কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও আকাশবাণী কলকাতার সাহিত্য বিভাগের প্রযোজক কবিতা সিংহের আজ জন্মদিন। ১৯৩১-এর ১৬ই অক্টোবর কলকাতার ভবানীপুরে তাঁর জন্ম। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বটানি নিয়ে বিজ্ঞানের স্নাতক হবার পরে আবারো বাংলায় অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। ছোটবেলা থেকেই ছবি এঁকেছেন, ধ্রুপদী নৃত্যের অনুশীলন করেছেন। জীবনসঙ্গী করেছিলেন কবি ও গল্পকার বিমল রায়চৌধুরীকে। বিয়ের পরেও সিংহ পদবি ব্যবহার করে আধুনিকতা ও সাহসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন।
আকাশবাণী কলকাতাতে কর্মজীবনের অনেকগুলো বছর আমি কবিতাদির সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁর মনটি ছিল সরল ও বিশ্বাসী শিল্পীর মন। আমাকে কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন। আকাশবাণীতে কবিতা সিংহের কর্মজীবন শুরু গত শতকের ছয়ের দশকের মাঝামাঝি। সাহিত্য বিভাগের সহযোগী প্রযোজক পদে তিনি যোগ দেন। তারপর ১৯৭০-এর আগষ্টে যুববাণীর নতুন চ্যানেল শুরু হলে তিনি প্রযোজকের পদের জন্যে প্রার্থী হন এবং প্রযোজক পদের দায়িত্ব পান।
যুববাণীতে থাকাকালীন অনেক তরুণ প্রতিভাকে এনেছেন এবং তাঁদের প্রশিক্ষিত করেছেন। অনেক তরুণ কবি, আবৃত্তিকার, তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী কালে যুববাণী থেকে তিনি আবার সাহিত্য বিভাগে প্রযোজকের দায়িত্বে ফিরে আসেন। সেই সময়ের পর ৮-র দশকের শেষ দিকে প্রমোশন পেয়ে দ্বারভাঙা বেতার কেন্দ্রের অধিকর্তা নিযুক্ত হন। কিন্তু বেশি দিন ওখানে তাঁর শিল্পী মন টেকেনি। অবসরের বয়স হবার আগেই স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন।

কিন্তু আকাশবাণী কলকাতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকতো। কবিতাপাঠ ও কথিকা বলতেন মাঝেমধ্যেই। তাঁর সময়ে সাহিত্য বিভাগে নানা বৈচিত্র্য এনেছিলেন। অভিজ্ঞান, শ্রবণী বেতার পত্রিকা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বাংলা কথিকা বিভাগে
কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক অধ্যাপক শিল্পীরা নিয়মিত আসতেন। মনে হতো চাঁদের হাট। তাঁদের নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি।
‘আমার জীবন আমার সময়’ এই শিরোনামে কবি সাহিত্যিকদের আত্মকথনের সিরিজ করেছিলেন। ‘আজকের অতিথি’ শিরোনামে বিভিন্ন শিল্পীর সাক্ষাৎকার প্রচার করেছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনেক শিল্পী এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এইসব রেকর্ডিংয়ের স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। কখনো স্টুডিওর ভেতরে শিল্পীর সামনে থাকতাম আমি আর কবিতাদি রেকর্ডিং করছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ডিং করছেন, আমি দেখছি খালি গলায় তিনি একের পর গান গাইছেন, কথাবলছেন — কিন্ত দুই ঠোঁটের মাঝে অল্প একটু ফাঁক। এই অভিজ্ঞতা ভোলা যায় না। কাট হলে কবিতাদি স্টুডিওতে এসে বলে যেতেন। আবার রেকর্ডিং শুরু হতো।
