কোনো কিছুর শ্রেষ্ঠত্ববোধের মধ্যে তার প্রভাব নিবিড় হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বাংলার কবিমানসেই সাড়া জাগিয়েছিল। জনমানসে তার তীব্র উন্মাদনা ও বিস্ময়কর মুগ্ধতাবোধ নানাভাবেই কবিদের প্রতিক্রিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সাধারণ ভাবে বিপুল জনপ্রিয়তা যেমন সন্দেহের আধার হয়ে ওঠে, তেমনই শ্রেষ্ঠত্ববোধেও পরশ্রীকাতরতা নেমে আসে। দুটি ক্ষেত্রেই নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সমান সচল মনে হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর ক্রমশ জনপ্রিয়তার শ্রীবৃদ্ধিমান প্রকৃতিতে সেই বিরূপ প্রকৃতিটি যেমন তীব্রতা লাভ করে, তেমনই তাঁর বিদ্রোহী প্রকৃতিটিই মানসপটে স্থায়ী আসন লাভ করে। প্রথমে ‘বিজলী’তে কবিতাটি প্রকাশের পর তীব্র সাড়া ফেলায় তার শ্রেষ্ঠত্ববোধে যিনি স্বয়ং আসরে নামেন, তিনি রবীন্দ্রসমসাময়িক স্বনামধন্য প্রভাবশালী কবি ও পণ্ডিতপ্রবর মোহিতলাল মজুমদার। তাঁর অভিযোগ নজরুল তাঁর ‘আমি’ (‘মানসী’, ১৩২১-এর পৌষ) শীর্ষক গদ্য রচনা থেকে ভাব অনুসরণে ‘বিদ্রোহী’ রচনা করলেও সেজন্য কবি ঋণস্বীকার করেনি। সেই মৌখিক অভিযোগকে মুখর করার জন্য মোহিতলাল আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মুজফফর আহ্মদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’য় সে সম্পর্কে জানিয়েছেন ‘শুরুতে তিনি “আমি”র ভাব নিয়ে “বিদ্রোহী” রচনার কথাই ব’লে বেড়াচ্ছিলেন। সম্ভবত তাতে তেমন কাজ না হওয়ায় অনেক পরে তিনি বলা শুরু করেছিলেন যে নজরুল তাঁর লেখার ভাব ‘চুরি’ করেছে।’ অর্থাৎ ঋণের দায় থেকে চুরি দায়ে উন্নীত করে নজরুলকে মোহিতলাল অভিযুক্ত থেকে অপরাধী সাব্যস্ত করার প্রয়াসী হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, প্রাথমিক ভাবে তাঁদের মধ্যে গুরুশিষ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মোহিতলাল মজুমদার তখন ক্যালকাটা হাই স্কুলের হেডমাস্টার। দুজনের মধ্যে কবিতা নিয়ে চর্চা হত। শুরুতে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় অচেনা কবি কাজি নজরুল ইসলামের কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে মোহিতলাল সেই পত্রিকায় (ভাদ্র ১৩২৭) চিঠি লিখেছিলেন। সেই মোহিতলালই তাঁর শিষ্যপ্রতিম কবির কবিতা নিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে মুজফফর আহ্মদের সাক্ষ্যে নজরুলের কাছে মোহিতলাল তাঁর ‘আমি’ রচনাটি স্বকণ্ঠে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু একবার শুনেই ‘বিদ্রোহী’ রচিত হয়েছিল, তা মুজফফর আহমদই তীব্র ভাবে খণ্ডন করেছেন।
