবতে থাকলেন উত্তরণের কোনো উপায় খুঁজে বের করা যায় কিনা। আত্মীয়ের বাসায় যেতে কখনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না সফিক। এমনকি খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বাসাতেও বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে যান না। রেস্টুরেন্টে বসেই ভাবতে থাকলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন রওয়ানা হবেন গুলিস্তানের এক আত্মীয়ের বাসায়। অতীতে অনেকবারই সেই আত্মীয় তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বভাবগত প্রবৃত্তির কারণে কখনই সেখানে যাওয়া হয় নি। ঘড়ির দিকে তাকালেন। হাতে এখনও যথেষ্ট সময় রয়েছে। ন্যূনপক্ষে তিনটে পর্যন্ত সময়কালকে বাসা বাড়ীতে দুপুরের খাবার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কিছু না খেয়েই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলেন। গুলিস্তানের বাসে উঠবার জন্যে দ্রুত ওভারব্রিজ পেরিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে আসলেন।
অসংখ্য যাত্রীর সাথে নিজেও দাঁড়িয়ে রইলেন। অপেক্ষা করতে থাকলেন যাত্রী ছাউনীতে। চারদিক থেকে আসা অনবরত গাড়ীর শব্দে কিছুটা বিচলিত হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিস্তানের একটি বাসে উঠলেন। কারওয়ান বাজার পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যেই আসলেন। শাহবাগে এসে একটু জ্যাম থাকলেও সেটিকেও উত্তীর্ণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সামনে চলে এলেন। সূর্য ঠিক মধ্যগগনে। জ্বলন্ত আকাশ থেকে পড়ছে আগুনের দলা। এরই মাঝে বাস থেকে নামলেন।
ব্যাগ থেকে বের করলেন গোলাপী-সাদা রঙের ছোট্ট ছাতাটি। ছাতা মেলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশেই ফলমূল ও মিষ্টির দোকানগুলি গভীর মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন। প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরত্বের একটি বৃহৎ মিষ্টির দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন। এক কেজি মিষ্টি কিনবার পর সামান্য দ্বিধা নিয়ে কিছু আপেলও কিনলেন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই হ্রাসপ্রাপ্ত হলেও এখনও বেশ হিসেবি তিনি। অযথা পয়সা খরচ করা তার স্বভাব বিরুদ্ধ। তবুও অনেক ভেবে চিন্তে মিষ্টির সাথে ফল কিনলেন যাতে করে ভালোভাবে আপ্যায়িত হওয়া যায়। তাছাড়া এই মুহূর্তে রেস্টুরেন্টে না খেয়ে যে কোনো বাসা বাড়ীতে খাবার গ্রহণ করা তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই বাসে বসে শুধু মিষ্টি নিয়ে যাত্রা করবার ভাবনাটিকে খুব একটা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে পারলেন না তিনি। গুলিস্তান হকি স্টেডিয়াম থেকে আজিজ ভাইয়ের বাসার দূরত্ব সামান্য। শুধু শুধু রিকসা ভাড়া করে যাত্রা করা যৌক্তিক মনে করলেন না। এক হাতে মিষ্টি ও ফলের ব্যাগ, অন্য হাতে ছাতা নিয়ে হেঁটে হেঁটেই এগিয়ে চললেন। গ্রামে থাকতেই আজিজের নামটি আজিজ ভাই-এ রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। সে সূত্রে সফিকও তাকে আজিজ ভাই হিসেবে সম্বোধন করেন।
আজিজ ভাইয়ের গ্রামের বাড়ী সফিকের বাড়ী থেকে প্রায় দুই কি.মি দূরে। বাবা পঞ্চগড়েই থাকেন। যে কোনো সমস্যা হলেই সফিকের শরণাপন্ন হন। এর আগেই সন্তানের সাথে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে আসলেও থাকতে পারেন নি। আজিজ ভাই ঢাকায় এসেছে অল্প বয়সেই। ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করে। উপার্জনও করেছে প্রচুর। যখন এলাকায় বাস করতো তখন সমস্যা হলেই সফিকের শরণাপন্ন হতো। বাস্তবতা ও ভালোলাগা দুটো বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই আজিজ ভাই সফিক সাহেবের সঙ্গে সম্পর্কটি অটুট রেখেছে।
