ডিভিসি-র ছাড়া জলে খানাকুল ও আরামবাগের নিচু এলাকায় জল ঢুকছে। ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের একটি দল বন্যা পরিস্থিতি ক্ষতিয়ে দেখতে খানাকুল পরিদর্শন করল প্রতিনিধি দলটি। দলে ছিলেন হুগলি জেলাশাসক, সাংসদ সদস্য মিতালী বাগ, স্বপন নন্দী ও অন্যান্য আধিকারিকরা। পরপর নিম্নচাপের জেরে নিম্ন দামোদর অববাহিকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খানাকুল, আরামবাগ ও গোঘাটের নিচু এলাকাগুলি। সেই সঙ্গে ডিভিসি জল ছাড়ায় নদীগুলো ফুঁসতে শুরু করেছে। বন্যার ভ্রুকুটিতে ত্রস্ত নিচু এলাকার বাসিন্দারা। এদিকে প্রশাসনও বন্যা মোকাবেলায় প্রস্তুত। দামোদরের নিম্ন অববাহিকায় টানা বর্ষণে গড়ানো জলেই জলমগ্ন খানাকুলের বেশ কিছু এলাকা। এই জল এ বার হু হু করে ঢুকতে শুরু করেছে গ্রামে গ্রামে। তাতেই প্লাবনের আশঙ্কায় সিঁটিয়ে এলাকার মানুষজন। ইতিমধ্যেই গড়েরঘাট- আরামবাগ রাজ্য সড়কের উপর দিয়ে জল বইছে। খানাকুলের জগদীশতলা এলাকায়। বাস চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। জগৎপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকার মাঠ জলে ভরে গিয়েছে। বাড় নন্দনপুর, পানশিউলি, জগৎপুর, মাড়োখানা, জগৎপুর ইত্যাদি এলাকায় রাস্তা ডুবেছে। এমনকি অনেক ঘরে জলও ঢুকেছে।দ্বারকেশ্বর, রূপনারায়ণ ও মুণ্ডেশ্বরীতে জল বাড়ছে। জল বাড়ছে দামোদরেও। এদিকে গোঘাটের জয়রামবাটি চেকপোস্ট ও সাতবেড়িয়াতে জলে ডুবেছে এলাকা।
প্রসঙ্গত, বিগত কয়েক বছরের বন্যা দেখে এ বছরও খানাকুলের মানুষজন আতঙ্কে রয়েছেন। জগৎপুরে রাজ্য সড়কের উপরে হাঁটুসমান জলের উপর দিয়েই যাতায়াত করছেন এলাকার মানুষজন। যাত্রিবাহী বাসগুলিও হাঁটুসমান জলের উপর দিয়ে চলাচল করছে। শুধু বাসই নয়, সমস্ত ধরনের যান চলাচলই হচ্ছে এই ভাবেই। অন্য কোনও উপায় না দেখে, অনেকে হেঁটেই যাচ্ছেন। এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, জলস্তর বাড়লে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।
উল্লেখ করা যেতে পারে এখানকার পানশিউলি, রাধাকৃষ্ণপুর, গড়ের ঘাট, ঢলডাঙা-সহ আশপাশের এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। এলাকার বাসিন্দাদের একাধিক জনের বক্তব্য, ‘জল ক্রমশই বাড়ছে। এতে প্লাবন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যায় যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁদের জন্য কেউ নেই। না পঞ্চায়েত, না জন প্রতিনিধি, না সরকারি আধিকাধিক। কেউই দেখেন না।’ জগৎপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান টুম্পা হাজরা বলেন, ‘যে জলটা এসেছে, এটা ঠেলা জল। মানে, বৃষ্টির জল বেশি হয়েছে। নদীগুলোও ভর্তি। তাই উঁচু এলাকার জল এসে ঢুকেছে গ্রামে। এখানকার এই সড়ক জলে ডুবেছে। তার উপর দিয়েই যাতায়াত চলছে। তবে এখনও বিপদের কিছু নেই। এখানে জল মানে বাড়িঘর-দোর সব ডুবে যায়। খেতের জমিতে নৌকো করে যাতায়াত করা হচ্ছে। বেশি জল ছাড়া হলেই এখানে বিপদ হবে। আমরা প্রস্তুত আছি। ব্লকেও জানানো হয়েছে। ওঁরাও বলেছেন, সব কিছু রেডি আছে। ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয়নি এখনও।
গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ডিভিসি জল ছাড়ার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। যার জেরে আরামবাগ মহকুমায় নদীগুলির জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে। খানাকুলের নিচু এলাকাগুলির একাংশ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নদীতে জল বাড়তে থাকায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বাসিন্দারা। নৌকা মেরামতির কাজও শুরু করেছেন অনেকে। কারণ বন্যা পরিস্থিতি হলে সড়কপথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। তখন একমাত্র ভরসা নৌকা। প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন,দামোদর, মুন্ডেশ্বরী নদীতে জলস্তর ক্রমশ বাড়ছে। রূপনারায়ণ বিপদসীমা ছুঁয়েছে। কিন্তু দুপুরের পর জল কিছুটা কমেছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা নদীর সঙ্গে সংযোগকারী খালগুলি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। খানাকুল ২ বিডিও মহম্মদ জাকারিয়া বলেন, এখনই বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা নেই। কিছু জায়গায় বৃষ্টির জল জমেছে। সেখান থেকে নামছেও জল। যেসব নিচু জায়গায় জল জমে রয়েছে সেখানে ব্লিচিং, চুন ছড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মারোখানার