একটা বাড়ি। চারপাশে বাগান। গেট পেরিয়ে যে রাস্তা ধরে রোজ বেরোনো। কেউ অফিস বা কেউ অন্য কাজে বেরোন। কিন্তু সন্ধ্যার পর এক অমোঘ টানে বাড়ি ফিরে আসা। সে বাড়ি হতে পারে, কুঁড়ে হতে পারে বা প্রাসাদ হলেই বা ক্ষতি কি? না, ক্ষতি তো কিছু নেই। নিজের বাড়ি, নিজের এলাকা, নিজের দেশ যেখানে একটি মানুষ বা মনুষ্যেতর প্রাণী জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়। এই পুরোটাই একটা কমফর্ট জোন। কিন্তু যদি এই সমস্তটুকুর অস্তিত্ব না থাকে আর? হ্যাঁ, ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু ভূমিকম্প হলেও যদি কেউ বেঁচে থাকেন তবে তিনি দেখতে পাবেন ধ্বংস হলেও এ তাঁর নিজের এলাকা। নিজের দেশ। চারদিকের অগুন্তি মানুষ তাঁর চেনা। ধ্বংসস্তুপে বসেও তিনি বেঁচে ওঠার শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু যদি পুরো এলাকা বা পুরো দেশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তবে?
আজ এমন একটি দুর্ভাগা দেশের কথা শোনাতে আসা, যে দেশ আগামী পঁচিশ তিরিশ বছরের মধ্যেই সমুদ্রগর্ভে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে বলে বিজ্ঞানীরা সচেতন করেছেন। কাকে সচেতন করেছেন? নিশ্চয়ই যে দেশ ডুববে সে এই ডোবার জন্য দায়ী নয়। দায় তো উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর। যারা এই বিজ্ঞানীদের সাবধানবাণীর তোয়াক্কা না করে শুধু তথাকথিত উন্নয়নের দিকে ছোটেন। আর যে দেশ ডুববে, সেই এলাকার মানুষ, মনুষ্যেতর প্রাণী অসহায় ভাবে দিন গোনে কবে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন আসবে। নিজের বাড়ি, নিজস্ব পথঘাট, স্কুল সব ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী বা ভিক্ষুকের জীবন।

এই দেশটি হল কমনওয়েলথ অফ নেশনসের মধ্যে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র, যা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ৪,০০০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত, নাম কিরিবাতি (উচ্চারিত হয় কিরিবাস)। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ যা মাইক্রোনেশিয়া নামে পরিচিত এবং ওশিয়ানিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। বিষুবরেখার কাছে পঁয়ত্রিশ লক্ষ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেত্রিশটি প্রবাল দ্বীপ নিয়ে এই দেশ গঠিত, যার মধ্যে একুশটি দ্বীপে মনুষ্যবসতি আছে। এর মধ্যে একটি বাদে সব দ্বীপই অ্যাটল প্রকৃতির, অর্থাৎ বলয়াকার দ্বীপ যার মাঝখানে রয়েছে শান্ত হ্রদ বা লেগুন। এই দেশ তিনটি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। গিলবার্ট, ফিনিক্স এবং লাইন দ্বীপপুঞ্জ। গিলবার্টের একটি অ্যাটল তারাওয়া কিরিবাসের রাজধানী। তারাওয়ার একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ বাইরিকি হল প্রশাসনিক কেন্দ্র।
এই কিরিবাসের সর্বোচ্চ স্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র একাশি মিটার উঁচুতে বানাবা আইল্যান্ড নামক প্রবালদ্বীপে অবস্থিত। আর এই দেশের গড় উচ্চতা হল ২ মিটার। এই কারণেই দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফখন্ড, হিমবাহ এবং গ্রীনল্যাণ্ডকে ঢেকে রাখা বরফের চাদর গলে যাচ্ছে, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। এই কারণেই প্রতি বছরের কিছু নির্দিষ্ট মাসে কিরিবাসে প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়, যা রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি প্লাবিত করে। সমুদ্রের লোনা জলে কৃষিজমি অবধারিতভাবে নষ্ট হয়ে যায়। সমগ্র দেশটিতে কোনও উঁচু পাহাড় বা টিলা নেই, যেখানে মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। গত কুড়ি বছরে কিরিবাসের অনেকগুলি দ্বীপ আংশিক বা সামগ্রিকভাবে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে।
এই দেশের আরও বড় সংকট হল খাদ্য ও পানীয় জলের সমস্যা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরও তীব্র হচ্ছে। প্রতিবছর তীব্র জলোচ্ছ্বাসের ফলে লোনা জল মাটি লবণাক্ত করে। ফলস্বরূপ কৃষির ক্ষতি। আর পানীয় জলের জন্য এখানে বৃষ্টির জলের উপরই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে জলের সমস্যা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই দেশের এক লক্ষ দশ হাজার মানুষ জানেন তাঁদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। তাঁরা জানেন তাঁরা হবেন বিশ্বের প্রথম জলবায়ু উদ্বাস্তু। তাঁদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রীতিনীতি সবকিছুই এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কিরিবাসের সরকার এই বিপদ মোকাবিলায় কিছু ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাঁরা ফিজিতে ছ’হাজার একর জমি কিনেছেন, যেখানে কিরিবাসের অধিবাসীরা নতুন ঘর বাঁধবেন। কিন্তু এটা তো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অন্যান্য অনেক দেশকেও তাঁরা আশ্রয়ের জন্য আবেদন জানিয়েছেন, যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড। কিন্তু এই উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি। উন্নত দেশগুলি এখনও দ্বিধাগ্রস্ত। আবার কিছু দেশ আশ্রয়ের আবেদনে সাড়া দিয়েছে, যার অন্যতম হল ফিজি দ্বীপপুঞ্জ।