কিছুটা পথ পেরিয়ে একটি বৃক্ষের নীচে দাঁড়ালেন সফিক। মুঠোফোনে আজিজ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলেন। আসতে কিছুক্ষণ দেরী হবে বলে ফোন করলেন বন্ধু সৌরভকে। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন ঢাকায় বাস করছে সৌরভ। সাথে স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। কিছুদিন পূর্বে কল্যাণপুরে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছে। ওর সাথে দেখা করবার ভীষণ ইচ্ছে হলো মধ্যাহ্নর এই তীব্র রোদের প্রাখর্য উপেক্ষা করে। কিন্তু সৌরভ তার কলটি রিসিভ করলো না। হয়ত ব্যস্ত। দ্বিতীয়বার কল দেবার কথা ভাবলেও শেষ মুহূর্তে আর কল করলেন না।
কিছুক্ষণের মধ্যে আজিজ ভাই আসলো। আধুনিক পোশাকে সজ্জিত আজিজ ভাইকে এতটা পরিচ্ছন্ন দেখতে পাবেন তা কখনোই আশা করেন নি সফিক। কড়া পারফিউম এর গন্ধ দূর থেকে অনুভূত হচ্ছে। গায়ের রঙ আগের তুলনায় অনেক শ্যামল হয়েছে। স্বাস্থ্যও বেশ ভালো দেখাচ্ছে। ঠোঁটের রঙ দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, পান খাওয়ার অভ্যেসটি ত্যাগ করতে পারে নি এখনও। বাম কপোলের মাঝখানের তিলটি অবিকৃতই রয়ে গেছে। নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট, সুুতি সাদা শার্ট, হাতের দামী ঘড়ি দেখে বোঝাই যাচ্ছে তার উন্নতি কোন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। সফিককে দেখবার পর উচ্ছ্বসিত বোধ করলো আজিজ ভাই। উৎফুল্ল হয়ে জড়িয়ে ধরলো সফিককে। জড়ানো অবস্থায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কিছুটা সময় রইলো। ব্যবহারের অতিমাত্রিক আতিশায্যে খানিকটা বিব্রত বোধ করলেও মনে মনে ঠিকই এক ধরনের আনন্দ অনুভব করলেন সফিক। বুঝতে চেষ্টা করলেন খাবারের ধরনটা বোধহয় ভালোই হবে। ভারী খাবার তো অবশ্যই। আজিজ ভাইকে বেশ তৎপর দেখাচ্ছে। সফিককে নিয়ে গলির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। গলিটি পরিচ্ছন্ন নয়। রাস্তাটিও অমসৃণ ও সরু। বেশ কিছু ইট আঁকাবাঁকাভাবে বিছানো। হোঁচট খাবার সম্ভাবনা প্রবল বিধায় সফিককে সাবধানে চলতে বললো। বাসাগুলি বহুতলবিশিষ্ট হলেও অনেক পুরোনো। বাসার বাম পাশের দেয়ালটিতে শ্যাওলা জমে সবুজ আকার ধারণ করেছে। কম করে হলেও পনেরটি বাসা পেরিয়ে ওরা এসে পৌঁছলো। চারতলা বিশিষ্ট বাসার চারতলাতেই থাকে আজিজ ভাই। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলো দুজনই। উঠবার সময় হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকলো সফিকের। বুঝতে পারলেন তার শরীর ঘেমে গেছে। কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে ফ্লোরের একদম সামনে এসে পৌঁছলেন। ভেতরে প্রবেশ করেই বসলেন ছোট্ট কামরার ফ্ল্যাটে পরিচ্ছন্ন ড্রইং রুমে। ফ্যানের পাখার গতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্তির পরিমাণ কমে এলো। মিষ্টি ও ফলের প্যাকেট সোফার ওপরেই ছিল। সেগুলোকে অতি দ্রুত আজিজ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলেন। প্যাকেটগুলো পেয়ে যে ধরনের তৃপ্ততার বোধ আজিজ ভাইয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেছিলেন সফিক, সেটির উপস্থিতি লক্ষ করতে পারলেন না। তবুও প্রচ্ছন্ন এক ভালো লাগার বোধ কাজ করতে শুরু করলো তার মননের মর্মমূলে। সবদিক বিবেচনায় এটি অনুমিত যে, ভালো কিছু অপেক্ষা করছে তার জন্যে। সফিককে ড্রইং রুমে রেখে ভেতরে প্রবেশ করলো আজিজ ভাই। গোলাপী রঙের ম্যাক্রি পড়া অবস্থায় পায়ের উপর পা তুলে চুপচাপ বেডরুমে বসে ছিলো রিক্তা। তার স্ত্রী। গড়নে শীর্ণ, মুখম-লজুড়ে ছোপ ছোপ মেছতা, চুলগুলিও দীর্ঘায়িত নয়। স্বর্ণের নাকফুল, কানের দুল ও হাতের চুরিও যে সৌন্দর্য বাড়াতে পারে নি বোঝা যাচ্ছে। আত্মীয় আপ্যায়নের কথা বলামাত্রই এতক্ষণের নীরবতা ভাঙলো তার। ‘হঠাৎ কোত্থেকে একজনকে নিয়ে আসলো আর আমাকে আপ্যায়ন করতে হবে, নাস্তা দিয়ে দ্রুত বিদেয় করো।’ স্ত্রীর ক্ষিপ্রতাভরা চাহনির দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয়বার আর কিছু বলবার সাহস পেল না আজিজ ভাই।
বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেল। বসেই আছেন সফিক। অনেকটা অসহায়ের মতো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকাতে থাকলেন রুমের চারিদিকে। ‘দুপুরে কিন্তু খেয়ে যেতে হবে ভাইজান।’ অবশেষে ভেতরের রুম থেকে বের হয়ে এসে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে অনুরোধ করলো আজিজ ভাই। আজিজের চোখে মুখে মলিন ভাবটি স্পষ্টতই অনুভব করতে পারলেন সফিক। কিছু সময় পূর্বের প্রাণোচ্ছল আজিজ ভাইকে যেন কোনোভাবেই আর আবিষ্কার করা যাচ্ছে না। মধ্যগগনে সূর্যের অবস্থান দেখেও যদি দুপুর না হয় তবে কখন দুপুর-এই ভেবে ক্রোধে ফুঁপে উঠে আপন মনে নিজেকেই প্রশ্নবানে জর্জরিত করলেন সফিক। বাসায় অপেক্ষা করবার কথা বললেও কথার ভেতরে এক ধরনের ফাঁক লক্ষ করে আর অপেক্ষার প্রয়োজন অনুভব করতে পারলেন না তিনি। তার গলার স্বর অবলীলায় মন্থর হয়ে এলো। অতৃপ্ততা নিয়েই বের হবার জন্য আজিজ ভাইকে অনুরোধ জানালেন। টেবিলের ওপরে ট্রেতে রাখা টুকরো টুকরো আপেল ও বিস্কুট সাজানোই ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেয়ে নিলেন। গেট অবধি সফিকের সঙ্গে আসলো আজিজ ভাই। তার মাঝে এক ধরনের অপরাধবোধের ছাপ লক্ষ করতে পারলেন সফিক। কিন্তু সেটি তাকে বুঝতে না দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বিদায় নিলেন।
বাইরে এসে শ্যাওলা জমা ছোট দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ঘড়িটি একবার দেখে নিলেন সফিক। এখনও দুটো বাজতে প্রায় মিনিট বিশেক বাকি। শম্বুক গতিতে গুলিস্তানের দিকে হাঁটতে থাকলেন। গুলিস্তানের কাছাকাছি এসে সে সুযোগটি আর রইলো না। রাস্তার পাশে হকার ও সাধারণ মানুষ সৃষ্ট কৃত্রিম জ্যামে সংকটাপন্ন অবস্থা তাকে আরো সতর্ক হয়ে হাঁটতে বাধ্য করলো। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দ্রুত তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে চলে এলেন। মসজিদের মূল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত ভেবে মুঠোফোনটি বের করে কল করলেন নীরবকে। নীরবও তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বেশ কিছুদিন যাবৎ ঢাকায় অবস্থান করছে। নামকরা একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির এক্রিকিউটিভ অফিসার। নীরবও কলটি রিসিভ করলো না। প্রথম কলটি মিসড হওয়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্বিধা নিয়ে দ্বিতীয় কলটি দেয়ামাত্রই অপর প্রান্ত থেকে নীরবেব কণ্ঠস্বরটি ভেসে এলো। ‘লাঞ্চ করছি তো, তাই ভাবলাম তোকে পরে ফোন করি, তা তুই কোথায়, ঢাকায় এসেছিস নাকি?’ ‘হ্যাঁ, ঢাকায়, এ মুহূর্তে গুলিস্তানে।’ প্রাণবন্ত ভাব নিয়ে বলবার চেষ্টা করলেন সফিক।
গুলিস্তানে অবস্থানের কথা শুনবার পর উচ্ছ্বসিত হয়ে নীরব দুপুরে বাসায় লাঞ্চ এর আমন্ত্রণ জানিয়ে সফিককে আসতে বললো। বিষয়টি সাধারণভাবে স্বাভাবিক হলেও এ মুহূর্তে সফিকের কাছে একটু অস্বাভাবিকই মনে হলো। কোনোভাবেই সুযোগটি হাতছাড়া করবার কথা ভাবতে পারলেন না। বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে ফুলবাড়িয়া রোড পর্যন্ত দ্রুত গতিতে হেঁটে এসে একটি রিকশা নিয়ে নীলক্ষেতের দিকে যাত্রা করলেন। গুলিস্তান থেকে ফুলবাড়িয়া রোডে আসতেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেল। উত্তেজনার মধ্য দিয়ে তৃপ্ততার উপলব্ধিকে নিশ্চিত করবার আশা নিজের ভেতর সঞ্চারিত করে পথচলা শুরু করলেন। রিকশাওয়ালাকে দ্রুত চালানোর জন্যে বারবার অনুরোধ জানালেন। ফোন করে নীরবের অবস্থানটি জেনে নিলেন। বাসাতেই আছে এখনও। পরিবার নিয়ে শুরু থেকেই নীলক্ষেতে অবস্থান করছে। নীরবের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও কখনও ওর বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি সফিকের।
গতকাল থেকে এ্যাসিডিটিতে ভুগছেন সফিক। গত কয়েকদিনে হোটেলের খাবার গ্রহণ সেই মাত্রাটিকে যেন তীব্রভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ভরা দুপুরে আজিজ ভাইয়ের বাসায় খালি পেটে নিজেরই কেনা ফল খেয়ে তার সুফলটি ভোগ করতে হচ্ছে এখন। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে রিকশা। সঠিক সময়ে পৌঁছতে পারবেন ভেবে স্বস্তি কাজ করছে। নীলক্ষেতের সামনে এসেই রিকশা থামিয়ে দ্রুত ভাড়া প্রদান করে মিষ্টির দোকান অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলেন। ফল না কিনে মিষ্টি আর সন্দেশ কিনলেন অনেক বেশি পরিমাণে। লক্ষ্য বাসায় কোনোভাবেই যেন কাক্সিক্ষত প্রত্যাশাটুকুর ভরাডুবি না ঘটে। বাসার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো নীরব। আট বছর আগে যেমন চেহারা ছিলো মনে হচ্ছে ঠিক তেমনই আছে। লম্বা নাক, ঘন কালো পরিপাটি চুল, উজ্জ্বল ফর্সা রঙে ইন করা নীল শার্টের সাথে কালো প্যান্টের কম্বিনেশন-সঙ্গে জুতো পরা অবস্থায় অনেক স্মার্ট দেখাচ্ছে ওকে। নীরবের প্রফুল্ল মুখ দেখে খুশিতে আত্মআস্থায় প্রচুর বিশ্বস্ত সফিক। সহজেই অনুমান করতে পারলেন- এবারের মতো মিস হবার কোনো সুযোগ নেই। মিষ্টি আর সন্দেশের প্যাকেটটি নীরবের হাতে তুলে দিলেন।
