ধানগাছের মধ্যে এককোমর জলে দাঁড়িয়ে ছিপ নাচাচ্ছিল অমূল্য। এখন অশ্বিন মাস। ধানে থোড় এসেছে। একটা মিষ্টি দুধ দুধ গন্ধ। এই ধান পাকবে কার্তিক মাসের দিকে। তখন আর সবুজ থাকবে না। পাকা সোনার বরণ ধরবে। মাঠের জল এবার নামতে শুরু করেছে। ধানবাদার মধ্যে মাছগুলো এতদিন খেলে বেড়াচ্ছিল। ওরা ঠিক বুঝতে পারে এবার ঘরে ফেরার পালা। মানে পুকুরের বেশি জলে ঢুকতে হবে। আর যাদের পুকুর তারাও বোঝে। এই সময় কাঁটা পালা ফেলে দেয়। যাতে মাছগুলো এসে থিতু হয়। কেউ জাল ফেলতে না পারে। আর ধানকাটা হয়ে গেলে মেসিন বসিয়ে জল তুলে পুকুর ছেঁচা হয়। তখন মাছ জামতলা হাটের কাঁটায় দিয়ে এলে পুকুর মালিকের হাতে কড়কড়ে কিছু উপরি টাকা আসে। কেননা, এ মাছের পোনা ফেলতে হয় না। খাদ্য দিতে হয় না। কোন খরচই নেই। জলে টান পড়লে ধানবাদা ঝেঁটিয়ে এসে পুকুরে জমে। শুধু জল তুলে মাছ বেচে দিলেই লাভ। সুন্দরবনের এই অঞ্চলের নোনা মেশানো জলে ভেটকি পার্সে ট্যাংরা ভাঙন ন্যাদস খয়রা পায়রাতলি যেমন হয়, তেমনই শোল কই ল্যাঠা চিংড়ি চ্যাং মাগুর-সিঙ্গিও হয়। ট্যাংরা ভেটকির দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই অমূল্যও এই বসতি সময়ে বেরিয়ে পড়ে ছিপ হাতে রাতের আঁধারে।
অমূল্য খেতমজুর। ওর নিজের জমি নেই। পরের জমিতে জনমজুর খাটে। বাবা বেঁচে থাকতে কিছু জমি ভাগে চাষ করত। এখন সে জমি মালিকরা বিক্রি করে দিয়েছে। চাষের সময় দু’ মাস কাজ থাকে। আবার সেই ধানকাটার মরশুমে দু’ মাস। মাঝের সময়ে টুকটাক কাজ পায়। তবে অমূল্য বেশি পছন্দ করে ছিপ নাচিয়ে মাছ ধরতে। এটা ওর নেশা। ধানি পুকুরে বা পিয়ালি নদীতে ও ছিপ ফেলে। এখন এই আশ্বিন মাসে ধানবাদার মাঝের পুকুরে ভেটকি খুব। বঁড়শিতে জীবন্ত চ্যাং মাছ বা বড় হরিণে চিংড়ি গেঁথে নাচালে মুখ বড় হাগুরে ভেটকিগুলো খপ করে চার গিলবে। আর তখনই অভিজ্ঞ মাছশিকারি অমূল্য ছিপে টান দিলেই ধারালো বড় বঁড়শি মাছের চোয়ালে আটকে যায়। তখন ছটফট করে। সে টাল সামলে দক্ষহাতে ছিপ টেনে কাছে এনে মাছটাকে কোমরে বাঁধা জালের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। এভাবে প্রতি রাতে সে প্রায় সাত আটটি করে ছোট বড় ভেটকি ধরে কাঁটাতে দিয়ে আসে ভোরের আগে। কোনদিন আবার একটা-দুটোও হয়। পুকুর মালিকরা চালাক হয়ে গেছে। আগে দিনের বেলা পাহারা দিত। এখন রাতের বেলাও পাহারা দেয় পুকুর পাড়ে ছোট কুঁজি করে। অমূল্যর নিজের পুকুর নেই। তাই রাতের আঁধারে ধানগাছের আড়ালে এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে তাকে অন্যের পুকুরে ছিপ ফেলতে হয়। এতে সে অন্যায় দেখে না। এ মাছ তো কারও নিজস্ব নয়। তার অভাব, সে ধরতেই পারে। মশা সাপের ভয় তো আছেই, তার উপর আছে বড় বড় জোঁক। কখন যে নিঃশব্দে এসে পায়ে বসে যায় টেরও পায় না। জল থেকে উপরে উঠলে তখন ঝরে যায়, লালচে কাটা থেকে অনেকক্ষণ রক্ত পড়ে। উপায় নেই। অমূল্য