কবিতা সিংহের গল্পকবিতা উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশটি। তাঁর মধ্যে কয়েকটি হলো — ‘সহজ সুন্দরী’, ‘কবিতা পরমেশ্বরী’, ‘মেয়ে মানুষের গল্প’, ‘চারজন রাগী যুবতী’, ‘বিমল হাওয়ার হাত ধরে’। কয়েকটি ইংরেজি ও হিন্দিতে অনূদিত হয়েছে। ‘একটি খারাপ মেয়ের গল্প’, ‘সেই উত্তম নায়ক’ হিন্দিতে, বৃহন্নলাদের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘পৌরুষ’ ইংরেজিতে ‘দ্য থার্ড সেক্স’ নামে অনূদিত হয়েছে।
১৯৮৪-তে প্রকাশিত ‘কবিতা সিংহের শ্রেষ্ঠ গল্প’ আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। এছাড়াও দিয়েছিলেন রহস্য উপন্যাস ‘রাত্রি ছিল পিশাচের’ যেটি টানটান রহস্যের আকর্ষণে একদিনেই পড়ে ফেলি। সাংবাদিক কবিতা সিংহ ‘আনন্দলোক’-এ মহানায়ক উত্তমকুমারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। কলকাতায় মঞ্চ নাটকের জন্যে ও আকাশবাণীর জন্যে গান-ও লিখেছেন। ১৯৮২-তে এশিয়াড উপলক্ষ্যে নারায়ণ সান্যালের লেখা বিশেষ বেতার আলেখ্য “লা জবাব” প্রযোজনা করেছিলেন যার আবহসুর রচনা করেছিলেন অলোকনাথ দে। আমি সহায়তা করেছিলাম।

১৯৮৫-র ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলন কভার করতে কবিতাদির সঙ্গে আমি বাংলাদেশ গিয়েছিলাম — সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। তিন দিনের ট্যুরের ফাঁকে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের বাসভবন, ভাষা আন্দোলনের শহিদ স্মৃতি ও বুড়িগঙ্গা দেখেছিলাম খুব সংক্ষিপ্ত অবসরে। তাঁর লেখা নাটকের সংলাপে তাঁর মেধা, মনন ও জীবন যন্ত্রণার শৈল্পিক প্রকাশ নানা চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা কাব্যনাটক ‘পৃথিবীর পুরোনো গল্প’ বেতারের জন্যে নতুন করে লিখে দেন যেটি আমার প্রযোজনায় প্রচারিত হয় ১৮.৮.১৯৯৪-এ। এই নাটকটি আমি ও আমার ছাত্রী রীণা বসু বহুবার মঞ্চে পাঠাভিনয় করেছি। নয়ের দশকের শেষে ব্যারাকপুরের সুকান্ত সদনে কবিতাদি এই পাঠাভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ‘পৃথিবীর পুরোনো গল্প’ একজন পুরুষ (অশোক) ও একজন নারীর ( দীপা) জীবন যন্ত্রণার গল্প যার শেষ হয় এক মহত্তম উপলব্ধিতে। দুটি নির্বাচিত সংলাপ —
॥ অশোক ॥
তাঁর চেয়ে সামনে তাকান!
দেখুন কি ভয়ঙ্কর অথচ সুন্দর!
সমস্ত আকাশ জুড়ে কমলা আগুন
পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় আগুনের চুল্লি জ্বেলে
রক্তারক্তি অগ্নিপিণ্ড অথচ এখন
সান্ধ্য ধিকিধিকি — সোনালী কমলা লাল
হেলিওট্রোপের
অদ্ভুত মহিমা দেখে কে বলবে সূর্যের ভিতর
পুড়ে যাচ্ছে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম মৌল পরমাণু।
॥ দীপা ॥
আমি সব বুঝি !
কিংবা হয়তো বুঝি না সব তবুও বলতে চাই—
এইটুকু বুঝি। হয়তো একটি রমণী বলেই বুঝে নিই
অন্ততঃ সংকেতে প্রতীকে
ঢেলে দিন হৃদয়ের ভার
কবিতা সিংহ বিদেশ সফরে ১৯৭৯-তে পূর্ব জার্মানি গিয়েছিলেন বেতার সম্প্রচারের উন্নততর ট্রেনিংয়ে। ১৯৮১-তে যান আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক কর্মশালার আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। ১৯৮৬-তে পশ্চিম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট বই মেলার ভারত উৎসবেও তিনি যোগ দেন। এছাড়া বহুবার আমেরিকার বোষ্টনে গেছেন ছোট মেয়ে পরমেশ্বরীর কাছে। সেখানেই ১৯৯৮-এর ১৭ই অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন। কবিতাদির জন্মদিনে তাঁর উদ্দেশে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।