অন্যদিকে ‘বিদ্রোহী’র সঙ্গে ‘আমি’র আপাতভাবে আঙ্গিকগত কিছু মিল আছে। সেখানেও অহংবোধের বহুমাত্রিক প্রকাশ লক্ষণীয়। সুচনাংশ :‘আমি বিরাট। আমি ভূধরের ন্যায় উচ্চ, সাগরের ন্যায় গভীর, নভো-নীলিমার ন্যায় সর্বব্যাপী। চন্দ্র আমারি মৌলিশোভা, ছায়াপথ আমার ললাটিকা, অরুণিমা আমার দিগন্তসীমান্তের সিন্ধুচ্ছটা, সূর্য্য আমার তৃতীয় নয়ন এবং সন্ধ্যারাগ আমার ললাট-চন্দন।‘ সেক্ষেত্রে ‘আমি’র চলন লক্ষ্যহীন কথার বিচিত্র প্রকাশ। শেষেও অনিশ্চিয়তার হাতছানি : ‘আমি ক্ষুদ্র, কিন্তু বিরাটকে আমি ধারণ করতে পারি। আমি মরণশীল, কিন্তু অমৃত আমাকে প্রলুব্ধ করিতেছে। আমি দুর্ব্বল….। কে বলিবে, আমি কে ? এ সমস্যার কে সমাধান করিবে ?’ সেদিক থেকে এই ‘আমি’র অস্বচ্ছ ভাবমূর্তি, অস্পষ্টতা ও লক্ষ্যহীনতা ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’তে নেই। শুধু তাই নয়, ‘বিদ্রোহী’তে যেভাবে অন্তঃস্থিত সত্তায় অপরাজেয় বীরের প্রতি প্রত্যাশা ও প্রত্যয় এবং আস্থা কল্পিত হয়েছে, তা মোহিতলালের ‘আমি’তে নেই। অন্যদিকে ‘বিদ্রোহী’র মধ্য যেভাবে কবি নজরুলের দ্বৈত সত্তার পরিচয় আন্তরিক হয়ে উঠেছে, তারও পরিচয় সেখানে মেলে না। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য’র প্রেমিক ও বিদ্রোহী বীরের কবিসত্তা মোহিতলালের ‘আমি’তে অপ্রত্যাশিত। তাছাড়া ভাব চুরির ক্ষেত্রে মোহিতলালও সমান দায়ী। তাঁর ‘আমি’র বীজ রয়েছে ক্ষেত্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভয়ের কথা’য়। অথচ সেই ঋণ বনাম চুরি নিয়ে গুরুশিষ্যের লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকে। এদিকে নজরুলের কবিখ্যাতি তাঁর বিদ্রোহাত্মক কবিতা ও রচনাদির প্রভাবে উৎকর্ষ লাভ করে। অন্যদিকে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ আরও জনমানসে নিবিড় হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রতিক্রিয়ায় ‘বিদ্রোহী’র প্যারডিও স্বাভাবিকতা লাভ করে।

সজনীকান্ত দাস কামস্কাটকীয় ছন্দে ‘বিদ্রোহী’কে ব্যঙ্গ করে ‘ব্যাঙ’ রচনা করে মোহিতলালের আপনজন হয়ে ওঠেন। আবার গোলাম মোস্তাফাও ‘বিদ্রোহী’র প্যারডি লিখেছিলেন। সেই ‘নিয়ন্ত্রিত’ কবিতাটিতে কবি ব্যঙ্গের পরিবর্তে সংযত হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। অন্যদিকে ‘আত্মস্মৃতি’তে সজনীকান্ত লিখেছেন, ‘পরে বুঝিতে পারিয়াছিলাম, তিনি তখন নজরুল ইস্লামের প্রতি অপ্রসন্ন তাই ‘বিদ্রোহী’র প্যারডি কানে প্রবেশ করিতেই আত্মবিস্মৃত ভাবে আমার ঘরে চলিয়া আসিয়াছেন।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৪-এর ২৬ জুলাই) প্রথম থেকেই নজরুলের প্রতি বিরূপ ছিল (কবির ভাষায় তিনি ‘‘শনিবারের চিঠি’ গালির গালিচার বাদশাহ’ )। সেখানে সজনীকান্ত দাস সম্পাদক হওয়ার পর ১৩৩১-এর ১৮ আশ্বিন তাঁর ‘ব্যাঙ’ প্রকাশিত হয় এবং সরবে ডাকতে শুরু করে : ‘আমি ব্যাঙ/লম্বা আমার ঠ্যাং/ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি যে/গ্যাঙোর গ্যাঙ।