ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাতে বাংলায় যে নবজাগরণের সূচনা হয়, তার অন্তিম লগ্নের অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাল্যকাল অতিবাহিত করলেও তাঁর দুরন্ত যৌবনে তিনি বাংলার মানুষকে উপহার দিয়েছেন এক উন্নত মানের সৃষ্টিশীল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের ডালি। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পেয়েও তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যে দার্শনিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক চেতনার যে মিলন ঘটিয়েছেন, তা আজও ভাবলে অবাক হতে হয়। তাঁর পূর্বপুরুষ মোহম্মদ ইসলাম সুলতান কুতুবউদ্দিনের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের বাগদাদ শহর থেকে দিল্লিতে আসেন। সেখান থেকে বিহারের হাজিপুরে তারপর চুরুলিয়াতে কাজী বা বিচারকের বৃত্তি নিয়ে। সেই থেকে এই বংশের পদবী হলো কাজী। ইংরেজ শাসনকালে কাজীদের পদ অবলুপ্ত হয়। দরিদ্র ফকির আহমেদের চতুর্থ সন্তান এই নজরুল (১৮৯৯ খ্রি. ২৪ মে) আগের তিনটি সন্তান মারা যাবার জন্য নজরুলের নাম দেওয়া হয়েছিল দুখু মিঞা। শিশু নজরুলের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল গ্রামের মকতবে। কিন্তু আট বছর বয়সে পিতাকে হারালেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ। মা জাহেদা খাতুন দুখু ও আরও দুই কন্যাকে নিয়ে পড়লেন অগাধ অভাব ও দুঃখের সংসারে। বালক দুখু মিঞার শেখার ও জানার আগ্রহ এবং মনে রাখার ক্ষমতার জন্য মৌলবী কাজী ফটলে আহমেদ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাই বোধহয় মকতবের পাঠ শেষ করে দশ বছর বয়সেই নজরুল দায়িত্ব পেলেন নতুন ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে। নজরুল লেটো দলের জন্য গান রচনা ও সুর দিতে শুরু করেন যাতে সংসারের জন্য অন্তত কিছু আয় হয়।
মেধাবী আর পড়াশোনার আগ্রহ থাকার জন্য নজরুল তাঁর কোনও এক আত্মীয়ের সাহায্যে বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার মাথরুন গ্রামের নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। আশা ছিল, জমিদারের দেওয়া বৃত্তি নিয়ে পড়ার। সেই সময় ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। কিন্তু বৃত্তি না পাবার জন্য তাঁকে এক বছর পরই বিদ্যালয় ছেড়ে আসানসোলে গিয়ে আবার কবিগানের দলেই যোগ দিতে হয়। এইসময় এক গার্ড সাহেব তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যান এই বলে যে, তাঁর থাকা ও পড়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু সেখানে তাঁকে ভৃত্যের কাজ করতে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, গার্ড সাহেব প্রত্যহ রাত্রে মদ্যপ অবস্থায় স্ত্রীকে মারধর করতো। নজরুল পালিয়ে এসে রুটির কারখানায় কাজ নিলেন। রাত্রে সংগীতচর্চা চলত। আসানসোলের তৎকালীন পুলিশ ইনস্পেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ তাঁকে নিয়ে নিজের গ্রাম ময়মনসিংহ জেলার কাজীর সিমলায় বড়ো ভাইয়ের কাছে রেখে দড়িরামপুর ইংরেজি হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। সেখানে এক বছর পড়াশোনার পর নজরুল আসানসোল ফিরে আসেন। তাঁর পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সিয়ারশোল স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পান ও জমিদারের দেওয়া বৃত্তিতে হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়। এই সিয়ারশোল হাই স্কুলে পড়ার সময়ই নজরুলের আধুনিক সাহিত্যের সাথে সম্যক পরিচয় ঘটে। এখানে বয়ঃসন্ধিকালে পাওয়া শিক্ষা তাঁকে পরিণত ও পরিমার্জিত করে তোলে। তাঁর ইংরেজি ভাষার দক্ষতা দেখে ইংরেজি শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল পর্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি আবার সংগীত রসিক ও উস্তাদ ছিলেন। তাঁর কাছেই শুরু হয় নজরুলের উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম। একই