এ দেশে চলেছে অভূতপূর্ব মৃত্যুমিছিল। গঙ্গা দিয়ে ভাসমান মৃতের সারি মনে পড়িয়ে দেয় শতবর্ষ আগের ফ্লু মহামারি অথবা ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের কথা। অসহায় মানুষের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু চমকে দিয়েছে বিশ্বের বিবেককে। দুনিয়ার শীর্ষ বিজ্ঞান পত্রিকাগুলি মোদি সরকারের সমালোচনায় সরব। এবার তথ্য সহকারে ভারতের দুর্দশার কথা তুলে ধরলেন এ দেশেরই প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু।
ভারতের অবস্থা এতটা করুণ আগে হয়নি, বলছেন অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। বৃদ্ধির বদলে সংকোচন হচ্ছে অর্থনীতির, বাড়ছে করোনায় আক্রান্তদের মৃত্যু। বিস্মিত কৌশিকের প্রশ্ন, বছর ছয়েক আগেও বিশ্বে সবথেকে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা অর্থনীতির এই হাল হলো কী করে?
কয়েকদিন ধরে সমাজমাধ্যমে একটা বার্তা ঘুরছে। এ দেশের প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা কৌশিক বসুর ছবি-সহ সেই বার্তায় বলা হচ্ছে, সমস্ত ভারতবাসী, যাঁরা দেশকে ভালবাসে, তারা অধীর আগ্রহে ২০২৪ সালের অপেক্ষায়, যেমন এ দেশের মানুষ একসময় অপেক্ষা করেছেন ১৯৪৭ সালের জন্য। ঠিক কবে এই কথা কৌশিক বলেছেন, তা না জানা গেলেও এমনই মনোভাব যে তাঁর, তা জানা ছিল আমাদের সবারই। এবার নিজের ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে জানিয়েছেন এক অনবদ্য তথ্য। তিনি দেখিয়েছেন, এশিয়া মহাদেশের দেশগুলির মধ্যে আর্থিক উৎপাদনে ভারত দ্রুততম গতিতে পিছিয়ে পড়ছে, এগোচ্ছে কেবল করোনা মৃত্যুতে।

তীব্র পশ্চাদপসরণ
কৌশিক জানাচ্ছেন, ২০২০ বর্ষে বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধি ৩.৮%। মায়ানমার ও চিনদেশে তা ২ ও ১.৯%। এরাই এই মহাদেশে দ্রুততম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মাঝারি বৃদ্ধি পেয়েছে যেসব এশীয় দেশ, তাদের মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ভুটান, যাদের বৃদ্ধি যথাক্রমে ১.৬ ও ০.৬ শতাংশ। পাকিস্তানে একই সময়ে জিডিপি বেড়েছে ০.৪% হারে।
কতগুলি দেশে কিন্তু ২০২০-তে জাতীয় উৎপাদন কমে গেছে। জিডিপি সংকুচিত হয়েছে ইন্দোনেশিয়াতে, ১.৫ শতাংশ হারে। দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে সংকোচন ১.৯, ৪.৬ ও ৭.১ শতাংশ হারে। জাতীয় উৎপাদন সংকোচনে ভারত প্রায় সবাইকে টেক্কা দিয়েছে। ২০২০ সালে এ দেশের জিডিপি কমেছে ৮ শতাংশ হারে।
কৌশিক বসু ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ভারতের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা ছিলেন। গৌরবের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর সময়ে দেশে জিডিপি বৃদ্ধি হয়েছে বিপুলভাবে। ২০১০ সালে এ-দেশে সামগ্রিক উৎপাদন বা জিডিপি বেড়েছিল সাড়ে আট শতাংশ হারে, যা ছিল বিশ্বে সর্বোচ্চ। তাই বলবার হক কৌশিকের আছে। তিনি বলেছেন, ভারত কেবল দৌড়চ্ছে কোভিড-মৃত্যুতে।

কোভিড-মৃত্যু – এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার
চলতি মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, প্রতি দশ লক্ষ জনসংখ্যায় কোভিড মৃত্যু ভুটানে ১ জন, ভিয়েতনামে ০.৪ জন। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানে তা ১০, ৬৬ ও ৮৯। বাংলাদেশ, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়াতে প্রতি দশ লক্ষে মৃত্যু ৭৪, ২০৪ ও ১৭৮ জন। কোভিড-মরণে ভারতের শিরে শীর্ষের শিরোপা, প্রতি দশ লক্ষে ২১২ জন।
এসবই অবশ্য সরকারি সূত্রে পাওয়া খবর। সংক্রমণ ও মৃত্যু-বিষয়ে ভারত সরকার প্রদত্ত তথ্য ব্যবহার করেই এই হিসেব কষা হয়েছে। এটা এখন সবথেকে বেশি চর্চিত গোপন কথাটি, যে ভারতে আক্রান্ত বা মৃত্যুর তথ্য দারুণভাবেই চেপে দেওয়া হচ্ছে। গুজরাত রাজ্য নিয়ে এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ক’দিন আগেই করেছে কংগ্রেস। তাই, গোপন কথাটি রবে না গোপনে…। তবুও, যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতেই চোখ চড়কগাছ বিশ্বের।
২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাঙ্কের মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিকের তাই সেই নির্মম প্রশ্ন, যে ভারত বিশ্বে সর্বাধিক টিকা উৎপাদন করে, তাদের এ হাল হলো কী করে? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও জানা। এই সময়ে তাই নরেন্দ্র মোদিবাবুদের একমাত্র সাফল্য রামমন্দির নির্মাণ। মনে পড়ে গানের পংক্তি, মরণ-রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান। একটু পাল্টে নিয়ে কোভিড আক্রান্ত ভারতীয়রা গাইতেই পারেন, মরণ-রে, তুঁহু মম রাম সমান।