টাটকা সবজি যতই খাওয়া যায় শরীরের পক্ষে ততই লাভজনক। বাজার বা মল, সবজি যেখান থেকেই আসুক না কেন, তা দশ হাত ঘুরে আসে অর্থাৎ প্যাকেজিং প্রসেসিং এই বিষয়গুলো জড়িত থাকে। ফলে সবজি পুষ্টিমূল্য অনেক কমে যায়। এছাড়া বাজারে সবজিতে ক্ষতিকারক কীটনাশক ও অন্যান্য সার প্রয়োগ করা হয়, ফলে এই ধরনের সবজি নিয়মিত সেবন স্বাস্থ্যের পক্ষেও ক্ষতিকর।
যদি বাড়ির সবজি বাগান থেকে সবজি আসে, সে সবজির স্বাদ, পুষ্টি এবং আনন্দই আলাদা। কিন্তু সবজি ফলানোর জায়গা কোথায়?
কথায় বলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। অতএব মনে ইচ্ছা থাকলে হাতের তালুর মত জায়গাতেও লাগানো যায় টমেটো, লেবু গাছ। প্রত্যেকের ঘরের সামনে একটুকরো ছোট্ট বারান্দা, জানালার কার্নিশ, ছাদ বা বাড়ির সামনে একফালি জায়গা থাকে, সেখানেই বানিয়ে ফেলুন কিচেন গার্ডেন।
কিচেন গার্ডেন তৈরি করতে গেলে সেই স্থানে পর্যাপ্ত পরিমাণ রোদ (দিনে অন্তত ৬ঘন্টা) আসা জরুরী। এছাড়াও জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ঠিকঠাক রাখতে হবে। কিচেন গার্ডেনের টবে মাটি ও সারের সঠিক অনুপাত জরুরী। টব নির্বাচনে মাটির টব সর্বদা এগিয়ে কিন্তু এখন অনেকেই চিনামাটির বা প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করেন। চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি টবে ধনেপাতা, পুদিনা পাতা, টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, লেবু লাগানো যায়। কম জায়গা থাকলে একটি বড় ধরনের পাত্রে বেগুন, বিন, টমেটো, পেঁয়াজ, গাজর গাছ একসঙ্গে লাগাতে পারেন। বড়ো ছোট বা মাঝারি টবে— মিষ্টি কুমড়ো, কলমি শাক, লাউ, পুঁইশাক, পেঁপে, পুদিনা, ধনেপাতা, লেটুস, ব্রকলি, টমেটো, শসা, ফলানো যেতে পারে। এছাড়া ফলাতে পারেন নিত্য প্রয়োজনীয় সবজি —

ধনেপাতা (coriander leaf): নিত্যদিনের খাবারে স্বাদ বাড়াতে ধনেপাতার জুড়ি মেলা ভার। শুধু স্বাদবর্ধকই নয়, প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ (বিটা ক্যারোটিন) ভিটামিন-সি রয়েছে এতে। অ্যাংজাইটি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে এন্টিফাঙ্গাল ও এন্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ রয়েছে যা বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের সাহায্য করে।
সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে ধনেপাতার বীজ লাগানোর আদর্শ সময়। তবে সারা বছরই ধনেপাতার বীজ রোপণ করতে পারেন। দোকান বা কোন নার্সারী থেকে কিনে এনে দু-দিন জলে ভিজিয়ে রাখুন সেই বীজ মাটিতে ফেললে তাড়াতাড়ি চারাগাছ গজিয়ে ওঠে। ছোট ছোট অনেকগুলো টবেতে কোকোপিট আর গার্ডেন্স সয়েল ভিজিয়ে তারপর বীজ ছড়িয়ে দিন। উপরে অল্প অল্প করে গার্ডেনসন ছড়িয়ে দিন মাসে দুবার জৈব সার দেবেন। এভাবে খুব তাড়াতাড়ি ধনেপাতা তৈরি হয়। কাঁচি দিয়ে কেটে নিন প্রয়োজন মত, আবার বড় হয়ে যাবে এই গাছ। ধনেপাতা গাছে প্রচুর পিঁপড়ে হয়, তাই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরী।

স্টিভিয়া (stevia): তরকারিতে বা চায়ে চিনি দিয়ে খেতে কার না ভালো লাগে কিন্তু সুগার কোলেস্টেরল হাইপ্রেসার ইত্যাদির ভয়ে চিনির লোভ সংবরণ করতে হয়। WHO-এর মতে প্রতিদিনের ক্যালোরি চাহিদার মাত্র ৫ শতাংশ চিনি ব্যবহার করা উচিত। সেই কারণেই স্টিভিয়া ব্যবহার এখন বেড়েছে। স্টিভিয়া যেহেতু এটি প্রাকৃতিক মিষ্টি তাই শরীরের পক্ষে যথেষ্ট নিরাপদ। স্টিভিয়ার চিনির থেকে প্রায় ১০০ গুণ বেশি মিষ্টি এবং এতে ক্যালরি নেই বললেই চলে। রক্তে শর্করা পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে দাঁতের ক্ষয় রোধে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সুগার বা হার্টের সমস্যা থাকলেও খেতে পারেন স্টিভিয়া।
সারা বছরে এই গাছ ভালো হয়। মাটির গভীর টবে চারা এনে পুঁততে পারেন। রোদে টব রাখতে হবে। জৈব সার আর গার্ডেন সয়েল সমপরিমাণ মিশিয়ে চারা গাছ লাগান। ২৫ থেকে ৩০ দিন পর পাতা সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল হলেই কেটে ফেলতে হবে কারণ ফুল হওয়ার পরে এই গাছ আর বাঁচে না। কাঁচি বা হাত দিয়ে কেটে ব্যবহার করুন এর পাতা।

পার্সলে (parsley): রান্নার স্বাদ বাড়াতে বিশেষভাবে সাহায্য করে পার্সলে। অ্যান্টিসেপটিক উপাদান থাকায় পেটের অসুখ ইউরেনারি ট্রাক ইনফেকশন কমাতে এবং হার্ট ভালো রাখতে সাহায্য করে। পার্সলে ফলানোর জন্য বিশেষ জায়গা দরকার পড়ে না, রান্নাঘরেও ফলাতে পারেন এটি। বীজ বপনের আগে এক দুই ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। যারা বাগানে পার্সলের চাষ করবেন, পার্সলে বীজের ফাঁকে মূলার বীজ লাগান। পার্সলে ফুটে ওঠার আগেই মূলা অঙ্কুরিত হবে।

লঙ্কা (chillies): নিয়মিত রান্নায় ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ লঙ্কা ব্যবহারে ত্বক ইমিউনিটি সিস্টেম হার্ট ভালো রাখে। চাষের জন্য মাঝারি সাইজের মাটি বা প্লাস্টিকের টবে নিচে একটা ছোটো ছিদ্র করতে হবে। টবের নিচের অংশে প্রথমে স্টোন চিপস এবং তারপর অল্প বালি দিয়ে ঢেকে মাটি দিতে হবে। এতে জল বেরিয়ে যাবে না আবার জল জমেও থাকবে না। আলো হাওয়া আসে এমন জায়গায় টবটি রাখবেন।

পুঁইশাক (Indian Spinach): টবে বা মাটিতে গাছের গোড়া পুঁতে দিলে বিনা পরিশ্রমে বেড়ে ওঠে। এই শাকের পুষ্টিমূল্য অনেক। ভিটামিন-সি, -এ, আয়রন, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি পাওয়া তো যায়ই, হার্ট ভালো রাখতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে যথেষ্ট সহায়ক। গাছটির ডাটা, পাতা, পুঁই মেটুলি ইত্যাদি বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে।

লাউ ও কুমড়ো শাক (Lau & Kumra Shak): বাড়িতে লাউ, কুমড়ো, চাল কুমড়া চাষ করা খুব সহজ। কুমড়ো পাতা বা শাক থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় যা হাড় ভালো রাখে। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজের উৎস লাউপাতা। এই ধরনের শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার। মজার ব্যাপার হলো লাউয়ের তুলনায় বেশি পরিমাণে উপকারী উপাদানগুলি পাওয়া যায় লাউ শাকে। লাউ কুমড়োর ডাটা ফুল উপাদেয় খাদ্য সামগ্রী। বিভিন্ন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ, ডায়েটারিফাইবার, প্রচুর পরিমাণে জলযুক্ত একটি সহজপাচ্য সবজি হলো লাউ। শরীর ঠান্ডা রাখতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে যথেষ্ট উপকারী।

লাউ, কুমড়ো ছাড়াও মেথি, নটে, পালং, হেলেঞ্চা, বেতো ইত্যাদি বিভিন্ন উপকারী শাক অনায়াসে তৈরি করে নিতে পারেন আমাদের এক টুকরো শখের বারান্দায়। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্সের ভান্ডার পেতে পারি হাতের মুঠোয়।

পাতিলেবু: ভিটামিন-সি এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস পাতিলেবু। বারান্দার টবে গাছ লাগিয়ে সেখান থেকে সহজেই পাওয়া যায়।এই গাছ খুব বড় হয় না এবং সহজে পরিচর্যা করা যায়।

মাইক্রো গ্রিন (microgreens): মাইক্রোগ্রিন আসলে একটি সাধারণ গাছের খুদে প্রতিরূপ। বাঁধাকপি ফুলকপি মূলো লেটুস গাজর আদা রসুন পালং শাক শসা, কিছু দানাশস্য যেমন — গম, বার্লি, ডালের মাইক্রোগ্রিন টবে বসানো যায়।
বৃক্ষরোপণ ও তার পরিচর্যা শুধুমাত্র মানুষকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে তা নয়, মনের দিক থেকেও ভালো রাখতে সাহায্য করে সবুজ গাছগাছালি। মনের স্ট্রেস, ক্লান্তি অনেক কিছুই দূর হয় সবুজের সংস্পর্শে। হঠাৎ করে কোন সবজি প্রয়োজন হলে ঘরের সবজি বাগান থেকে টুকরো কলা মুলোটা তুলে আনাও ভীষণ আনন্দদায়ক। ইট কাঠ বালি কংক্রিটের দুনিয়ায় এক টুকরো সবুজের ছোঁয়া পেতে ঝুল বারান্দায় তৈরি করে ফেলুন কিচেন গার্ডেন।