| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম (শেষ পর্ব) : হরিশংকর জলদাস

Reporter
হরিশংকর জলদাস / ৮৭৮ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪

ছয়

শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসর প্রকাশের ২২ বছর পরেও জেলেজীবন নিয়ে তেমন কোনো উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি বাংলাদেশে। ২০০৮ সালে বর্তমান প্রবন্ধকারের লেখা উপন্যাস জলপুত্র প্রকাশিত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর ৫৭ বছর পর আরেক জেলের হাত দিয়ে কৈবর্তজীবননির্ভর উপন্যাস রচিত হলো জলপুত্র। জলপুত্রের পর দহনকাল (২০০৯) নামে বর্তমান লেখকের আরেকটি উপন্যাস বের হলো। জলপুত্র আর দহনকালের স্বাতন্ত্র্য এজন্য যে, দুটো উপন্যাসই সম্পূর্ণভাবে জেলেজীবননির্ভর এবং সমুদ্রপাড়ের জেলেদের নিয়ে রচিত। বাংলাসাহিত্যে সমুদ্রপাড়ের জেলেদের নিয়ে এই প্রথম দুটো উপন্যাস রচিত হয়েছে। জলপুত্র জলের কাহিনি হলে দহনকাল জল ও স্থলের কাহিনি। বর্তমান লেখক জলপুত্র উপন্যাসে কৈবর্ত-সম্প্রদায়ের অপ্রাপ্তির বেদনা, প্রাপ্তির উল্লাস, শোষণের হাহাকার, অশিক্ষার অন্ধকার – সবই বিশ্বস্ততার সঙ্গে অঙ্কন করার চেষ্টা করেছেন। এই উপন্যাসটি ভুবনেশ্বরী নামের একজন জেলেনারীর সংগ্রামশীল জীবনের ইতিহাস যেমন, তেমনি গঙ্গাপদ নামের একজন জলপুত্রের অধিকার সচেতন হয়ে ওঠার কাহিনিও বটে। জলপুত্র উপন্যাসে কৈবর্ত-সমাজ তার সকলপ্রকার সংগতি-অসংগতি নিয়ে উপস্থিত। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে চরিত্রগুলোর সংলাপ হিসেবে ব্যবহার করে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন লেখক। ভুবনেশ্বরী এ-উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও তার পুত্র গঙ্গাপদ শেষ পর্যন্ত কৈবর্ত-জনজীবন কাহিনিটির নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাদনদার শুক্কুর মিয়া ও শশিভূষণের বিরুদ্ধে উত্তর পতেঙ্গার জেলেপুত্রদের সে সংঘবদ্ধ করতে পেরেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গঙ্গাপদকে খুন করে এই দাদনদাররা। প্রতিবাদের কাহিনি, কৈবর্ত-জীবনসংগ্রামের কাহিনি এখানেই শেষ হয়ে যায় না। ভুবনেশ্বরীর মতো অন্য জেলেরা অপেক্ষা করে বনমালী নামের আরেক গঙ্গাপদের জন্য।

জেলে সম্প্রদায়ের দিবারাত্রির কাব্য নির্মাণ করতে গিয়ে বর্তমান প্রবন্ধকার দহনকাল লিখেছেন। এটি সমুদ্রসংগ্রামী জেলেদের জীবনালেখ্য। উল্লেখ্য, নদীপাড়ের জেলেরাও এই উপন্যাসে অবহেলিত হয়নি। দহনকালের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত জেলেসম্প্রদায়। আর আছে তাদের প্রতিবাদ প্রতিশোধের কাহিনি। মহান ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এই উপন্যাসের একটি বড় অংশজুড়ে আছে।

হরিদাস নামের এক জেলেসন্তান অশীতি বাবা রাধানাথের প্রেরণায় আলোর পথে হাঁটছে। তার পরিবারকে ঘিরে সমাজের পিছুটান, স্বার্থপরদের লোলুপতা, সুবিধাবাদীদের ওপর-চালাকি আবর্তিত হচ্ছে। নিকুঞ্জ সর্দার আব্দুল খালেকের সঙ্গে মিলেমিশে রাধানাথ তথা গোটা জেলেসমাজকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। চন্দ্রকলা নামের বিধবা কৈবর্তনারীটি শেষ পর্যন্ত এসব অনাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল থেকে গেছে।