পাঁচ তলা ভবনের নীচতলায় নীরবের ফ্ল্যাট। বাইরে থেকে বেশ সুনিপূণ মনে হচ্ছে। দরজা খোলাই ছিল। সহজেই দুজনে ভেতরে প্রবেশ করলো। ভেতরটাও অনেক গোছালো। সোফার এক পাশে একটি বিশালায়তন বুক সেলফ ড্রইং রুমের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। সিলেবাসের পড়াশুনার বাইরে অনেক বই পড়তো নীরব। ক্লাসে যারা গ্রন্থ পাঠে আগ্রহী ছিলো কমবেশি সবার জন্যে বিভিন্ন ধরনের বই নিয়ে আসতো। সেলফে বইয়ের বিপুলতা থেকে বোঝাই যাচ্ছে আজ অবধি সেই অভ্যেসটি ধরে রেখেছে ও। কয়েকটি বনসাই সাজিয়ে রেখেছে দেয়ালের কোণ ঘেষে। দেয়ালে টাঙানো প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত বেশ কিছু মনোরম জলরংয়ে অঙ্কিত পেইন্টিং বৃদ্ধি করেছে রুমটির সৌন্দর্য। ছোটবেলা থেকেই ওর রুচি অনেক উন্নত। অন্যান্য বন্ধুরা যেখানে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ কিংবা রুমের পরিবেশ নিয়ে উদাসীন থাকতো সেখানে নীরব ছিলো একদম ব্যতিক্রম। ওর বাসার ব্যক্তিগত কক্ষটি সবসময়ই থাকতো পরিপাটি। যে সাইকেলটি ক্লাস সিক্রে নিয়ে এসেছিল সেটিই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ব্যবহার করেছিল। সাইকেলটি দেখে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না-সেটি সাত বছরের পুরোনো। নীরব মিষ্টির প্যাকেটটি হাতে নিয়ে খানিকটা বিরক্তির সাথে বললো, ‘এসব আনতে গেছিস ক্যান, তুই ড্রইংরুমে একটু অপেক্ষা কর, আমি প্যাকেটটা তোর ভাবীকে দিয়ে আসছি। খুব বেশি দেরি হবে না, অফিসের বস ভীষণ কড়া, তাড়াতাড়ি না গিয়ে উপায় নেই।’ এ কথাটি শুনবার পর অবচেতনাতেই সফিকের মনের অতলান্তের দরোজায় একটি অশুভ সন্দেহের হাত কড়া নাড়তে থাকলো। বসে থাকা অবস্থায় মাংস ও মাশ কালাইয়ের ডালের ঘ্রাণ যখন কিচেনের সীমানা পেরিয়ে ড্রইং রুমে এসে পৌঁছছিল তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলেন না তিনি।
অনেকটা ধরেই নিয়েছিলেন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগুনো এবারে সম্ভব হবে। কিন্তু, ‘অফিসের বস ভীষণ কড়া।’ বাক্যটি কান পর্যন্ত পৌঁছবার পর আর আশাবাদী হতে পারলেন না সফিক। অনেক দিনের পুরোনো বন্ধু নীরব। সে কি নিজেও তৃপ্ত থাকতে পারবে তাকে ভালোভাবে আপ্যায়ন না করে! সীমাহীন অতৃপ্ততা হৃদয়জুড়ে বিরাজমান থাকলেও একটি সূক্ষ্ম আশার বীজ বুনতে শুরু করলেন সফিক।
‘চল, চল দেরি হয়ে গেছে। ভাবলাম বাসায় প্রথম এলি, তোকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করি। কিন্তু তা আর হয় কীভাবে? বুঝলি, এমন চাকরি করি প্রতিদিন ঠিকমতো যে খেতে পারবো তারও সুযোগ নেই, তুই অনেক ভালো আছিস রে।’ কথাগুলি বলতে বলতে বাসা থেকে বের হবে এমন সময় স্ত্রী সুপ্রিয়ার ডাক শুনেই দাঁড়ালো নীরব। দরজার কাছেই। ‘এই যাচ্ছো যে! ভাইয়াকে খাইয়ে নিয়ে যাও। আমি তো খাবারই সাজাচ্ছিলাম।’ এক শ্বাসেই বলে গেলেন সুপ্রিয়া। তার কথা বলবার শৈল্পিক ভঙ্গিতে বিমোহিত হলেন সফিক, প্রতিটি শব্দই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে জুড়িয়ে দিলো তার তৃষিত হৃদয়। কিছু বলবার উপক্রম করতেই সফিককে লক্ষ্য করে আবারও বললেন সুপ্রিয়া, ‘ভাইয়া আসুন না ভেতরে!’ শুরু থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত সফিক প্রত্যাশা করছিলেন নীরবের হার্দিক আন্তরিকতা। কিন্তু সেটি প্রত্যক্ষ না করায় রাজী হতে পারলেন না। ‘আর কোনো একদিন খাবো বোন।’ বলেই যাত্রা করলেন নীরবের সাথে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্ধুকে সঙ্গ দেবার কাজটি করতে থাকলেন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই। যদিও স্বাভাবিক হওয়া এই মুহূর্তে তার জন্যে অত্যন্ত কষ্টের। স্বল্প সময়েই চলে আসলেন নীরবের অফিসে।
