পুলিশ ও প্রশাসনের লাগাতার অভিযান ও তল্লাশি সত্ত্বেও লাগাম টানা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ বাজি তৈরিতে। আরামবাগের খানাকুল ও গোঘাটে অভাবের তাড়নায় এখনও পর্যন্ত নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হচ্ছে বাড়ি বাড়ি। এ যেন ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের চেহারা নিয়েছে। বিস্ফোরণে মারা গেছে বেশ কয়েকজন। বিস্ফোরণে বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তবুও অভাবের জ্বালায় বাজি তৈরি বন্ধ হয়নি।
উল্লেখ করা যেতে পারে চারধারে নদী। মাঝখানে নতিবপুর গ্রাম। খানাকুলের এই গ্রামকে সকলেই এক ডাকে চেনে। কারণ একটাই এখানের মতো বাজি আর কোথাও হয় না। যেমন জোরালো আওয়াজ, তেমনি চোখধাঁধানো রঙমশাল, ফুলঝুরি। এখানেই শেষ নয়, গাছ বোমার আওয়াজ ও বাজি ফাটার মাধ্যমে বিভিন্ন চিত্র দেখতে পাওয়া যাবে। এক আধ দিন নয়। দেড়শো বছর ধরে চলে আসছে। বংশ পরম্পরায় এই কাজে যুক্ত থেকে বর্তমানে পঞ্চাশটির বেশি ঘরে এই কাজ কারবার করে আসছে। এটা না করলে ভাত জুটবে না। এই ধারণাই পেয়ে বসেছে পঞ্চাশটি পরিবারের মালিকের। দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা বুঝেও বুঝতে চায় না। নিয়মনীতি বিসর্জন দিয়ে তাই আজও বাজি তৈরি হচ্ছে, শব্দবাজিও বাঁধা হচ্ছে।

আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরেই হিন্দুদের কালীপুজো। তাই ইসলাম, জয়নাল আবেদিন, সকুর আলি, আবজল আলি এদের কারও কথা বলার সময় নেই। দিনরাত বাজি তৈরির কাজ চলছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়ম না মেনেই শক্তিশালী বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আওয়াজের বাজিও এখানে তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি তুবড়ি, রঙমশাল, ফুলঝুরি, দড়িবাজি, সাপবাজি, পটকা, চকোলেট এবং গাছ বমও তৈরি হচ্ছে। পুলিশ নির্বিকার। আশপাশ জেলা থেকে ছোট বড় ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন এবং সস্তা দরে তা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেবল পুজোর জন্য নয়, বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্যও বাজি যাচ্ছে
এখান থেকে। দেড়শো বছর ধরে চলতে থাকা এই কারবারগুলি এখন বারুদের স্তূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতিবপুরের বরখানতলা যে কোনো দিন বড় ধরনের বিস্ফোরণের কবলে পড়তে পারে। আর তা যদি হয় তাহলে পুজোয় বরখানতলার সাহা পাড়া নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে এলাকার বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। ইতিমধ্যে সম্প্রতি এখানে ঘটে গেছে ছোটো বিস্ফোরণ। আগুন আয়ত্তে আসার আগেই ততক্ষণে কারখানার সমস্তটাই শেষ। পাশে থাকার ঘরটিও সম্পূর্ণ ভস্মীভূত। পেছনের জানালা ভেঙে একটি বাচ্চাকে বের করা হয়। গুরুতর আহত হন দুজন। ঘটনা পুরোটাই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। এরকম ছোটো বড় ঘটনা দেড়শো বছরে অনেক ঘটে গেছে। তবু পেশা থেকে ছেড়ে আসেনি এখানকার পরিবারগুলি।
প্রসঙ্গত, বেকার শিক্ষিত যুবক আবজল আলি৷ চাকরির বহু চেষ্টা করেও না পাওয়ায় বাবার পেশা বাজি তৈরিকে বেছে নিয়েছেন। আবজল জানে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়মনীতি। শিক্ষিত বলেই তাই মেনে চলে। নিষিদ্ধ বাজি তৈরি বন্ধ রেখেছে। তুবড়ি, রঙমশাল, ছোটখাটো পটকা, চকলেট বাজি তৈরি করেন। তিনি জানান, ৫০টি ছোটবড়ো বাজি তৈরির কারবার আছে। এরসঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় পাঁচশ লোক। এদের সকলের রুটি রোজগার এর উপরই। কোনও কাজ না পেয়ে বাজি তৈরির পেশাই বেছে নিয়েছে। ইসলাম সাহা, আবজল আলি, জয়নাল আবেদিন, সকুর আলি, আয়ুব আলি সকলের একমত আমরা কোনও অন্যায় বা চুরি ডাকাতি করিনি। পেটের দায়ে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছি। এদের ছেলেপুলেরাও এই কারবার চালাবে বলে মনে করেন। বর্তমানে ৫০টি বাজি তৈরির কারবারে কয়েকশ লোক নিযুক্ত। এরমধ্যে শিশু শ্রমিকও ১০-১৫ জন আছে। এরাও কাজ করছে। বাজির মশলা তৈরি, বাঁধা, সব কাজেইে এরা পটু। আবার একদল শিশুকে দেখা যায় কাজ শিখতে। এই ভয়ংকর কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনও ভীতি নেই। কেবলই কাজের উন্মাদনা, আর অর্থ উপার্জন। এই নেশাই কেবল পেয়ে বসেছে।

এতবড়ো কাজ কারবার চালানোর জন্য প্রতিটি কারবারে একজন করে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক আছেন। যাঁরা কাজ শিখিয়ে দেন। কোন বাজিতে কতটা মশলা, কিভাবে বাঁধতে হবে তা অতি সূক্ষ্মভাবে দেখিয়ে দেন। একটু গোলমাল হলেই বিস্ফোরণ। তাই সদা সতর্ক থাকেন এরা। এখানকার বাজি করতে যত মশলা লাগে সবই কলকাতা থেকে নিয়ে আসে। থাকে সোরা, গন্ধক, পাইরো, অ্যালমুনিয়ামচুর ইত্যাদি। যাতে আনার সময় ধরপাকড় না হয় এজন্য লুকিয়ে ছাপিয়ে আনে। অনেক সময় ধরাও পড়েছে পুলিশের হাতে। এদের তৈরি বাজি বেশিরভাগ হাওড়া কলকাতার ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। এছাড়া মেদিনীপুর ও হুগলির অন্যান্য জায়গায় এখান থেকেই যায়। এদের বাজিতে কোনও লেবেল সাঁটা নেই। ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে নিজের পছন্দমতো লেবেল সেঁটে দেন। এবং উচ্চ দামে বিক্রি করেন। এখানকার বাজির গুণমান ও আওয়াজ, কারুকাজ রাজ্যের অন্য কোনও কারখানার বাজির সঙ্গে তুলনা হয় না বলে এরা মনে করেন। তাই বিক্রিও বেশি। আবজলের অকোপট স্বীকারোক্তি, বহু কষ্টে ও বিপদের মধ্যে কাজ করে উপযুক্ত পয়সা পাই না। তৈরি বাজি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে বহুমূল্যে বিক্রি করে এবং প্রচুর অর্থ তারাই উপার্জন করে থাকেন।
সারা বছর ধরে কাজ করেও এখনও কাঁচা মাটির ঘরে বাস করতে হচ্ছে। বহু বসতি বাড়ি আছে। যা এখনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দিন আনা দিন খাওয়ার মতো অবস্থা। বছরে প্রতি মাসে গড় আয় ৮ – ১০ হাজার টাকা। এ থেকেই ছেলেমেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাওয়ার খরচা। ফলে সঞ্চয় করা যায় না। প্রতিবন্ধী হয়েও এশাহক সাহা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। একটা পা নেই তো কি হয়েছে? একলাই চালিয়ে যাচ্ছেন একটা ছোটো কারখানা। কয়েকজন যুক্ত এই কারখানায়। সবরকম বাজিই এখানে তৈরি হয়। প্রতিবন্ধী হয়েও যা অর্থ উপার্জন করেন তাতে অন্নের অভাব হয় না। একই অবস্থা জয়নাল আবেদিনের। ইনিও প্রতিবন্ধী। ডান হাতটা পুরো অকেজো। বাঁ হাত আছে। এক হাতেই সমস্ত কাজ দেখভাল করেন এবং এমনকী নিজেও কাজ করেন। সেরকম অভাব নেই ।ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখান। মোটামুটি স্বচ্ছলভাবেই সংসারটা চলে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত এত বড়ো বাজি তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে এখানে তার জন্য কোনও নিরাপত্তা নেই। নেই কাছাকাছি ফায়ার ব্রিগেড। চারধারে নদী থাকায় আশপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন সহজে যেতে পারে না। কখনও বিস্ফোরণ ঘটলে পাড়ার চার পাঁচটি চাষের কাজে সেচ দেওয়া পাম্প সেট নিয়ে যাওয়া হয়। তাতেই তদারকি ও নেভানো হয়। বাজি তৈরির কারবারগুলির পাশেই বড়ো উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছাত্র ছাত্রীদের কানে অনবরত ছোটো বড়ো বাজির আওয়াজ ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। বারুদ ও মশলায় বর্জ্য পড়েছে সাহা পাড়ার ছোটোবড়ো পুকুরগুলিতে। জল হয়েছে কালো, সেই জলেই হাত মুখ ধোওয়া, বাসন মাজা এবং পশুদের খাওয়ানো। বাজি তৈরি করতে করতে সেই হাতেই জল ও খাবার খাওয়া। এ দৃশ্য নিত্যদিনের। এখানে প্রায় প্রতিটি লোকই পেটের রোগে ভুগছেন। বাচ্চারাও রেহাই পায়নি। ডাক্তার লেগেই আছে। স্বাস্থ্য খাতে পয়সা চলে যায় এখানকার বাসিন্দাদের। সহজ ও সরলভাবে কাজ করছে এরা। কালীপুজো উপলক্ষে বাজির মেলাও বসেছে। হাজার হাজার টাকা বাজি কিনছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছোট-বড়ো ব্যবসায়ীরা।আবার নিঃশব্দে চলেও যাচ্ছেন। খেলার মাঠে মেলা। রয়েছে রকমারি বাজি। নিষিদ্ধ বাজিও বিক্রি হচ্ছে। গাছবোমা, বড় বড় চকোলেট, কালী পটকার মতো বাজিও আড়ালে আবডালে নয়, প্রকাশ্যে দিনের বেলাতেই বিক্রি হচ্ছে। এ দৃশ্য নতিবপুরে গেলেই দেখা যাবে। তবে মেলা চলবে কালীপুজো পর্যন্ত ।
আশ্চর্যের ব্যাপার পুলিস ও প্রশাসনের লাগাতার অভিযান ও তল্লাশি সত্ত্বেও লাগাম টানা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ বাজি বিক্রিতে। পুলিসকে ফাঁকি দিতে বাজি কারবারিরা লুকিয়ে চুরিয়ে নানা কৌশলে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। মাস দুয়েক আগেই পুলিস ও প্রশাসনের তরফে বড় গলায় বলা হয়েছিল, লাগাতার অভিযানের জেরে খানাকুলের বাজিগ্রাম হিসেবে পরিচিত নতিবপুরে বাজি তৈরি একপ্রকার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেই নতিবপুর থেকেই মঙ্গলবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে ১ কুইন্টাল ১০ কিলোগ্রাম নিষিদ্ধ বাজি বাজেয়াপ্ত করল খানাকুল থানার পুলিস। ওদিকে রবিবার রাতে গোঘাট থানার পুলিস হাজিপুর থেকে ১৬ কিলোগ্রাম নিষিদ্ধ বাজি বাজেয়াপ্ত করেছে। সেখানে নিষিদ্ধ বাজি মজুত করার দায়ে ধীরেন সাঁতরা নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহকুমা পুলিস প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, আমাদের কাছে খবর ছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের বাজি কারবারিরা গোঘাটের সীমানা এলাকার একাধিক ডেরায় বাজি মজুত করছে। সেই বাজি আরামবাগ সহ বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত সোমবার রাতে হাজিপুরে অভিযান চালানো হয়। বাজি মজুত করার জায়গাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।