এই রক্তের বিনিময়ে ক্ষুধার অন্ন জোগাড় করে। কেউটে সাপ ধান জমিতে খুব। শামুক আর ব্যাঙ খেতে বেরিয়ে পড়ে। সতর্ক থাকতে হয়। আগে ভয় পেত অমূল্য। এখন আর ভয় পায় না। ভয় পেলে সংসার চলবে কী করে। বাড়িতে বুড়ি মা, বউ সনকা আর দুটো বাচ্চা। তারা খাবে কী? বউ মাঝেমধ্যে বলে, “তুমি বাপু আর রেতের আঁধারে ধানবাদার পুকুরে মাছ ধরতি যেওনি। এ সময় মাঠের আলে কেউটে শুয়ে থাকে খুব। কী সব্বোনাশ যে হয়ে যায়। বরং দিনে জোয়ার এলি নদীতে ছিপ ফেলো।”
“তুই বল্লি বটে। পিয়ালি ড্যাম হবার পর নদী তো শুইকে গেচে। বড় মাছ আর আসে না। ছিপ ফেল্লে হবে কি। সাধে কি আর জেবন হাতে নে’ ছুটি। টপাটপ মাছ পাই।”
কিন্তু ধরা পড়লে আবার মাছচোর বলে পঞ্চায়েতে দেবে। তখন মোটা ফাইন। তাই তো রাতের আঁধারে লুকিয়ে ছিপ ফেলে অমূল্য। মাটির ঘরটাও ভেঙে পড়ে পড়ে। এবছর খোরো এলে সারাতেই হবে। বউটা আবার পোয়াতি। ক’ মাস হল কে জানে! বুড়ি মা সেদিন বলছিল, “বাপ অমূল্য। এট্টা কতা বলি শোন্, বউমাকে এবার একবার জামতলা হাসপাতালে নে যা। ডাক্তার দেখিয়ে আন।”
“যাব মা। নে যাব।”
সামনে পুজো। নিজেদের না হোক, ছেলেমেয়ে দুটোর তো জামাপ্যান্ট কিনে দিতে হবে। এদিকে আশ্বিন মাস চলি গেলি তো জল নেমে যাবে। ধান গাছের আড়াল থাকবে না। পুকুর পাড়ে পাহারা বসবে। আর ছিপ ফেলা যাবে না। যা ধরার এই আশ্বিনেই ধরতে হবে।
আজ চাট্টি পষ্টিভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি চলে এয়েচে আঁধার নামতেই। এখন পর্যন্ত দুটোমাত্র ভেটকি ধরেছে। অনন্ত গোটা চারেক না হলি। কেজির ওপরের ভেটকির দর এখন চারশো টাকা। নিচে হলি সাড়ে তিন। চারটা কেমন নেতিয়ে পড়েছে। অমূল্য সবে একটা জ্যান্ত চ্যাংমাছ চিপে গাঁথতে যাবে এমন সময় পাঁচ বেটারি টর্চ জ্বলে উঠল। সে তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে ধানগাছের আড়াল খোঁজে। আজ যার পুকুরে ছিপ ফেলছে সে মহা ধড়িবাজ। মহাদেব মণ্ডল। কিছু একটা অনুমান করে নিজেই পাহারা দেয়। সেদিন কাঁটা থেকে ফিরছিল, খুব সকাল। দেখা হল মুখোমুখি কালভার্টের কাছে। দেখেই দাঁড় করাল। “বলি বাপধন, এত সকালে কোতা থেকে ফিরছিস?”
আমতা আমতা করে অমূল্য জবাব দেয়, “কোতায় আর যাব, কাকা। আপনার সেজভাই সহদেবের জমিতে নিড়ানি কাজ ছিল, গিছলুম। গিয়ে দেখি অন্য লোক লেইগেছে। তাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।”
উত্তর মহাদেবের মনঃপূত হয় না। সে সন্দেহের স্বরে বলে, “দেখিস অমূল্য, অসৎ কাজ কিচ্চু করিস না। জানিস তো পুবপাড়ার অর্জুন, মদন হালদারের পুকুরে জাল ফেলছিল রাতের আঁধারে। ধরা পড়তে পঞ্চায়েত ফাইন করেছে এক হাজার টাকা। না শোধ দিলি একশো দিনের কাজ আর পাবে না। কথাটা মাতায় রাকিস।”
অমূল্যর মাথা গরম হয়ে যায়। গলা চড়িয়ে বলে, “ওসব কতা আমায় শোনাবে না, কাকা। আমার কোন জাল নি। তাছাড়া তোমার পুকুরে আমি যাব কেন?”
“সেটাই মনে রাখিস। ধরতি পারলি কিন্তু…” মহাদেব হনহনিয়ে চলে গেল।
অমূল্য সতর্ক হয়। একে পূর্ণিমা। রুপোর মত আলোয় সারা মাঠ ভাসছে। যদি মহাদেব দেখতে পায়। নিজেকে গলা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে নেয়। ছিপ আর নাচায় না। এ পুকুরে আর আসা যাবে না মনে হচ্ছে। পুবপাড়ার অর্জুন স্লুইস গেটের কাছে ছিপ ফেলে। ওটা ওর এলাকা। নিজেদের মধ্যে ওরা আপোষে ভাগ করে নিয়েছে। ওর সঙ্গে কাল একবার কথা বলতে হবে। দুটো একটা পুকুর যদি ছাড়ে। মহাদেব মণ্ডল টর্চ জ্বেলে এবার পুকুরের দু’পাড় ঘুরে গেল। এদিকের আল এখনও জলে ডোবা। কেউটে সাপের ভয়ে আর এদিকে এল না। কুঁজিতে ঢুকে গেল। আরও কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে অমূল্য আবার ছিপ নাচাতে শুরু করল। মেজাজটা খিচড়ে গেছে। এতক্ষণ জলে গলা ডুবিয়ে থাকার ফলে কেমন কাঁপ এসেছে। আর একটা ভেটকি ধরতে পারলে সে চলে যাবে। ছিপ তাই আরও জোরে নাচাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ তার চোখ চলে গেল সামনের দিকে। জল কেটে হিসহিস করে প্রমাণ সাইজের একটা কালো কেউটে তিরবেগে তার দিকে আসছে। হয়তো ওদিকে কোন শিকার পায়নি। সোজা জলপথ বেছে নিয়েছে এদিকের পাড়ে আসার। অমূল্য একবার ভাবল, ছিপ তুলে চলে যাবে। তবে সাপটা যেভাবে জোরে আসছে, ধানবাদা ঠেলে আলে উঠতে সময় লাগবে। তার উপর ছপছপ শব্দ হবে। মহাদেব মণ্ডল যদি আবার কুঁজি থেকে বেরিয়ে আসে। দেখে ফেললে রক্ষে থাকবে না। চকিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল সে। হাতের ছিপটা শক্ত করে ধরে। সাপটা এবার গায়ের কাছে চলে এসেছে। অমূল্য অব্যর্থ লক্ষ্যে সরু বেতের ছিপ দিয়ে বাড়ি করল চলন্ত সাপটাকে। তারপর মনে মনে মন্ত্র পড়ার মত বলল, ”ক্ষমা করো মা মনসা। প্রাণ বাঁচাতি বাড়ি দিলুম। মাপ করো।”
বাড়িটা বেশ জোরেই পড়েছিল। সম্ভবত মাথায়। একবার পাক খেয়ে সাপটা চোখ উলটে জলে ডুব দিল। রক্তে পুকুরের জল লাল হয়ে উঠল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। সাবধানে কোমরের জালে বাঁধা ভেটকি মাছগুলো পিঠে ফেলে বাড়ির পথ ধরল।
বাড়ি ফিরে পিছনের ছোট পুকুরের ঘাটে খোঁটার সঙ্গে মাছের জালটা বেঁধে দিল। যাতে মরে না যায়। মরা মাছের দাম নেই। হাত-পা ধুয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাবে মায়ের গলা পেল, “ও অমূল্য, বাপ্… তুই কোতায় গেলি। দেকে যা কী সব্বোনাশ হল রে…”
উঠোনে ঢুকেই অমূল্যর চক্ষু স্থির। বউ সনকা মাটিতে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পরনের কাপড়। মাথা কোলে নিয়ে বসে মা। তাকে দেখে বুড়ি মা আরো জোরে কান্না শুরু করল। “এইচিস বাপ্। দ্যাখনা কী বেপদ। পোয়াতি বউটা পড়ে গেল। বাচ্চাটা বোধহয় আর বাঁচল না।”
“কিন্তু মা, কী করি এসব হল?”
“তোর আসতি দেরি দেখে বাচ্চাদের খাইয়ে ঘুম পেইড়ে বলল, ” মা, আমি একটু ফাঁকা থেকে আসি। ফিরে ঘটির জলে পা ধুয়ে দাবায় উঠতি যাবে, সিলিপ খেয়ে পড়ল। ভারি পেট নিয়ে সপাট আছাড়। কত রক্ত…”
অমূল্য দৌড়ে গেল। ঝুঁকে পড়ে বউয়ের মাথা হাতে নিল। চোখ বন্ধ। মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ। হতভম্ভ অমূল্য মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, কী হবে, মা?”
“তুই বউমার কাছে এট্টু বস। আমি হীরা ধাইকে ডেকে আনি। জড়িবুটি দিয়ে যদি রক্ত বন্ধ করতি পারে। না হলি, সক্কাল হলি হাসপাতালে নে যাবি।”
মা উঠে যেতে অমূল্য বউয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসল। যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে সনকা। একটু নড়ে উঠল। চোখ খুলল একবার। অমূল্য অবাক হয়ে দেখল, ছিপের বাড়ি খাওয়ার পর কেউটে সাপটার কালো চোখদুটো এমন ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল। সেও কি সনকার মত গর্ভবতী ছিল? ডিম পাড়ার জন্য ওমন ছুটে যাচ্ছিল জলকেটে ডাঙার খোঁজে।
একবার মনে হল বউ নয় আহত সাপটার থেঁতলে যাওয়া মাথাটা কোলে নিয়ে অমূল্য বসে আছে। আশ্বিনের আকাশ থেকে তরল জ্যোৎস্না তাকে ভর্ৎসনা করছে।
আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই
কি অনির্বচনীয় ছবি আঁকলেন আপনি অক্ষরে অক্ষরে!