কেয়ার ব্যক্তিত্ব প্রথমেই আমাকে মুগ্ধ করেছিল । তার বেশি পরিচয়টা আমি ক্রমশ পেয়েছিলাম। প্রথমে মঞ্চে ওর নাটক আমার মনে যথেষ্ট দাগ রেখেছিল। নাটকটা — তিন পয়সার পালা। ও যে একজন বিশিষ্ট ধরনের অভিনেত্রী তার পরিচয় পাই ঐ নাটকে। প্রথমে একেবারে নাকে নোলক দিয়ে যখন সে মহীন্দ্রকে বিয়ে করে মঞ্চে আসছে — সমস্ত ব্যাপারে, কথা বলায়, আচরণে, — একটা স্বকীয়তা, একটা বিশিষ্টতা। সেইটা দেখে আমার সেইদিনই বুঝতে অসুবিধে হল না যে তৎকালীন মঞ্চে — ‘অন্য থিয়েটারের ক্ষেত্রে — না, সব মিলিয়ে .. মঞ্চে কেয়ার থেকে প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী এক তৃপ্তি ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু তৃপ্তির যেমন কয়েকটা ক্ষেত্র আছে, যাতে অত্যন্ত সাংঘাতিকভাবে ওপরে উঠে যায়, কিন্তু সব রকম চরিত্রে আমি কিন্তু তৃপ্তিকে এমন সাবলীল অভিনয় করতে দেখি নি। ধরা যাক্, যেসব মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আছে, সেখানের চরিত্রগুলোতে … ধরা যাক ‘পুতুল খেলা’র চরিত্রটি। কিন্তু পুতুল খেলা বা নন্দিনী বা আরও যে সমস্ত চরিত্রে তৃপ্তির প্রতিমা সাংঘাতিক ভাবে পরিস্ফুট হয়েছে – এমন কি ইয়কাস্তেতেও, তা থেকে এটা বোঝা যায় যে সিরিয়াস চরিত্রে তৃপ্তি আশ্চর্য সাবলীল, আশ্চর্য প্রাণবন্ত। কিন্তু লঘু চরিত্রে, কমেডি বা সিরিও —কমিক চরিত্রে আমি ওঁকে আজ পর্যন্ত কখনও দেখি নি। কেয়াকে কিন্তু আমি দু’ ধরনের চরিত্রেই দেখেছি। বিশেষ করে আমি বলব ‘তিন পয়সার পালা’র কথা। এই নাটকটাতে অনেক গুলো জিনিষ ছিল । ও যে চরিত্রটা অভিনয় করেছিল সেটা apparently একটা কমিক চরিত্র হলেও তার মধ্যে অনেকগুলো বিশেষত্ব ছিল। একটা অল্পবয়সী মেয়ে, সে জীবনের কোন গুরুত্ব বোঝে কি না, হঠাৎ করে হাল্কা মেজাজের মেয়েটি একজনের হাত ধরে বেরিয়ে এল স্রেফ তাকে ভাল লেগেছিল বলেই – সে ডাকাত না চোর না ভালো লোক না দার্শনিক — কোন জ্ঞানই ছিল না। এইরকম একটা চরিত্রে আমি প্রথম কেয়াকে ভালভাবে অর্থাৎ গুরত্ত্বপুর্নভাবে দেখি। আবার যখন এই মেয়েটিই মহীন্দ্র গ্রেপ্তার হবার পথ টান করে এক লাথি মেরে দলের কতৃত্ব নেয় – তখন সেই যে চট করে একট। রূপান্তর হয় — কেয়ার অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে, তা আশ্চর্যভাবে দাগ কেটে যায়। এটাই তো ব্রেখট অনুসারে যে একটা মোড় নেয়…. মানে …পদাঘাতটা সে আগেকার খোলসটাকেই করে | এখানে সম্পুর্ন একটা নতুন স্কিমিং — যার কাছে টাকাটাই বড় যে পুরো জগতের রহস্য জেনে গেছে, মানে অকস্মাৎ mature হয়ে গেল। এই যে একট। certain রূপান্তর, সেটা আমি তুপ্তির কোন অভিনয়ে দেখি নি — হয়তো কোথাও করে থাকতে পারেন — আমি জানি না।
