থাকার মধ্যে গঙ্গার ধারে এই ছোট্ট দোতলা বাড়িটা ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। যাদের নিয়ে একদিন একটি খেলাঘর শুরু হয়েছিল, তারা সব বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একে একে সরে পড়েছে। এ দেয়ালে একটা ছবি, ও দেয়ালে একটা ছবি। হাসি হাসি মুখ। ছবিতে সকলকেই হাসতে হয়। সেইটাই প্রথা। ফোটোগ্রাফার বলতে থাকেন, ‘একটু হাসুন, একটু হাসুন, স্মাইল, স্মাইল প্লিজ, প্লিজ।’ বর্তমানের কান্না ভিতরে চেপে রেখে ভবিষ্যৎকে দেখাতে হবে হাসি হাসি মুখ।
পশ্চিমে গঙ্গা। সেই দিকেই দোতলার এই বারান্দা, উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রসারিত। মা বলতেন, জীবনের সূচনা পর্বে এই পরিসরে উত্তর থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ থেকে উত্তরে আমি হামা দিতুম, খলখল করে হাসতুম, পৃথিবীর স্বাদ, বিস্বাদ চেখে দেখার জন্যে এটা, ওটা তুলে মুখে পুরতুম; তারপর যথাসময়ে বারান্দার রেলিং ধরে উঠে দাঁড়ান। ছোট্ট একটা পা বাইরে, শূন্যে প্রসারিত করে জগৎকে দেখানো, আমার জয়যাত্রা শুরু হল। আর কয়েকদিন পরেই আমি ভূচর হব। এখন গভীর রাতে মাঝে-মাঝে রোল-কল করি। বাবা! অ্যাবসেন্ট! মা! অ্যাবসেন্ট! পর পর! কেউ নেই। ফাঁকা মাঠে ফুটবল। যটা পার গোল দাও।
বন্ধু শংকর, একমাত্র বন্ধু। এসে বসেছে তার প্রিয় বেতের চেয়ারে। পশ্চিমে গঙ্গার পরপারে সূর্যাস্তের ঘটা চলেছে। এই সময় সূর্যদেব বিশেষ কয়েকটা রং নিয়ে খেলা করেন। বিরাটের বিরাট ব্যাপার। এই সময় গঙ্গায় ভাসমান নৌকাগুলো কালো কালো হয়ে যায়। সার বেঁধে পাখিরা ফিরতে থাকে বাসায়। শংকর আর আমি দু’জনেই ‘ব্যাচেলার’। দু’জনেই রিটায়ার করেছি। তেমন কিছু করার নেই। দু’জনেই একা। একটা করে দিন চলে যাচ্ছে। বার, তারিখ, মাসের কোনও হিসেব নেই। ‘লেফট লাগেজে’ পড়ে থাকা দুটো ব্যাগ। মায়ের আঁচলে যে চাবির থোলোটা বাঁধা থাকত, সংসারের শব্দ করত, হুকে ঝুলিয়ে রেখেছি। কোন চাবি, কিসের চাবি বলতে পারব না। নীচের রান্নাঘরটা নীচেই আছে। শেষ কবে রান্না হয়েছিল মনে নেই। এই দোতলায় কাজ চলা গোছের একটা ব্যাপার করে নিয়েছি। কোনওদিন ইচ্ছে হলে ছোটখাটো রান্না করা যেতে পারে; যেন একটা অ্যাডভেঞ্চার। একটা মজা। একটাই প্রয়োজন—একটু ভালো চা। চা হল, ‘লিকুইড রোমান্স’। কিছুক্ষণের জন্যে সময়কে স্থির করে দেয়। দাঁড় করিয়ে দেয়। ট্রাফিক সিগন্যাল। শংকর বললে, ‘আজ রাতে একটা কিছু রাঁধার চেষ্টা করলে কেমন হয়! পুজো তো এসে গেল রে! আর একটা পুজো। বাতাসে কেমন একটা দুঃখ দুঃখ ভাব। পুরনো আলমারির পাল্লা খুললে এইরকম একটা বাতাস বেরোয়।’