হস্টেলে থাকা বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী জীবনেও বজায় ছিল। উঁচু ক্লাসে ওঠার সাথে সাথে নজরুলের মন স্বদেশি আন্দোলনের প্রভাবে প্রভাবিত হতে থাকে। অস্ত্র শিক্ষা করলে তবেই ইংরেজের সাথে যুদ্ধ করা সম্ভব, তাই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই জন্য ঊনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি ব্যাটেলিয়ানে যোগদানের সুযোগ পেতেই মাধ্যমিক বা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়েই চলে গেলেন সেনাবাহিনীতে। হিন্দু, মুসলমান, শিখ সকল ধর্মের সকল প্রদেশের সৈন্য বন্ধুদের সাথে করাচি ব্যারাকে থাকাকালীন একদিকে যেমন বিভিন্ন দেশের ও প্রদেশের ভাষা আয়ত্ত করেন, তেমনি আয়ত্ত করেন বিভিন্ন প্রদেশের সংগীত। বৈচিত্র্যময় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া বুঝি একেই বলে। করাচি সেনানিবাসে থাকাকালীন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় নিয়মিত লেখা পাঠাতেন ও তা প্রকাশিত হতো। আরও একটি পত্রিকার সাথে তিনি যুক্ত হন। তা হলো ‘সবুজ পত্র’। যার সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তা সারাজীবন স্থায়ী হয়। এইভাবে করাচিতে থাকাকালীন সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর না দেখা বন্ধু ও অনুরক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই সময়ই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব তৈরি হয় মুজাফ্ফর আহমেদের সাথে, যিনি পরবর্তীকালে বামপন্থী আন্দোলনকারীদের কাছে ‘কাকাবাবু’ নামে পরিচিত।
১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ব্রিটিশরা ৪৯ নং বাঙালি পল্টন ভেঙে দেবার কথা ভাবতে থাকে। কারণ বাঙালি সৈন্যরা যদি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে, তা হলে তা সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনে কাজে লাগাবে, যা মোটেই অভিপ্রেত নয়। তাই ১৯২০ সালের মার্চ মাসে পল্টন ভেঙে দেওয়া হলো ও যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার্থী বাঙালি যুবকেরা যা যার ঘরে ফিরে গেল। নজরুলও করাচি থেকে বেডিং-প্যাটরা নিয়ে কলকাতায় ফিরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যের অফিসে মুজফ্ফর আহমেদের অতিথি হয়ে বাস করতে লাগলেন। এইসময় ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুল নিয়মিত লেখক। ভারতে তখন ব্রিটিশ আন্দোলন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ১৯১৯ সালের এপ্রিলে সংঘটিত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড যুবসমাজকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তুলল। গান্ধীজির নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলনে অনেকের সাথে নজরুলও একমত হচ্ছিলেন না। এইরকম অগ্নিগর্ভ পরিবেশে নজরুল ও মুজফ্ফর আহমেদ চাইলেন একটি অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের ব্রিটিশ-বিরোধী পত্রিকা বের করতে। অবশেষে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নজরুল ইসলাম ও মুজফ্ফর আহমেদের যুগ্ম সম্পাদনায় ৬ টার্নার স্ট্রিট থেকে সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটল। পরিচালক থাকলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী এ কে ফজলুল হক। নবযুগ পত্রিকার প্রথম প্রকাশনার দিন থেকে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পত্রিকার শিরোনামে থাকত বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন।