এর পর থেকেই কেয়া আমার কাছে নতুন রূপে ভেসে উঠল । শুরুতেই বলেছি ব্যক্তিত্ব, সেটা এবার তার কথার মধ্যে, ব্যবহারের মধ্যে দেখলাম। কেয়া যে মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগছিল সেটা হচ্ছে, পুরো সময়ট। সে থিয়েটারে দেবে না থিয়েটারে সে পার্টটাইম এ্যামেচার হয়ে কাজ করবে। ‘তিন পয়সার পালা’র বোধহয় শ তিনেক শো-এর কাছাকাছি ওর অন্তর্দ্বন্দটা প্রকট হল।
যে ভূমিকাতেই ও অভিনয় করুক না কেন, অভিনয়ের সময় মঞ্চে কেয়া, এবং কলেজে ইংরেজী ক্লাসে কেয়া, সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। একেবারে আলাদা, এবং তখন স্কটিশ চার্চ কলেজে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কেয়া অসম্ভব একটা respect পেত। কিন্তু থিয়েটারটাকেই ও ক্রমে নিজের জায়গা বলে মনে করছিল। এবং কলেজ ওকে disturb করছিল। ও যে কলেজটা ছেড়েছে তা লোকলজ্জা, অপবাদ, বা পড়ানোর ঘটিত কোন অসুবিধের জন্য নয়। মঞ্চে কেয়া অধিক সময় দিতে পারছিল না। মঞ্চ মানে শুধুমাত্র থিয়েটার করা তা নয়, নাট্য আন্দোলনে ওর সত্তাটাকে পুরোপুরি ও দিতে পারছিল না। যদিও ও পড়াতেও ভালবাসত। দুটো ভালবাসার মধ্যে একটাকে নিয়ে যখন পক্ষপাত বেশী হয়, তখন অন্যটাকে ছেড়ে আসার জন্য যেমন কষ্টবোধ হয় সেটা কেয়া অনুভব করেছিল। অর্থের জন্য নয়, একটা নিশ্চিত কেরিয়ার ছেড়ে অনিশ্চিতের দিকে, মঞ্চের দিকে, চলে আসছে তাও নয়। ও ভেবেছিল পড়ানোটা যতখানি সিরিয়াস্ ব্যাপার, মঞ্চটাও ততখানি সিরিয়াস ব্যাপার। অন্য একটা টান থাকলে পরে, ভাল করে যেমন পড়ানো যায় না, মঞ্চের ব্যাপারেও ঠিক তাই। অন্য কাজ আঁকড়ে ধরে থাকলে অভিনয় ও আনুষঙ্গিক কাজ করা যায় না। একটা সংঘাত আসেই। আর সেইজন্যই ও কলেজ ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি থিয়েটারে আত্মনিয়োগ করে। এটাই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এটাই তো ব্যক্তিত্বের চরমতম বিকাশ।
ওর অভিনয়ের কথা বলি। একটা, আমি নিরপেক্ষ সমালোচকই বল, বা সাধারণ পক্ষপাতদুষ্ট গুণগ্রাহীই বল — এই একটা দিক ধরে মন্তব্য করা যায়। আর একটা দিক হচ্ছে, আমার নিজের ও কিছু পছন্দ — অপছন্দ আছে সেই পছন্দের মধ্যে কেয়া যে চরিত্রটার সঙ্গে আইডেন্টিফায়েড, হয়ে গেছে, স্বভাৰতই সেই চরিত্রটা আমাকে আকৃষ্ট করবে বেশি। আমি মনে করি হয়ত সম্ভব, (‘হয়ত কথাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ), কোন এক সময় জনৈক অভিনেত্রী এসে যাবেন যিনি শান্তা ও শান্তাপ্রসাদ অনুরূপ কুশলতার সঙ্গে করতে পারবেন । হয়ত, সন্দেহ যদিও আমার, তিন পয়সার পালার পারুলবালার