ট্রেনের নাম মৎস্যগন্ধা শুনেই পুলক, সঙ্গে প্রথমবার একলা ভ্রমণের রোমাঞ্চ। যদিও এই সময়টাতে দাঁড়িয়ে মেয়েদের সোলো ট্রিপ এমন কিছু পাহাড় ডিঙোনো কাজ নয়। কিন্তু জীবনের প্রথম প্রেম, প্রথম উপার্জনের মত এও লাল কালিতে লিখে রাখা একেবারেই নিজস্ব অনন্য এক অনুভূতি।
সেই একলা চলোর নান্দীমুখে মৎস্যগন্ধা চলতে লাগল শেষ বিকেলের আলো নিয়ে। কোঙ্কন উপত্যকার যে বনপথ ধরে সে এগোল, সেখানে এখনই বসন্তের সংকেত। পলাশের ডালে আগুন লেগেছে। পাতাঝরা গাছে শিমূলকলিরা ফোটার অপেক্ষায়। তারপর অসংখ্য গুহাপথ আর আরব সাগরের মৎস্য উপকূল ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার ছুটে যাওয়া। মুম্বাইয়ের লোকমান্য তিলক স্টেশন থেকে দক্ষিণপশ্চিম কর্ণাটকের উদিপীতে পৌঁছতে মৎস্যগন্ধার সময় লাগল প্রায় পনেরো ঘন্টা। উদিপীতে পা রাখলাম ভোর সাড়ে ছ-টার অন্ধকারে। আকাশে নবমী তিথির বাঁকা চাঁদ তখনো ঝুলে আছে।
মৎস্যগন্ধা নামটা মহাভারতের রাণী সত্যবতীকে মনে করাবেই। উদিপীর ভান্ডারেও রয়েছে মহাভারতের সঙ্গে জুড়ে থাকা নানা রঙের গল্প। উদিপীর রাজা নাকি কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে চান নি। তাঁর পরিবর্তে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ সেনাদের খাবার সরবরাহ করার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর। সেখানে রাজার এতটুকু ভুলচুক হতনা। অপচয় ছিলনা। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্রশংসা আর আশীর্বাদধন্য উদিপীর ক্যাটারিঙের তাই এখনো বড় নামডাক দক্ষিণভারতে! প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত উদিপীর মঠে প্রসাদ গ্রহণ করে ধন্য হন।
উদিপীর মঠে মহাভারতের সেই পান্ডবসখা বালগোপাল হয়ে বিরাজ করেন। মধ্যযুগে ভক্তিবাদের অন্যতম প্রাণপুরুষ জগৎগুরু মাধবাচার্য প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীকৃষ্ণমঠ। সেই শিশুগোপালের প্রতি সন্ধ্যেয় বাজনা বাজিয়ে, আলো জ্বালিয়ে, রথে চড়ে অন্ততঃ মন্দিরপ্রাঙ্গনটুকুও একটুও ঘুরে না এলে মেজাজ বিগড়ে যায়। তিনিই আবার অস্পৃশ্য কনকদাসের ভক্তিতে বিগলিত হয়ে তার দর্শনের জন্যে খিড়কিজানলা কাটিয়ে দেন।
এই কৃষ্ণমঠকে ঘিরেই কত উৎসব, গল্প, লোককথা, সংগীত আর যক্ষগণের মত অভিনয়-নাচ-গানের এক অনন্য শৈলীর জন্ম।

যক্ষগণের কথা জানতে আমি ছুটে গেছিলাম তাদের ইস্কুলে। তাদের প্রদর্শন দেখতে আমি পৌঁছেছিলাম তাল-সুপুরি-নারকেল ঘেরা, জোনাকির আলো জ্বলা এক গ্রামে। সারারাত সেখানে চলবে সেই থিয়েটার। ছোট্ট মঞ্চের মাথায় চাঁদোয়া, সেখানে গায়ক তার দুই যন্ত্রীদের সাহায্যে গণপতি বন্দনা দিয়ে নাটক শুরু করলেন। সেদিন ছিল রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনী। রংবেরঙের জমকালো পোশাক, জমজমাট অভিনয়, নাচ এবং সর্বোপরি সুরেলা গানে সেদিন ভাষা কোনো অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। তাই বোধহয় গ্রামের লোক ছাড়াও সেখানে দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন দেশী-বিদেশী বেশ কিছু মানুষ। এ বোধহয় শুধুই কৌতুহল নয়। ভারতবর্ষের অন্তরাত্মাকে উপলব্ধি করতে আমাদের বারবার ফিরে ফিরে যেতে হয় সেই মাটির প্রাঙ্গনে।
সেই উৎসবমুখর প্রাঙ্গন থেকে প্রকৃতির কাছে যাবার ছিল। শ্রীক্ষেত্র পুরীর মতই উদিপীর মন্দির আর সমুদ্র মানুষের আগ্রহের কারণ। উদিপীর পাথুরে কাপুবীচের বাতিঘর নাবিকদের পথ দেখায়। মালপের সাদা বালির বিস্তৃত সৈকতে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করে শৈশবের খুশিতে চঞ্চল হয় মানুষ।

