বাসস্টপ থেকে বৃদ্ধাবাসের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা প্রতিবারই সুমনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। দুই পাশে বড় বড় গাছ পথটিকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে, মনে হয় ছোট কোনো পাহাড়ি শহরে এসে পড়া গেছে।
প্রতিবারই সুমনা দুই পা হাঁটে তো একটু দাঁড়ায়, গাছেদের শরীর থেকে ভেসে আসা ভেজা গন্ধ মুখে, গলায়, দুই হাতে মাখতে চায়। ওপর দিকে তাকিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে চলা পাখিদের দেখে, একটি কি দুটি শুকনো পাতা পথ থেকে তুলে নেয়, গালে আলতো করে বুলায়, একেক দিন পথের পাশে শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করে, এভাবে অনেক দিন যদি ঘুমিয়ে থাকা যায় সে ভাবে।
আজ তরঙ্গকে দেখতে আসার কোনো কথা ছিল না। হঠাৎ অফিসে মায়ের ফোন, সুমি আজ একবার আসবি? তরঙ্গর কণ্ঠস্বরে এমন এক অনুনয় ছিল, যেন সুমনাকে আজ না দেখলে তার জীবনের বড় কিছু হারিয়ে যাবে। সুমনা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিল এড়াতে। কেননা এই এখন যখন যে ছায়াচ্ছন্ন পথ ধরে বৃদ্ধাবাসের দিকে এগোচ্ছে, প্রলয় দাঁড়িয়ে আছে সিনেমা হলের সামনে, তার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ প্রলয়ের সঙ্গে ‘সামার উইথ মোকিনা’ দেখার কথা। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, সে ভাবল, মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসে প্রলয়কে এড়িয়ে যাওয়া গেল। প্রলয়কে সে এড়াতে চায়। কিন্তু পারছে না কেন? প্রলয়ের জন্য? নাকি তার নিজের জন্যও? প্রলয় তো কিছু নিয়েই তাকে জোরাজুরি করে না। তবু প্রলয়ের কোনো কথা সে এড়াতে পারে না। এই সম্পর্কের পরিণতি কি সুমনা বুঝতে পারে না? প্রলয় তাদের পারিবারিক বন্ধু। তবু প্রলয়ের সঙ্গে তার ‘রঁদেভু’র কথা অমিতাভ জানে না। একে কি ‘রঁদেভু’ বলা যায়, সুমনা মনে মনে হাসল। সম্প্রতি দামোদর গুপ্তের কুট্টনী কথার অনুবাদ পড়তে গিয়ে সুমনা জেনেছে, যে নারী স্বামীকে মান্য না করে নিজের বাড়িতে বা অন্য জায়গায় অন্য পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়, বাৎস্যায়ন সেই নারীকে স্বৈরিণী বলতেন। সেও কি তাহলে স্বৈরিণী? মিলন বলতে বাৎস্যায়ন সেই নারীকে স্বৈরিণী বলতেনও কি তাহলে স্বৈরিণী? মিলন বলতে বাৎস্যায়ন কী বলতে চেয়েছেন? শরীরের মিলন? কিন্তু কারোর মনে যদি আর একজনের মনের ভেতর ঢুকে যায়? দুটি মন যদি পরস্পরকে এড়াতে না পারে? সুমনা জানে, অমিতাভকে এ প্রশ্ন করলে অমিতাভ বলবে, ‘সেই দুটি মন শরীরকে সময় পেতে চাইবে। দুটি মন তো আর মরা নয়।’ তাহলে? প্রলয়ও একদিন শরীর পেতে চাইবে? শুধু সময়ের অপেক্ষা?
অমিতাভ তো একদিন রেস্তোরাঁর পর্দাঢাকা ঘরে- আমি তখন কুড়ি-একুশের যুবতী-আমাকে প্রথম চুম্বন করেছিল, আমার বুকে হাত দিয়েছিল। আমি সেদিন কেঁদে ফেলেছিলাম, কেন জানি না। অমিতাভের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার বছর দু-তিন পরেও হঠাৎই একদিন এমনটা করেছিল। আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার অনেক পরে অমিতাভকে একদিন বলেছিলাম, ‘আমার শরীর তোমার খুব পেতে ইচ্ছে করত?’
