তিন.
‘বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্যে’র দ্বিতীয় অংশে (পৃষ্ঠা=১৯৫-৪৩৬) বেঙ্গল গেজেট, দিগ্দর্শন, ব্রাহ্মণ সেবধি,জ্ঞানান্বেষণ, সংবাদ প্রভাকর, সংবাদ মৃত্যুঞ্জয়ী, সংবাদ ভাস্কর, তত্ত্ববোধিনী, নিত্যধর্মানুরঞ্জিকা, দুর্জয়-দমন-মহানবমী, কাব্যরত্নাকর, সর্বশুভকরী, বিদ্যাকল্পদ্রুম, বিবিধার্থ সংগ্রহ, ধর্মরাজ, মাসিক পত্রিকা, সর্বার্থ পূর্ণচন্দ্র, সুবোধিনী, মনোরঞ্জিকা, কবিতা কুসুমাবলি, শুভকরী, রহস্য সন্দর্ভ, গ্রামবার্তা প্রকাশিকা, বামাবোধিনী পত্রিকা, শিক্ষাদর্পণ, চিত্তরঞ্জিকা, ধর্মতত্ত্ব, বিদ্যোন্নতিসাধিনী, নব প্রবন্ধ, পল্লিবিজ্ঞান, অবোধবন্ধু, হিতসাধক, জ্ঞানরত্ন, শুভসাধিনী, বঙ্গবন্ধু, হালিশহর পত্রিকা, সাহিত্য মুকুর, মিত্রপ্রকাশ, সমাজদর্পণ পত্রিকার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
বিবরণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনারও উল্লেখ করেছেন কেদরনাথ। যেমন ‘সমাচার দর্পণে’-র একটি প্রবন্ধের উত্তরে রামমোহন রায় শিবপ্রসাদ শর্মার বেনামিতে তাঁর ‘ব্রাহ্মণ সেবধিতে’ প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রবন্ধ লেখেন; এতে বাদ-প্রতিবাদ বেশ জমে ওঠে। ‘জ্ঞানান্বেষণে’-র আলোচনায় সেকালের ইঙ্গ-বঙ্গ বক্তৃতার নমুনা বেশ মজার। ‘সংবাদ প্রভাকরে’র প্রসঙ্গে নববর্ষে সাহিত্য সম্মেলনএর (১২৫৭ সালের ১ল বৈশাখ) উল্লেখ করেছেন লেখক। মনে হয় বাংলায় বোধহয় এটাই প্রথম সাহিত্য সম্মেলন। এখানে প্রবনধ পাঠ, আলোচনা, ভোজের ব্যবস্থা এবং ব্রা্হ্মণ বিদায়ের ব্যবস্থা ছিল। আর একটি কৌতুকপ্রদ ঘটনা ‘কালেজীয় কবিতা যুদ্ধ’। কবিতা নিয়ে এই যুদ্ধ হয়েছিল দীনবন্ধু মিত্র, দ্বারকানাথ অধিকারী ও বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে।

গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের নাম কেন গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য হয়েছিল, তিনি তাঁর ‘সংবাদ রসরাজ’ পত্রিকায় কাশিমবাজারের মহারাজা কৃষ্ণনাথ রায় এবং তাঁর পত্নী স্বর্ণময়ীর নামে গ্লানিজনক প্রবন্ধ প্রকাশ করে কিভাবে কারাদণ্ড ভোগ করেন ও অর্থদণ্ড দেন, কেদার সরস ভঙ্গিতে তা বিবৃত করেছেন।
‘তত্ত্ববোধিনী’র আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে নিরামিষ ভোজনের আন্দোলন ও নিরামিষভোজী পত্রিকার কথা। ‘সংবাদ প্রভাকর’ মন্তব্য করেছিল যে মৎস্য, মাংস, মদ্য সম্পর্কে অক্ষয়কুমার দত্ত শেষ রক্ষা করতে পারেন নি। তাই তাঁর মাথার অসুখ হলে গুপ্তকবি লিখলেন : —
আমিষ অবিধি বলে যে করেছে গোল।
সে এখন নিত্য খায় শামুকের ঝোল।।
নোদে শান্তিপুর ফিরে, ফিরিয়া হুগলি।
শেষ করিয়াছে যত দেশের গুগলি।।
নিরামিষ আহারেতে ঠেকেছেন শিখে।
ঘুরিতেছে মাথা-মুণ্ডু, মাথামুণ্ডু লিখে।।…
‘তত্ত্ববোধিনী’র প্রবন্ধ নির্বাচন সমিতির প্রবন্ধ নির্বাচন পদ্ধতির বিবরণ দিয়েছেন লেখক রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, আনন্দকৃষ্ণ বসু, ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা (বিদ্যাসাগর) প্রভৃতির মন্তব্য উদ্ধৃত করে। ‘নিত্যধর্মানুরঞ্জিকা’ পত্রিকার বক্তব্যের সঙ্গে অক্ষয়কুমার দত্তের মতবিরোধ, ‘সত্যজ্ঞানসঞ্চারিনী’ সভার প্রশ্ন, প্রশ্নোত্তরের প্রতিবাদ উল্লেখযোগ্য।
‘সর্বশুভকরী’র আলোচনায় মদনমোহন তর্কালঙ্কার সম্পর্কে কিছু নতুন তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। সুধীরঞ্জনের ইংরেজিভাষাও তাই শ্লেষ করে মদনমোহনের মাতৃভাষাকে বলেছিল : —
ভাল আশা সুবদনি করিয়াছ মনে।
বাড়াবে তোমার মান এরা দুইজনে।।
‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’-এর অনুবাদক সমাজের সভ্যদের নাম উল্লিখিত হয়েছে। এঁরা হলেন বিদ্যাসাগর, রসময় দত্ত, হরচন্দ্র দত্ত, শ্যামাচরণ সরকার, পাদরি জে রবিনসন, রেভারেণ্ড লং, মি: সিটনকার, মি: ওয়ালিলি, মি: প্রাট, মি: বেইলি, রাজেন্দ্রলাল মিত্র। অনুবাদক সমাজের কার্যবিবরণও দেওয়া হয়েছে।

‘কবিতা কুসুমাবলি’ পত্রিকায় নতুন লেখকদের উৎসাহ দেবার জন্য কবিতার পাদপুরণের ব্যবস্থা ছিল। কবিতায় দেশের তৎকালীন অবস্থার ছবি ফুটিয়ে তোলা হত। যেমন : —
সুরামাহাত্ম্য
হায় হায় বিখ্যাত বিদ্বান লোক যাঁরা।
সুরার প্রধান ভক্ত হয়েছেন তাঁরা।।
কেহ কেহ সুরাপানে মত্ত হয়ে বলে।
‘রিফরম’ বিরাজিত সদা লাল জলে।।
চাকুরি সমস্যা
দশ টাকার রাইটারি যদি হয় খালি।
ওমেদার মিলে তার কত শত হালি।।
কি করিবে সুবিদ্যার কি করিবে গুণে।
নির্গুণ সুপদ পায় মুরুব্বির গুণে।।
পূজাবাড়ি
সাহেবের খানা দিতে যেমন উৎসুক।
ব্রাহ্মণ ভোজনে তার নয় ততটুক।।

‘অবোধবন্ধু’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশ করেন যোগেন্দ্রনাথ ঘোষ। তারপরে তিনি পত্রিকার স্বত্ব ত্যাগ করলে দশম সংখ্যা থেকে বিহারীলাল চক্রবর্তী সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে পত্রিকা পরিচালনা করেন। এই পত্রিকার সম্পাদক ‘গ্রন্থকর্ত্রী’কে কেন ‘’গ্রন্থকার’ বলে সম্বোধন করেছেন তার কৈফিয়ৎ দিয়েছেন এভাবে : —
“আমাদের বক্তব্য এই যে আজি কালি ইয়ুরোপে আমেরিকাতে স্ত্রীজাতি ও পুরুষ জাতির ক্ষমতা লইয়া যে বাদানুবাদ চলিতেছে আমরা সে সম্পর্কে সমকক্ষতার দলভুক্ত। …. আমরা মনে করি যে অন্যান্য বৈলক্ষণ্য কৃত্রিম, অস্থায়ী, অনিত্য, আগন্তুক এবং উভয়ের সুখের ব্যাঘাতক। সুতরাং গ্রন্থরচনা বিষয়ে লিঙ্গভেদ করা অনভিপ্রেত বলিয়াই আমরা স্ত্রীপ্রত্যয়ের শরণাপন্ন হই নাই।”
উপসংহারে লেখক স্যার রিচার্ড টেম্পলের আহ্বানে ১৮৭৫ সালের আগস্ট মাসে বেলভিডিয়ারে ও গঙ্গাবক্ষে রোটাস নামক বিলাস তরণিতে বাঙালি লেখকদের সান্ধ্য সম্মিলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। [সমাপ্ত]