—‘তুই তো কবি। কোনও কবিতা কোনও কালে লিখেছিস কি না জানি না। তবে ভাবুক। আকাশে, বাতাসে তুই অনেক কিছু খুঁজে পাস। তুই যখন বলিস, তখন আমিও চেষ্টা করি সুর মেলাতে। একসময় তুই ছবি আঁকতিস। সূর্যাস্তের আকাশ তোর চোখে একরকম; আমার কিন্তু মনে হয় চিতা। অতীতে সতীদাহ হত। সেই সতীদের চিতা। এলো চুল আগুনে ফুর ফুর করে পুড়ছে, নানারকম আঁকিবুঁকি আঁকছে। আজ তুই আছিস তাই, তা না হলে এই সময়টায় আমি কেমন যেন হয়ে যাই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। অনেক লোকজনের মধ্যে ঢুকে পড়ি। দোকানে, দোকানে ঘুড়ি। জীবনের প্রয়োজনের জিনিসপত্তর ঝুলছে। কেউ কিনছে, কেউ দেখছে। বড় রাস্তার যানজট। ব্যস্ত-সমস্ত মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি ফিরছে। ক্লান্ত ফেরিওয়ালা ভাঁড়ে চা খাচ্ছে। আটার তাল। রুটি তৈরি শুরু হয়ে গেছে। স্বামী, স্ত্রী দু’জনেই নেমে পড়েছে। এই দু’জনকে আমি শ্রদ্ধা করি। দুজনেই পরিশ্রমী। দু’জনেই দুজনকে বোঝে। একেই বলে প্রকৃত ভালোবাসা। সূর্যাস্তের আকাশের রং দেখে কবিতা লিখতে বসে না। একটাও প্রেমপত্র কখনও লেখেনি। মেয়েটির বিউটি পার্লারে আটার পাউডার, গনগনে আগুন। শুলেই ঘুমিয়ে পড়ে, স্বপ্ন দেখে না। পরচর্চা করার সময় নেই। পরী সাজতে লজ্জা করে। ছোট্ট ঘরে যত্নের সংসার। নেতাদের পাত্তা দেয় না। অলসদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সকালে কাজের মেয়ে এল না বলে রণনৃত্য করে না। শংকর! আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। লজ্জার। আমরা নির্লজ্জ।’
—‘চুপ কর! ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার মতো, একটা মারাত্মক নতুন ভাইরাস এসেছে—বক্তৃতা, ভাষণ, বাত। হাঁটুর বাত, জিভে। কেউ নিজের ইচ্ছায় বাঁচে না। নিজের ইচ্ছায় কোনও কাজ হয় না। এখন বল, আমাদের পিকনিক কি হবে?’
—‘আমাদের দৌড় তো খিচুড়ি!’
—‘খিচুড়িই হোক, চালটা কিন্তু বাসমতী।’
আছে। এক প্যাকেট ইনট্যাক্ট। লক্ষ্মী নেই: কিন্তু লক্ষ্মীর সংসার।’
—‘সঙ্গে ডিম ভাজা?’
—‘অবশ্যই। এক ডজন ডিম ওয়েট করছে।’
—‘মুসুর ডাল।’
—‘আছে, খাঁড়ি মুসুর। সব আছে, এমন কি তেজপাতাও আছে।’
—‘ভেরি গুড। আজ রাতে আমি বাড়ি যাব না। তোর বিয়ে না করার বিরাট রহস্যটা আজ শুনব। আমি সময় পেলুম না। ভাই, বোনের দায়িত্ব, মায়ের সেবা, বাবার অকাল মৃত্যু, মামলা। তোমার তো বাপু এতসব ঝামেলা ছিল না, পরিষ্কার সংসার, বাবা, মা, ছেলে। তুমি কোন কালে ফেঁসে ছাদনাতলায় গেলে না? রহস্যটা কী? ল্যাংটা কে মারলে, কোন সুন্দরী! কোন দেশেতে থাকে?’