চরিত্রেও কেউ দক্ষতা দেখাতে পারবেন। আর বিনোদিনী কেয়া ছাড়াও সম্ভব, কেননা অনেকে করেছেন। ইন ফ্যাক্ট নান্দীকারেই অন্য একজন করেছেন — মঞ্জু ভট্টাচার্য। কিন্তু যে চরিত্রটা কেয়া ছাড়া ঐ ডাইমেনশনে পৌছনো সম্ভব নয়, সম্ভবই নয় কোনদিন, একেবারেই না, তা হল আন্তিগোনে। এটা হতে পারে আমি আন্তিগোনে সম্পর্কে বায়াস্ট। বায়াসের কারণটা হল একটা ঘটনাচক্র। যে সময় রুদ্র আন্তিগোনে’ নাটক মঞ্চস্থ করছে, তখন ভারতবর্ষে রাজনৈতিক পটভূমিটা পরিবর্তন হতে যাচ্ছিল এবং আমি পরিবর্তনটা একটু আগে ধরতে পেরেছিলাম, অনেকগুলো লক্ষণ দেখে। আমাদের দেশে যে ধরনের গণতান্ত্রিক আবহুাওয়া ছিল তখন সেটা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এবং আমার নাকে একটা গন্ধ এসেছিল যাতে আমি ভীত শঙ্কিত হয়েছিলাম যে আমাদের দেশে স্বেচ্ছাচার — শাসন ও স্বেচ্ছাচারী শাসক তৈরী হতে চলেছে। আমার মনের অবস্থা যখন এই রকম এবং আমি অত্যন্ত পরিমাণে যখন ভাবিত এবং চিন্তিত, ভীত ও সন্ত্রস্ত সবই, ঠিক সেই সময় ওরা ‘আন্তিগোনে’ মঞ্চস্থ করল। আমার ইচ্ছে ছিল ‘আন্তিগোনেকে আমি ভাল করে আনন্দবাজার পত্রিকাতে সমালোচনা করি। কেন করতে পারলাম না তারও একটা কথা আছে। ব্যাপারটা হচ্ছে তখন যদি আমি নাটকটাকে নিয়ে অনিন্দবাজার পত্রিকায় দুর্দান্তভাবে লিখতাম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও নাটক ওরা অভিনয় করতে পারত না। কর্তৃপক্ষ সজাগ হয়ে যেত। নাটকের অন্তলীন চেতনাটা দর্শকমনে যে কী প্রশ্ন জাগাচ্ছে, এবং কী বক্তব্য তৈরী করছে, আমার লেখার মধ্যে সেটা যদি প্রকাশ হয়ে যেত, আমি বাজী রেখে বলতে পারি, সে সময়কার সরকার ও নাটক বন্ধ করে দিত। আমি কি করলাম — খুব একটা চালাকি করলাম। কলকাতার কড়চাতে আমি কেয়ার উপর দিয়ে মানে আন্তিগোনের উপর দিয়ে যে মেসেজটা কেয়া দিয়েছিল, সেটা অন্য রচনার খোপে ভরে চালিয়ে দিলাম। তার কিছুদিন পরেই আমি অ্যারেষ্ট হই। সম্ভবত সেই সপ্তাহেই।
আন্তিগোনে দেখবার স্মৃতিটাও আমার সাংঘাতিক। সাধারণত কেয়া যখন আমাকে নেমন্তন্ন করত তখন একটু আগেই আমি যেতাম। ব্যাপারটা হত অদ্ভুত। কেয়া তখন একট। শিশু হয়ে যেত। যে কোন কারণেই আমার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা অদ্ভুত ধরনের ছিল। ও অপেক্ষা করত যে, ও স্টেজে ঢোকবার আগেই যেন ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়। অনেক সময় ও দলের ছেলেদের বাইরে রেখে দিত, রুদ্র একথা আমাকে বলেছে — আর আমি ত বুঝতেই পারতাম। এটা কেয়ার সেই আপন করে নেওয়ার ব্যাপার বোধহয়। অনেকের তো অনেক রকম প্রকাশের মারফৎ থাকে। যেমন যারা যুদ্ধে যায়, যাওয়ার আগে কুকুর, ভালুক, দাড়িওল সান্টা