অফিসের ডেকোরেশন অত্যাধুনিক। আলাদা কক্ষে বসে নীরব। ব্যক্তিগত টেলিফোন, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার-সহ প্রয়োজনীয় সকল উপকরণই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে- অফিসে তার ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা। ইজি চেয়ারে বসে পুরো শরীর এলিয়ে দিয়ে পিয়নকে ডাকলো নীরব। মুহূর্তেই শব্দ না করে দরজা টেনে ভেতরে প্রবেশ করলো পিয়ন। পিরিচের মধ্যে সজ্জিত সিংগারা ও বিস্কুট টেবিলের ওপর রাখলো। দরজা খোলা রাখা অবস্থায়ই দিয়ে গেলো লাল চায়ের দুটি কাপ। ক্ষুধার্ত থাকায় ভদ্রতার খাতিরে একটি বিস্কুট রেখে সিংগারা-সহ সবকটি বিস্কুটই খেয়ে নিলেন সফিক। পানি খাবার পর অত্যন্ত ধীর গতিতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে শুরু করলেন। নীলক্ষেত থেকে পলাশীর দূরত্ব সামান্য। বিষয়টি নীরবের কাছে গোপন রেখে ভেবে নিলেন- বের হয়েই হোস্টেলে যাবেন। অতীত স্মৃতিচারণের পাশাপাশি নানা বিষয়ে ওদের মধ্যে চলতে থাকলো গল্প। ঘণ্টাখানেক নীরবের অফিসে অবস্থানের পর বের হয়ে এলেন সফিক। সফিকের সাথে বাইরে আসবার ইচ্ছে থাকলেও অফিসের ব্যস্ততার কারণে নীরবের পক্ষে সেটি আর সম্ভব হলো না।
নীরবের অফিস থেকে বের হতেই বিকেল পাঁচটা পেরিয়ে গেল। হাঁটতেও আর ইচ্ছে করছে না। রিকশা ডাকবেন এমন সময় মুঠোফোনের কলসুরটি বেজে উঠলো। অপরিচিত নম্বর। তবে বুঝতে পারলেন ঢাকা থেকেই কেউ ফোন করেছে। রিসিভ করবার পর ও প্রান্ত থেকে সৌরভের পরিচিত কণ্ঠস্বরটি শুনতে পেলেন সফিক। শোনামাত্রই বিষণœতায় শীতল হয়ে আসা অনুভূতিগুলোয় উষ্ণতার রেশ অনুভব করলেন। কথা বলতে থাকলেন প্রাণ খুলে। ক্লাসের মধ্যে সৌরভ ছিল সর্বোচ্চ মেধাবী। যে কোনো অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে ও ছিলো অতুলনীয়। বিতর্ক, আবৃত্তি, রচনাসহ সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ও-ই একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্কুল থেকে অংশগ্রহণ করতো। এবং প্রতিটি বিষয়ে অধিকার করতো প্রথম স্থান। এস. এস. সিতে যখন ও বোর্ড স্ট্যান্ড করেছিল তখন ডি.সি, এস.পি, ইউ. এন. ও থেকে শুরু করে জেলার সব কর্মকর্তা ওকে নিয়ে ভীষণভাবে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। রেজাল্ট প্রকাশের পরদিন হেড স্যার প্রতিটি ক্লাসরুমে ওকে নিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তৃতা দিতে বলেছিলেন। জাতীয় পত্রিকায় ছাপানো সৌরভের ছবিটিও প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেখিয়েছিলেন গর্বভরে। বন্ধুর এই সাফল্যে ওরাও অনুভব করেছিল গর্বের। সাত পাঁচ ভাববার পর সৌরভের প্রাণিত অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না সফিক। পুরোপুরি মনস্থ হলেন ওর বাসায় যাবার।
কল্যাণপুরের বাসে উঠলেন। দিনমনির অস্তরাগ শেষে কুমারীত্বে পদার্পণ করে সন্ধ্যাটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসছে। নিয়ন আলোতে শহরের সৌন্দর্যের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটাই। একটি সিটও ফাঁকা নেই। তাই বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্রমাগত ভীড় বেড়েই চলেছে। ঢাকা কলেজের গেটের সামনে এসে সেই ভিড়টি রূপ নিলো অসহনীয় পর্যায়ে। চরম বিরক্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাত্রা করতে থাকলেন। ধানমন্ডি পেরিয়ে শিশুমেলার সামনে এসে একটি সিট পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন। সিটে বসলেন ঠিকই কিন্তু দাঁড়িয়েই রইলো বাস। প্রায় চল্লিশ মিনিট বসে রইলেন শিশু মেলার সামনেই। বসা অবস্থায়ই সৌরভকে ফোন করে ওর বাসার লোকেশন জেনে নিলেন। লোকেশনটি একদমই সহজ। সৌরভের কাছ থেকে শুনবার পর বুঝতে পারলেন সফিক। কল্যাণপুরে নামবার পর সরাসরি সৌরভের বাসা অভিমুখে এগুতে থাকলেন। কল্যাণপুর ওভারব্রিজ পার হয়ে যতই সামনের দিকে যাচ্ছেন ততই বন্ধু সৌরভের প্রতিচ্ছবিটি ভেসে উঠছে তার মননের অতলান্তে। বন্ধু হিসেবে সৌরভ ছিলো অসাধারণ। তার সাথে সৌরভের সম্পর্ক ছিলো সবচাইতে