হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন —
কৈবর্ত অর্থ দাশ, ধীবর। যারা মৎস্য হিংসাকরে, তারা কৈবর্ত। (বঙ্গীয় শব্দকোষ, ১ম খন্ড)
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসও তাঁর বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে প্রায় একই কথা বলেছেন। রাজশেখর বসু চলন্তিকায় বলছেন —‘কৈবর্ত মানে হিন্দুজাতি বিশেষ। জেলে।’ কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন — ‘কৈবর্ত : যে জলে বাস করে, জলের সহিত বিশেষ সম্বন্ধযুক্ত হিন্দুজাতি বিশেষ।’ (ব্যবহারিক শব্দকোষ)
আবু ইসহাক সমকালীন বাংলাভাষার অভিধানে বলেছেন — ‘কৈবর্ত অর্থ জেলে, ধীবর, মেছো।’ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানেও আবু ইসহাকের মন্তব্যের সমর্থন মেলে।
ভারতকোষে আছে — ‘কে বৃত্তির্যেষাং ইতি কৈবর্ত।’ ‘কে’ শব্দের অর্থ জল। জলে যাদের জীবিকা, তারা কৈবর্ত।
কৈবর্ত জাতির উৎপত্তি বিষয়ে ঋষি মনুর ভাষ্য এরকম — ‘নিষাদ নৌকর্মজীবী মার্গব নামক সন্তান উপাদন করে। এদের আর্যাবর্তবাসীগণ কৈবর্ত নামে অভিহিত করেন।’ (দশম অধ্যায়, ৩৪নং শ্লোক)
শ্রেণিবৈষম্যের কারণে চতুর্বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে — ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য আর শূদ্র। শূদ্ররা ছিল পেশাজীবী। তারাই ছিল আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর মূল স্তম্ভ। এই শ্রমজীবী মানুষরাই বর্ণবাদীদের দ্বারা শূদ্র নামে অভিহিত হয়েছে।
শূদ্র পীড়নকারীরা শূদ্রদের দুই ভাগে ভাগ করেছে। সৎশূদ্র আর অসৎশূদ্র। ১৭টি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে অসৎশূদ্রের অন্তর্গত করেছে তারা। ‘কৈবর্ত’ এই সতেরোটি সম্প্রদায়ের একটি। বর্ণবিভাজনের জাঁতাকলে পড়ে কৈবর্তসম্প্রদায় একেবারে দলিত প্রান্তজনে পরিণত হয়েছে।
জীবনধারণের তাগিদে মানুষকে কোনো না কোনো কাজ অবলম্বন করতে হয়। মানুষের আর্থ-সামাজিক ইতিহাস মানে শ্রমজীবী তথা পেশাজীবী মানুষের ইতিহাস। জীবনের জন্যই জীবিকা। আর এই জীবিকা হিসেবে মানুষ গ্রহণ করেছে নানারকম পেশা। এর প্রাসঙ্গিক উদাহরণ মৎস্য শিকার, মাছ-ব্যবসা।
ভারতবর্ষীয় সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, সেটা মোটা দাগে দুভাগে বিভক্ত। এক. সেবাগ্রাহী, দুই. সেবাদাস। অমানবিক বর্ণবিভাজনের কারণে উৎপাদনশীলতার মূল ভিত্তিতে শ্রমের জোগান দেওয়া সত্ত্বেও কৈবর্তরা সেবাদাসের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাঙালির প্রধান যে দুটো খাদ্য – মাছ আর ভাত, তাদের একটি সরবরাহ করে আসছে এই কৈবর্তরা। তারপরও তারা অবহেলিত, কখনো কখনো তীব্রভাবে নিন্দিতও। কিন্তু এই কৈবর্তরা অবহেলার নয়। তাদের একটা প্রাচীন ইতিবৃত্ত আছে। এই দলিত সমাজ থেকেই একদা উঠে এসেছিলেন শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। প্রজ্ঞা আর মনস্বিতার অধিকারী ছিলেন তিনি। ব্যাসের প্রথম কৃতিত্ব – বেদ বিভাগ করেছিলেন তিনি। ব্যাসদেবের শ্রেষ্ঠকীর্তি মহাভারত। কৈবর্ত-কন্যাজাত ব্যাসদেব অষ্টাদশ পুরাণ ছাড়াও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা রচনাকরেছিলেন। একাদশ-দ্বাদশ শতকে বাংলাদেশে কৈবর্তদের বলা হতো ‘কেবট্ট’। কেবট্ট পপীপ-রচিত গঙ্গাস্তবের একটা পদ পাওয়া যায়। সদুক্তি কর্ণামৃত নামক কাব্যসংকলনে এটি সন্নিবেশিত।