ধর্মঘট প্রবন্ধে তিনি লিখলেন, ‘যে চাষী সমস্ত বছর ধরে হাড়ভাঙা মেহনত করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও দুবেলা পেট ভরে মাড়-ভাত খেতে পায় না, হাঁটুর উপর পর্যন্ত একটা ট্যানা বা নেঙটা্ ছাড়া কাপড় জোটে না, অথচ তারই ধান-চাল নিয়ে মহাজনেরা পায়ের উপর পা দিয়ে তেত্রিশ পার্বণ করে নওয়াবী চালে দিন কাটিয়ে দেন।’ এই লেখা পড়ে বাঙালি পাঠক সমাজ একেবারে স্তম্ভিত ও বাক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারও বসে থাকেনি। তারা নিয়মিত পত্রিকার উপর নজর রাখত। পত্রিকার কণ্ঠরোধ করার জন্য তারা জামানতের হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করে। হক সাহেব জামানতের টাকা পুনরায় জমা দিয়ে পত্রিকার প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য নতুন সম্পাদক নিয়োগ করলে নজরুল নবযুগ্ পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে।
১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল তাঁর বিবাহ হয় আশালতা বা দুলির সাথে, যিনি পরে প্রমিলা নামে পরিচিত হন। নজরুল কলকাতায় ফিরে এসে একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশনার প্রচেষ্টা করতে থাকেন। এই সময় অর্থাৎ ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ কাগজে প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। কবিতাটি এত জনপ্রিয় হয় যে, পত্রিকাটি দু-বার ছাপতে হয়। ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের আরও ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। নজরুল তাঁর নতুন পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র জন্যে কবিবরের আশীর্বাদ চাইলেন। কবি লিখলেন—‘কবি কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু’
আজয় চলে আয় রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে,
আছে যারা রাখি অর্ধচেতন।
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেই সময় বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন দুটি বিপরীত মতবাদে দ্বিধাবিভক্ত হয়। একদল হলেন নরমপন্থী, অপর দল চরমপন্থী। নজরুল দ্বিতীয় মতবাদের দলে। নজরুল চাইলেন ধূমকেতুর মাধ্যমে তাঁদের নতুন করে উজ্জীবিত করতে। ধূমকেতুর ভাষা ও বক্তব্য স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন ঢেউয়ের সঞ্চার করল। তিনি লিখলেন, ‘পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়মকানুন, বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে আর এই বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে।’ ইতিমধ্যে ধূমকেতু পৌঁছে গেছে সরকারি আধিকারিকদের কাছে। তাঁরা প্রতিটি প্রতিবেদনে ইংরেজি অনুবাদ করে ইংরেজ প্রভুদের কাছে পাঠাচ্ছেন। অবশ্য কোন কোন স্বদেশি অফিসার চেষ্টা করতেন, পত্রিকাটি যাতে ব্রিটিশ রাজরোষে না পড়ে।
১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর পুলিশ ধূমকেতুর অফিস এবং ৩২ কলেজ স্ট্রিটের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে হানা দেয়। ধূমকেতুর অফিস থেকে ২৬ সেপ্টেম্বরের বাকি সংখ্যাগুলি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। এমনকী সমিতির অফিস থেকে প্রকাশক ও মুদ্রাকর আফজালুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তবে তিনি কয়েক দিন পর জামিন পান। ২৩ নভেম্বর নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয় রাষ্ট্র তথা সরকার-বিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অপরাধে। প্রেসিডেন্সি জেলে থাকাকালীন ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বন্ধু তথা সবুজ পত্রের সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে ডেকে সদ্যসমাপ্ত ‘বসন্ত’ কাব্যগ্রন্থখানি ‘কবি নজরুলকে’ উৎসর্গ করে তাঁকে দিয়ে পাঠালেন। জেলে থাকাকালীন নজরুল তাঁর প্রিয় কবির কাছে উপহার পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই রাত্রেই লিখলেন—‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে’ কবিতাখানি।
