সম্বল ছিল মাত্র তিনশো টাকা। তাতে কি। তিনি কবি। বাংলার মানুষ তাকে চেনে এক ডাকে। চির-বিদ্রোহী তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার ভোটে নির্বাচিত হলে তিনি সেই সব গরীব মানুষদের কথা তুলে ধরবেন যাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। অ্যারিস্টোক্রাসি— ব্যারিস্টোক্রেসির মায়াজালের বিরুদ্ধে স্কুল ছুট তিনি হবেন এক মূর্তিমান কালাপাহাড়। কবি যেন বলতে চাইলেন— ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়। অসম্ভব আত্মবিশ্বাস আর মানুষের উপর আস্থা, কেবল এইটুকু আশ্রয় করে কবি নির্বাচন যুদ্ধে সামিল হলেন। ১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত কেন্দ্রে প্রার্থী হলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।
তিনি ছিলেন স্বরাজ্য দলের প্রার্থী। শোনা যায় স্বরাজ্য দলের নেতা বিধান চন্দ্র রায় কবিকে নির্বাচন যুদ্ধে সামিল হতে হাতে দিয়েছিলেন মাত্র তিনশো টাকা! প্রয়োজনের তুলনায় এই টাকা ছিল সামান্যই। ভোটারদের কাছে পৌঁছনো তো দূর অস্ত, নিজের নামটুকু তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও ছিল অসাধ্য। তখনকার সময় ভোটাধিকার ছিল সীমিত, বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিলেন ভোটাররা, এদের বেশীর ভাগই ছিলেন জমিদার ও অবস্থাপন্ন। এই সব ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর জন্য যে ধরনের ভোট মেশিনারি লাগে, তার প্রায় কিছুই ছিলনা কবির। কলকাতা আর দূর বাংলার চালচিত্র যে একরকম নয় কবি তা অনেক পরে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু তিনি বিদ্রোহী কবি নজরুল। মানুষের কলজে তে তাঁর নাম লেখা আছে। এমনই বিশ্বাস তাঁর। চললেন তিনি ঢাকা। গাঁটের পয়সা খরচা করে চলল নির্বাচনী প্রচার। বহু নেতার দোরে দোরে ঘুরলেন কবি। ভোট পেতে কিনা করেছেন। তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য আশীর্বাদ নিতে ছুটেছেন ফরিদপুরের পীর বাদশা মিয়ার কাছে। অনেক কম বয়সে বাবা মারা গেছেন। বাবা ফকির আহমেদ গ্রামের মসজিদের মৌলবী ছিলেন। বাবার মৃত্যু হলে মাত্র নয় বছর বয়সে মসজিদ দেখভালের কাজে লাগেন নজরুল। পরে হন মুয়াজ্জিন। মসজিদে আজান দিতেন এই সময়। সেই অতীত কাজে লেগে গেল এই সময়। কেউ কেউ বলেন বাদশা মিয়ার কাছ থেকে তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য ‘ফতোয়া’ নিয়ে আসেন নজরুল। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি।
একসময় মুজফফর আহমেদ নজরুলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি রাজনীতিতে যোগ দিতে চান কিনা! নজরুল উত্তর দিয়েছিলেন — রাজনীতিতে যোগ দেবেন বলেই তো তিনি ফৌজের চাকরি নিয়েছিলেন। ধূমকেতু পত্রিকার ত্রয়োদশ সংখ্যায় তিনি সরাসরি লেখেন, ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। ব্রিটিশ বিরোধী লেখায় ভরা থাকতো ধূমকেতুর পাতা। এখানেই ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লেখার অপরাধে কারারুদ্ধ হন নজরুল। হুগলি জেলে বন্দী কবি ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শুরু করলেন অনশন। রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে বার্তা দিলেন, অনশন তুলে নাও, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নজরুল জড়িয়ে পাড়লেন রাজনীতির ঘূর্নাবর্ত্বে। রাজনীতির চিন্তার জগতেও পরিবর্তন এসেছে। চরমপন্থার আশ্রয় ছেড়ে কবি তখন মধ্যপন্থী। সময়কাল ১৯২৪-২৫। চষে বেড়াচ্ছেন পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দক্ষিনবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছেন কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী নজরুল। তৈরি করেছেন দ্য লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। সংগঠনের মুখপত্র সাপ্তাহিক লাঙল পত্রিকা। পরে যা নাম বদলে হয় গণবাণী। এই সময়পর্বেই কেন্দ্রীয় আইনসভার ভোট এলে নজরুল সিদ্ধান্ত নেন ভোটে দাঁড়াবেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু হলেও এসময় স্বরাজ্য দলের প্রভাব ছিল অনেকটাই। কংগ্রেস এর আইনসভা বর্জনের সিদ্ধান্ত অনেকেরই মনঃপূত ছিলনা। নজরুলও এই মতের শরিক ছিলেন। আগুন জ্বালালেই যে দাবানল সৃষ্টি হবেনা, এর জন্য চাই সময় ও জমি তৈরির মেহনত, নজরুল বুঝেছিলেন। তাই তিনি ভোট যুদ্ধে সামিল হলেন। প্রার্থী হলেন ঢাকা কেন্দ্রের সংরক্ষিত আসনে।
ভোট যত এগিয়ে আসতে লাগল কবি ততই যেন আশান্বিত হতে লাগলেন। জয় তাঁর নিশ্চিত। ভোটের কয়েকদিন আগে তিনি কবি জসিমউদ্দিন কে বলেছিলেন, ঢাকার ৯৮% শতাংশ ভোট তাঁর পকেটে, ফরিদপুরের কিছু ভোট পেলেই কেল্লা ফতে। কবি এতটা আত্মবিশ্বাসী হলেও আশ্বস্ত হতে পারেননি কবি জসিমউদ্দিন। ভালোবাসা, বিদ্রোহী কবিকে সামনাসামনি দেখা আর তাঁকেই ভোট দেওয়া যে এক নয়; বুঝেছিলেন জসিমউদ্দিন। নজরুল কে হতাশ করেননি তিনি। ভোটের দিন জসিমউদ্দিন পোলিং বুথে নজরুলকে বসিয়ে দিয়ে আসেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল কবিকে দেখে ভোটাররা যদি তাঁকে সমর্থন করেন!
ভোট শেষ হল। নজরুল নিশ্চিত তিনি জিতছেন। ভোটাররা তাঁকেই ভোট দিয়েছেন এব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। ভোটারদের মুখ দেখেই তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু বিধি বাম। ফল বেরোলে দেখা গেল পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে বিদ্রোহী কবি রয়েছেন চতুর্থ স্থানে! ভোট পেয়েছেন ১০৬২টি এবং তাঁর জামানত জব্দ হয়েছে। আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়! এরপর কবি অন্যের ভোট প্রচারে থাওলেও নিজে কোনদিন আর ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হননি।