অন্তরঙ্গ। স্বাভাবিকভাবে ওকে দেখবার ইচ্ছেটিও অন্তর্মনে জাগ্রত হয়েছিল সে মুহূর্তে। বাসার একদম সামনেই ঢিলেঢালা কালো রঙের জিন্সের প্যান্ট ও টি- শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সৌরভ। কিন্তু কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছে না ওকে। অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে ওর ওজন, গত বছরও এতটা বেশি ছিল না যতটা না এখন মনে হচ্ছে। সামনের দিকের চুলগুলিও প্রায় সবটুকুই উঠে গেছে, চশমা দেখে বোঝাই যাচ্ছে পাওয়ার পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। তবুও ওর চেহারায় প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিপক্বতার ছাপটি ফুটে উঠেছে। কিছু বলবার আগেই সফিককে জড়িয়ে ধরলো সৌরভ। সফিকও নিজেকে লীন করে দিলো বন্ধুর মাঝে। ইস! কতদিন পর দেখা। বিড়বিড় করে দুজনই যেন দুজনকে বলতে থাকলো। অতঃপর হাতে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতেই দুজন মিলে দ্রুত প্রবেশ করলো ফ্ল্যাটে। আনন্দে উছলে উঠলো দুজনের পুলকিত মন। শুরু হলো জমে থাকা কথার মুহূর্মুহূ বিস্ফোরণ। গল্পের ভাব এতটাই জমে গিয়েছিল যে,কখন দু’ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারে নি। বিশাল ড্রইং রুমে বসেই অনবরত গল্প করছিলো ওরা। সফিক প্রত্যাশা করছিলেন হয়ত সৌরভের স্ত্রী অথবা অন্য কেউ এসে খোঁজ খবর নেবে। কিন্তু সেটির অনুপস্থিতি দেখে চিন্তার রেখাটি স্ফীত হতে শুরু করলো। অপেক্ষা করবার ধৈর্য হলো না। নিরুপায় হয়ে বাথরুমে যাবার কথা বলে বাসার চারদিকটা লক্ষ করলেন। কাউকেই দেখতে পেলেন না।
বাথরুম থেকে কিচেনের দূরত্ব একটু বেশি হলেও পানি খাবার কথা বলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। কিচেন রুমে প্রবেশের পর পরই ফ্রিজ হয়ে গেলেন সফিক। অনেক চেষ্টা করেও কোনো ধরনের ঘ্রাণের অস্তিত্ব পেলেন না। ভদ্রতার খাতিরে একটি পানির পট সঙ্গে নিয়ে আবার এসে বসলেন ড্রইং রুমে। মুখে ঢেউসদৃশ কচু পাতায় ফোঁটা অস্থায়ী জলের মতো খুশির আবহ নিয়ে আসার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলেন,‘কিরে সৌরভ, বাসায় আর কাউকেই দেখছি না, তুই না ফোনে বললি ভাবী বাসাতেই আছেন! একটি শ্বাস নিয়ে আবারও বললেন, তোর বাচ্চাদেরকেও দেখছি না, ওরা কোথায়?’
অকস্মাৎ হোঁচট খাবার মতো অবস্থার সৃষ্টি হলো সৌরভের। ‘আর বলিস না, তোর ভাবী শপিং এ গেছে, প্রায়ই যায়, শপিংও করে চাইনিজও খায়, বুঝলি, ওর সামনেই তোর সঙ্গে ফোনে কথা বললাম।’ আরও কিছু বলবার উপক্রম করতেই সৌরভকে থামিয়ে দিলেন সফিক। সফিকের কথাটি শুনবার পর সৌরভের ঠোঁট দুটি প্রায় শুকিয়ে এলো। এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু বলবার আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন সফিক। সীমাহীন কষ্টের উদ্রেক ঘটলেও কিছু কিছু বাস্তবতাকে যে মেনে নিতে হয় সেই সত্যটি দারুণভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো এ মুহূর্তে, ওর জীবন দর্শনে। অনেক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সৌরভের সঙ্গে আর বেশিক্ষণ গল্প চালিয়ে যাবার সুযোগ পেলেন না। এগারটার মধ্যেই হোস্টেলে পৌঁছতে হবে তাকে। সঙ্গত কারণেই সৌরভের অনুরোধ সত্ত্বেও আর অবস্থান করলেন না তিনি। সফিকের এমন অবস্থা দেখে সৌরভও প্রস্তুতি নিলো বাসা থেকে বের হবার। বাইরে এসে অনেকটা জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারলো না বন্ধুকে। নিরুপায় হয়ে হাঁটতে থাকলো ওভারব্রিজের দিকে। রাস্তার দু’ধারেই অসংখ্য মানুষের ছুটোছুটি। সেদিকে দৃষ্টি ছিল না কারুরই। জনবহুল পরিবেশ কোনোভাবেই ওদের মধ্যে চলমান দুর্লভ মুহূর্তটিকে বাস্তবতার আবহ দ্বারা ম্রিয়মাণ করে তুলতে পারলো না। ওভারব্রিজ অবধি হেঁটে আসলো দু’জনই। সফিকের বাম হাতটিকে নিজের ডান হাতে পুরে নিয়ে এতক্ষণ পর্যন্ত ধরে রাখছিলো সৌরভ। বাসের কাছাকাছি আসতেই নিজেই ওর হাতটিকে সফিকের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো। স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে রইলো সৌরভ। কোমরে রাখা হাত দুটি সোজা করলো তখনই যখন চলন্ত অবস্থায় একটি বাসে উঠলেন সফিক। মুহূর্তের মধ্যে দুজনই আলাদা হয়ে গেলো। বাসে তুলে দেবার পর হাফ ছেড়ে বাঁচলো সৌরভ। ‘যাক! অনেকটাই বেঁচে গেছি।’ মনে মনে অনুভব করলো। স্ত্রী আসবার পূর্বেই সফিকের প্রস্থানে সে যে স্বস্তি বোধ করলো তা ওর অনুভূতিতেই প্রস্ফুটিত হলো। যদিও যতই হাঁটছে ততই বন্ধু সফিকের সাথে শৈশব স্মৃতিগুলি আপনাআপনি স্মৃতির মুকুরে ভেসে আসছে। অপরাধবোধের পাশাপাশি ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছে ও।
