কলকাতায় এক সময়ে নয় নয় করে নয়জন বিখ্যাত খানসামার নামে গলি ছিল। ছকু খানসামা লেন, চমরু খানসামা লেন, পাঁচু খানসামা লেন, করিম বক্স খানসামা লেন, নিমু খানসামা লেন, মিসরী খানসামা লেন, পিরু খানসামা লেন, গদাই খানসামা লেন। দুয়েকটা নাম এখন বদলে গেছে। খানসামা, চাকরবাকর, কাজের লোক, জোগাড়েরা যে শহরে স্থাননামেও চিহ্ন রেখে গেছে, তা তো দেখাই যাচ্ছে। হাতিবাগানে কাজের জোগাড়েরা থাকত শুনে তাই চমকে উঠবেন না। বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে আছে হাতি শব্দটির একট অর্থ হল, কাজের জোগাড়ে বা সহায়ক।
শিয়ালদহের ছকু খানসামা লেন এবং পার্ক সার্কাসের চমরু খানসামা লেন এখনও তাদের পুরোনো নামেই বিদ্যমান। যাইহোক, তালতলায় করিম বক্স খানসামা লেন এখন করিম বক্স লেন আর মিসরি খানসামা লেন মারকুইস লেন নামে পরিচিত হয়েছে। রাজা রামমোহন রায় সরণির পাচু খানসামা লেন এখন দেবেন্দ্র মুখার্জি রো, আর কলকাতা মেডিকেল কলেজের কাছে নিমু খানসামা লেন হয়েছে ইডেন হাসপাতাল রোড। চিৎপুরের পিরু খানসামা লেন এখন টার্নার রোড, তালতলার কাছে মিয়াজান খানসামা লেন নবাব আবদুর রহমান স্ট্রিট এবং গদাই খানসামা লেনও হয়েছে অন্য কারও নামে।

খানসামারা মুঘল ভারতের নবাবদের রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকতেন। পরিচারকের কাজও করতেন। খাবার পরিবেশনের দায়িত্বও থাকত তাদের হাতে। তারা সাধারণত মুসলিম হত। তারা প্রায়ই হত শেখ বা পাঠান সম্প্রদায়ের অন্তর্গত এবং শুধুমাত্র তাদের রন্ধন সম্পর্কীয় দক্ষতার জন্যই নয়, তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্যও তারা খ্যাত ছিল। যে সিক কাবাব , যা অনেকে মনে করেন যে মাংস ভাজাতে ব্যবহৃত লোহার শিক বা স্ক্যুয়ার থেকে এর নাম এসেছে, নবাব সিরাজদ্দৌলার খানসামা শেখ শাহনওয়াজের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল। শাহনওয়াজ তার প্রভুর জন্য খাবারটি আবিষ্কার করেছিলেন বলে জানা যায়। খানসামারা খুব প্রভুভক্ত হত। যে কারণে প্রভুরাও (যাঁরা প্রায়শই গভর্নর জেনারেল হতেন) তাঁর স্নেহের খানাসামার নামে একটি রাস্তার নামকরণ করে যেতেন।
ভারতে আগত ইউরোপীয়রা ভারতীয় নবাবদের সমৃদ্ধ জীবনধারা দেখে ঈর্ষান্বিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। পলাশীর যুদ্ধ এবং নবাবদের পতনের পর বেশ কিছু ব্রিটিশ অফিসার নবাবদের জীবনধারা অনুকরণ করতে শুরু করে। তারা নবাবদের রীতিতে জীবনযাপন করত, এমনকি তরুণ অফিসারদেরও গৃহকর্মী এবং চাকরদের একটি দল থাকত যথা খিদমতগার, বাবুর্চি, বেহারা, দারোয়ান, ভিস্তিওয়ালা, জমাদার (জেমাদার), হুকাবরদার, দর্জি, মালি এবং আরও অনেক কিছু।
খানসামারা তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের রান্নাঘরে রীতিমতো ছড়ি ঘোরাত।

খুবই দক্ষতার সঙ্গে, তারা দ্রুত মহাদেশীয় রন্ধনপ্রণালী আয়ত্ত করে, এবং প্রতিটি রান্নার পদে একটি সূক্ষ্ম ভারতীয় অনুসঙ্গ যোগ করে। এতে খানসামাদের চাহিদা বেড়ে যায় এবং একজন ব্রিটিশ অফিসারের রান্নাঘর এটি ছাড়া অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। অন্যান্য চাকরদের ছিল চাকরি হারানোর সময়, একজন ভালো খানসামার চাহিদা বাড়তেই থাকে এবং তারা কলকাতার কুইজিনপ্রেমী ব্রিটিশদের নয়নের মণি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, শেখ করিম বক্স, ১৮৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির রান্নাঘরে নিযুক্ত ছিলেন। এরপর তিনি লর্ড মিন্টো পর্যন্ত সাতজন গভর্নর জেনারেলকে প্রধান খানসামা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। করিম বক্সের সেবার স্বীকৃতি দিয়ে মিন্টো তাঁর তৈলচিত্র তৈরি করে গভর্নর হাউসের উত্তর-পূর্ব কোণে সিঁড়ির পাশে স্থাপন করেন।
বর্তমান মুদিয়ালির পাশের এলাকাটিতে বেশিরভাগ খানসামাদের বাসা ছিল এবং সেটি খানসামাপাড়া নামে পরিচিত ছিল। যাঁরা পেশায় সফলতা পেতেন এবং প্রচুর সম্পদের মালিক হতেন, তাঁরা খানসামাপাড়া থেকে শহরের অন্যান্য স্থানে চলে যেতেন। এবং প্রায়শই তাঁরা যে এলাকায় বাড়ি করেন, সেই এলাকাটির রাস্তার নাম তাঁর নামেই হত। চমরু খানসামা লেনের উদাহরণ দেওয়া যায়, যেটি চমরু খানসামার নামে নামকরণ করা হয়েছিল, তিনি তাঁর বিরিয়ানি এবং মোগলাই খাবারের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং খানসামাপাড়া থেকে পার্ক সার্কাসে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।
কলকাতায় খানসামাদের এই প্রতিপত্তি দেখে মনে হবে চাকর, পরিচারক, রান্নার ঠাকুর ও তাদের জোগাড়ের নামে কোনও জায়গা কি হতে পারত না? হাতিবাগানে কাজের জোগাড়েদের বাস ছিল। হাতি মানে কাজের জোগাড়ে। রাজারহাট যে আদতে রেজার হাট ছিল না, তাই বা কে বলতে পারে? রেজা মানে ফারসিতে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। রাজাবাজার যে আসলে রেজাবাজার ছিল না, তাই বা কে জানে! মানে রাজমিস্ত্রির জোগাড়েরা যে বাজারে শুত রাতের বেলায়। কলকাতার সাবঅলটার্ন ইতিহাস কবে যে লেখা হবে জানি না।