বাসিন্দা সুজিত পাল বলেন, রূপনারায়ণ নদে জোয়ার হয়। সেই জোয়ারের ফলে কিছু গ্রামে জল ঢুকে গিয়েছে। আবার ভাটা হলে জল নামছেও। তবে রূপনারায়ণে জল রয়েছে। পানশিউলি বাজারে যান চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। নন্দনপুরের বাসিন্দা সুদীপ রায় বলেন, বর্ষার সময় থেকে আমাদের বাড়ির সামনে জল জমে রয়েছে। সেই জমা জলে মশা, মাছির উপদ্রব বাড়ছে। প্রশাসনিক কোনও উদ্যোগ নেই। ফলে সমস্যায় পড়ছি আমরা। হানুয়ার বাসিন্দা অশোক সামন্ত বলেন, নদীতে জল বাড়ছে। রাস্তাঘাটেও কিছু জায়গায় জল চলে এসেছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগাম নৌকা সারাইয়ের কাজ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৭ জুন থেকে গোটা রাজ্যে বর্ষা প্রবেশ করার পর দক্ষিণবঙ্গের উপর একের পর এক নিম্নচাপ আসছে। এর আগের নিম্নচাপটির দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে খুব ধীর গতিতে অগ্রসর হওয়ায় কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় গত সপ্তাহেই প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। তার জন্য দক্ষিণবঙ্গের নদীগুলির জলস্তর বৃদ্ধি, ডিভিসি-সহ বিভিন্ন বাঁধ থেকে বেশি মাত্রায় জল ছাড়তে হয়। এতে বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার কিছু অংশে বন্যাপরিস্থিতি তৈরি হয়। বন্যাপরিস্থিতির মোকাবিলায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। ফের নতুন করে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে উদ্বেগ। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা হবিবুর রহমান বিশ্বাস জানান, দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে বৃষ্টি হবে। তবে কোন জায়গায় বৃষ্টির মাত্রা কতটা হবে, তা নির্ভর করছে নিম্নচাপের গতিপ্রকৃতির উপর। প্রাথমিকভাবে আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, আগের নিম্নচাপটির মতো এটিও দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে ঝাড়খণ্ডের দিকে সরে যাবে। দক্ষিণবঙ্গের উপর বেশি সময় ধরে নিম্নচাপটি অবস্থান করলে বৃষ্টির মাত্রা বেশি হবে।
প্রসঙ্গত, রাজ্যে ফের বন্যার ভ্রুকুটি। ডিভিসি জল ছাড়ায় রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতির আগেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কাজে ঝাঁপানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পরিস্থিতিতে সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে তাঁর অনুরোধ, ‘প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। অকারণে রাজনীতি করবেন না।’ মঙ্গলবার রাজ্য প্রশাসনের কর্তাদের পাশাপাশি ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দেন জেলাশাসকরা। সকলের সঙ্গে প্লাবন পরিস্থিতির পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বন্যানিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বাংলার সঙ্গে বঞ্চনা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন মমতা। তাঁর সাফ কথা, ‘জনগণের ক্ষতির কথাওরা ভাবে না। অসম বন্যাত্রাণের টাকা পায়, কিন্তু বাংলা পায় না।’ কীভাবে প্রতিবছর বাংলাকে ভাসিয়ে দিয়ে খালাস হয়ে যায় মোদি সরকার, সেই ব্যাখাও তুলে ধরেন মমতা। তিনি জানান, বিভিন্ন জলাধার থেকে এবছর ১৮ জুন থেকে এপর্যন্ত ২৭ হাজার লক্ষ কিউবিক মিটার বিপুল জল ছেড়েছে। ডিভিসি বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে। শুধু কোনও পদক্ষেপ করেনি কেন্দ্র। তারই ফল ভুগছে বাংলা। এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনকে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রয়োজনে মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, ডিভিসি যথাসময়ে ড্রেজিং করলে জলাধারগুলির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ত। প্রধানমন্ত্রীকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন বৈঠকেও উঠেছে ড্রেজিং প্রসঙ্গ। গঙ্গাভাঙন রোধসহ বন্যা রোখার জন্য প্রয়োজনীয় – কাজের অনুরোধ করা হয় কেন্দ্রকে। করবেন। জেলায় তিনজন অভিজ্ঞ আমলাকে পাঠানো হবে। তাঁরা জেলায় সাতদিন থেকে প্লাবন পরিস্থিতি সামলাতে সহযোগিতা জনপ্রতিনিধিদেরকে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করার আর্জি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মানুষকে সাহায্য করতে হবে। কোনও অভিযোগ শুনতে চাই না।