রাস্তায় জ্যাম না থাকলেও ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে বাস। স্বল্প সময়ের মাঝেই কলাবাগানও পেরিয়ে গেল। নির্দিষ্ট সময়েই হোস্টেলে পৌঁছতে পারবেন, আশা করছেন সফিক। শব্দ না করে জানালার গ্লাসটি সরিয়ে দিয়ে ডান হাতের কনুইটি জানালার ফ্রেমে রেখে হাতটি ডান গালে চেপে একমনা হয়ে তাকিয়ে থাকলেন নিঃসীম প্রশান্ত আকাশের দিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশের নিঃসীমতার মাঝেই খুঁজতে থাকলেন তার অতীতের কিছু স্মৃতিকে। সেই স্মৃতির ফ্রেমে এক এক করে ফুটে উঠতে থাকলো তার মা ও একমাত্র বোনের পাশাপাশি শুভাকাক্সক্ষীদের ছবি। এরই মধ্যে তার স্মৃতিতে আরো একটি বিষয় ফুটে উঠলো যেটি তার বিয়ে। আত্মীয়-স্বজনদের বাইরেও শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে থেকেও প্রবল চাপ আসতে থাকলো তার ওপর বিয়ের পাটটি চুকিয়ে দেবার। এবং এটি গত তিন-চার ঈদেও এসেছিল। কিন্তু সফলতার মুখটি আর দেখা হয় নি। এই মুহূর্তে সংসার জীবন শুরু করবার কথা ভাবতেই ভীষণভাবে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়লেন সদ্য অতীত হওয়া কিছু স্মৃতি রোমন্থন করে। তার কল্পিত জীবনে প্রবহমান স্নিগ্ধ স্রোতধারা বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়বে না তো বিয়ের কারণেই! তীব্র হতাশা ও যন্ত্রণার বিষবাষ্পে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তার মায়াভরা মুখখানি। মনের ভুবনে স্থির হতে থাকলো বিয়ে করলে যে নারীটি তার জীবনে আসবে সে কি সেই রোমন্থিত স্মৃতির নেতিবাচক নারী চরিত্রগুলির মতোই হবে? কোনো কিছুই ভাববার অবকাশ পেলেন না সফিক। এতটা জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে সেটি উপলব্ধি করতে পারেন নি এখানে আসবার পূর্বে। পঞ্চগড়ের ফেলে আসা নদনদীময় প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ চা বাগান, সারল্যে আবৃত মানুষগুলি ভীষণভাবে কাছে টানছে তাকে। মনে মনে তীব্রভাবে কামনা করতে থাকলেন- এই মুহূর্তে যদি ডানা মেলে উড়ে উড়ে পঞ্চগড়ে যাওয়া যেত!
এই ভাবনার ভেতর দিয়েই বাসটি পৌঁছে গেলো পলাশী রোডে। যাত্রী কম থাকায় হেলপারের মধ্যে কোনো তাড়া লক্ষ করা গেল না। মনে হচ্ছে স্বল্প সময় এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে বাস। স্থির চিত্তে বাস থেকে নামলেন সফিক। এগারটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। দ্রুত হাঁটতে থাকলেন হোস্টেলের দিকে। মূল রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টগুলোর সামন দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ করেই কেন যেন দাঁড়িয়ে পড়লেন। রেস্টুরেন্টগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টি প্রক্ষিপ্ত করে সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে পরক্ষণেই আবারো হাঁটতে শুরু করলেন।
হোস্টেলের চারদিকটা বেশ পরিচ্ছন্ন। মূল ফটকের সামনে রোপিত ঝাউগাছ সৌন্দর্যের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। সীমানার পাশ দিয়ে সারি সারি বৃক্ষের পাশাপাশি প্রত্যেক ভবনের সামনে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের সমারোহ হোস্টেলের পরিবেশকে করে তুলেছে অত্যন্ত মনোলোভা। মূল ফটক পেরিয়ে নিজ কক্ষের দিকে হাঁটতে থাকলেন সফিক। মুঠোফানের কলসুরটি বেজে উঠলো। একবার পকেটে হাত দিয়ে আবার হাতটি পকেট থেকে বের করে হাঁটতে থাকলেন। চারতলা ভবনের নীচতলায় তার কক্ষ। মানিব্যাগ থেকে চাবিটি বের করে রুমের তালা খুললেন। রুমের ভেতর প্রবেশ করেই অন করলেন লাইট ও ফ্যানের সুইচ। মশারিটি ঝুলানোই ছিলো। চাদরটিও ছিলো অগোছালো, মেসের বোর্ডারদের