—হ্যাঁ।
—তাহলে আগে চাওনি কেন?
—সংকোচ ছিল, ভয় ছিল।
—কেন?
—তুমি যদি মনে করো, আমি শুধু তোমার শরীর চেয়েছি।
—তাহলে সেদিন পারলে কিভাবে?
—জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল, তোমাকে সম্পূর্ণভাবে আমি ছুঁতে পারছি না।
—শরীর সেই সম্পূর্ণতা দেয়?
—তুমি বুঝতে পারোনি?
প্রলয়ও কি একদিন এভাবে—। যদি চায়? আমি কী করতে পারব? বাধা দিতে পারব? বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে আমার? এসব ভাবনা এড়াতে সুমনা এবার দ্রুত হাঁটা দিল। ইদানীং প্রলয় তাকে আক্রমণ করছে, কোনো না কোনোভাবে।
এই তো সেদিন, হঠাৎ মাঝরাতে টেলিফোন বেজে উঠল। ঘুমের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম, টেলিফোন বেজেই চলেছে। অমিতাভ ঘুম থেকে উঠে টেলিফোন ধরল। আমি কেটে যাওয়া ঘুমের আচ্ছন্নতায় অমিতাভের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রলয় বারবার আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। অমিতাভ বলছিল, আমি ঘুমিয়ে আছি। পরদিন প্রলয়ের সঙ্গে দেখা হতেও রাত্রির টেলিফোন নিয়ে একটা কথাও বলল না, আমিও কিছু বলিনি। প্রলয় কি তাহলে ধীরে ধীরে বিপৎসীমা টপকাচ্ছে?
ভোরবেলা হঠাৎ অমিতাভ আমাকে ঘুম থেকে ঠেলে তুলল। একটি ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে ওকে কেমন আক্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল। কী দেখছে অমিতাভ? আমি তাকে বুকের ভেতরে আঁকড়ে ধরি। অমিতাভ বলে যায়, আমি আর তুমি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। বার্গম্যানের ‘সামার উইথ মোনিকা’। পুরো সিনেমাটা যেন স্বপ্নে দেখলাম। সিনেমা দেখে বেরিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগল? তুমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে-আগে দেখেছি।
—কবে?
—এই তো সেদিন, প্রলয়ের সঙ্গে।
আমি আর কোনো কথা বলিনি। তোমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কী মনে হলো, দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে জামার হাতায় আগুন ধরিয়ে দিলাম।
অথচ প্রলয়ের সঙ্গে আজ আমার ‘সামার উইথ মোনিকা’ দেখার কথা ছিল।
ঘরে ঢুকতেই তরঙ্গ সুমনাকে জড়িয়ে ধরল।-তোকে আজ খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তোকে খুব বিরক্ত করলাম, না?
—না।
সুমনা দেখল, তরঙ্গের গাল জলে ভেসে যাচ্ছে।-কী হয়েছে মা? কী হয়েছে তোমার আজ? তুমি তো এভাবে ফোন করো না আমাকে। বোসো— আগে বোসো—
তরঙ্গকে সোফায় বসিয়ে তার পায়ের কাছে বসল সুমনা।
—এ কী, তুই এখানে বসলি কেন?
—ঠিক আছে। তোমার পায়ের কাছে বসতে ভালো লাগছে। সুমনা হাসল, মাঝে মাঝে তোমার কোলে মাথা রাখব। ছোটবেলায় তুমি তো আমাকে শুধু বকতে।
—তারপর তোকে বুকে জড়িয়ে ধরিনি?
—তোমার ঘামের গন্ধ, কাপড়ের গন্ধ কী ভালো লাগত আমার মা।
—সেই গন্ধ তোর মনে আছে?
