| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম (দ্বিতীয় পর্ব) : হরিশংকর জলদাস

Reporter
হরিশংকর জলদাস / ৩০১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৪

তিন

অদ্বৈত মল্লবর্মণের অমর সৃষ্টি তিতাস একটি নদীর নাম। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে আরো তিনটি উপন্যাস লিখলেও তিতাস একটি নদীর নাম তাঁকে অমরত্ব দেয়। উল্লেখ্য, অদ্বৈতের চারটি গল্প আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, কোনো গল্পই জেলেজীবনকেন্দ্রিক নয়। তিতাস একটি নদীর নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে রচিত, কিন্তু এতে যুদ্ধ অনুপস্থিত। তবে যুদ্ধের চেয়েও মারাত্মক খাদ্যসংগ্রামে জর্জরিত কৈবর্ত-মানুষদের অখন্ডনীয় ভাগ্যের লিখন এতে বিম্বিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় বন্দি, বঞ্চিত ও বিড়ম্বিত মালোসমাজের চিত্র এই উপন্যাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মেঘনার শাখা তিতাসের তীরবর্তী ধীবর সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, দুর্জ্ঞেয় প্রকৃতি ও মানব চরিত্রের অন্তর্নিহিত উপলব্ধি উদ্ঘাটিত হয়েছে এখানে।

তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের কাহিনি চার খন্ডে বিধৃত। প্রতি খন্ডে দুটি করে পর্ব। ধনুকের মতো বাঁকা তিতাসের তীর ঘেঁষে মালো সম্প্রদায় বাস করে। তাদের নিরীহ-নির্বিরোধ জীবনযাপন। অন্ত্যজ কৈবর্ত-সমাজের জীবনসংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ইতিহাস ধারণ করে আছে তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি। কৈবর্ত-সমাজের অবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও প্রতিরোধের কাহিনি নিঃশব্দ স্রোতের মতো উপন্যাসের পরতে-পরতে প্রবহমান।

মালো সম্প্রদায়ের অবহেলিত নরনারীরাই উপন্যাসের কুশীলব। কিশোর, বাসন্তী এবং অনন্ত এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র। কিন্তু সুবল, রামকেশব, কালোর মা, উদয়তারা, অনন্তের মা, মোহন, বনমালী কিংবা কাদির মিয়াও এই কাহিনির সমৃদ্ধি সাধন করেছে। উপন্যাসের শেষ দুটো পর্বে দেখা যায়, মালোদের জন্ম-জন্মান্তরের আশ্রয় তিতাস নদী শুকিয়ে আসে, তার বুকজুড়ে জেগে ওঠে চর। তিতাসপাড়ে নেমে আসে দুঃখের ছায়া। শোষিত জেলে ও কৃষাণের ক্ষয়িষ্ণু জীবনকাহিনি ঔপন্যাসিক বাস্তবনিষ্ঠভাবে উপন্যাসের পরিণতি পর্যন্ত বিস্তৃত করেছেন।

কৈবর্তদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুমকির সম্মুখীন হয় – নদী ও বাজারকে ঘিরে এই জাতীয় ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক জীবনবেদ গ্রন্থন করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। পদ্মানদীর মাঝির মতো তিতাস একটি নদীর নামেও অধিকাংশ জেলের নিজের জাল নেই, নেই মূলধন। জমিদার মেজকর্তা অনন্ত তালুকদার, মুহুরি শীতল ঘোষ, আড়তদার লোকনাথ কিংবা মাগন সরকার, দোলগোবিন্দ – সবাইকে নিয়ে কৈবর্ত শোষণের চেনাজানা বৃত্ত। তবে পদ্মানদীর মাঝিতে ঔপন্যাসিকের অনবধানে অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও সংঘর্ষের দিকটি উপেক্ষিত হলেও তিতাস একটি নদীর নামে অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কৈবর্ত-সমাজের সংঘবদ্ধ হওয়ার চিত্র আছে। আনন্দবাজারে মাছ বিক্রির ওপর জমিদার আনন্দবাবুর লোক নতুন খাজনা আরোপ করে। এতে মোড়ল রামপ্রসাদ গর্জে ওঠে — ‘শুন বেপারী, বাবুকে সাফ কথা কইয়া দিও, মালোরা মাছ বেচতে কোনো সময় মাসুল দেয় নাই, দিবেও না।’

তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের প্রথম দিকে ধীবরদের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিপূর্ণতার কথা আছে। কিন্তু উপন্যাসের শেষ দিকে শুকনো তিতাসের বিপ্রতীপে কৈবর্তজীবনে নেমে এসেছে সামাজিক-অর্থনৈতিক পতন। তিতাসের জেলেরা জীবিকার প্রয়োজনে তিতাস ছাড়িয়ে মেঘনায় মাছ ধরতে গেছে, আবার ফিরেও এসেছে। সমুদ্রে যেতে হয়নি তাদের। এক্ষেত্রে অদ্বৈত মল্লবর্মণ অপূর্ব দক্ষতায় কৈবর্তদের জীবনযাত্রার বহির্ঘটনা চিত্রণের পাশাপাশি তাদের মুখের ভাষা, অন্তরের স্বপ্নময় চিন্তা, আবেগের স্পন্দন, গোষ্ঠীজীবনের সমস্ত প্রদোষান্ধকার, স্পষ্টতা-অস্পষ্টতা ও রহস্যঘন দীপ্তি উদ্ঘাটন করেছেন।

দারিদ্রে্য দীর্ণ, হতশ্রী এক কৈবর্ত-পরিবারে অদ্বৈতের জন্ম। ফলে কৈবর্তজীবনের গতিপ্রকৃতি, সংগ্রামশীলতা, অস্তিত্বের সংকটের কথা তাঁর ভালো করে জানা। কৈবর্ত-সম্প্রদায়ের নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা, মৎস্যজীবিতার ঐশ্বর্য-অঘটন, সামাজিকতা এবং এর পাশাপাশি কৃষিজীবীদের অবস্থান, তাদের ঔদার্য-কুটিলতা আর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে মালোদের সংস্পর্শ-সংঘাত — এ সবকিছু অদ্বৈত বিশ্বস্তভাবে তাঁর উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন। এখানে অদ্বৈত কৈবর্তজীবনের লবণাক্ত রূপের গাথা রচনা করেছেন।

পদ্মানদীর মাঝির কুবের-গণেশের জালনৌকা ছিল না। ধনঞ্জয়ের মতো শোষকের জালনৌকা নিয়ে জীবনসংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছে তাদের। তিতাসেও গগন-সুবলের নিজের জালনৌকা নেই। ফলে দারিদ্র্য আর শোষণের মুখোমুখি তাদেরও হতে হয়েছে। কৈবর্ত-সমাজের ভেতরই বোধাই-কালোবরণদের সঙ্গে সুবল-গগন-তিলক-গৌরাঙ্গদের শ্রেণিপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজবিকাশের ধারায় কৈবর্তরা একটা বিশেষস্তরে স্থিত, কিন্তু সেখানেও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের চিত্র স্পষ্ট।

‘জাউল্যার পোলা’ হয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ জেলেজীবনকে খুলেমেলে ধরছেন এ-উপন্যাসে। তিনি ভেতর থেকে জেলেজীবনকে, তাদের অস্তিত্বের সংগ্রামকে অবলোকন করেছেন। ফলে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে নিম্নবর্গীয় কৈবর্ত-জনজীবনের সংগ্রামশীল নান্দনিক উপন্যাস।

চার

এবার সত্যেন সেনের (১৯০৭-৮১) বিদ্রোহী কৈবর্তের কথায় আসা যাক। তাঁর সাহিত্যজীবন স্বল্পকালীন। তাঁর বাষট্টি বছর বয়সে বিদ্রোহী কৈবর্ত বের হয়। বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত। বিদ্রোহী কৈবর্ত উপন্যাসে বিধৃত সময় – পাল যুগ, স্থান – গৌড় ও বরেন্দ্রী, চরিত্র – পালরাজা ও শক্তিশালী অমাত্যরা, দলিত কৈবর্ত-সমাজ এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়, পটভূমি – পালরাজা মহীপালের সঙ্গে কৈবর্ত-সামন্ত দিব্যোকের রাজনৈতিক সংঘাত। ফলশ্রুতি – মহীপালের পতন ও কৈবর্ত-সমাজ কর্তৃক গৌড় দখল। এ-ই হলো বিদ্রোহী কৈবর্তের সাদামাটা বিবরণ। কিন্তু এই উপন্যাসের ভেতরে অনুরণিত হচ্ছে শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্ব, অত্যাচারিত কৈবর্ত-সমাজের হাহাকার ধ্বনি। এই উপন্যাসের একদিকে প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে কৈবর্ত-জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তরঞ্জিত চিত্র। কৈবর্ত-সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথাও বিদ্রোহী কৈবর্তে স্থান পেয়েছে। বঞ্চিত হতে হতে, লুণ্ঠিত হতে হতে কৈবর্তরা একসময় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। এবং সেই অস্ত্রের আঘাতে আঘাতে গৌড়ের আকাশছোঁয়া রাজপ্রাসাদ ভূমিতে লুটিয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় মহীপালের সময় বরেন্দ্রীর ভূস্বামীরা বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন কৈবর্ত-ভূস্বামী দিব্যোক। কৈবর্তদের দুটো ভাগ। হালিক ও জালিক কৈবর্ত। দিব্যোক হালিক কৈবর্ত। অদ্বৈত জালিকদের নিয়ে আর সত্যেন সেন হালিকদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। বিদ্রোহী কৈবর্তে উপস্থাপিত জেলেজীবন জল ও জলশস্যনির্ভর নয়। এই উপন্যাসের কৈবর্তজীবন দারিদ্র্যলাঞ্ছিত নয়, রাজপ্রতিনিধি দ্বারা নিষ্পেষিত। এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই হাল ফেলে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল কৈবর্তরা এবং জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।

উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে পালরাজাদের সঙ্গে কৈবর্তদের অসন্তোষের সূচনা। কৈবর্তরা মনে করত, বরেন্দ্রী তাদের একান্ত নিজস্বভূমি। এই ভূমিতে ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধদের কখনো স্বাগত জানায়নি তারা। কৈবর্তদের প্রতি গৌড়ের রাজণ্যবর্গের মনোভাব ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। মহাপ্রতীহার কীর্তিবর্মা কৈবর্ত-সমাজ প্রসঙ্গে বলেন –

ছোটলোক (কৈবর্ত) গুলোকে সবসময় শাসনের উপর রাখতে হয়। কখনও প্রশ্রয় দিতে নাই। একটু প্রশ্রয় দিয়েছেন কি মাথায় উঠে বসবে।

বহিরাগতরা ছলে-কৌশলে কৈবর্তদের ভূমি অধিকার নিয়েছে। পদ্মনাভের কথায় চিত্রটি স্পষ্ট।

কৈবর্তরা এমনিতে শান্তিপ্রিয় নিরীহ সম্প্রদায়। ওরা মিথ্যে বলতে জানে না। কিন্তু সময়বিশেষে ওরা বাঘ আর সাপের মতোই দুর্দান্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে। গৌড়ের সম্রাটদের বিরুদ্ধে এরা দীর্ঘকাল সংগ্রাম চালিয়েছে। এ-সংগ্রামের পশ্চাতে ছিল ওদের সংঘশক্তি। বরাহস্বামী, যে মনেপ্রাণে কৈবর্তদের ঘৃণা করে, তার মুখে এ-কথার সত্যতা মেলে। উপন্যাসের পঞ্চম অধ্যায়ে কৈবর্ত-চরিত্রধর্ম বাস্তবসম্মতভাবে অঙ্কন করেছেন সত্যেন সেন। এখানে বলা হয়েছে, পূর্বে চুরি বা ডাকাতি কাকে বলে কৈবর্তরা জানত না। চোর আর ডাকাত – এ দুটো শব্দ শিখেছে গৌড়ের লোকদের মুখ হতে। মহাভারতের কাল থেকে ‘দাশবংশে’র মেয়েদের রূপযৌবন ব্রাহ্মণ ও অন্য বর্ণহিন্দুদের জৈবিক ক্ষুধার সামগ্রী হয়েছে। এই অপমানের ইতিহাস লেখা আছে বিদ্রোহী কৈবর্তে। নারীর অপমান বুকে নিয়ে ভূমিহারা কৈবর্তরা একদিন জেগে উঠেছে। জেগে-ওঠা কৈবর্তরা রাজধানী গৌড় অধিকার করেছে। এই আক্রমণের নেতা দিব্যোক। সক্রিয় যোদ্ধা পরভু। দিব্যোক যতটুকু রাজা, তার অধিক মানবিক মানুষ। গৌড়জয়ের প্রথম দিনেই নিজ সৈন্যদের আদেশ দিয়েছে –

মেয়েদের আর বাচ্চাদের গায়ে হাত দিতে পারবে না, কারো ঘরে আগুন দিতে পারবে না। যে এই নিষেধ মানবে না তার কঠিন শাস্তি হবে।

কৈবর্ত-জনগোষ্ঠীর ওপর নিবিড় আলো ফেলেছেন সত্যেন সেন বিদ্রোহী কৈবর্ত উপন্যাসে। তাদের অন্তর্চিত্র ও বহির্চিত্র সমান দক্ষতায় অঙ্কন করেছেন ঔপন্যাসিক। কৈবর্তদের সুরাপ্রিয়তার কথা, সুরা যে তাদের চৈতন্য লুণ্ঠন করেছে, তার কথা লিখতেও ভোলেননি কথাকার। উপন্যাসটি যেন কৈবর্ত-জনমানুষের রূপান্তরের ইতিহাস। নিরীহ, দরিদ্র, লাঞ্ছিত, সর্বহারা কৈবর্তদের শাসক-শ্রেণিতে রূপান্তরের ইতিহাস যেন বিদ্রোহী কৈবর্ত।