বিছানাপত্র সাধারণত যে অবস্থায় থাকবার কথা, ঠিক তেমন। সেদিকে দৃষ্টি প্রক্ষিপ্ত না করে সরাসরি বাথরুমের দিকে চলে গেলেন সফিক। চোখে মুখে ভালোভাবে পানি ছিটিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই রইলেন। আবারও কলসুরটি বেজে উঠলো। কলসুরের শব্দ শুনতে পেলেও রিসিভ করবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। হয়ত তিনি বুঝতে পারলেন কলসুরটি কার হতে পারে? বেসিনের আকার ছোট হওয়ায় ঈষৎ নিচু হয়ে দু’হাতের আজলা ভরে সামান্য পানি নিয়ে মাথা ভেজানোর পর আরো বেশ কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। গভীর মনোনিবেশের সাথে নিজেকে দেখতে থাকলেন অনবরত। শেষ কবে এত অসীম আগ্রহ নিয়ে নিজেকে আয়নার সামনে দেখেছেন সেটিও মনে করতে পারছেন না এই মুহূর্তে।
বাথরুম থেকে আসবার সময়ই লাইটটি অফ করে ডিম লাইটটি অন করে মশারি টেনে ভেতরে প্রবেশ করলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মশারির প্রান্ত অংশটি তোশকের ভেতর সেঁধিয়ে দিলেন। বিছানায় শুয়ে পা দুটিকে যতটা সম্ভব ছড়িয়ে রাখবার চেষ্টা করলেন। হাত দুটি মাথার নীচে রেখে অবিরাম ঘূর্ণায়মান ফ্যানটির দিকে তাকাতে থাকলেন। মাথার মধ্যে ক্রিয়ারত অসহ্য যন্ত্রণার ভাব সামান্য হ্রাস পেলো। সম্পূর্ণ শরীর জুড়ে অনুভব করতে থাকলেন ক্লান্তি শেষের প্রশান্তি। আবারো কলসুরটি বেজে উঠলো। মোবাইল স্ক্রিনের আলোয় ফ্যানের পাখাগুলিকে প্রত্যক্ষ করা না গেলেও প্রবলভাবে পাখাগুলির ঘুরন্ত শব্দ কানে আসছে। মুঠোফানটি টেবিলের ওপরই ছিলো। বাম হাত দিয়ে মশারিটির একটি অংশ তুলে টেবিল থেকে ফোনটি হাতে নিলেন। কলসুর বেজেই চলেছে। উিউটি অফিসারের নামটি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে। বালিশ থেকে মাথা তুলে পা’দুটোকে সামনে নিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। শ্বাস- প্রশ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে এলো সফিকের। ধুকধুক করতে থাকলো তার হৃৎপিন্ডটি। শুনশান নীরব আবহ চেপে ধরলো, একাকীত্বের সুযোগ হত্যা করতে উদ্যত হলো তার অস্তিত্বকে। বেশ কিছুটা সময় বসেই রইলেন। প্রাণপন চেষ্টা করলেন স্বাভাবিক হয়ে উঠবার। অবশেষে শান্ত হয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন রাখলেন নিজেকে। তৃতীয়বারের মতো কল রিসিভ না হওয়ায় ভেবে নিলেন হয়ত আর কলটি আসবে না। নির্ভার হয়ে মুঠোফানটি রাখলেন বালিশের পাশে। ডান হাত মাথার নিচে রেখে চেষ্টা করলেন ঘুমোবার। চোখের পাতা দুটি আপনা আপনি বুজে এলো। একটু পরেই আবারও কলসুরটি বেজে উঠলো। বালিশের পাশেই রাখা ফোনটি চরম বিরক্তি নিয়ে হাতে নিলেন। স্ক্রিনে পুনরায় ইশতিয়াক সাহেবের নামটি দেখবার পর রিসিভ করলেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবার আর অস্বাভাবিক হলো না। অপর প্রান্ত থেকে তাকে কোনো ধরনের কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে নিজেই অনবরত বলা শুরু করলেন, ‘শুনুন, আমি তো আপনাকে গত তিন দিন ধরেই অনবরত বলে আসছি – কোনো ধরনের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়া যদি কাজ হয় তবেই আমি সামনের দিকে এগুতে পারি, অন্য কোনো পথে আমার পক্ষে চলা সম্ভব নয়, বিষয়টি ভেবে দেখলে খুশি হবো। ভালো থাকবেন।’ অতি সন্তর্পণে কল কেটে দিয়ে কলসুরটি নিঃশব্দ রেখে পুনরায় ঘুমোবার চেষ্টা করলেন সফিক।
জুলাই, ২০১৭, কুড়িগ্রাম
লেখক পরিচিতি: জন্ম ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৮১ কুড়িগ্রাম। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি পড়াশুনা করছেন নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়াতে। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পরিচালনা করে আসছেন ‘প্রতীতি’ নামে একটি অবৈতনিক বিদ্যানিকেতন। ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ লেখকের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ‘কাঠের শহর’ দ্বিতীয় এবং প্রথম গল্প গ্রন্থ। এছাড়াও লেখক কর্তৃক অনূদিত বিশ্বসাহিত্যের ধ্রপদী কিছু প্রবন্ধ, গল্প এবং কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য সাময়িকীতে।