১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি তৎকালীন চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো কবিকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করেন। ১৭ জানুয়ারি নজরুলকে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৪ এপ্রিল তাঁকে কুখ্যাত হুগলি জেলে পাঠানো হয় রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে নয়, সাধারণ বন্দি হিসেবে কোমরে দড়ি বেঁধে। ব্রিটিশ রাজশক্তির উদ্দেশ্য ছিল হুগলি জেলের পৈশাচিক পরিবেশে রেখে নজরুলকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে তোলা। যাতে ভবিষ্যতে তাঁর লেখনীতে আর কখনও ব্রিটিশ-বিরোধী বাক্য না বর্ষিত হয়। কিন্তু নজরুল হুগলি জেলের মৃতপ্রায় পরিবেশে প্রাণের সঞ্চার করলেন। নিত্য নতুন উদ্ভাবনায় বন্দিদের মধ্যে জাগ্রত করলেন। রাজশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি। জেল কর্তৃপক্ষও নানাভাবে নজরুল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিবিধ প্রকার দমনপীড়নের মাত্রা বাড়াতে থাকে। প্রতিবাদস্বরূপ নজরুল বন্দিদের নিয়ে শুরু করলেন অনশন ধর্মঘট। অনশন ভাঙার জন্য বন্দিদের উপর নানা প্রকার অত্যাচার শুরু হলো। দলের গোদা নজরুলকে রাখা হলো ছয় ফুট বাই চার ফুট মাপের গরাদ দেওয়া কুঠুরিতে। এই কুঠুরিতে বসেই নজরুল গাইলেন—
‘এই শিকল পরা ছল মোদের, শেকল পরা ছল।
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবে রে বিফল।’
সমস্ত বন্দিদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল এই গান। ক্রমে বেশ কয়েক জন বন্দি মৃত্যুবরণ করেন। মে মাসের মাঝামাঝি খবর পাওয়া গেল নজরুলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা বিফল হয়েছে। সমস্ত বাংলা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাখ শিলংয়ে খবর পেয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করে লিখলেন—“Give up hunger strike, our literature claims you.’ রবীন্দ্রনাথ জানতেন যে, নজরুল আছে প্রেসিডেন্সি জেলে। তাই টেলিগ্রামটি ওই ঠিকানাতেই পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্সি জেল কর্তৃপক্ষ Address not found লিখে টেলিগ্রামটি প্রেরককে ফেরত পাঠায়। অথচ নিয়ম অনুসারে তা হুগলি জেলে পাঠিয়ে দেবার কথা। ব্যথিত কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখলেন—‘ওরা আমার মেসেজ ওকে দিতে চায় না, কেন না নজরুল প্রেসিডেন্সি জেলে না থাকলেও ওরা নিশ্চয়ই জানে যে, সে কোথায় আছে। অতএব নজরুল ইসলামের আত্মহত্যায় ওরা বাধা দিতে চায় না।’ উদ্বিগ্ন বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে এই সংবাদ পৌঁছোলো কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে যাকে তিনি মা বলে ডাকতেন। তিনি এ সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন হুগলি জেলে। নজরুলকে মা-এর দাবি মেনে ৩৯ দিনের অনশন ভাঙতে বাধ্য করেন। ১৮ জুন নজরুলকে হুগলি জেল থেকে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময় বহরমপুর জেলের জেলার ছিলেন বসন্ত ভৌমিক। নজরুলের আগমনে বহরমপুর জেলের পরিবেশ গেল পালটে। রাজবন্দি বিপ্লবী যতীন সেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন দাবি তুলে এখানেও অনশন শুরুর সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু জেল সুপার বন্দিদের কিছু দাবি মেনে নেওয়ায় অনশন তুলে নেওয়া হয়। দাবিগুলি ছিল—বন্দিদের পাঠ্যপুস্তক লেখার সরঞ্জাম ও সকলকে উপযুক্ত খাদ্য দেওয়া। তাই বহরমপুর জেলে নজরুলের সকল রচনা খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। বন্দিদশা রচনা নিয়ে ১৯২৩ সালের আশ্বিন মাসে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেন। অবশেষে সরকারবিরোধী রচনা (কবিতা) লেখার অপরাধে অভিযুক্ত নজরুল ইসলামকে এক বছর কারাবাসে কাটানোর পর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। এরপরেও কিন্তু নজরুলের লেখনী ব্রিটিশ শক্তির অপশাসনের বিরুদ্ধে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ন্যায় লাভা নির্গত করতে থাকে।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২৫ মে ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত