বড় জমায়েত দেখে অভ্যস্ত বঙ্গবাসী। এখানে নির্বাচন বা কোনো আন্দোলন উপলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হামেশাই হয়। কিন্তু উত্তর ভারতে তেমনটা রাজনীতির চলন নয়। সেখানেও বিশাল জনসমাগম হয়, সেটা ধর্মীয় সমাগম, যেমন কুম্ভ মেলা। রাজনীতির কোলাহল অনেক সময়েই নিবদ্ধ থাকে জাত-পাতের জটিল সমীকরণে। এবার বোধহয় সে খণ্ডচেতনা ভাঙছে, অন্তত ৫ সেপ্টেম্বর মুজফ্ফরনগরের সমাবেশ তো তা-ই বলছে। ৫ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা সহ লাগোয়া রাজ্যগুলো থেকে লক্ষ লক্ষ কৃষক সমবেত হয়ে ঘোষণা করেছে, বিজেপিকে হারাও। ডাক দেওয়া হয়েছে ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বন্ধের।

মোদি সরকারের পাশ করা তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্ঘোষ শুরু হয়েছে আজ কয়েক মাস হয়ে গেল। কোন পরিপ্রেক্ষিতে, কেন এই আন্দোলন? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক গত বছর চারেকের ঘটনাক্রম —

কৃষি ও কৃষক বিরোধী তিন আইন
১) ফার্মার্স প্রোডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রোমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) অ্যাক্ট – এতদিন কৃষকরা তাদের পণ্য এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি বা এপিএমসি বা চলতি কথায় কৃষক মান্ডিতে বিক্রি করতেন। এ দেশে অনেক কৃষিপণ্যেরই সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দাম রয়েছে. প্রতি বছর সরকার এই মূল্য কিছুটা বাড়ায় বা একই রাখে। নতুন আইনের ফলে এই গোটা ব্যবস্থটা ভেঙে পড়বে, কারণ, কৃষিপণ্য যে-কোনো জায়গায় বিক্রি করার ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হলো। মান্ডির বাইরে কৃষিপণ্যের লেনদেন চালু হবার পরে কয়েক বছরের মধ্যেই মান্ডিগুলি আস্তে আস্তে উঠে যাবে, সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দামও থাকবে না। তখন বড়বড় কর্পোরেটদের হাতের পুতুলে পরিণত হবেন কৃষকরা, কর্পোরেট যে দাম দেবে, তাতেই বিক্রি করতে হবে কৃষিপণ্য। তাছাড়া মান্ডির বাইরে কৃষিপণ্যের কেনাবেচায় কোনো কর বা ফি নিতে পারবে না রাজ্যগুলি, ফলে কর্পোরেটগুলির এই ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোনো বাধা থাকবে না। নানা সূত্রে মনে করা হচ্ছে, মোদি-অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ গুটিকয় পুঁজিপতির দিকে তাকিয়েই এই নয়া বেসরকারিকরণের রথ চালাতে চাইছে কেন্দ্র। তাই এই আইনের বিরোধিতা করে কৃষকরা বলছে, মান্ডি, ন্যূনতম মূল্য ব্যবস্থা ইত্যাদিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

২) ফার্মার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অন প্রাইস অ্যাসিওরেন্স অ্যন্ড ফার্ম সার্ভিসেস অ্যাক্ট — এই আইনবলে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ব্যাপক ভাবে শুরু হবে। কন্ট্রাক্ট ফার্মিং হলো সেই ব্যবস্থা, যেখানে ফসল বোনার আগেই তার দাম নিয়ে কৃষক ও কর্পোরেটের মধ্যে চুক্তি হয়ে যায়। ফসল ওঠার পরে বাজারে তার দাম যা-ই হোক না কেন, চুক্তি স্থির হওয়া দামই পাবেন কৃষক। কয়েক বছরের মধ্যেই চাষি সম্পূর্ণ ভাবে কর্পোরেটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, তখন কর্পোরেটের ইচ্ছাতেই কী চাষ হবে, কত দাম পাওয়া যাবে, সবই নির্ধারিত হবে।
৩) এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট — এ দেশে বেশ কয়েকটি পণ্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বা এসেনশিয়াল কমোডিটি হিসেবে গণ্য করা হতো। এই আইন আসার ফলে সে ব্যবস্থা উঠে যাবে। খাদ্য সহ সব কৃষিপণ্যই বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কেবলমাত্র যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা ছাড়া সরকার এই পণ্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না।

সারা দেশের কৃষকরা এই জনবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। সরকার বারবার নানা ছলে আন্দোলন ভেঙে দেবার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। এই অবস্থায় উত্তর প্রদেশের মুজফ্ফরনগরে কৃষক মহাপঞ্চায়েত ডাকা হয়েছিল। সে রাজ্যের যোগী সরকার সমাবেশ ব্যর্থ করতে ধারাবাহিক চেষ্টা করেও বিফল হয়, কয়েক লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটে। এই সমাবেশ থেকে ডাক দেওয়া হয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বন্ধ। উত্তরপ্রদেশ সহ সর্বত্র বিজেপিকে নির্বাচনে পরাজিত করার ডাকও দিয়েছে কৃষক মহাপঞ্চায়েত। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি (বিজেপি প্রভাবিত বিএমএস বাদে) ভারত-বন্ধকে সমর্থন করেছে। কিছুদিন আগেই কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমর্থন করছে কংগ্রেস সহ অনেক বিরোধী দল। এবার লড়াই সরাসরি — ভারত বন্ধ বনাম কেন্দ্রীয় সরকার। এই কৃষক-শ্রমিক ভারত বন্ধ দেশে নয়া ইতিহাস গড়বে।