কৈবর্ত-সমাজ একসময় উন্নত ছিল, সভ্য ছিল। বর্তমানের মতোসেসময়ও কৈবর্ত-সমাজে পণপ্রথা ছিল না, বিবাহবিচ্ছেদ ছিল না। বিধবাবিবাহ এই সমাজের একটা অনুমোদিত বিষয়। পাল আমলে দিব্যোক নামে এক কৈবর্ত-সামন্তরাজের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। দিব্যোকের পর রুদোক ও ভীম নামে আরো দুজন কৈবর্তরাজ বরেন্দ্রভূমি শাসন করেছিলেন।
এসব কিছুর পরও ভারতবর্ষীয় সমাজে কৈবর্তদের স্থান ছিল অত্যন্ত নিচুস্তরে। তাদের জীবনে হতাশা, জীবনাচরণে নানা সংকট আর ঘরের চৌকাঠ পেরোলেই অসম্মান। প্রথাদীর্ণবর্ণবৈষম্যের দম-বন্ধ করা পরিবেশে আর দারিদ্রে্যর জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হতে কৈবর্ত-সম্প্রদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তাদের স্থান ছিল না সমাজে, স্থানছিল না সাহিত্য-সংস্কৃতিতে।
দুই
১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের পর ক্ষমতার পালাবদল হলো। মুসলমান নবাবের হাত থেকে ক্ষমতা চলে এলো ইংরেজদের হাতে। ভূমিরাজস্বের নতুন ব্যবস্থা হলো। ফলে গ্রামসমাজ তীব্রভাবে আক্রান্ত হলো। অল্পদিনের মধ্যে ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষণের রূপ জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঠিক এই সময়েই মুষ্টিমেয় বাঙালি তরুণ পাশ্চাত্যচিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া শুরু করলেন। তাঁদের ভাবনায় পালাবদল হতে শুরু হলো। এলো উনিশ শতক। এই শতকের প্রথমার্ধ ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে চঞ্চল। উনিশ শতকের নবজিজ্ঞাসার সূচনায় ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচিত্র ঘটনাবলি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে যে-ছাপ ফেলল, তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠল বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের উপন্যাস সাহিত্য।
বাংলা উপন্যাসের সূচনালগ্নে কাহিনির কেন্দ্রভাগে ছিল জমিদার, সামন্ত আর ধনীরা। এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কৈবর্তের মতো ব্রাত্যজনেরা উপন্যাসের কেন্দ্রভূমিতে প্রথমবারের মতো এসে দাঁড়ায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-৫৬) মাধ্যমে। তারাশঙ্করের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা ও নাগিনীকন্যার কাহিনীর আগেই মানিকের পদ্মানদীর মাঝিতে (১৯৩৬) প্রান্তিকায়িত জনগোষ্ঠীর উদ্বোধন হয়েছে।
সাহিত্যে প্রান্তবর্গীয়-জীবনের সন্ধান – আধুনিকতার এক বিশেষ লক্ষণ। দেশি-বিদেশি বহু সাহিত্যিকের অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে দলিত-প্রান্তজনদের জীবন। এই প্রান্তবর্গীয়দের উল্লেখনীয় জনগোষ্ঠী হলো কৈবর্ত তথা জেলে।
জেলেদের নিয়ে পাশ্চাত্যের স্মরণীয় উপন্যাসগুলো হলো – আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি (১৯৫২), ভিলিস লাৎসিসের সান অফ ফিশারম্যান (১৯৩৪), স্টিফেন গুয়ইনের ডাফার লক – অ্যা ফিশারম্যানস্ অ্যাডভেঞ্চার (১৯২৪), নরমান হিলের অ্যা ফিশারম্যানস্ রিফ্লেকশনস্ (১৯৪৪), অলিভার কাইটের অ্যা ফিশারম্যানস্ ডায়েরি (১৯৬৯) প্রভৃতি। এসব উপন্যাসে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কাহিনির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মাছশিকারের খুঁটিনাটি বর্ণনা।
অন্যদিকে, বাংলাভাষায় এ-জাতীয় উপন্যাসগুলোর মূল উপজীব্য কৈবর্ত-সমাজজীবন। কৈবর্ত-জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামের পরিচয় এসব উপন্যাসে স্পষ্ট। বাংলা সাহিত্যে এ-বিষয়ে যে কয়েকটি স্মরণীয় উপন্যাস রচিত হয়েছে সেগুলো হলো – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬), অমরেন্দ্র ঘোষের চরকাশেম (১৯৪৯), অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৬), সমরেশ বসুর গঙ্গা (১৯৫৭), সত্যেন সেনের বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গহিন গাঙ (১৯৮০), শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসর (১৯৮৬), মহাশ্বেতা দেবীর কৈবর্ত খন্ড (১৯৯৪), ঘনশ্যাম চৌধুরীর অবগাহন (২০০০) ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গঙ্গা একটি নদীর নাম (২০০২)।
উল্লিখিত ১০টি উপন্যাসের প্রথমটির রচনাকাল ১৯৩৬ এবং শেষটির রচনাকাল ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ। ৬৬ বছরের কাল পরিধির মধ্যে রচিত এই উপন্যাসসমূহে ধীবর জীবন ও সমাজ নানা মাত্রিকতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
এই প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আলোচ্য উপন্যাস হবে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, সত্যেন সেনের বিদ্রোহী কৈবর্ত, শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসর এবং বর্তমান সময়ে লিখিত আরো কয়েকজন ঔপন্যাসিকের জেলে-জীবনসংগ্রামভিত্তিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
বাংলাদেশে কৈবর্তজীবননির্ভর উপন্যাসগুলোর রচয়িতা হিন্দু ও মুসলমান। হিন্দু রচয়িতার মধ্যে আবার দুটি শ্রেণি লক্ষণীয় – বৈশ্য ও শূদ্র। একটির রচয়িতা ‘সেন’, অন্য একটি শূদ্র। বাকিগুলোর মুসলমান। কৈবর্ত-সমাজের ওপর এই তিন শ্রেণির রচয়িতারা ত্রিমাত্রিক আলো ফেলে সেই সমাজের অন্তর্রহস্যকে উদ্ঘাটন করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এই আলোর নানা রং। কোনো রং মুগ্ধতার, কোনো রং অনুসন্ধিৎসার, কোনো রং সহানুভূতির, আবার কোনো রং বাস্তবতাঋদ্ধ নির্মোহতার। প্রায় সব ঔপন্যাসিক চেয়েছেন কৈবর্ত-জনগোষ্ঠীর মূল সমস্যাকে নির্দেশ করে এর প্রকৃত চেহারার উদ্ঘাটন ঘটাতে। স্বীকার্য যে, সবাই সমান দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি।
কোনো উপন্যাসে জেলেজীবনের সংগ্রামশীলতার কাহিনি বিবৃত, কোনোটিতে কৈবর্ত-কাহিনি মূলকাহিনির সহকাহিনি হিসেবে অঙ্কিত। কোনো উপন্যাসে কৈবর্ত-সমাজজীবন রাজনীতির টানাপড়েনে দীর্ণ, আবার কোনোটিতে রাজনীতি বিচ্ছিন্ন উচ্চবর্গীয় নিষ্পেষণে জর্জরিত। কোনো উপন্যাসে কৈবর্ত-সমাজ শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, কোনোটিতে শোষিতের পর্যায়ে অবনমিত। এক-একটিতে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম প্রসঙ্গ এসেছে এক-এক রকমভাবে। [ক্রমশ]
ইতিহাস নির্ভর লেখাটা পড়ে ভাল লাগল।আমাদের অতীতকে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। লেখক যে কাজটি করছেন এই জন্য তাকে ধন্যবাদ।