ক্লজ — ওরকম একটা ম্যাসকট থাকে — এমনও হতে পারে কেয়ার ‘আমি ম্যাসকট ছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা ছিল সত্যিকারের — ও উন্মুখ হয়ে প্রতীক্ষা করত। ঐ দিনেই দেরী হয়েছিল। কেননা আমাদের কলকাতা পত্রিকাটা নিয়ে আমরা একটু অসুবিধেতে পড়েছিলাম — যে সংখ্যাটা পরে বাজেয়াপ্ত হয়। তা যাই হোক দেরী হয়েছিল। ঢোকার মুখেই রুদ্রর সঙ্গে দেখা। রুদ্র আমাকে একবারে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল সাজঘরে। আমি কেয়াকে খুঁজে পাই নি। এরকম আমার একদম হয় না। তারপর আমি দেখলাম, কেয়া আর নেই, আন্তিগোনে বসে আছে। পুরোপুরি। কেয়া আমার হাত দুটো চেপে ধরল। তারপরেতে সে যাহোক ইমোশনাল ব্যাপার সব। তারপর অভিনয় একটা করল বটে কোন সন্দেহ নেই। এবং সত্যি কথা বলতে কি, সে সময় যে কটা জিনিস, যে কটা স্মৃতি, অত্যন্ত মুষ্টিমেয় স্মৃতি…কিছু বন্ধুদের মুখের ছবি ছিল, কেয়ার মুখের ছবি ছিল, এবং যেটা আমাকে সারা জেল — জীবন, একটি বছর, একাকী সেলে উদ্দীপ্ত করে রেখেছিল, সেটা হচ্ছে কেয়ার আন্তিগোনের অভিনয়ের স্মৃতি। সংলাপগুলো আমার কানে সব সময়, বেজেছে, বাজে ।
সমস্ত স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে — এরকম একটা সাংঘাতিকভাবে অস্বীকার কেয়ার অভিনয়ে ফুটেছিল, মানে ভাবাই যায় না। অদ্ভুত ভাবে ও কণ্ঠটাকে বাতাসে তুলে দেয় আর অনুরণনে একেবারে গুড়িয়ে দেয়। সাংঘাতিক। মানে সেইটা … মানে ….আমাকে … অসুস্থ হয়ে পড়েছি, একা , সব বন্ধু — বান্ধবও বাইরে তাদেরও মুখ মাঝে মাঝে মনে পড়ছে, … হাসপাতালে যখন আমাকে গ্যাস দিচ্ছে, তার মধ্যে — আমার অজস্র দুঃখ — বেদনা — অভাবের মধ্যে কেয়ার মুখটা আমার সব সময় মনে পড়ত। আগে, কেয়ার মুখটা আসত, তারপর ধীরে ধীরে আন্তিগোনেতে রূপান্তরিত হত। আর মনে ভীষণ বল পেতাম । আর ঐ যে বললাম না, এক একটা জিনিসের পেছনে কেমন একটা আত্মিক যোগাযোগ। থাকে — ওর যে আন্তিগোনের রেফারেন্সট আর আমার যে রেফারেন্সটা — দুটো মিলিয়ে মিশিয়ে গিয়েছিল। তাই আমি আন্তিগোনে সম্পর্কে এত বায়াস্ট। তবুও, বায়াস্ট হলেও আমার দৃঢ়ভাবে মনে হয়েছে, রুদ্রের পরিচালনায় নান্দীকার যেভাবে নাটকটা বাংলায় করেছে, আর অভিনয় — সবাইকার কিন্তু সর ছাপিয়ে ঐ বেলচা হাতে কেয়া মানে আস্তিগোনে, শুধু অভিনয় নয়, আমার মনে হয়, যুগের একটা প্রতীক। মানুষের মর্যাদকে শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবার জন্যে যে প্রচেষ্টা, বেলচা হাতে আন্তিগোনের মূর্তিটা আমার মনে হয়েছে তারই একটা প্রতীক। ঐ মুহূর্তগুলো শুধু বাংলার বা ভারতের নয় — চিরকালের মূহুর্তের প্রতীক করে তুলেছিল। আমি জেলে যাবার পর যে কজন লোক আমার কলকাতার বাড়ীতে খোজখবর করেছে তার মধ্যে কেয়াও খোঁজখবর নিয়েছে। যে দিন জেল থেকে আমি বেরিয়েছি, খবর পেয়ে সেইদিনই রুদ্র ও কেয়া এখানে এসেছে। ভীষণ ব্যস্ত ছিল। ফুটবল’ নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছিল। রিহার্সাল বন্ধ করে, ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে শুধুমাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা করে চলে গেল।
আর একটা নাটকের কথাও আমার মনে পড়ছে — ‘তুঘলক’। বাংলা নাটমঞ্চ প্রতিষ্ঠা সমিতি করেছিলেন। শম্ভু মিত্র করেছিলেন তুঘলক। কেয়া তুঘলকে সৎমার পার্ট করেছিল। শম্ভু মিত্রর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কেয়া অসাধারণ অভিনয় করেছিল। কেয়ার সঙ্গে এই নিয়ে আমার পরে অনেকবার কথা হয়েছে, — কেয়া বরাবরই বলেছে — সে একেবারে ফ্লপ। কিছুই করতে পারে নি। তা সত্ত্বেও আমি বলব, তুঘলকে যে কটি চরিত্র দাগ কেটেছিল তার মধ্যে সব থেকে আগে শম্ভুবাবু ও কেয়া। এটা ছিল পুরোপুরি ফিজিক্যাল অ্যাকটিংয়ের ব্যাপার। বিদ্বেষটা ধীরে ধীরে কামে পরিণত হচ্ছে, এই যে গ্র্যাজুয়াল চেঞ্জ — শরীরের যে কসরৎ লাগে — ওরে ব্বাপ! সমস্ত মুখের, শরীরের পেশীগুলোর যে যথাযথ সঞ্চালনের চেষ্টা, যাকে আমরা ষ্টাইলাইজড —অ্যাকটিং বলি — মানে, এই রকম একটা রিফাইন্ড, অ্যাকটিং যে হতে পারে — আমি ত কারো কথা ভাবতেও পারি না। নান্দীকার নাট্য গোষ্ঠীর অভিনয়ের যে নিজস্ব রীতি আছে, যা প্রত্যেক নাট্যগোষ্ঠীর থাকে — অভিব্যক্তির যে কতকগুলো বিশিষ্ট কৌশল অর্থাৎ যিনি ডিরেক্টর তার কৌশল তার অভিব্যক্তির ছাপ অভিনেতা — অভিনেত্রীদের মধ্যে পড়েই যায়। এখানে আমার কেয়ার অভিনয় ভাল লাগার কারণ, এই ধারার সম্পূর্ণ বাইরে সে অসাধারণ অভিনয় করেছিল । শম্ভুবাবু আমায় নিজে বলেছিলেন, কেয়াকে তার কিছুই বলতে হয় নি । কেয়া যা করেছে নিজেই করেছে। এবং শম্ভুবাবু নিজে কেয়ার ঐ অভিনয়ের খুবই — খুবই প্রশংসা করেছিলেন। নন্দিকারের মধ্যে ও যে ধরনের অভিনয় করে জাসছে তার থেকে quite a departure ।
সেদিন ওর অভিনয় দেখতে দেখতে আশ্চর্য — প্রভার অভিনয়ের কথা মনে পড়েছিল, প্রভার অভিনয় তোমরা দেখ নি। পরে জন্মানোর যে সমস্ত অসুবিধে থাকে তোমরা সেই অসুবিধের মধ্যে পড়েছ। প্রভা হচ্ছেন বাংলাদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পাঁচজন অভিনেত্রীর একজন। অসাধারণ প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী। এবং serious অভিনয় দেখতে দেখতে — কেয়ার অভিনয় দেখাতে দেখতে — মুভমেন্ট, তার কৌশল, তার ব্যক্তিত্ব দেখতে দেখতে প্রভার সঙ্গে কোন সাদৃশ্যই পাই নি। কিন্তু ঐ যে