যাক যা বলছিলাম, ‘সৃষ্টির’র মূল উৎস কি? কাম না লোভ। কার পরিসমাপ্তি এই সৃষ্টি। আমার মনে হয় ‘এই’ দুটি বিষয়’ই সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভীষন জোরদার। আমাদের রক্ত-মাংসে গড়া নর দেহটা কি অদ্ভূত না। আমাদের পুরুষ জাতিটার পৌরুষত্ব দেখাবার জায়গা এই পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু আমরা মনে মনে সবচেয়ে বেশি পৌরুষত্বের আস্ফালন জাহির করি নারীর নরম শরীরটার ওপর। আর এই পৌরুষত্ব পশুত্বে পরিণত হয়ে সৃষ্টির প্রথম আলো আমাদের সামনে তুলে ধরে। ঠিক ওই মুহূর্তে, ঠিক ওই মুহূর্তটার কথাই আমি বলছি। ঠিক ওই সময়ে আমাদের মধ্যে কোন সহানুভূতি, কোন আত্মসম্মান, কোন আবেগ কোন সহমর্মিতা কাজ করে না। একজন প্রফেশন্যল খুনী যখন হত্যা কার্যে লিপ্ত থাকে তখন তার মধ্যেও ঠিক ঐ সময়টুকুর জন্য এই ব্যাপারগুলি কাজ করে তাই না? কিন্তু সৃষ্টির মহৎ ঐশ্বর্য্য এর মধ্যেই আত্ম গোপন করে আছে।
নিজেকে নির্লিপ্ত রাখার অসীম ক্ষমতা আমাদের নেই বললেই চলে। যাদের আছে তারা মহৎ। আমি এদের দলে নই। তাই বার বার নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করার পন্থা খোঁজার চেষ্টা করি। শারীরিক ব্যাপার গুলি যত বেঠিক রাস্তার পা বাড়ায়। চেষ্টা করেও সরে আসা ভীষন ভাবে কঠিন। তবু আমরা চেষ্টা করি।
মনে রেখো সৃষ্টির ব্যাপারে তোমাকে যে কথা লিখেছি তা সর্বৈব মিথ্যা। ‘সত্যি’ হলে সৃষ্টি ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে মন থেকে তা মেনে নিতে পারি না। আবার এত হিংসাপরায়নতার মধ্যে সৃষ্টির আত্মগোপন তাও মেনে নিতে পারি না। এই দ্বন্দ্ব আমার চির কালের।
জজ বার্নাড শ্য কে পড়া আছে? জানিনা তুমি কতটা পড়েছ। আমি পড়েছিলাম। কিন্তু অতবড় মনিষীর কাছে এ ধরনের Cheap ল্যাঙ্গুয়েজ আশা করি নি তাই ঘৃণায় বাকিটা পাড়ি নি। উনি একটা জায়গায় লিখেছিলেন ‘wife is a legual prostitute’ অর্থাৎ অর্থটা দাঁড়ায় এরকম ‘স্ত্রী হচ্ছেন আইনত বেশ্যা।’ কথাটা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা কোন সুস্থ মস্তিষ্ক বিবাহিত দম্পতি কিংবা পুরুষ মেনে নিতে পারবেন? মনে হয় না। আমিও পারি নি।
স্ত্রীকে যাঁরা বেশ্যা বলেন তাদের উন্নাসিক ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় কিনা আমার জানা নেই। বেশ্যা বলতে আমরা ‘সাদা’ কথায় যা বুঝি ‘শরীর বেচা’। শরীর যদি কেউ বেচেই থাকে তার সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক সুস্পষ্ট। কোন পুরুষের নিত্য-দিনের শয্যা সঙ্গিনী স্ত্রী কি শরীর বেচে? অস্বীকার করি কেমন করে। ঘটনা মাত্রই দুর্ঘটনা। আমাদের দুচোখের আড়ালে যা ঘটে যায় তা জানা যায় শ্রবন ইন্দ্রিয় এবং অনুভূতির মাধ্যমে।
অর্থাৎ আমরা ধরে নিতে পারি সভ্যতার প্রথম দিন থেকে পুরুষ জাতি নারী জাতিকে ভোগ পন্য হিসাবে ধরে এসেছে। পুরানের তথাকথিত দেবতারাও এ খেলা খেলেছে। আমরাও খেলছি। তাই দ্রৌপদী কিংবা কুন্তী, তারা অথবা চন্দ্র এরা কেউ বেশ্যা নয়। আমি যাকে ঘটা করে সকলের সামনে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি তাকে বেশ্যা বলছি।
শোনা কথার উপর ভিত্তি করে একটা গল্প বলি। ইংরেজ সাহেবরা এদেশিয়দের ভীষন ঘৃণা করত। মাঝে মাঝেই তারা ‘Dirty niger’ বলে এদেশিয়দের গালি দিত। অহংকারে আমাদের বুক ভরে উঠত। সাহেব গালি দিয়েছে। আমাদের কোন এক মনীষী, আই. এ. এস পাশ করে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে হাজির হলেন তৎকালিন সাহেবদের সামনে। এক কথা দু’কথা হবার পর সাহেব বলে বসলেন, “Your mother is s Prostitute, ‘ মনিষী সামান্য হাসলেন, বললেন ‘Yes, my father is a only customer.
