হুগলী জেলার খানাকুলে ঘন্টেশ্বর শিবের গাজন এই এলাকায় বিপুল জনপ্রিয়। এখানে সন্ন্যাসীদের জলঝাঁপ, সালেভর, ধুল গাড়ি, ইত্যাদি দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান। করোনা পরিস্থিতির কারণে গত দু’বছর এভাবে অনুষ্ঠান করা যায়নি। তাই বর্তমান বছরে নীলের দিন থেকেই মন্দিরের জনসমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

এখানে দুই ধরনের ঝাঁপ হয়, জলঝাঁপ ও আরাঝাঁপ। মন্দিরের সামনের পুকুরে প্রথমে মূল সন্ন্যাসী জলঝাঁপ দেন। এরপর অন্য সন্ন্যাসীরা তাকে অনুসরণ করেন। তারপর শয়ে শয়ে মানুষ জলে নেমে পড়েন , একটি দর্শনীয় দৃশ্য তৈরি হয়। এখানের সন্ন্যাসীরা কৃচ্ছসাধন এর ব্রত পালন করেন ধূলগাড়ি, শালে ভড় ইত্যাদির মাধ্যমে। ধুল গাড়িতে উল্টো দিকে অর্থাৎ উপরে পা এবং নিচে মাথা করে ধূল সন্ন্যাসীকে রাখা হয়। নিচে মাথার কাছে ধুনোর আগুন জেলে রাখা হয়। এই অবস্থায় গাড়ি ঠেলে ঠেলে এলাকা প্রদক্ষিণ করানো হয়। শালেভড় অনুষ্ঠানে বাঁশের মাচা বেঁধে তার উপর আড়াআড়ি কলাগাছ রেখে, তার উপর পাঁচটি ধারালো খাঁড়া স্থাপন করা হয়। এই খাঁড়ার উপরে শুইয়ে দেওয়া হয় সন্ন্যাসীদের। তাদের বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরের সামনে দিয়ে।

বর্তমান বছরের মূল সন্ন্যাসী ৬৯ বছর বয়সী হারাধন কারকের বক্তব্য, “কুড়ি বছর ধরে আমি মূল সন্ন্যাসী আছি। তারও আগে 25 বছর সাধারণ সন্ন্যাসী থেকেছি। বর্তমান বছরের মতো ভিড় আগে দেখিনি

একসময় আরামবাগ মহকুমা জুড়ে ডোম, বর্গ ক্ষত্রিয় ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষ আদি বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করতেন। তাদের আরাধ্য দেবতা ছিলেন ধর্ম ঠাকুর। রামাই পন্ডিতের ধর্ম পূজা পদ্ধতি অনুযায়ী ধর্ম ঠাকুরের আরাধনা কৃচ্ছসাধন এর একটা বড় ভূমিকা থাকতো। সেখানে শালে ভর, বান ফোঁড়া ইত্যাদি রোমহর্ষক আচার-অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ আছে। সেই ধর্মের গাজনের অনেক আচার-অনুষ্ঠান শিবের গাজন এর মধ্যেও পরবর্তীকালে এসে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রসঙ্গত, ঘন্টেশ্বর মন্দিরের শিবলিঙ্গ টি ‘শয়ম্ভু’ বলে উল্লেখ আছে প্রাচীন তন্ত্র শাস্ত্র ‘মহালিঙ্গাস্টন’ এ। এখানে একইসঙ্গে আছে রত্নাবলী কালী মন্দির, যেখানে সতীর বাম স্কন্ধ পড়েছিল বলে কথিত আছে। এছাড়া বিশালাক্ষী, অন্নপূর্ণা, ষষ্ঠী, ধর্ম ঠাকুর ক্ষুদিরায়, নিতাই গৌড় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা আছে। জায়গাটির মহিমার জন্য একে গুপ্তকাশী বলেও উল্লেখ করা হয়।

খানাকুলের উবিদপুর গ্রামে মটুকচন্দ্র কারক এই মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। অসম্পূর্ণ অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করলে পরবর্তীকালে কানাইলাল দে মন্দির নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করেন। পরবর্তীকালে তিনবার মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়। শেষবার ১৩৫২ শালী এখানকার বিখ্যাত জমিদার বিপিনবিহারী সিংহ এটির পুনর্নির্মাণ করেন।