vitality, মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তিযেগুলির প্রকাশ হচ্ছিল, তা আশ্চর্যজনকভাবে প্রভার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। প্রভার ঐ যে উদিপুরী এবং এই যে সৎমাটির চরিত্র — এগুলি হচ্ছে আশ্চর্য ধরনের এক চরিত্র। এরা তৈরীই হয়েছিল দর্শকদের প্রশংসা না পাবার জন্য। তাই প্রশংসা আদায় করে নেওয়া, moved করে দেওয়া খুব শক্ত। এক ধরনের ক্ষমতা থাকলে পরে একজন অভিনেত্রী একটি অসুবিধেজনক চরিত্রকে একেবারে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে দর্শকদের ভুলিয়ে দিয়ে স্থান করে নিতে পারে। এটাই হচ্ছে আর্টের লক্ষণ। এখানে —কেয়া — একবারে দারুণ ভাবে সার্থক।
যখন আন্তিগোনে’ দেখলাম — সেই সময় একটা চেষ্টা হচ্ছিল — কিছু শিল্পী সাহিত্যিককে জড়ো করে স্বাক্ষর দেওয়া বন্দীমুক্তির দাবীতে ও জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে। তা অনেকে আমাকে কেয়ার স্বাক্ষরের কথা বলতেন। তা আমি এই কাজের মধ্যে কেয়াকে জড়াতে চাই নি। এও একটা অদ্ভুত ব্যাপার। সবাই আমায় বলছে — আপনি কেয়াকে বলুন, আপনি বললেই কেয়া করবে। কিন্তু আমি কিছুতেই তা চাইছিলাম না তা কেয়া শুনে একেবারে রাজী। কিন্তু আমার ইচ্ছে নয় — কেননা স্বাক্ষরে কিছু এসে যায় না। কেননা, স্বাক্ষর হলেই ‘আন্তিগোনে’ বন্ধ হতে পারে। আর ঐ জরুরী অবস্থায় আতিগোনের যতগুলি সম্ভব অভিনয় করে ফেলুক — এটাই তখনকার প্রয়োজন। যা কিছু লোকের মনোভাব তার অধিকাংশ আন্তিগোনের মধ্যে আছে। এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে আন্তিগোনে কোন কোপৰশত বন্ধ হয়। কেননা আমরা যেটা করছিলাম কলকাতা’ পত্রিকায়, সেই কাজটা ‘অস্তিগোনে’তে কেয়া রুদ্র নান্দীকার অনেক effectively করে যাচ্ছিল। সেই জন্যই আমি চাইছিলাম না। কোন একটা বিষয়ে আমরা সাধারণত যে আচরণ করি তার বাইরে যদি আমাদের যেতে হয়, তার জন্যে তো অনেক মানসিক প্রস্তুতি দরকার। যে ক্ষেত্রে শিল্প সাহিত্য অভিনয় কার্যকরী অন্তত স্বাক্ষর বা লিফলেট লেখার চেয়ে — যদিও অনেকে লিফলেট লেখাটাকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করেন – এবং আমিও মূলত এক জন লিফলেটিয়ার — তা সত্ত্বেও আমি ভাবি এর থেকে অনেক বেশি লোককে চালিত করতে পারে শিল্প, কবিতা, সাহিত্য, নাটক, গান। তাই লিফলেট লেখার চেয়ে, আমার লেখার চেয়ে, কেয়ার আন্তিগগোনে অনেক গুরুত্বপুর্ণভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। আমার খুঝই আফশোস — যে অবস্থায় আমরা পড়েছিলাম, সেই অবস্থা আবার আসতে পারে, — কিন্তু কেয়া থাকবে না, এটা great loss আন্তিগোনে কেয়ার মতন তখন কে করবে ?
সেই সময় ওরা যে ‘আন্তিগোনে’ করতে পেরেছিল এটাই ছিল লাভ। সেই সময় রেডিওতে কবিতা গান সব বন্ধ করেছিল, কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এট। ওদের মাথায় ঢোকেনি, এর চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর হয়েছে ওদের পক্ষে, যে নাটকটা ওরা করছে — ‘আন্তিগোনে’। তৎকালীন শাসকরা ঐ নাটক বন্ধ করতে পারত। তাই যাতে ঐ পাগলটা কেয়াদের না নাড়ায় — যদি আমি লিথি, যদি কেয়া — রুদ্ররা সই করে, তাহলে পাগলটা ওদের নাড়াবেই — আর ঐ যে পাগলার নজরে পড়ে যাবে, তাহলেই পাগলা রেগে গিয়ে ‘আন্তিগোনে’ বন্ধ করে দেবে। তাই শাসকদের বোকা বানিয়ে নান্দীকার অনেক দর্শককেই উজ্জীবিত করেছে।
আমি তো সমস্ত বাংলা থিয়েটার দেখি নি — বিশেষত গত দু’বছর ধরে দেখে ওঠা সম্ভব হয় নি নানান কারনে। আমার দেখবার জগৎ শেষের দিকে ভীষণ সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছিল। তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়েছে বাংলা মঞ্চে যে দুই মহিলা একছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, তার একজন তৃপ্তি, অন্যজন কেয়া – যদিও তৃপ্তির আধিপত্য বিস্তারের সময়কাল কেয়ার চেয়ে অনেক বেশি — তবু, কেয়ার সময়কাল কম হলেও, আমি জোর করে বলব, কেয়ার মত অভিনেত্রী বাংলা মঞ্চে আসে নি। তার কারণ, কেয়া সমান কুশলতার সঙ্গে সব রকম চরিত্র অভিনয় করতে পারত, এবং তা একটা অন্য ডাইমেনশনে পৌছত। আর তাই কেয়ার মৃত্যুতে একটা দারুণ ক্ষতি। একটা সাংঘাতিক ক্ষতি। একটা কথা যে দ্বিতীয় কেয়া তো আর হবে না। যেমন দ্বিতীয় তৃপ্তি হবে না। তবে কি কেয়ার ব্যাপারটা — কেয়া তো শুধু অভিনেত্রী ছিল না। ছিল যুক্তিগ্রাহ্য কোমল — কঠিনের একটি নারী — যে পুরুষের সঙ্গে সমান পাল্লায় লড়তে পারত। ও বাংলা থিয়েটারে একটা vigour সংযোজন করেছিল। সাংঘাতিক রকমে একটা শক্তি সঞ্চার করেছিল। অত অসুবিধের মধ্যে থেকেও, অত অর্থকষ্টের মধ্যে থেকেও, ও বাংলা থিয়েটারকে যে শক্তিটা যুগিয়ে যাচ্ছিল সেটা তো কোন দিক দিয়ে কারুর মধ্যে দেখি না। তাই শুধু নান্দীকারের নয়, সমগ্র বাংলা থিয়েটারের বিরাট ক্ষতি। আর এই থিয়েটার যাতে অনবরত নানারকম মানুষের দ্বারা পরিপুষ্ট হয় তার জন্য তার চেষ্টার তো অন্ত ছিল না।
গৌরকিশোর ঘোষ এটি মুখে বলেছেন। ১১/৬/৭৮ তারিখে। টেপ রেকর্ডারে গ্রহণ ও অনুলিপন করেছেন সৌমিত্র মিত্র।
অভিনয় এবং লেখালেখি ছাড়াও কেয়া চক্রবর্তী ১৯৬৪ সালে দমদম ক্রাইস্ট চার্চ স্কুলে ইংরাজী শিক্ষিকা ছিলেন এবং ১৯৬৫ – ১৯৭৪ সাল অবধি স্কটিশ চার্চ কলেজে ইংরাজী বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।
ঋণ স্বীকার : চিত্তরঞ্জন ঘোষ সম্পাদিত কেয়ার বই (১৯৮১)
খুব ভালো লাগলো। একজন বিশিষ্ট মানুষের আর এক অনন্য অভিনেত্রীর অভিনয়ের এই বিশ্লেষণ, খুব কাজ থেকে যাকে দেখেছেন।