মিনি রান্নাঘরে সবই আছে, একটি বিশেষ বস্তু নেই। সেটি হল নুন। শংকর বললে, ‘চল, নুন কিনব, শৈলর দোকানে চা খাব। খানিকটা জোরে জোরে হাঁটব। আমাদের হাঁটাটা কমে গেছে। যত হাঁটবি তত বাঁচবি। এমন মানব জনম আর পাবি না; সুতরাং সহজে হারাতে চাই না। তোর সাইকেলটার কি হল?’
—‘আছে, তবে চালাই না, অটো আর টোটো, ভয় করে।’
—‘মনে পড়ে, কলেজে পড়ার সময় আমরা প্ল্যান করেছিলুম, সাইকেলে বিশ্ব পরিক্রমা করব।’
—‘সে আর হল কই। আমার সাইকেলটা তো চুরিই হয়ে গেল।’
রাস্তায় নেমে, শঙ্কর বললে, ‘আগে কোনটা? শৈলর চা, না নুন কেনা!’
—‘খুচরো কাজটা আগে, তারপর আরাম। শৈল তো মহাভারত, অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার।’
রাস্তাটা প্রাচীন। দু’পাশের বাড়িগুলোরও যথেষ্ট বয়স। বৃদ্ধ আর বৃদ্ধায় ভরতি। সাদা সাদা চুল, পাকাপাকা দাড়ি। অতীতের সুন্দরীরা বর্তমানে বৃদ্ধা। তবে, সে যেন আর এক রকমের সৌন্দর্য! আগুন নিভে গেছে, আভাটা রয়ে গেছে। যৌবন যেন ব্যান্ডপার্টি—দুর্দাম বাজাতে বাজাতে চলে গেছে। একটি মাত্র বাঁশির একটি মাত্র সুর ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে চলেছে। রাস্তার ওপর থেকে গগনবাবুর বাড়িটা উঠেছে, ঠিক যেন একটা কেল্লা! অন্ধকার। কেউ থাকে না। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে। ছেলেবেলায় কত ঐশ্বর্য দেখেছি! কিছুই থাকে না, থাকবে না।
শৈলর মাথায় একটা ব্যান্ডেজ। ‘কী হল শৈল? মাথাটা ফাটালে কী করে?’
শৈল বললে, ‘সে আর বলবেন না, খুব বেঁচে গেছি—প্রতাপের বাইকের পেছনে বসে সোদপুরে যাচ্ছিলুম বিটি রোড ধরে একটা মিনি ট্রাক মেরে দিলে। প্রতাপের বেশি লেগেছে। আমার একটু কম। এই নিয়ে আমার তিনবার হল, দেখি, আর ক’বার হয়! মা যদ্দিন আছে, মরব না। সেবা করার জন্যে আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে।’
শৈল খুব ভালো ছেলে। অ্যাথলিট। লেখা-পড়ায় খুব ভালো ছিল। চাকরি-বাকরি জুটল না। হঠাৎ এই দোকানটা পেয়ে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে গেল—শৈল নয়, শৈলর চা। শৈলর ব্যবহার, শৈলর জ্ঞান। ছেলেটা কত কি যে জানে! আমি রোজ প্রার্থনা করি ভগবান! শৈলর ভালো কর ভগবান, ও যেন সুখী হয়, সুস্থ শরীরে অনেক অনেকদিন বাঁচে। শৈল আমাকে কতভাবে যে সাহায্য করে! আমার একটা ইচ্ছার কথা ওকে চুপিচুপি বলে রেখেছি—আমাদের বাড়িটা একটা আশ্রমের মতো। ও বাড়িতে যে থাকবে তার সংসার হবে না। বাবার হয়নি, আমারও হল না। বাস্তুর অভিশাপ।