পাঁচ

বরিশাল জেলার দক্ষিণাংশ সমুদ্রঘেরা। দক্ষিণাঞ্চলে বাস করে সমুদ্রনির্ভর জনগোষ্ঠী। শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-৯৭) সমুদ্রতীরবর্তী জনজীবনের সুখ-বেদনাকে উপজীব্য করে সমুদ্র বাসর (১৯৮৬) উপন্যাসটি রচনা করেছেন। শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের জীবনাচরণকে এই উপন্যাসে অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে উপস্থাপন করেছেন ঔপন্যাসিক। উপন্যাসটি মূলত মুসলিম সমাজকেন্দ্রিক। কিন্তু এতে কৈবর্ত-সমাজের চিত্রও নিটোলভাবে অঙ্কিত হয়েছে। উপন্যাসটির শুরুই হয়েছে কামদেবপুরের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ দিয়ে।

কৈবর্তদের জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে জলে। মৎস্য শিকারই তাদের প্রধানতম পেশা। জেলেপাড়ার সখানাথ, রতিকান্ত, দেবনাথ প্রভৃতি কৈবর্ত এক অন্ধকার রাতে মাছ ধরতে গিয়ে নতুন জাগা একটি চরের সন্ধান পায়। নতুন স্থলভূমির সন্ধান পেয়ে তারা উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। কারণ তাদের আবাসভূমি নিতান্ত সংকীর্ণ। জেলেপাড়ার জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু জায়গা নয়। ফলে বাসযোগ্য ভূমি জেলেদের কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। নতুন চরের সন্ধান পেয়ে তারা এজন্য খুশি হয়েছে যে, তারাও এই স্থলভূমির মালিকানা পাবে। তাদের অস্তিত্বে যে-সংকট চলছে, তা একদিন কাটিয়ে উঠতে পারবে। মৎস্য শিকার অসম্পূর্ণ রেখে সখানাথ মুজফ্ফর মিঞার কাছারিতে উপস্থিত হয়। উদ্দেশ্য — নতুন জাগা চরের কথা মুজফ্ফর মিঞাকে জানানো। এই চরে নিজের প্রতিষ্ঠা কায়েমের জন্য মুজফ্ফর সচেষ্ট হয়ে ওঠে।

তারপর নানা সংঘর্ষ-সংঘাত, রাগ-অনুরাগ, প্রাপ্তি-হতাশার মধ্য দিয়ে সমুদ্র বাসরের বিকাশ ও পরিসমাপ্তি ঘটে। গোটা উপন্যাসটি মুসলিম সমাজকেন্দ্রিক হলেও স্বল্প-পরিসরে কৈবর্তদের বাঁচা-বাড়ার লড়াইয়ের ইঙ্গিত আছে। এই প্রান্তিক মানুষের জীবন যে লোকবিশ্বাসের আবরণে ঢাকা, তার উদাহরণ আছে উপন্যাসে। — ‘জীবন দেয় কেডা? মা ধরিত্রী আর এই গাঙ।’ – কৈবত সমাজ-বিশ্বাসের কথা এই উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। তাছাড়া কৈবর্ত-সমাজের ‘কুমীরব্রতে’র কথা সমুদ্র বাসরে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য প্রান্তিক সমাজের মানুষের মতো কৈবর্তরাও ভয়ংকর ও সর্বনাশা প্রকৃতির কাছে মাথানত করে। নিষ্ঠুর ও খল স্বভাবের দেবদেবীরাই কৈবর্তদের কাছে ভক্তি পেত বেশি। সময়ান্তরে দেবদেবীর পাশাপাশি মানবেতর প্রাণীরাও জেলেদের কাছে পূজ্য হয়ে ওঠে। ‘কুমীরব্রত’ উৎসবের মধ্যে উক্ত বক্তব্যের প্রমাণ মেলে।

শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসরে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা লিপিবদ্ধ। এই মানুষদের মধ্যে আছে মুসলিম আর কৈবর্ত। স্বল্পপরিসরে কৈবর্তজীবনকথা সমুদ্র বাসরে বিধৃত হলেও তা দ্যুতিময়। [ক্রমশ]

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev