বর্ষা দক্ষিণবঙ্গের অন্দরমহলে উপস্থিত। আর এই বর্ষণমুখর দিনে চালে ডালে পেট ভরাতেই ভালোবাসে বঙ্গ। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর তার সাথে ডিম কিম্বা ইলিশ মাছ ভাজার ‘ডেডলি কম্বিনেশন’ পেতে চায় ভোজন রসিক মন। ভিন্ন হলেও এই অমোঘ জুটিকে আপন করেছে হৃদয় সেই কোন মান্ধাতা আমল থেকে।
মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যে শিবঠাকুর পার্বতীকে কে ডাবের জল দিয়ে মুগ ডালের খিচুড়ি খাওয়ানোর জন্য আবদার করেছিলেন। তবে দেবাদিদেব নাকি তাঁর ভক্তরা খিচুড়ির ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, এর সত্যতা জগাখিচুড়িই বটে!
বাংলায় খিচুড়ির জয়ধ্বনি শোনা আলেকজান্ডারের জামানায়। ইবনবতুতার ভ্রমণ কাহিনীতে মুগ ডাল আর চাল দিয়ে ‘খিসরি’-র উল্লেখ পাওয়া যায়। মুঘল হেঁসেলে পেস্তা, কিশমিশ, নানা ধরণের মাছ ও ডিম দিয়ে বিশেষ ধরনের খিচুড়ি তৈরি হতো বলে জানা যায়। জাহাঙ্গীর আদর করে এই খাবারের নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’। আকবরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বীরবল কিভাবে খিচুড়ি রান্না করেছিলো, সে গল্প অনেকেরই জানা। যদিও এই গল্প মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের সংস্করণেও প্রচলিত, বোঝা যায় গল্পের চরিত্ররা পাল্টে গেলেও চাল-ডালের খিচুড়ি কিন্তু বদলায়নি।

খিচুড়ি এমন একটি খাবার যার প্রয়োজনীয়তা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার। শিশুর প্রথম শক্ত খাবার খিচুড়ি, কৈশোরের ফিস্টিতে কাঁচা হাতের প্রথম রান্না খিচুড়ি, হোস্টেলে খাবারের চাহিদায় খিচুড়ি, চাকরি জীবনে বাড়ী থেকে দূরের পোস্টিংয়ে ফোনে ইন্সট্রাকশন শুনে বা ইউ-টিউবে দেখে শেখা প্রথম রান্না খিচুড়ি, ছোট্ট সংসারে আদুরে কন্যাটির মেঘলা দিনে ভালোবাসার খিচুড়ি, বার্ধ্যকে দাঁতগুলো যখন সঙ্গ ত্যাগ করে, ডাক্তারবাবুর পথ্য হিসাবে মসলাবিহীন নরম খিচুড়ি।
সামাজের প্রতিটি প্রয়োজনে স্বমহিমায় বিরাজমান এই খিচুড়ি। তা সে পুজোর ভোগ হিসাবেই কিম্বা কাঙালি ভোজনেই হোক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণ হিসাবে যে খাদ্যটি দেওয়া হয় তা হলো খিচুড়ি। উনিশ শতকে ভারতের এই খাবারটি ইংল্যান্ডের দরবারে নিয়ে গেছিলেন ব্রিটিশরা কেডগিরি (কেডগিরি) নামে।
খিচুড়ি খাবেন আর তার সঙ্গে ভাজাভুজি না হলে হয়! কুচো কুচো লঙ্কা, ধনে পাতা বেসনের ব্যাটারে ডুবিয়ে বেগুন, কুমড়ো বা পাতলা আলুর ফালি মুচমুচে করে ভেজে ধুম্রায়িত খিচুড়ি যেন রাম-সীতার জোড়ি।

“হাঁস ছিল, সজারুও, (ব্যাকরণ মানি না),/ হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না৷”
সুকুমার রায়ের ‘খিচুড়ি’ কবিতার এই দুই লাইন এতটাই আত্মস্থ করেছে বাঙালি যে কথ্যভাষায় ‘জগাখিচুড়ি’ শব্দটি খাদ্য হিসাবে ব্যবহার না হয়ে তালগোল পাকানোর প্রতিশব্দ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। যদিও পুরীর জগন্নাথ দেবের প্রসাদ হিসাবে যে খিচুড়ি বিতরণ করা হয় তা লোকমুখে ‘জগা খিচুড়ি’ নামে খ্যাত।
বর্ষার মরশুমে শহরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে মৌসুমী মেনুতে স্থান পেয়েছে খিচুড়ি। আজকাল শুকনো হয়ে বন্দী করা প্যাকেটে পাওয়া যায় খিচুড়ি। তবে এমন সুস্বাদু আর উপাদেয় খাবারটি ঘরেই বানিয়ে নেওয়া যায় সহজে।
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের ভারতে মিলনের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত এই প্রাচীনতম খাবার খিচুড়ি। আজ বিশ্বে ‘ব্র্যান্ড ইন্ডিয়ান ফুড’ নামে পরিচিতি পেয়েছে পুষ্টিকর খাবারটি। উপাদানের জগাখিচুড়িতেই আপন করে নিয়েছে ভোজন রসিক হৃদয় এই খিচুড়িকে।