হিমালয়ে তু কেদারাং
তুষারাবৃত হিমালয়ের কেদার শৃঙ্গের কাছে মন্দাকিনী নদীর তীরে অবস্থান করছেন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের একাদশ জ্যোতির লিঙ্গ রূপে স্বয়ং কেদারনাথ। বর্তমানে এটি উত্তরাখন্ডের গাড়োয়াল হিমালয় পর্বত শ্রেণীতে পড়ে। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল কেদারখন্ড, তাই এখানকার শিবলিঙ্গকে বলা হয় কেদারনাথ অর্থাৎ কেদার খণ্ডের অধিপতি। কথিত আছে শিবের বয়স যত, কেদারনাথের শিবলিঙ্গ ততটাই প্রাচীন।
কেদারনাথ যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো গ্রীষ্মকাল — মে থেকে অক্টোবর। তীব্র শীতের জন্য কেবল এপ্রিল মাসের শেষ থেকে কার্তিক পূর্ণিমা অবধি মন্দির খোলা থাকে। শীতকালে কেদারনাথ মন্দিরের মূর্তিগুলি ছ-মাসের জন্য গুপ্তকাশী বা উখিমঠে পুজো হয়। স্থানীয় ভাষায় এই গমনকে বলা হয় ‘ডোলিযাত্রা।’
কেদারনাথ যেতে গেলে, কলকাতা থেকে হরিদ্বার, সেখান থেকে গুপ্ত কাশি (২০৮ কিলোমিটার পথ, সময় লাগবে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা), গুপ্ত কাশি থেকে শোনপ্রয়াগ (৩০ কিলোমিটার সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘন্টা) সেখান থেকে গৌরীকুণ্ড। সরাসরি আপনি হরিদ্বার থেকে গৌরীকুণ্ডও যেতে পারেন।

বাসে বা প্রাইভেট গাড়ীতে গৌরীকুণ্ড যাওয়ার পথে গুপ্তকাশিতে থামতে পারেন। এখানে বিশ্বেশ্বরের একটি প্রাচীন মন্দির আছে। আছে গোমুখী ধারা, মণিকর্ণিকাকুন্ডু। এখান থেকেই ত্রিযুগীনারায়ণ ও উখিমঠে যাওয়া যায়। গৌরিকুন্ডুকে বলা হয় কেদারনাথের বেসক্যাম্প।
২০১৩ সালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে গৌরীকুন্ডু থেকে পায়ে হেঁটে, ডুলিতে অথবা ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলচটি, চিরবাসা, ভৈরব ভীমবলি, রামওয়াড়া, গরুরচটি হয়ে কেদারনাথ পৌঁছতেন যাত্রীরা। বিপর্যয়ের পর বহু পথ নষ্ট হয়ে গিয়ে এখন ভীমাবলি থেকে লিঞ্চোলি, বদিয়ারপুছ হয়ে কেদারনাথ মন্দিরে পৌঁছানো যায়। বর্তমানে উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে হেলিপ্যাডের ব্যবস্থাও রয়েছে। মেডিকাল চেকআপ ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার নিয়ে কেদারনাথের পথে যাত্রা করতে হয়। চারিধারে শুধু তুষার আচ্ছাদিত চূড়া, পাহাড়ী খরস্রোতা ঝর্না, পাহাড়ি ফুল জঙ্গলের সঙ্গে অকল্পনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই যাত্রাপথ। কেদারনাথের সূর্যোদয়, কেদারশৃঙ্গের ভুবন মোহিনী রূপ দেখলে মন প্রাণ এক দিব্য আনন্দে ভরে ওঠে।

কেদারনাথের ডলি যাত্র।
কেদারনাথ মন্দিরটির উচ্চতা ৮৫ ফুট চওড়া ১৮৭ ফুট। ৬ ফুট উঁচু ভীতের উপর মন্দিরটি তৈরি। কেদারনাথের কোন লিঙ্গ মূর্তি নেই। ষাঁড়ের কুঁজের মত এবড়ো খেবড়ো কালো পাথরের চাঁই একটি। সৌভাগ্যবশত আমি এখানে ব্রহ্মকমল, ফুল, বেলপাতা দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে পান্ডার মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে পূজা দিতে পেরেছিলাম। এত শান্তি আর সুন্দরভাবে পূজা হয়তো জীবনে কখনো দিতে পারিনি। ভাবলে শিহরণ জাগে, মহাভারতের পঞ্চপান্ডব, শংকরাচার্য এই কেদারনাথের বিগ্রহকে পুজো করেছিলেন। পূজা শেষে মন্দিরের ভিতর শিবলিঙ্গকে তিনবার প্রদক্ষিণ করলাম।
পুজোর শেষে পান্ডার মুখে শুনলাম এই জ্যোতির্লিঙ্গের গল্প। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর জ্ঞাতিবধ জনিত পাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য পাণ্ডবরা মহর্ষি বেদব্যাসের পরামর্শে মহাদেব দর্শনে ও স্বর্গে আরোহণের জন্য মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন। কিন্তু হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানগুলিতে তারা শিবের দর্শন পান না কারণ শিব তাদের দেখা দেবেন না বলে লুকিয়ে ছিলেন। তখন ভীম কঠোর তপস্যা শুরু করেন। ভীমের তপস্যার বিঘ্ন ঘটানোর জন্য শিব ভীষণাকৃতি এক ষাঁড়ের রূপ ধরে ভয় দেখাতে আসেন।

উখিমঠে রাখা ডলির পঞ্চমূর্তি
চিনতে না পেরে ভীম দুপাশে দুই পা রেখে পথ অবরোধ করেন। শিব এবার ভীম কে তাড়া করলে ভীমও ঝাঁপিয়ে পড়েন তার ওপর। শিব তখন পাতালে প্রবেশ করতে যাওয়ার আগেই ষাঁড়রূপী শিবের লেজ টেনে ধরেন ভীম। টানাটানিতে ষাঁড়ের দেহ খন্ড খন্ড হয়ে যায়।
দেহের পাঁচ অংশ পাঁচ জায়গায় পড়ে এবং স্থানগুলি পঞ্চকেদার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ষাঁড়ের পিঠের দিকটি মূল কেদারনাথ, নাভি দেশ মদমহেশ্বর, বাহু তুঙ্গনাথ, মুখ রুদ্রনাথ ও শৃঙ্গ কল্পেশ্বর। ছিন্ন ভিন্ন বাকি অংশ হল পশুপতিনাথ। তবে নেপাল দেশের পশুপতিনাথকে পঞ্চ কেদারের মধ্যে ধরা হয় না। বলা হয় কেদারনাথের পুজোর পর পঞ্চকেদার দর্শন না করলে পুজো সম্পূর্ণ হয় না। কথিত আছে, নারায়ণ একবার এখানে এসে মাটি দিয়ে শিবেরমূর্তি স্থাপন করে পুজো করেন। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য ভগবান স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে এখানে প্রতিষ্ঠিত হন।

উখিমঠ
মহানির্বাণ তন্ত্রে আছে, প্রসিদ্ধ অনেক দেবতাই শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছেন। সেই লিঙ্গের নাম প্রতিষ্ঠাতা দেবতার নামেই প্রসিদ্ধ। আদিতে কেদারনাথের শিবলিঙ্গ পূজার প্রবর্তন করেন স্বয়ং অগ্নিদেব। যার আরেক নাম পাবক। কেদারনাথ স্বয়ং স্বয়ম্ভু জ্যোতির্লিঙ্গ। সুতরাং প্রতিষ্ঠার কথা ওঠে না। সেতুবন্ধে নাম একই কারণে রামচন্দ্রের প্রবর্তনে শিবলিঙ্গ রামেশ্বর নামেই খ্যাতি লাভ করেছে বলা হয়।
কেদারখন্ডে বলা হয়েছে ভীম মহিষরূপী মহাদেবের পাতাল প্রবেশ সময় পিঠ ধরে ফেলেন। তার মানে এই নয় যে, ভীম কেদারনাথের প্রতিষ্ঠাতা। সদাশিব সেখানে অগ্নিদেব কর্তৃক প্রবর্তিত হয়ে ভীমের আসার আগে থেকেই বিরাজিত ছিলেন। তাঁর মাহাত্ম্য ও করুণাময় প্রভাবের কথা শুনে পান্ডবেরা সেখানে যান মহাদেবের কৃপালাভের আশায়। এ ঘটনা আজ থেকে আনুমানিক প্রায় ৫ হাজার বছর আগের। তবে তার অনেক পূর্ব থেকেই অনাদিলিঙ্গ পাবকেশ্বর বিরাজিত ছিলেন কেদারে। ইনি বর্তমানের কেদারনাথ। জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতিষ্ঠা কবে হয়েছে, তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল।
কেদারনাথ মন্দিরের কাছেই অগস্ত্য মুনির স্থল। এখানে শিবমন্দির অগস্ত্যেশ্বর মহাদেব নামে পরিচিত।

কেদারনাথ মন্দিরের অভিভাবক হলেন ভৈরনাথজী। ভগবান শিবের জ্বলন্ত অবতার। কথায় বলে কেদারনাথ মন্দিরটি না কি তিনি পাহারা দেন। গাড়োয়াল অঞ্চলের “ক্ষেত্রপাল” নামে প্রসিদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। বিনয়ের চতুর্থী দিওয়ালিতে এখানে খুব বড় উৎসব হয়। শ্রাবণী পূর্ণিমার আগে অন্নকূট মেলা বসে। হিমালয়ের গাম্ভীর্যে তীর্থস্থানের ঐশ্বরিক বাতাবরণে কেদারনাথ এক বিস্ময়কর দেবভূমি।
Asadharon
থ্যাঙ্ক ইউ