/…. আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই/আমি বুক দিয়া হাঁটি, ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই। …’ সেদিক থেকে মোহিতলাল সজনীকান্তের ‘বিদ্রোহী’র প্রতি ব্যঙ্গবিদ্রুপে মেতে ওঠার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কেননা সেই সময় কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। তারপরেও তা নিয়ে মোহিতলাল নজরুলের প্রতি বিদ্বেষ পুষে রেখেছিলেন। অন্যদিকে ‘ব্যাঙ’-এর কবি হিসাবে সজনীকান্ত ‘গাজী আব্বাস বিট্কেল’ ছদ্মনামে লেখায় কল্লোলীয় বন্ধুদের মনে হয়েছিল সেটি মোহিতলাল মজুমদারের লেখা। প্রসঙ্গত মোহিতলালের মুখে ‘মর্কট’ ও ‘বিট্কেল’ শব্দগুলি স্বাভাবিক ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তার জবাব দেওয়ার জন্য তাঁরা নজরুলকে দিয়ে ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ লিখিয়ে প্রকাশ করেন ‘কল্লোল’-এ (১৩৩১-এর কার্তিক সংখ্যায়)। পরবর্তীতে সেটি ‘সাবধানী ঘণ্টা’ নামে কবির ‘ফণীমনসা’ কাব্যে সংকলিত হয়েছে। সেখানে কবি মোহিতলালকে দ্রোণাচার্যের আসনে বসিয়ে নিজেকে তাঁর শিষ্য বলে অভিহিত করে গুরুর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করে ব্যঙ্গবিদ্রুপ ও পরিহাস-উপহাসে মেতে ওঠার জন্য সবিনয়ে অভিমান ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে এবার মোহিতলাল সরাসরি আসরে নেমে দ্রোণাচার্যের আসনে বসে সঙ্গে সজনীকান্ত অর্জুন বানিয়ে ১৬২ লাইনের ‘দ্রোণ-গুরু’তে (‘শনিবারের চিঠি, বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা, ৮ কার্তিক ১৩৩১) শিষ্যের(অশ্বথামা) বিনয়কে অভিনয় ভেবে তাঁর উপরে কদর্য ভাষায় যাচ্ছেতাই বলে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করায় অসংযমী হয়ে ওঠেন। সজনীকান্তও কবিতাটিকে ‘বাংলা সাহিত্যে অভিশাপের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে দুজনের কবিতাযুদ্ধে আবার ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিয়েছে। গুরু-শিষ্যের বন্ধনে মোহিতলাল ও নজরুলের পরিচিতি ভ্রান্তপথে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যাইহোক, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যে বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিস্তারের পথেও আলো হয়েছিল, তা কবিতাটির দীর্ঘ প্রাসঙ্গিকতাতেই প্রতীয়মান। অন্যদিকে কবিতাটি নজরুলের কবিজীবনের গোড়াপত্তনেই অনস্বীকার্য নয়, বাংলা কবিতায় বিদ্রোহী চেতনার অভিনব পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সে পথের অগ্রপথিকও নজরুল। তাঁর পথে সমকালীন কবিদের প্রাণিত করেছে। কিন্তু সবচেয়ে সফল হয়েছেন নজরুলই। ‘বিদ্রোহী’র শিরোপা তাঁরই অসপত্ন অধিকার। বাংলা কবিতায় বিদ্রোহী আত্মার দোসর তো তিনিই। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিই যে তাঁর ললাটে বিজয় তিলক পরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সেই ‘বিদ্রোহী’ তার শতবর্ষেও বিপ্লবের হাতছানি দিয়ে চলেছে, ভাবা যায় !
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।