হরিদাস, রাধানাথ, খু-উ বুইজ্যা, রাধেশ্যাম, চন্দ্রকলা, পরিমল, রসমোহন, শিবশরণ — এরা যেন কৈবর্ত-সমাজের এক-একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। এদের নিয়েই দহনকালের কাহিনি-বয়ন। দহনকাল উপন্যাসে দয়ালহরি বঞ্চনার শিকার হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে আর রামহরি নিজের জীবন দিয়ে জালাল মেম্বারের নৌকা ডুবিয়ে বঞ্চনার প্রতিশোধ নেয়। হরবাঁশি গানের ভেতর দিয়ে জগৎ ও জীবনকে অনুধাবন করতে চায়। সমুদ্রসংগ্রামী এবং নদীলগ্ন জেলেদের সঙ্গ-নৈঃসঙ্গ্য, মৃত্যু-জন্ম একাকার হয়ে আছে দহনকাল উপন্যাসে।

দহনকালের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর পতেঙ্গার কৈবর্তরা একাত্তরের পাদদেশে এসে উপস্থিত হয়। নির্জীব, নির্বাক, নিথর উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিটি পাকসেনাদের অত্যাচার-বর্বরতায় জেগে ওঠে। মা-বোন-স্ত্রীর ইজ্জত রক্ষা করার জন্য হরিদাস-রাধেশ্যাম-খু-উ বুইজ্যারা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। কৈবর্তদের জীবনে শুরু হয় আরেক দহনকাল।

১৯৭১-ই জন্ম কথাকার প্রশান্ত মৃধার। মৃত্যুর আগে মাটি, আপন সাকিন, ক্ষয় পুরাণ, নদীর তৃতীয় তীর — এসব উপন্যাস লিখে তিনি পাঠকপ্রিয়তা পান। কৈবর্তজীবন নিয়ে তাঁর জল ও জালের তরঙ্গ নামের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। এটি কৈবর্ত-জননির্ভর নদীভিত্তিক উপন্যাস। বলেশ্বর নদীর পাড়ে কৈবর্ত-জনপদ। সেই কৈবর্তপল্লিতে অনেক জেলের বাস। গণেশ তাদের একজন। সে জাল-নৌকাহীন। দারিদ্রে্যর নোনাজলে ডুবসাঁতারের জীবন তাঁর। দৈবক্রমে দুই বিয়ে তাঁর। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাঁশরীকে দ্বিতীয় স্ত্রী করে আনে গণেশ। গণেশের প্রথম স্ত্রীর ঘরে দুই সন্তান – গোকূল আর গৌরী। প্রথাগতভাবে বিমাতা বাঁশরী সতীন-সন্তানদের অবহেলা-অত্যাচার করে। পিতা গণেশ অসহায়। সন্তানদের প্রতি স্নেহ থাকলেও বউয়ের ভয়ে তা দেখাতে পারে না। এই সময় গণেশ নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। পঙ্গু হয়ে বাড়ি ফেরে সে। বিমাতার মধ্যে পরিবর্তন আসে। তার ভেতরের ক্রোধ ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়। সে সতীন-সন্তানদের কাছে টেনে নেয়। গোকূল সংসারের হাল ধরে। পিতার মতো মাছ ধরার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করল সে। পিতার মতো নিজেকে বলেশ্বর নদীর দুপাড়ের ঘেরাটোপে বন্দি রাখতে চায় না গোকূল। সে সমুদ্রসংগ্রামী হতে চায়। এ যেন গোকূলের ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের দিকে যাত্রার আকাঙ্ক্ষা। জল ও জালের তরঙ্গ পড়তে পড়তে সমরেশ বসুর গঙ্গা উপন্যাসের কথা মনে আসা স্বাভাবিক। গঙ্গা প্রকাশিত হওয়ার ৫৭ বছর পরে লেখা প্রশান্ত মৃধার জল ও জালের তরঙ্গ উপন্যাসটি। তারপরও আমাদের মনে হয় পুরনো কাহিনির আড়ালে প্রশান্ত মৃধার এ-উপন্যাসে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রামের কথা নতুন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। গণেশের আর গোকূলের, গৌরীর আর বাঁশরীর ব্যক্তিকাহিনির সঙ্গে সঙ্গে গোটা জেলেপল্লির কৈবর্তদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কাহিনিও এ-উপন্যাসে বড় জায়গা নিয়ে আছে।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী (১৯৬০) মূলত কবি। হঠাৎ হঠাৎ লেখেন উপন্যাস। ২০১৪-তে বেরিয়েছে নার্গিস, নজরুল-স্ত্রীকে নিয়ে লেখা। ২০১৫-তে বেরিয়েছে বাসন্তী তোমার পুরুষ কোথায়? — একজন কৈবর্তনারীর একক জীবনসংগ্রামের কাহিনি। কৈবর্তনারীটির নাম নিভারানী ওরফে নাজমা বেগম ওরফে বাসন্তী। বস্ত্রবালিকা ছিল সে। গার্মেন্টসে চাকরি করতে করতে নিজামউদ্দিনের প্রেমে পড়া। নাম পালটে, নিভারানী নাজমা বেগম হয়ে নিজামকে বিয়ে করে। সমাজে নিন্দার ঝড় ওঠে। ভ্রূক্ষেপ করে না নাজমা। মাছ ধরতে গিয়ে নিজাম জলদস্যুদের কবলে পড়ে। পঙ্গু হয়ে বাড়ি ফেরে। তারপরও প্রেমে ভাটা পড়ে না নাজমার। সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে কাপ-ডিশ ধুয়ে দিনে গার্মেন্টসে চাকরি করে জীবন চালাচ্ছিল নাজমা। এ-সময় মনোহরখালীর জেলেপাড়ায় ‘নিষ্ঠা’ নামের একটা এনজিও আসে। এর কর্ণধার হায়দার সাহেব। হায়দার সাহেবের নজর পড়ে নিভা তথা নাজমার ওপর। বলে — ভেতরে আগুন আছে মেয়েটার। জেলেসংস্কৃতি নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতে চায় ‘নিষ্ঠা’ নামের এনজিওটি। বংশী জলদাস প্রতিবাদ করে। বলে, ‘পেডত ভাত থাইলে তোঁয়ারারে ন লাগিব। আঁরার নাটক আরা গইয্যম। পেট খালি রাই নাটক অইব না বা-জি!’

কৈবর্ত-জীবনসংগ্রামের মূল সূত্রটি যেন বংশীর সংলাপে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। জলদাসদের কাছে ‘অন্ন চিন্তা চমৎকারা।’ পেটে ভাত না থাকলে নাটক আর সংস্কৃতি দিয়ে কী হবে? তারপরও নাটক হয়, কৈবর্ত-বিধবার হাহাকার নিয়ে নাটক। ওই নাটকে নিভারানী মানে নাজমা বেগম বাসন্তী চরিত্রে অভিনয় করে। সেই থেকে তার পরিচয় বাসন্তী নামে। হায়দার আলী পনেরো হাজার টাকা বেতনের চাকরির টোপ ফেলে বাসন্তীর সামনে। বাসন্তী টোপ গেলে। নাটক মঞ্চায়নের কথা বলে হায়দার আলী বাসন্তীকে নিউইয়র্ক নিয়ে যেতে চায়। বাসন্তীর পিছুটান প্রবল – সে আমেরিকা গেলে তার স্বামী নিজামকে দেখবে কে?

হায়দার বলে, মাত্র বিশ-বাইশ দিনের ব্যাপার। এই সুযোগ বারবার আসে না। বাসন্তী রাজি হয়ে যায়। তারপর নিউইয়র্ক, তারপর হায়দারের ভোগের সামগ্রী হওয়া। ফিরে এলে এই কৈবর্তকন্যার জেলেপাড়ায় আর স্থান হলো না। বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হলো পতিতাপল্লিতে।

অসহায় কৈবর্তনারী, যে-মাটিতে পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল, যে অল্পতে তুষ্ট ছিল, এক নিজামে তৃপ্ত ছিল, সেই নিভারানী জীবনযুদ্ধে হেরে গেল। হেরে গেল প্রলোভনের কাছে। হেরে গেল এনজিওর উর্দিপরা তথাকথিত ভদ্দরনোকদের রিরংসার কাছে। এক দুর্মর বেদনায় চুরমার হয়ে যাওয়া বাসন্তী নামের কৈবর্তনারীটির হাহাকার বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়? নামের উপন্যাসটিতে ধ্বনিত হয়েছে।

বাংলাদেশের আরেক তরুণ ঔপন্যাসিক মহি মুহাম্মদ (১৯৭৪)। এর মধ্যে তাঁর তিনটি উপন্যাস বেরিয়েছে। আড়াইপাতা (২০১২), ময়নাদ্বীপ (২০১৪) ও মেনকা (২০১৫)। চা-বাগানেই জন্ম তাঁর, বেড়ে ওঠাও ওখানে। বালকবেলা থেকে প্রান্তিক দলিত মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা তাঁর। তাঁর গল্প-উপন্যাসে প্রান্তজনরা বারবার ফিরে ফিরে আসে। চা-বাগানের কুলি-কামিন, মেছো, দেহোপজীবিনীদের নিয়েই তাঁর লেখালেখি। একদা চা-বাগানের মানুষজন থেকে মহি মুহাম্মদ দৃষ্টি ফেরালেন নদী-সমুদ্রপাড়ের জেলেদের দিকে। পদ্মানদীর মাঝির শেষাংশ থেকেই তাঁর ময়নাদ্বীপ উপন্যাসের সূচনা করেছেন তিনি। সাধারণত পদ্মানদীর মাঝির মতো ক্ল্যাসিক উপন্যাসগুলোর শেষাংশ নিয়ে অনেকে নতুন উপন্যাস লিখেছেন। এ-ধরনের উপন্যাসকে পরিণতিখন্ডও বলা যেতে পারে। পদ্মানদীর মাঝির পরিণতিখন্ড ময়নাদ্বীপ। মানিকের উপন্যাসটি শেষ হয় কপিলাকে নিয়ে কুবেরের ময়নাদ্বীপে অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে।

হোসেন মিয়ার স্বপ্নবুননের ময়নাদ্বীপকে নিয়ে মহি মুহাম্মদ জেলেজীবনের নতুন পাঁচালি লিখেছেন। কুবের ছিল নদীনির্ভর কৈবর্ত। জল-জাল-মালা-সন্তানাদি নিয়ে ছিল কুবেরের দিনাতিপাত। কিন্তু ময়নাদ্বীপের কুবেরের অবস্থা যেন জলবিচ্ছিন্ন মাছের মতো। হোসেন মিয়া তাকে ময়নাদ্বীপে নিয়ে গিয়ে মৎস্য শিকারের সঙ্গে যুক্ত করেনি। চাষিতে রূপান্তরিত করতে চেয়েছে। তাই হোসেন মিয়া কুবেরকে মাঠলগ্ন করেছে। হোসেনের কৌশলে কুবের জালিক কৈবর্ত থেকে হালিক কৈবর্তে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানেই ময়নাদ্বীপের স্বাতন্ত্র্য। মৎস্য শিকারবিযুক্ত হওয়ার কারণে কুবেরের যে অন্তর্দাহ, তারই বিশ্বস্ত রূপায়ণ লক্ষ করা যায় ময়নাদ্বীপে। মালাবিহীন সন্তানবিচ্ছিন্ন কুবেরের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কাহিনি মহি মুহাম্মদের ময়নাদ্বীপ উপন্যাসটি। একটা ক্ল্যাসিক উপন্যাসের অনুবর্তনমূলক কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও ময়নাদ্বীপ কৈবর্ত-জীবনসংগ্রামের উল্লেখনীয় গ্রন্থ।