শৈল বললে, ‘দাদা, অভিশাপ নয় আশীর্বাদ। আপনি তো জানেন, অনেক রাত পর্যন্ত আমি এই দোকানে থাকি। আপনার ওই বাড়ি সম্পর্কে আপনি যা জানেন না, আমি তা জানি। গভীর রাতে বাড়ির ছাদে সাদা একটি মূর্তি পশ্চিমে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম যেদিন দেখি সেদিন ভূত ভেবে ভীষণ ভয় পেয়েছিলুম; তারপরে আবার যেদিন দেখলুম, সেদিন কিছুক্ষণের জন্য কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলুম। ভেতরটা শান্তিতে, আনন্দে ভরে গেল। নিজেকে মনে হল ভীষণ সুস্থ। এই দোকানটা নিয়ে একটা মামলা চলছিল। মামলাটা জিতে গেলুম। ওই মূর্তি অবশ্যই কোনও দেবী। বাইক দুর্ঘটনায় আমার কিন্তু মরে যাওয়ারই কথা। জ্ঞান হারাবার মুহূর্তে অনুভব করলুম আমার মাথাটা রয়েছে তাঁর কোলে। দুধ সাদা আলোয় আমি ভেসে যাচ্ছি। কাকাবাবু, আমার জীবনটা পালটে যাচ্ছে। একটা সময়ে আমাদের দু-বেলা খাবার জুটত না, এখন দশটা পরিবারকে আমি সেবা করি। কাকাবাবু! আমার বিশ্বাস ছাদে দাঁড়িয়ে থাকেন আপনার মা। তিনি সাধিকা ছিলেন। বড় বড় সাধকরা ওই বাড়িতে আসতেন, থাকতেন কিছুদিন। আপনি সবই জানেন।’
—‘শৈল! আমি চলে যাওয়ার পর ওই বাড়িতে তুমি একটা আশ্রম কোরো। আমি কাগজপত্র করে দিয়ে যাব। তোমার ওপর আমার পাঁচ সিকে পাঁচ আনা বিশ্বাস।’
শংকর বললে, ‘ওসব কথা পরে হবে। এইবার ওঠ।’
নুন কিনে ফেরার পথে শংকর বললে, ‘আজ রাতে জাগবি?’
—‘কেন রে?’
—‘গঙ্গার ঘাটে বসে দেখব, গভীর রাতে ছাদে কে দাঁড়িয়ে থাকে!’
—‘দেখতে পাবি না, আমাদের সে বিশ্বাস নেই। আমাদের মনে সন্দেহের চাষবাস। কিছুই জানি না, মনে করি সব জানি। আমার আবার এত ভয় রাতে একা ছাদে উঠতে বুক কাঁপে। গভীর রাতে এক একদিন অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। একদিন শুনছি যেন বিরাট একটা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে।’
আজ পূর্ণিমা। নির্মেঘ আকাশে থালার মতো চাঁদ ভাসছে। চাঁদের আলোয় অনেকক্ষণ থাকলে শরীরটা কেমন যেন ভিজে ভিজে লাগে, শীত শীত করে। শংকর বললে, ‘মনে কর আজ আমাদের জন্মদিন। চাঁদ উঠেছে, পার্টি হচ্ছে। খাবার টেবিলটা কি রকম সাজিয়েছি, একবার বল?’
—‘যেন পাঁচতারা হোটেল!’
—‘আর একটু ওঠ—বল, কিং আর্থারের খানা টেবল।’
—‘খানসামা কোথায়?’
—‘আমাদের ডবল রোল—কখনও খানসামা, কখনও খানদার। খানা খানেওয়ালা।’
—‘সুন্দর সাদা টেবল ক্লথটা কোথা থেকে পেলি?’
—‘তোর আলমারিতে। কোনওদিন খুলে দেখিস?’
—‘না, এখন বন্ধ করার বয়স। ওরা যেমন আছে তেমনই থাক—রেস্ট ইন পিস। আমাদের দু’জনের দুটো চেয়ার। তৃতীয়টা কার জন্যে?’
—‘অদৃশ্য অতিথির জন্যে।’
—‘শংকর! আমার গা ছমছম করছে। ওটা টেবিলের তলায় ঢুকিয়ে দে। খাবার টেবিলে খালি চেয়ার রাখবি না। খাটে একা শুলে নিজের মাথার বালিশের পাশে আর একটা বালিশ রাখবে না। বাথরুমে দুটো সাবান রাখবে না। তারে দুটো তোয়ালে পাশাপাশি ঝোলাবে না। খালি গেলাস উপুড় করে রাখবে। খালি চায়ের কাপে চামচে দিয়ে রাখবে না। রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াবে না। খাওয়ার পর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঢেঁকুর তুলবে না। অন্ধকারে জানলা বা বারান্দার বাইরে হাত বাড়াবে না। রাস্তায় কোনও মহিলার পিছনে পিছনে যাবে না। চাঁদের আলো মাথার বালিশে যেন না পড়ে। বালতির জল যেন না কাঁপে। কাঁসার বা স্টিলের গেলাস মাটিতে যেন গড়িয়ে না যায়। শোবার আগে খোলা ছুরি দেখবে না।’
শংকর বললে, ‘স্টপ, স্টপ, ক্লক স্ট্রাইকস টেন।’
নিস্তব্ধ, নির্জন গঙ্গায় আলোটালো জ্বেলে বিরাট একটা লঞ্চ যাচ্ছে। ভেতরে গান-বাজনা হচ্ছে। আমরা দু’জনে টেবল সাজালুম। আমরা এখন খানসামা। শংকর কাঁধে একটা তোয়ালে। নেশা ধরানো চাঁদের আলোয় ভীষণ উতলা হয়ে দূরে কোথাও একটা পাপিয়া ডাকছে। হুকে ঝোলানো মায়ের চাবির রিংটা দমকা বাতাসে কেঁপে উঠল।
আমাদের যৌথ প্রয়াসে খিচুড়িটা দারুণ নেমেছে। চাপাবার আগে আমরা দশ-পনের মিনিটের একটা মিটিং করেছিলুম ওভার এ কাপ অফটি। চার-পাঁচ রকমের ফর্মুলার মধ্যে আমরা কোনটা ফলো করব। মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হল, আমার মায়ের শেখানো পদ্ধতি—পোলাও টাইপ। এই রেসিপিটার আমি নাম রেখেছিলুম ‘শের আফগান।’ খাওয়া-দাওয়ার পর দু’জনেই যথেষ্ট ক্লান্ত। বাঘ একটা মানুষ খাওয়ার পর ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ে। তিন-চারদিন আর উঠতে পারে না। সেই সময় ল্যাজ ধরে টানা যায়। কানে কাতুকুতু দেওয়া যায়। কানে পালক ঢোকানো যায়। আমরা বেশ আরাম করে বারান্দায় বসেছি। আমাদের পাড়ার পালোয়ান খোকাদা—আফটার সাপার ওয়াক এ মাইল করতে বেরিয়েছেন। গঙ্গার ওপারে একটা কিছু উৎসব হচ্ছে। বাতাসের ওঠা-পড়ায় ভেসে আসা শব্দ কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট হচ্ছে।
শংকর বাঘের মতো হাই তুলে বললে, ‘নাও শুরু করো।’
আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি। আমার হাতে একটা প্যাকেট। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই রহস্যকে আমি রক্ষা করছি। যৌবন পেরিয়ে জীবন গড়াতে গড়াতে চলে এসেছে বার্ধক্যে। এই প্যাকেট, এই রহস্য এতকাল আমি চেপে রেখেছি। আজ ফাঁস করব শংকরের কাছে। বারান্দা জুড়ে চাঁদের আলোর পাগলামি চলেছে। চরিত্রহীন চাঁদ। শংকরকে প্যাকেটটা দেখিয়ে বললুম ‘এটা কী?’
বললে, ‘একটা প্যাকেট।’
—‘কী আছে এর ভেতর?’
‘-তোয়ালে-টোয়ালে হবে।’
—‘না, খোলস, সাপের খোলস। খোলসটা পেয়েছি, সাপটাকে ধরতে পারিনি।’
—‘তা এর সঙ্গে বিয়ে করা, না করার কী সম্পর্ক?’