মালপেই পথ দেখায় সেন্ট মেরী দ্বীপের। এই নির্জনদ্বীপেই নাকি ভাস্কো ডা গামার প্রথম পদক্ষেপ। মা মেরীর নামে তিনি এই নীলসবুজ জল, কালো পাথর আর নারকেল বনে ঘেরা সুন্দর দ্বীপটি উৎসর্গ করেছিলেন। এর পরের গল্পে রয়েছে পর্তুগীজ এই নাবিকটির কেরালার কালিকট বন্দরে পৌঁছনো।
অন্যদিকে সেন্ট মেরী দ্বীপের কালো পাথরের কাহিনী আরো অনেক অনেক পুরোনো। কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভূমিকম্পের লাভা থেকে এই চারটি দ্বীপের জন্ম। তার চিহ্ন রয়ে গেছে ইতস্ততঃ ছড়ানো ছ-কোণা আগ্নেয় শিলায়। সমুদ্রের ঢেউ, নোনা হাওয়া এসে সেখানে অনবরত আঘাত করছে। বদলে যাচ্ছে তার আকার। রাতে জোয়ার এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে বালুতট। বর্ষায় জলের তলায় ডুবে যাচ্ছে গোটা দ্বীপভূমি। শুধু নারকেলগাছেরা মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে, না না যায়নি এখনো। সব আছে। আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে ডুবো পাহাড়। আবার জেগে উঠবে রূপোলী বালুচর। তোমরা আবার এসো পৃথিবীর সন্তান! স্পর্শ করো, জেনে নাও তোমাদের প্রাচীন ইতিহাস।

এই ইতিহাসের খোঁজেই আবার যাওয়া কোল্লুরের মুকাম্বিকার প্রাচীন মন্দির। পথে কখনো সবুজ পাহাড়ের হাতছানি, সুপুরি-নারকেল-তাল-কাজুগাছের ছায়া, ব্যাক ওয়াটারের সবুজ জল, রূপোলী সমুদ্র সৈকত, নদীর সর্পিল গতি।
সৌপর্ণিকা নদীর তীরে, পাহাড়ের নীচে দেবীর মন্দিরে পৌঁছতে বেশ খানিকটা বনপথ পেরোতে হয়। মুকাসুরকে বধ করেই তিনি মুকাম্বিকা। কোন ত্রেতা অথবা দ্বাপর যুগে পরশুরাম প্রতিষ্ঠা করেছেন এই মন্দির। প্যাগোডার মত দেখতে মুকাম্বিকা দেবীর কাঠের কারুকাজ করা মন্দিরে পুজো দিচ্ছেন রঙিন, সাদা ধুতি (মুন্ডু) আর উত্তরীয় পরা পুরুষ। মেয়েরা সজ্জিত রং বেরঙের লাঙ্গা দাওনী (হাফ শাড়ি)-তে। প্রায় প্রত্যেকের চুলে ফুলের বেণী। দক্ষিণী মেয়েদের চুলের সুস্বাস্থ্যের কারণ সম্ভবতঃ ফুলের নির্যাস আর খাঁটি নারকেল তেল। ফুলের কোনো বাছবিচার নেই। সুপুরির ফুলও মেয়েদের মাথায়, পুজোর ডালিতে। গোটা সুপুরি দিয়ে মন্দির সাজানো হয়েছে। সুপুরি গাছের পাতা দিয়ে তৈরি হয়েছে মাথার টুপি। সুপুরি গাছের এত বহুল ব্যবহার এর আগে আমার কখনো চোখে পড়েনি।

