দুই.
বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যের মুখবন্ধে কেদারনাথ মজুমদার লিখেছেন : —
“প্রাচীন গ্রীকদিগের একটি চলিত কথা আছে — বৃহৎ গ্রন্থ বৃহৎ আপদ, দীর্ঘ ভূমিকা আরও বিপদ (A great book is a great devil and a lengthy preface is a greater one)। এই প্রবচন স্মরণ করিয়া বিপদের উপর আর বিপদ আহ্বান করিব না।
“১৩১৫ সালে বাঙ্গালা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস (সারস্বত কুঞ্জ) প্রকাশ করিতে যাইয়া বর্তমান গ্রন্থের বিজ্ঞাপন প্রচার করিয়াছিলাম। আজ দশ বৎসরকাল পরে সেই বিজ্ঞাপিত গ্রন্থ প্রকাশ করিতে সমর্থ হইলাম। নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক আপদ বিপদই যে এই দীর্ঘ বিলম্বের একমাত্র কারণ তাহা নহে; ব্যক্তিগত অযোগ্যতাও তাহার অন্যতম কারণ।
“সাময়িক সাহিত্য অর্থে আমি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক প্রভৃতি পত্রিকা, যাহাতে বেশির ভাগ সাহিত্যের আলোচনা করা হইয়াছিল, তাহা বুঝিয়াছি এবং যতদূর সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি তাহার বিবরণ এই গ্রন্থে প্রদান করিতে চেষ্টা করিয়াছি। এতদ্ব্যতীত এই সকল সাময়িক সাহিত্যের আলোচনা প্রসঙ্গে অন্যান্য সংবাদপত্রাদির সম্বন্ধেও যে দুই একটি কথা বলা যায়, তাহা বলিতে চেষ্টা করিয়াছি।
“বৃহৎ গ্রন্থের যে বিপদ তাহা পদে পদে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লক্ষিত হইবে। ছাপার ভুলগুলি পাঠকের চক্ষে অনায়াসে ধরা পড়িবে বলিয়া কোন ‘ভ্রমসংশোধন’ দিবার চেষ্টা করিলাম না। যাহা হউক গ্রন্থে যদি কেহ কোন মারাত্মক ভ্রমপ্রমাদ লক্ষ্য করেন, তবে অনুগ্রহপূর্বক জানাইলে কৃতজ্ঞ থাকিব।
“গ্রন্থ সঙ্কলনে অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আমাকে সাহায্য করিয়াছেন; তাঁহাদিগের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। কলিকাতার প্রাচীন পুস্তক বিক্রেতা শ্রীযুক্ত রাজবল্লভ মিত্র আমাকে বহু প্রাচীন পুস্তক ও সুহৃদ অধ্যাপক শ্রীযুক্ত উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য এম.এ, বি.এল মহাশয় মুদ্রণকালে এই গ্রন্থের আদ্যোপান্ত দেখিয়া দিয়া গ্রন্থপ্রকাশের এবং বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হরিরাম ধর বি.এ মহাশয় যাবতীয় ব্যাপারে দৃষ্টি রাখিয়া আমাকে প্রচুর সাহায্য করিয়াছেন; সেজন্য আমি তাঁহাদিগের নিকট চির কৃতজ্ঞ।
“সাময়িক সাহিত্যের দ্বিতীয় খণ্ডও লিখিত হইয়াছে। তাহা প্রকাশ করিতে পারিলে এই বিপুল পরিশ্রম সার্থক জ্ঞান করিব।“
কেদারনাথের এই ভূমিকা থেকে দুটি ব্যাপার স্পষ্ট হয়। প্রথমত, তিনি ১৩১৫ সন বা তার কিছু আগে থেকেই বাংলা সাময়িক পত্রের সন্ধানে নিযুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয়ত ব্রজেন্দ্রনাথের মতো তিনি সাময়িকপত্রের ইতিহাস রচনা করার সিদ্ধান্ত করেন নি, সাময়িক সাহিত্যের ইতিহাস তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি মোট ৪০টি সাময়িক সাহিত্য পত্রিকার বিবরণ দিয়েছেন। ব্রজেন্দ্রনাথের বইতেও সেই সব পত্রিকার বিবরণ আছে।
আমার মতে কেদারনাথের ‘বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যে’র প্রথম খণ্ডটি (পৃষ্ঠা= ১-১৯৪) ব্যতিক্রমী এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই খণ্ডে আছে মোট ৬টি অধ্যায়। সূচনা অংশে বাংলা সাময়িকপত্রের প্রচারকাল, সেকাল ও এ কালের তুলনা, বিভিন্ন দেশের পত্রিকার সংখ্যা, চিন-ইতালি-ইংল্যাণ্ড ইত্যাদি দেশের সংবাদপত্র ইত্যাদি আলোচনা করেছেন।
‘মিশনরি যুগের বাঙ্গালা মুদ্রিত গ্রন্থ’ অধ্যায়ে সে যুগের মুদ্রিত গ্রন্থের সঙ্গে হ্যালহেড ও উইলিয়াম কেরির সংক্ষিপ্ত জীবনী বর্ণনা করেছেন কেদারনাথ, বর্ণিত হয়েছে স্কুল বুক সোসাইটির পুস্তক প্রচারের বিষয়টি।
‘কোম্পানির আমলে দেশীয় শিক্ষার অবস্থা ও ব্যবস্থা’ অধ্যায়ে রাষ্ট্রপরিবর্তনে শিক্ষাব্যবস্থার ছবি আছে। কিভাব সুপ্রিম কোর্ট স্থাপনে ইংরেজি ভাষাভিজ্ঞ মানুষের প্রয়োজন হল, দেশীয় মানুষের ইংরেজি শিক্ষার অনুরাগ জন্মাল, মিশনরিরা শিক্ষাবিস্তারে অংশগ্রহণ করলেন, স্থাপিত হল হিন্দু কলেজ, শিক্ষা সম্বন্ধীয় অনুসন্ধানে অগ্রসর হলেন মিঃ অ্যাডাম, কি প্রতিক্রিয়া হল দেশীয় রক্ষণশীলদের তার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কেদারনাথ।
‘বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যের ক্রমবিকাশ ও বঙ্গসমাজ’ অধ্যায়ে’ ‘বেঙ্গল গেজেট’ থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পর্যন্ত বাংলা সাময়িক পত্রিকার ক্রমবিকাশ সংক্ষেপে আলোচিত।
চতুর্থ অধ্যায়ে কেদারনাথ বাংলায় ইংরেজি সংবাদপত্রের জীবন সংগ্রাম আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়টি অভিনব ও চমকপ্রদ। ‘বেঙ্গল গেজেটে’র সম্পাদক হিকি সাহেবের অসংযত আচরণ ও তার পরিণাম, পত্রিকাটির সুর পরিবর্তন ও হিকির বিরুদ্ধে প্রতিকার প্রার্থনা; গ্লেডুইন সাহেবের ‘কলিকাতা গেজেটে’-র উপর সরকারের কড়া হুকুম; ‘ইণ্ডিয়ান ওয়ারেল্ড’ সম্পাদক ডুরানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ; ‘এশিয়াটিক মিরার’ সম্পাদকের প্রতি নির্বাসন দণ্ড, টেলিগ্রাফ লেখকের নির্বাসন; পাণ্ডুলিপি পরীক্ষকের পদ, পাণ্ডুলিপি পরীক্ষার ধারা, অঙ্গীকারপত্র; মহাসভায় ভারতীয় মুদ্রাযন্ত্র বিধানের আলোচনা; মাদ্রাজের গভর্নর সম্বন্ধে ‘কলিকাতা জার্নালে’-র অপ্রীতিকর মন্তব্য, গভর্নমেন্টের সেক্রেটারিগণের বিরুদ্ধে ‘কলিকাতা জার্নালে’-র মন্তব্য; বাকিংহাম ও তাঁর বিরুদ্ধ দল; ‘জনবুল’ ও রেভারেন্ড ব্রাইস সম্বন্ধে বাকিংহামের অভিযোগ; ‘কলিকাতা জার্নালে’-র সহকারী সম্পাদক আর্নটের প্রতি ভারতবর্ষ ত্যাগের আদেশ; ‘বেঙ্গল ক্রনিকলে’র অপরাধ; ‘জনবুলে’র আক্রমণ; অর্ধ বাটার আন্দোলন; সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করার মন্ত্রণা; সংবাদপত্র সমূহের প্রতি সরকারের আদেশ — এইসব বিষয় এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
সাহিত্য প্রচারে প্রাচীন রাজবিধি আলোচিত হয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে। প্রাচীন ভারতের রাজবিধির সঙ্গে গ্রিস, রোম ও ইংল্যাণ্ডের রাজবিধি আলোচনা করছন লেখক।
ষষ্ঠ অর্থাৎ শেষ অধ্যায়ে সে কালের ডাকের ব্যবস্থা ও মফস্বলের সাময়িকপত্রের উপর আলোকপাত করেছেন লেখক। সেকালের অশ্বারোহী ডাক, ডাকের গোলমাল, সরকারি ডাকে সাধারণ মানুষের চিঠি, বেসরকারি ডাকের উচ্ছেদ, সরকারি ডাকের উচ্চ মাশুল, বাঙ্গিডাক, বাংলার বাইরে ডাকমাশুল, ডাকের নৌকো ও ডাকের পাল্কি, বিলাতি চিঠির মাশুল, দেশি ও বিদেশে ডাকে চিঠিপত্রের সংখ্যা, সংবাদপত্রের মাশুল, দূর মফস্বলের পত্রিকা, লর্ড ডালহৌসির পোস্টাল কমিশন, ডাক বিভাগের সংস্কার প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। [ক্রমশ]