—মনে থাকবে না? আর মাঝে মাঝেই তোমার চুল বেঁধে দিতে যেতাম। তুমি চিৎকার করতে, সুমি এভাবে চুল ধরবি না। আমার ভালো লাগে না। তবু আমি নির্লজ্জের মতো তোমার চুল বাঁধতাম। কী ভালো লাগত। কেন জানো? শুধু ভাবতাম, তোমার মতো যেন কোমর ছাড়ানো চুল হয় আমার।
—তোর খুব কষ্ট হতো, না?
—তোমার মতো চুল আর আমার হলো না মা। একেক দিন দেখেছি, বাবা তোমার চুলে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে আছে। আমার কেন অমন চুল হবে না? খুব হিংসে হতো।
—সুমি-
—বলো।
—তোর তখন তিন-চার বছর বয়স। তুই আমাকে কী ডাকতিস, মনে আছে?
—কী?
—তুই তরঙ্গ বলতে পারতিস না। বলতিস, তয়ঙ্গ। তোর বাবার কথা থেকেই শিখেছিলি।
—তোমার নাম ডাকতে খুব ভালোবাসত বাবা।
তরঙ্গ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তরঙ্গ…। পুরো নাম তরঙ্গলতা। মণীশ ডাকত, তরঙ্গ… ও তরঙ্গ…।
—সুমি—
—বলো।
—আজ আমাকে তরঙ্গ বলে ডাক।
—যাঃ -সুমনা হেসে ফেলল।
—আমি তোমাকে বলছি। কতদিন কেউ তরঙ্গ বলে ডাকে না।
—তুমি আমাকে ডেকে পাঠালে কেন তরঙ্গ? বলতে বলতে সুমনা তরঙ্গর কোলে মাথা ডুবিয়ে দিল। তার চুলের ভেভরে খেলা করছে তরঙ্গর আঙুল। কী আরাম। প্রলয় যদি এভাবে আঙুল দিয়ে খেলা করে? সুমনা কেঁপে উঠল। সে তো তরঙ্গর কোলে মাথা রেখেছে, তরঙ্গর আঙুল তার চুলের ভেতরে খেলা করছে, এর মধ্যে প্রলয় কিভাবে এলো?
—সুমি—
—বলো।
—তোর ঘুমোতে ইচ্ছে করছে?
—না।
—আজ আমাদের এখানে একজন মারা গেলেন।
—কে?
—রাজমোহন মুখোপাধ্যায়।
—তোমার কষ্ট হচ্ছে মা?
—এখানে আসার কিছুদিন পর থেকে রাজমোহন বাবুর সঙ্গে আমার বড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। তিনি নিজের কথা কিছু বলতেন না। শুধু আমার কথা শুনতে চাইতেন। সকালে-বিকেলে কত যে গল্প হতো তাঁর সঙ্গে। রাজমোহন বাবু আজ চলে গেলেন। আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
সুমনা মুখ তুলে তরঙ্গর দিকে তাকাল।-তুমি তো আগে কখনো ওনার কথা বলোনি।
—না।
—কেন বলোনি মা?
—ওঁকে নিয়ে বলবার কথা কী-ই বা আছে। মাঝে মাঝে আমাকে নানা রকম বই পড়ে শোনাতেন।
—কী বই পড়তেন?