মুরুদেশ্বরে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য তার শেষ রঙটুকু ছড়িয়ে দিচ্ছে সমুদ্রের জলে। জেলেরা মাছধরা জালের বাঁধন দেখে নিচ্ছে। নৌকা জলে ভাসাবার আগে শেষমুহুর্তের ব্যস্ততা। অপরিচ্ছন্ন, আঁশটে গন্ধের ঝোপড়িগুলোতে এক এক করে টিমটিমে আলো জ্বলে উঠল। প্রায়ান্ধকার জেলে বস্তির উল্টোদিকে ঝলমলে পথ, দোকান, সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসা অগণিত হাসিমুখ। কংক্রিটের বিশাল মন্দিরে, শিবের দীর্ঘ মূর্তিতে রঙবাহারি আলোর খেলা। দূরে,অন্ধকার সমুদ্রের ঢেউয়েও নেচে উঠছে জেলে নৌকার লাল-সবুজ-হলুদ নিশানা বাতিগুলি।
মুরুদেশ্বর আমাকে বিশেষ আকর্ষণ করেনি। মনে হল পাহাড়-সমুদ্র-নারকেলবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আড়াল করেছে নতুন গড়ে ওঠা এই মন্দির আর মূর্তি। মন চাইল না সেখানে থাকতে। সকাল সকাল মুরুদেশ্বর ছেড়ে যাবার আগে আরেকবার গেলাম জেলে নৌকার মাঝখানে। সেখানে তখন জাল থেকে মাছ ছাড়াচ্ছে মেছুনী। রঙিন শাড়ি, গয়না আর মাথার ফুলে তারা রাতজাগা জেলেদের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষনীয়, স্বাস্থ্যবতী। বঁটির ধার তাদের তেজস্বিনী করে তুলেছে।

পরের গন্তব্য গোকর্ণ। পথে পড়ল মিরজান দুর্গ। ল্যাটেরাইট পাথরের লাল দুর্গের গায়ে লেখা আছে এটির গৌরবের নানা কথা। নৌবাণিজ্যে এটি ছিল একসময়ের অনন্য ঘাঁটি। বিজয়নগর, বাহমনী, বিজাপুরের সুলতান, পর্তুগীজ, হায়দর আলি, টিপু সুলতানের পর এটি শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের কব্জায় এসেছিল।

দুর্গের এই লাল পাথুরে মাটিই ছড়িয়ে আছে গোকর্ণের পথেঘাটে। তার রাঙাধুলোয় রয়ে গেছে অনেক পৌরাণিক, লৌকিক গল্পগাথা। গোকর্ণে আছেন মহাবালেশ্বর শিব। সেই মন্দিরের চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে আরো কতশত মন্দির, এক আশ্চর্য জগত। সেখানে আদিবাসী মহিলারা চামেলীর মালা বিক্রি করেন। নক্সাকাটা কাঠের দোতলা বাড়ি দেখে মনে হয়, একটু ভেতরে ঢুকে দেখি। কত জানা অজানা মশলা নিয়ে বেসাতি করে দোকানদার। ট্যাটু করে বিদেশীরা। বাসনের দোকান, পূজার সামগ্রী সব যেন চেনা হয়েও একটু অন্যরকম।
মন্দির ছাড়িয়ে অন্যত্র গোকর্ণ সেজে থাকে সবুজ বনানীতে। শান্ত, নিরিবিলি ওঁ বিচ বা প্যারাডাইস বিচে মনে হয় আরেকটু সময় কাটাই। সমুদ্রের নীল জল, সবুজ বনভূমি, পাথুরে বা বালির তটে যেন এক নির্ভার জীবনের অদ্ভুত প্রশান্তি বাস করে।

পটে আঁকা ছবির মত সুন্দর চালচিত্রে অঘননাশিনী নদীর মোহনায় নুন তৈরি করে সনিকাট্টা গ্রামের মানুষ। আমরা আরো এগিয়ে যাই। জঙ্গলের পথে, পায়ে হেঁটে ইয়ানায় খুঁজে পাই অবাক করা পাহাড়, তার গুহা। আমার পাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলে পাহাড়ি ঝর্ণা। ঘন বনের ফাঁকে নাম না জানা পাখিরা গান গেয়ে যায়। হলদে-সবুজ-সাদা-নীল প্রজাপতিরা আমার পায়ে পায়ে নেচে বেড়ায়। মুগ্ধ, অভিভূত, সৌন্দর্যপিয়াসী এক মন বেঁচে থাকার রসদ নিয়ে এবার ফিরতি পথে পা বাড়ায়।