—‘সেটা বুঝতে হলে একবার ঘরে যেতে হবে।’
—‘খোলস কি ছোবল মারে?’
—‘না। মনে করিয়ে দেয়।’
—‘বিষ আছে?’
—‘বিষ নেই, তবে বিষাক্ত।’
ঘরে, খাটের সামনে দাঁড়ালুম দু’জনে। পরিপাটি বিছানা, টান টান চাদর। বললুম, ‘এই সর্বনাশীকে আমি শোয়াবো। আজকে আমার ফুলশয্যা।’
প্যাকেট থেকে বেরলো সুন্দর একটা শালোয়ার আর কামিজ। পরিপাটি করে শুইয়ে দিলুম দেহহীন সেই তরুণীকে।
—‘এইবার চলো, গল্পটা বলি।’
ফিরে এলুম বারান্দায়। বিষাক্ত চাঁদের আলোয়—’চল্লিশ বছর হয়ে গেল। সবে চাকরিতে ঢুকেছি। একদিন ডালহৌসি থেকে বাসে উঠেছি। বাড়ি ফিরছি। পুজো এসে গেছে। সেই সময় পুজোয় বর্ষা হত না। স্পষ্ট শরৎ। চারজনে বসা যায় এইরকম একটা লম্বা সিটে বসেছি। পুজোর বাজার। চতুর্দিকে জ্যাম। কখনও থামছে, কখনও চলছে। গুমোট গরম, ঠাসা ভিড়। মাঝে মাঝে তন্দ্রা আসছে। পাশ থেকে কেউ উঠে যাচ্ছে, কেউ বসছে। এক সময় মনে হল একটি মেয়ে বসেছে। নিজেকে যতটা সম্ভব সঙ্কুচিত করে নিলুম। যাত্রী বোঝাই সেই বাস যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। মাঝে মাঝে মেয়েটিও তন্দ্রাচ্ছন্ন হচ্ছে। তার দেহের ভার আমার দেহে এসে পড়ছে, টালটা আমার দিকেই। সে এক ভয় মেশানো সুখের ব্যাপার। রোমহর্ষক। বয়সটা ভাব! সেই বয়সের পৃথিবী তো প্রেমে ভরা। দু’জনেই ঘুমের জগতে। বাস ছুটছে, দুলছে, নাচছে, থামছে। একটা গাদাগাদি, ঝাঁকা ঝাঁকি। প্রথম দিকে একটা ভয় ছিল, আড়ষ্টতা ছিল, নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। আমাকে যেন অসভ্য, অভদ্র না ভাবে। কিন্তু দেখলুম সে নিজেই শরীরটা ছেড়ে দিয়েছ। মাঝে মাঝে তার মাথাটা আমার কাঁধের দিকে ঝুঁকে আসছে, কখনও আমার মাথাটা তার দিকে। আমি টার্মিনাসে, গুমটিতে নামব, অতএব ঘুমোতেই পারি। স্টপেজ পার হয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর আমি নামব। ঘুম না ভাঙলে কন্ডাকটার খুঁচিয়ে তুলে দেবে।
তাই হল। এক সময় চমকে, চেয়ে দেখলুম, বাস চলছে না, কোনো যাত্রী নেই, আমি একা। তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে দেখি, আমার পাশে একটা প্যাকেট পড়ে আছে। তুলব কি তুলব না! শেষে তুলে নিয়ে নামলুম। সন্ধ্যা পেরিয়ে দিন রাতে ঢুকছে। দিনের মৃত্যুকাল। প্রথমে ভাবলুম, গুমটিতে জমা করে দিই। তার আগে দেখি কি আছে। সুন্দর পোশাক-শালোয়ার আর কামিজ। এতক্ষণ শরীরটা আমার শরীরেই লেগেছিল, একটা উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। এখন শরীরটা নেই, পোশাকটা আছে, আমার কোলে রেখে সে চলে গেছে। এই নরম, পরম এবং পবিত্র একটি জিনিস ওই গুমটিধারীদের হাতে দেওয়া যায়! গণ্ডারের নাকে গোলাপ ফুল!
কোথায় কোন স্টপেজে নেমে গেল সে! তা তো জানি না। একটা কি দুটো কি তিনটে আগে! গুমটির পাশের চায়ের দোকানের বাইরের বেঞ্চিতে অনেকক্ষণ বসে রইলুম, যদি সে আসে। তিন কাপ চা খাওয়া গেল। রাত ন’টা বাজল। লাস্ট বাস ছাড়ার সময় হল। সে এল না।’
শংকর বললে, ‘হয় তো এসেছিল!’
‘কী করে? সে এলে দেখতে পাব না? আমি তো দেখার জন্যই বসেছিলুম। শেষ বাস ছাড়া পর্যন্ত আজও বসে আছি সে এল না। আজও এল না। আসবে না কোনও দিনও। হাটে, ঘাটে, বাজারে, দোকানে, বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, কলেজের বাইরে, পাড়ায় পাড়ায় তাকে খুঁজেছি। এই বুঝি সে! না, পোশাকের আকার আয়তনের সঙ্গে মিলছে না। হয় একটু বড়, না হয় একটু ছোট। মা পাত্রী দেখছেন একের পর এক, আমাকেও দেখাচ্ছেন। শেষে বিরক্ত হয়ে বলছেন—’কী ব্যাপার বল তো, আমার পছন্দ হচ্ছে, তোর হচ্ছে না কেন? তুই কী রম্ভা, ঊর্বশী খুঁজছিস? তোর কী কারোকে ঠিক করা আছে?’
—‘না, মা। সবাই সুন্দরী; কিন্তু ফিট করছে না।’
—‘কি ফিট ফিট করছিস। তুই কি জুতো কিনছিস?’
—‘না, না, সে তোমাকে বলতে পারবো না মা। সিক্রেট। পাগলামিও বলতে পার মুকুটটা তো পড়েই আছে রাজাই শুধু নেই। শংকর! তাই বলছিলুম, খোলসটাই আছে, সাপটা বোধহয় নেই। কত বছর হয়ে গেল! তাই না!’
শংকর বললে, ‘বিজন! আজ মনে হচ্ছে, আমারও একটা সিক্রেট আছে। শার্লক হোমস। সেই রাতে গুমটিতে মেয়ে নয়, একটা ছেলে গিয়েছিল; আর সে ছেলেটা এই আমি, তখনও তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়নি। এই পোশাকটা আমার বোনের। বিয়ে করলে না। পাত্র পছন্দ হয় না; কেন হয় না? বলে, আমার একটা আদল আছে।’ তারপরে বলতে লাগল, ‘আমি বিয়ে করলে, দাদা একা চালাতে পারবে না।’
—‘শংকর! আমার খুব লজ্জা করছে, মনের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেললুম। কে জানত, এমনও হয়।’
—‘হয়, এই বাড়িতে হয়। হয় তো তিনি এখন ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন শরীরে চাঁদের আলো মেখে, ঠোঁটের কাছে ঠেকিয়ে রেখেছেন মঙ্গল শঙ্খ।’
—‘মানে?’
—‘শাঁখ বাজবে, মালা ঝুলবে, ওই পোশাক একটা শরীর পেয়ে উঠে দাঁড়াবে, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওই তৃতীয় চেয়ারটায় বসবে। শালা! আমি যে তোর শালা রে! আমার বোনের নাম রাধিকা।’
—‘কিন্তু বয়স?’
—‘ধুর গাধা! প্রেমের আবার বয়স কী! নদী জানে চলতে, নদী জানে মিলতে, সাগর ডাকছে আয়, আয়।’
—‘তা হলে?’
—‘বন্ধু, কিসের লজ্জা! আসছে ফাল্গুন, মিলনের মধু মাস!’
প্রথম প্রকাশ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
এখানে প্রকাশিত শহরের নাম ও প্রকাশক কোম্পানির নাম দেওয়া হোক