—শুনবি? তরঙ্গ সোফা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে টেবিল থেকে একটি বই নিয়ে এলো। সুমনা দেখল, রবীন্দ্রনাথের ‘শান্তিনিকেতন’। তরঙ্গ আবার সোফায় বসল। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টোতে লাগল। একসময় বলল, ‘শোন। প্রেমের সাধনায় বিকারের আশঙ্কা আছে। প্রেমের একটা দিক আছে, যেটা প্রধানত রসেরই দিক-সেইটার প্রলোভনে জড়িয়ে পড়লে কেবল সেইখানেই ঠেকে যেতে হয়-তখন কেবল রসসম্ভোগকেই আমরা সাধনার চরম সিদ্ধি বলে দাবি করি। তখন এই নেশায় আমাদের পেয়ে বসে। এই নেশাকেই দিনরাত্রি জাগিয়ে তুলে আমরা কর্মের কঠোরতা, জ্ঞানের বিশুদ্ধতাকে ভুলে থাকতে চাই-কর্মকে বিস্মৃত হই, জ্ঞানকে অমান্য করি।
‘এমনি করে সম্ভবত আমরা গাছকে কেটে ফেলে ফুলকে নেওয়ার চেষ্টা করি, ফুলের সৌন্দর্যে যতই মুগ্ধ হই না কেন, গাছকে যদি তার সঙ্গে তুলনায় নিন্দিত করে তাকে কঠোর বলে, তাকে দুরারোহ বলে উৎপাটন করে ফুলটি তুলে নেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে তখনকার মতো ফুলকে পাওয়া যায়, কিন্তু চিরদিন সেই ফুল নতুন নতুন করে ফোটবার মূল আশ্রয়কেই নষ্ট করে তার প্রতি অবিচার এবং অত্যাচারই করে থাকি।’
—তরঙ্গ—
—বল।
—রাজমোহন বাবু যখন তোমাকে এই বই পড়ে শোনাতেন, তখন তোমার কিছু মনে হয়নি?
—প্রথমে কিছু মনে হয়নি, কিন্তু-
—কী?
—একদিন মনে হলো, এভাবে তো একটা প্রেমপত্র লেখা যায়। একটা লোক যদি সরাসরি না বলতে পারে, তবে এভাবেও তো প্রেম নিবেদন করতে পারে সে।
—তরঙ্গ—
—বল।
—তুমি তাঁর প্রেমে পড়েছিলে?
—আমি জানি না সুমি। তবে তিনি আজ চলে গেলেন, আমার এখানে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না।
—তরঙ্গ—
—বল।
—বাবা মারা যাওয়ার পর তুমি কোনো বৃদ্ধাবাসে চলে যেতে চেয়েছিলে।
—হ্যাঁ।
—কেন? তোমার নিজের ফ্ল্যাট ছিল, তুমি একা থাকতে পারতে।
—ওই ফ্ল্যাটের সবকিছুর সঙ্গে মণীশ জড়িয়ে ছিল।
—আর এখানে?
তরঙ্গ কোনো কথা বলল না।
—তরঙ্গ—
—বল।
—তুমি প্রেমে পড়িয়াছ।
তরঙ্গ এবার হেসে ওঠে।-আজ আবার চুল বেঁধে দিবি? তোকে আমি আর বকব না।
—কেন প্রেমে পড়লে তরঙ্গ? মণীশ তোমাকে ভালোবাসত না?
—খুব।
—তাহলে?
—মণীশের ভালোবাসা ছিল, ও যেভাবে চায়, সেভাবে। কী অসম্ভব সুমি-রক্তাক্ত-প্রিয় মানুষকে খুব করে পাওয়ার মতো ভালোবাসা।
—আর রাজমোহন?
—তিনি শুধু আমার কথাই শুনতে চাইতেন। মণীশকে যা বলিনি, তাঁকে সে কথা বলেছি।
—কী বলেছ তরঙ্গ?
—শোন। ‘শান্তিনিকেতন’ থেকে একদিন তাঁকে আমি পড়ে শুনিয়েছিলাম … জগতের সর্বসাধারণের সঙ্গে সাধারণভাবে আমার মিল আছে। ধূলির সঙ্গে পাথরের সঙ্গে আমার মিল আছে, ঘাসের সঙ্গে গাছের সঙ্গে আমার মিল আছে; পশুপাখির সঙ্গে আমার মিল আছে; কিন্তু এক জায়গায় একেবারে মিল নেই-যেখানে হচ্ছি বিশেষ। আমি যাকে আজ ‘আমি’ বলছি এর আর কোনো দ্বিতীয় নেই। ঈশ্বরের অনন্ত বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে এ সৃষ্টি সম্পূর্ণ অপূর্ব, এ কেবলমাত্র আমি, এ কথা আমি, অনুপম অতুলনীয় আমি। এই আমির যে জগৎ সে একলা আমারই জগৎ-সেই মহাবিজনলোকে আমার অন্তর্যামী ছাড়া আর কারো প্রবেশ করার জো নেই।
—তরঙ্গ—
—বল।
—তোমার এই একলা আমি কেউ ছুঁঁতে পারে?