ফিজি দ্বীপপুঞ্জ থেকে দশ ঘন্টার বিমান যাত্রার মাধ্যমে কিরিবাসে পৌঁছনো যায়। সেটিই কিরিবাসের নিকটতম বিমানবন্দর। এই বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে কিরিবাসে যাতায়াতের কোনও সহজ রাস্তা নেই। আশেপাশে অন্য কোনো দেশ বা শহর নেই। অদ্ভুত এই দেশের পরিকাঠামোর ব্যবস্থাও স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের অনুকূল নয়। এই দেশে একটি মাত্র বিমানবন্দর, একটি মাত্র শপিং মল এবং একটি মাত্র বড় রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সেটাও চিনা রেস্টুরেন্ট। কিরিবাস সরকার এই দেশে পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য একমাত্র চিনের কাছ থেকে সাড়া পেলেও ব্যাপারটি নানা বিতর্কের মধ্যে আর অগ্রসর হয় নি।
এটি এমন একটি দেশ যেটি আমাদের দেশগুলির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সূর্য এখানে সর্বপ্রথম আলো ছড়িয়ে দেয়। চারপাশে শুধু নীল সাগরের জল। যে দেশে নতুন বছরের সূচনা সব দেশের আগে হয়। কারণ আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার সবচেয়ে নিকটে কিরিবাসের অবস্থিতি। এই রেখাটি পৃথিবীকে দুটি ভিন্ন দিন হিসাবে ভাগ করে। ১৯৯৫ সালের আগে পর্যন্ত কিরিবাসের এক অংশ ছিল একদিনে, অন্য অংশ ছিল পরের দিনে। ফলে ভীষণ বিভ্রান্তি ঘটছিল। এক প্রান্তের মানুষ অন্যপ্রান্তে ছুটির দিন বেড়াতে গিয়ে দেখল সেখানে সেদিন কাজের দিন, সকলে ব্যস্ত। এই বিভ্রান্তি দূর করতে এবং স্থানীয় সময় নির্ধারণ সহজ করার জন্য ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য এই দ্বীপরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাটি স্থানান্তর করার আবেদন করে ও সেটি গৃহীত হয়। কিরিবাস তার পূর্বতম দ্বীপপুঞ্জগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১৮০-ডিগ্রি মেরিডিয়ান জুড়ে পূর্বদিকে রেখাটি স্থানান্তর করেছিল।

কিরিবাসের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সরল ও সাদাসিধে। এঁরা প্রধানত মাছ ধরা, মাছ সংরক্ষণ ও সম্পর্কিত কাজে নিযুক্ত থাকেন। কিছু মানুষ কৃষির উপরেও নির্ভরশীল। এছাড়া নারকোল ও অন্যান্য সামুদ্রিক উদ্ভিদের উপর নির্ভর করে কিছু মানুষের জীবন চলে। এঁদের সংস্কৃতি অনেকটাই নৌকাকেন্দ্রিক। পালতোলা নৌকা প্রতিযোগিতা ও নাচগান এঁদের বিনোদন ও সংস্কৃতি। এঁরা ধর্মে প্রধানত রোমান ক্যাথলিক।
কমপক্ষে দুহাজার বছর ধরে এই দ্বীপপুঞ্জে মানুষের বসবাসের ইতিহাস পাওয়া যায়। সলোমন বা ভানুয়াতু থেকে আগত অষ্ট্রোনেশীয় জনগণ এখানে বসবাস শুরু করে। সাতশো বছর পূর্বে পলিনেশীয় ও মেলানেশীয় হানাদাররা এখানকার অষ্ট্রোনেশীয় আদিবাসীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। ইউরোপীয় নাবিকরা ১৭ শতকে এই দ্বীপপুঞ্জে পা রাখে। তারপরেই এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশরূপে শাসিত হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। বর্তমানে অষ্ট্রোনেশীয় আদিবাসীরাই এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
চতুর্দিকে নীল জলরাশির মধ্যে ভেসে থাকা স্বর্গের সৌন্দর্য নিয়ে কিরিবাসের পানীয় জলের সমস্যা ভাবায়। জল এঁদের জীবিকা আবার এই জলই একদিন সম্ভবত এঁদের পায়ের তলার মাটিটুকু কেড়ে নেবে। এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা ও অন্যান্য পরিকাঠামো দুর্বল বলে গড়ে উঠতে পারে না। এই দেশের শিশুরা এখনও খালি পায়ে স্কুলে যায়। জলবায়ুর পরিবর্তন তো মানুষের হাত ধরেই আজ এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। যদি মানুষ এই পরিবর্তন আটকানোর চেষ্টা না করে তবে অচিরেই এই শিশুদের অন্য কোনও দেশে আশ্রয় নিতে হবে। পেতে হবে উদ্বাস্তুর তকমা। শুধু এই ভাসমান দেশই নয় আরও অনেক সমুদ্রতীরবর্তী দেশ ও জনপদ ধীরে ধীরে এই তালিকায় যুক্ত হবে, যার মধ্যে আমাদের সুন্দরবনও রয়েছে।
পৃথিবীর জলবায়ু উদ্বাস্তুর ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। এমনকি সিন্ধু সভ্যতা ধবংসের অন্যতম প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এই সভ্যতার মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে বিভিন্ন দিকে চলে গিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে। সুতরাং ‘তারা (কিরিবাসের অধিবাসী) হবে পৃথিবীর প্রথম জলবায়ু উদ্বাস্তু ‘ কথাটি ঠিক না।