কথাসাহিত্য মানে শুধু উপন্যাস নয়, ছোটগল্পও। বাংলাদেশে কৈবর্তজীবন নিয়ে তেমন করে ছোটগল্প লেখা হয়নি। শওকত আলীর দু-একটা গল্পে, আল মাহমুদের ‘কালো নৌকা’ নামের গল্পে, মহি মুহাম্মদের ‘বীজ’ নামের গল্পে কৈবর্তজীবনের দু-একটা অনুষঙ্গ উদ্ভাসিত হয়েছে। আল মাহমুদের ‘কালো নৌকা’ ক্ল্যাসিক পর্যায়ের ছোটগল্প। তাছাড়া বর্তমান প্রবন্ধকারের জলদাসীর গল্প নামে একটি গল্পগ্রন্থ এবং ‘আহব ইদানীং’ নামের অন্য একটি গল্প আছে। জলদাসীর গল্পে দশজন জেলেনারীর জীবনকাহিনি বিধৃত হয়েছে। নানা দিক থেকে আলো ফেলে দশজন কৈবর্তনারীর টিকে থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে এসব গল্পে। একজন পঙ্গু কৈবর্ত-মুক্তিযোদ্ধার বেদনার্ত কাহিনি ‘আহব ইদানীং’। স্বাধীনতাবিরোধীদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে কী নিবিড় কষ্ট নেমে আসে, তারই বিবরণ আছে এই গল্পে।

সাত

এ-কথা স্বীকার্য, কৈবর্তজীবন নিয়ে, তাদের বেদনা উল্লাস আর অতীত-বর্তমান নিয়ে যেরকম বিপুলভাবে গল্প-উপন্যাস লিখিত হওয়ার কথা, সে-রকম করে লেখা হচ্ছে না বাংলাদেশে। যদিও দু-চারটা উপন্যাস লেখা হচ্ছে, তাতেও তথাকথিত সমালোচকদের প্রশ্নের খোঁচায় রক্তাক্ত হতে হয়। পদ্মানদীর মাঝি বা তিতাস একটি নদীর নাম বা গঙ্গার পরে জেলেদের নিয়ে আর কোনো উপন্যাস লেখার দরকার আছে কিনা? এরকম প্রশ্ন বারবার উত্থাপিত হচ্ছে। আমার মনে হয়, এরকম প্রশ্ন অবান্তর। একটা বিষয় নিয়ে একাধিক, দশাধিক উপন্যাস লেখা কি অপরাধের? তাতে কি উপন্যাস বা উপজীব্য বিষয়বৈচিত্র্য হারায়? তাতো নয়। একজন মানুষের জীবনে কত বৈচিত্র্য, একটা গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে কত স্তর-উপস্তর? কত রাজনীতি, সমাজনীতি, কত অর্থনীতি, কত ধর্মনীতি!

জেলেদের নিয়ে আজ পর্যন্ত যত উপন্যাস লেখা হয়েছে, তাতে তেমন করে রাজনীতি উপস্থাপিত হয়নি। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গহিন গাঙ আর ঘনশ্যাম চৌধুরীর অবগাহন উপন্যাসের কথা স্মরণে রেখেও এ-কথা বলা যায়। কৈবর্তরা ধীরে ধীরে শিক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষিতজনের মধ্যে অধিকার সচেতনতা ও যুক্তিবাদিতা বাড়ে। কৈবর্তরা এখনো পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়। অশিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার, বর্ণবাদীদের সঙ্গে বর্ণহীনদের যে দ্বন্দ্ব, দলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কৈবর্তদের অধিকার আদায়ের যে সংগ্রাম — এসবকে অবলম্বন করে এখনো উপন্যাস লেখা হয়নি বাংলাদেশে। তবে আশার কথা এই যে, কৈবর্ত-জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে কথাসাহিত্য রচনা একেবারে থেমে থাকেনি। দু-চারজন দরদি লেখক এখনো কৈবর্ত-জনগোষ্ঠী নিয়ে উপন্যাস-গল্প লিখে যাচ্ছেন। আশা করি, ভাটার নদীতে একদিন জোয়ার আসবে, কৈবর্তজীবন রূপায়ণের সমুদ্রস্রোতে বেগের প্রাবল্য বাড়বে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev