গ্রীষ্মকালটা কলকাতাবাসীর পক্ষে অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমি এই অসহনীয় গ্রীষ্মের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ এই ঋতুতেই আমি দুই লেখককে পুনরাবিষ্কার করেছি। গত শতকের সত্তরের দশকের একেবারে শুরুতে পুনরাবিষ্কার করেছিলাম ঢাকার অকালে নিহত এক তরুণ লেখককে।
মনে আছে গ্রীষ্মের ছুটিতে বেলভিডিয়ারে জাতীয় গ্রন্থাগারে যেতাম রোজ। তেমনই এক দুপুরে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত দুর্ধর্ষ পত্রিকা ‘অরণি’র পাতায় পড়লাম একটি অসাধারণ গল্প ‘মুহুর্ত’। লেখক সোমেন চন্দ। তাঁর অকাল মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় গল্পটি। কে এই তরুণ লেখক? কি তার পরিচয়? তারপর খোঁজ খোঁজ। এক বৎসরের নিরন্তর চেষ্টায় সেই লেখকের কুড়ি বাইশটি গল্প সংগ্রহ করা গেল, লেখকের জীবনবৃত্তও সংগৃহীত হল। আমার বন্ধু মজহারুল ইসলাম তাঁর নবজাতক প্রকাশন থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশ করলেন ‘সোমেন চন্দ ও তাঁর রচনা সংগ্রহ’; বছর দুই পরে সে রচনা সংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয়। এই পুনরাবিষ্কারের ফলে কিছু আত্মশ্লাঘা জন্মেছিল আমার। কারণ পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় এটাই সোমেন চন্দের প্রথম রচনা সংগ্রহ। অনেক পরে বাংলা দেশে থেকে ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের সম্পাদনায় সোমেন চন্দের একটি রচনা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছিল। আর এক গ্রীষ্মে আমি পুনরাবিষ্কার করলাম ময়মনসিংহের কেদারনাথ মজুমদারকে। সেটা গত শতকের নয়ের দশকের কথা।
গোলপার্কে আছে রামকৃষ্ণ মিশন, সে মিশনে আছে একটি চমৎকার গ্রন্থাগার। প্রতি শনিবার স্কুলের ছুটির পরে চলে আসতাম সেই গ্রন্থাগারে। মাঝে মাঝে আমার সহকর্মী প্রবীর সামন্তও আসত আমার সঙ্গে। এক গ্রীষ্মের বিকেলে গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আমরা হেঁটে হেঁটে গড়িয়াহাট মোড়ের দিকে যাচ্ছিলাম। পথেই বাঁদিকে ফুটপাথের উপর পুরানো বই-এর কয়েকটি স্টল। তেমনি এক স্টলে পকেট সাইজের পোকায় কাটা দুটি বই-এর দিকে নজর পড়ল। দুটি বই মানে দুই খণ্ড। বই-এর নাম : ‘বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্য’। লেখক জনৈক কেদারনাথ মজুমদার। বইটির প্রকাশক রিসার্চ হাউজ ময়মনসিংহের নরেন্দ্রনাথ মজুমদার। বইটি ছাপা হয়েছে ঢাকা জগৎ আর্ট প্রেসে; মুদ্রাকর সতীশচন্দ্র রায় ও সেখ আবদুল গণি। বইটি বিক্রির জন্য দেওয়া হয়েছিল ঢাকার পপুলার লাইব্রেরি ও কলকাতার আশুতোষ লাইব্রেরিকে (৫০/১, কলেজ স্ট্রিট)। বই-এর দাম ৩টাকা মাত্র। এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে লেখকের পুত্র সৌরভ ও কন্যা আরতিকে; তাঁরা দুজনেই অকালে প্রয়াত।
আমি বইটি বেশ মনোযোগের সঙ্গে দেখছি দেখে প্রবীর বলল, লেখকের পদবী মজুমদার দেখে আপনি বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। দেখুন উনি আপনার আত্মীয় কি না! একথা বলার পরে প্রবীর হাসতে হাসতে বলল, আপনার শেকড় নিশ্চয়ই পদ্মাপারে।

আমিও হাসতে হাসতে বলি, সে কথা তোমার বউদিও বলে। কিন্তু আমরা তো পাঁচ পুরুষ মেদিনীপুরের কাঁথির বাসিন্দা।
২৫ টাকায় দুটি খণ্ড কেনার পরে আমি বইটির প্রকাশ সাল দেখে চমকে উঠলাম। ১৩২৪ বা ১৯১৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। আমার মনে পড়ে গেল ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের দোকান থেকে ব্রজেন্দ্রনাথের একটা বই কিনেছিলাম : ‘বাংলা সাময়িক পত্র’। কত সালে যেন ব্রজেন্দ্রনাথের বইটি প্রকাশিত হয়? বাড়ি গেলে বই খুলে জানতে পারব, কিন্তু আমার আর তর সইছিল না। প্রবীরকে বললাম, চলো, একবার লাইব্রেরি থেকে ঘুরে আসি। প্রবীর অবাক। তবু সে সঙ্গ দিল আমাকে।
লাইব্রেরির দিকে যেতে যেতে আমি ভাবছিলাম ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯১-১৯৫২) কথা। হুগলি জেলার বালিগ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবে পিতৃহারা হন, তারুণ্যের প্রথম প্রহরে হারান মা-কে। তাই প্রথাগত শিক্ষা লাভ করতে পারেন নি। অথচ স্বশিক্ষিত এই মানুষটি পণ্ডিত ও গবেষক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন। সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসে অনুরাগ ছিল তাঁর। তাঁর প্রথম বই; ‘বাঙ্গালার বেগম’; পরে তিনি মোগল যুগ নিয়ে আরও কয়েকটি বই লেখেন। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সান্নিধ্য তাঁকে পরিচিত করায় ইতিহাস অনুশীলনের বৈজ্ঞানিক ধারার সঙ্গে। তারই ফলশ্রুতি ‘রাজা রামমোহন রায়েজ মিশন টু ইংল্যাণ্ড’ (১৯২৬), ‘ডন অব নিউ ইণ্ডিয়া’ (১৯২৭), ‘বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ’ (১৩৩৮)। বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ ও মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। তারপরে চলে আসেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। এটিই ছিল তাঁর সঠিক কর্মক্ষেত্র। ১৩৩৯ সালে তিনি এই পরিষদের কার্যনির্বাহক সমিতির সভ্য হন, ১৩৪১ সালে পরিষদের আজীবন সদস্য পদ লাভ করেন, তারপর গ্রন্থাধ্যক্ষ (১৩৪০-৪১ ও ১৩৫২-৫৫) হন; ১৩৪১-৪২ তিনি ছিলেন সহকারী সম্পাদক, পরিষদ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ১৩৪৫-৪৬; পরিষদের সম্পাদক ছিলেন ১৩৪৭-৫১ ও ১৩৫৬-৫৯ পর্যন্ত।
বাংলার সাময়িক পত্র সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধিৎসা জন্মায় শোভাবাজার রাজবাড়ির গ্রন্থাগার থেকে। সেই গ্রন্থাগারে তিনি ‘সমাচার দর্পণ’-সহ অন্যান্য সাময়িক পত্রিকার ফাইল পেয়ে যান। ঊনিশ শতক তাঁর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। সজনীকান্ত দাস ও ব্রজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মধুসূদন-ভারতচন্দ্র-দীনবন্ধু-রামমোহন-বলেন্দ্র-দ্বিজেন্দ্রলাল-রামেন্দ্রসুন্দর রচনাবলি। ব্রজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকে ‘সাহিত্য সাধক চরিতমালা’। তিনি নিজ রচনা করেন বাংলা সাহিত্য বিষয়ক কয়েকটি অমূল্য বই :
১. সংবাদপত্রে সেকালের কথা (৩ খণ্ড, ১৩৩৯, ১৩৪০, ১৩৪২)
২. বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস (১৩৪২)
৩. বাংলা সাময়িক পত্র (১৩৪৬)
৪. বাংলা সাময়িক সাহিত্য : ১৮১৮-৬৭ (১৩৫১)
৫. সাময়িকপত্র সম্পাদনে বঙ্গনারী (১৩৫৭)
মনে আছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ‘বাংলা সাময়িকপত্রের ক্রমবিকাশ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখার সময়ে অধ্যাপক ক্ষেত্র গুপ্ত বলেছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাময়িকপত্র’ বইটির সাহায্য নিতে। বলেছিলেন সেই বইই বাংলা সাময়িকপত্রের উপর প্রথম ও প্রামাণ্য বই।
কেদারনাথের বইটি হাতে পাওয়ার পর আমার মনে হচ্ছিল ব্রজেন্দ্রনাথের আগেই কেদারনাথ বাংলা সাময়িকপত্র নিয়ে বই লিখেছেন। এখন লাইব্রেরি গিয়ে সেটা মিলিয়ে নেওয়া দরকার। লাইব্রেরিতে গিয়ে আমি চেয়ারে বসলাম, প্রবীর স্লিপ দিয়ে বইটি নিয়ে এল। টাইটেল পেজ খুলে আমি আনন্দে-বিস্ময়ে প্রবীরকে বললাম, দেখো, দেখো।
টাইটেল পেজে লেখা আছে : —
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘বাংলা সাময়িক সাহিত্য ১৮১৮-১৮৬৮’ প্রকাশিত হয়েছে ১৩৪৬ সালে (এটি দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৪২ সালে)। প্রকাশক রামকমল সিংহ; সজনীকান্ত দাসের শনিরঞ্জন প্রেস (২৫/২ মোহনবাগান রো) থেকে ছাপা হয়েছে বইটি; দাম ৫টাকা।
আমার আনন্দ-বিস্ময়ের ব্যাপারটি বুঝতে পারে নি প্রবীর। তাকে বললাম, বাংলা সাময়িক পত্রের উপর প্রথম বই লিখেছেন ময়মনসিংহের কেদারনাথ মজুমদার। আশ্চর্যের ব্যাপার এ বই কলকাতার আশুতোষ লাইব্রেরিতে পাওয়া গেলেও ব্রজেন্দ্রনাথের বই-এর ভূমিকায় সে বইএর উল্লেখ নেই। কেদারনাথের বইটি আগে প্রকাশিত হয়েছে, সে বইতে ব্রজেন্দ্রনাথ ও তাঁর বইএর উল্লেখ থাকার কথা নয়। কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথ কি কেদারনাথের বইটি দেখেন নি?
তখন আমি ‘সংবাদ প্রতিদিন’এর অতিথি কলমে মাঝে মাঝে লিখতাম। এই বইএর ঘটনাকে নিয়ে সে পত্রিকায় আমার যে লেখা ছাপা হল তার নাম : ‘পঁচিশ টাকায় কিনলাম একজোড়া সোনা’। লেখা পড়ে আমার স্কুলের এক প্রবীণ শিক্ষক বললেন, ‘বইকে সোনার সঙ্গে তুলনা করেছ, বড় ভালো তুলনা হে!’ [ক্রমশ]