—না। একজন তো আর একজনকে নিজের মতো করেই ছুঁঁতে চায়।
—রাজমোহন পেরেছিল?
—জানি না।
—তাহলে?
—কিন্তু—
—কী?
—আমার তো ইচ্ছে ছিল, কেউ একজন আমার এই একলা আমি তো ছুঁতে পারবে।
—মণীশ কখনো তা পারেনি, না?
—আমি জানি না।
—রাজমোহনকে তুমি পেতে চেয়েছিলে কেন?
—তিনি আমার কথাই শুনতে চাইতেন।
—তুমি বলতে খুব আনন্দ পেতে?
—হ্যাঁ।
—তরঙ্গ, একজন তো আর একজনকে নিজের মতো করেই ছুঁতে চায়? তাহলে? রাজমোহন কিভাবে পেরেছিল?
—আমি জানি না। হয়তো পারেনি। কিন্তু তুই তো চাস, তুই যা, তোকে সেভাবেই কেউ চিনতে পারুক।
সুমনা হেসে ফেলল।
—হাসছিস?
—তরঙ্গ—
—বল।
—ধর, আমি একজন স্বৈরিণী। আমি যদি চাই এভাবেই কেউ চিনে নিক আমাকে। এই জেনাকে কে বহন করতে পারবে তরঙ্গ?
—কেউ না। সুমি সব পুরুষ যেমন বহুগামী, সব নারীর মধ্যেই একজন স্বৈরিণী আছে।
—তরঙ্গ। তুমি আজ এই কথা বলছ? মণীশ মারা যাওয়ার পর তুমি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে এসেছিলে।
—তবু বলছি। নিজের একলা আমিকে কারোর কাছে চেনাতে চায় মানুষ। চেনানোর জন্য ছুটে মরে। তবু চেনানো যায় না। পুরুষ যদি নিজেকে চেনাতে চায়, নারী চেনাতে চাইবে না?
—চলো। সুমনা উঠে দাঁড়াল।
—কোথায়?
—চলো না—
বৃদ্ধাবাস থেকে বেরিয়েই তরঙ্গকে নিয়ে ট্যাক্সি ধরল সুমনা। ট্যাক্সিতে একটি কথাও সে বলতে পারল না। তরঙ্গও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল। সিনেমা হলের সামনে ট্যাক্সিথামিয়ে সুমনা দেখল, প্রলয় নেই। ট্যাক্সিথেকে নেমে সে আশপাশে খুঁজল। কোথাও প্রলয় নেই।
ট্যাক্সিচলতে শুরু করলে সুমনা মায়ের হাত ধরে বলল-‘একজন আরেকজনের জন্য কত দিন অপেক্ষা করে?’
—যত দিন ইচ্ছে থাকে। তরঙ্গ হাসল।
—ইচ্ছে জন্মায়, ইচ্ছে মরে যায়-
হ্যাঁ।
—কেন জন্মায়? কেমন মরে যায় মা?
তরঙ্গর কোনো উত্তর শুনতে পেল না সুমনা। এক সময় মুখ ঘুরিয়ে দেখল, তরঙ্গর চোখ বোজা।
—তরঙ্গ—
—বল। ফিস ফিস করে বলল তরঙ্গ।
—তুমি আবার বাড়ি ফিরবে?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—খুব একা লাগছে। আর কয়েকটা দিন তোদের কাছাকাছি থাকব। মণীশ, রাজমোহন বাবু আজ আর কেউ বেঁচে নেই। এ বয়সে আর নিজেকে কোথায় খুঁজতে যাব?
সুমনার হাত সজোরে চেপে ধরল তরঙ্গ। অন্ধকারে দুই পাশে আলোকবিন্দু ছিটকে ছিটকে ট্যাক্সিএগিয়ে চলেছে।
সূত্র : কালের কণ্ঠ, ঈদ সংখ্যা, ঢাকা, বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২, ৫ শাওয়াল ১৪৩৬