নারী সৃষ্টি-স্থিতি-ধ্বংসের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তাকে আমরা কখন বলি দেহপসারিনী কখন বলি স্ত্রী। কাম-ক্রোধ-লোভ-মাৎসর্য্য-ক্ষুধা এই পাঁচের উর্ধ্বে নারী পুরুষ কেউ কখনই হতে পারে না। তাই আমার মনে হয় কি জান ভালোবাসা, শ্রদ্ধা,নিজেকে ছিক ভাবে বোঝা, অপজিট সেক্সকে ঠিক ভাবে বোঝার অক্ষমতা আমাদের বিকৃত রুচির কথা বলতে, কথা বলাতে ভীষন ভাবে সাহায্য করে। আর এর উর্ধ্বে আছে অহমিকা বোধ। এই ‘বোধ’ আমাদের স্খলেনের পফ প্রশস্থ করে।
জমাট বাঁধা অন্ধকারকে পেছনে রেখে, যখন আলোর সামনে এসে হাজির হলাম। অবাক লাগল নিজেকে। ভীষন ভালো লাগল আলোর ছটা মাতাল হয়ে ওঠার ঠিক আগের মুহুর্ত পর্যন্ত আকণ্ঠ ভাবে পান করলাম চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া আলোর রশ্মি গুলিকে। কি অদ্ভূত আমাদের এই মন। না পেলে কাঁদে, পেলে হাসে। এই দ্বৈত সত্বার লড়াই চিরন্তন। অত্যন্ত গোপনে, এই লড়াইয়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকতে ভীষন ভালো লাগে। হঠাৎ অন্ধকার থেকে আলোয় এসে নিজেকে যাচাই করার আকাঙ্খাটা কেমন বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ‘লজ্জা’ বোধ আমাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। একটা না মানা আতঙ্কের অতর্কিত আক্রমনে দিসেহারা হয়ে পড়েছি।
আবার ভুল বকতে শুরু করেছি। কতবার ক্ষমা চাই তোমার কাছে। এবার আর ক্ষমা চাইতে পারব না। সাফ কথা জানাই তোমাকে চিঠি লেখার অধিকার আমার আছে। তাই লিখছি, বেশ করব লিখবো। হাজার বার লিখবো। তোমার উত্তর দেবার অক্ষমতা আমাকে এ ধরনের চিঠি লিখতে বাধ্য করিয়েছে।
রাগ করোনা, অভিমানে চেয়ে দেখো, যখন নিভৃতে একাকী থাকি জীবনের সব সত্য গুলি আমাকে ঘিরে হাসাহাসি করে। কটাক্ষ নয়নে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এ হাসি চামড়ার ভেতর দিয়ে হাড়ে এসে বেঁধে। যন্ত্রনায় ছটফট করি। শান্তনা দেবার কেউ থাকে না চারপাশে। কলম ধরি। মনের খেয়ালে যা পারি লিখে জানাই। সত্যতা, সত্য গুনবিচারের ভার তোমার।
‘লজ্জা’ নারীর অঙ্গের ভূষণ। পুরুষের নয় কেন? তার মানে কি ধরে নিতে হবে পুরুষ শাসিত এই সমাজ ব্যবস্থায় এমন কিছু কিছু বিষয় বা গুন আছে যা জোর করে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, না ভুল বললাম প্রকৃতি পার্মিট করে নি। হাসি পায়। তাও একজনকে প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছিলাম নারীর সবচেয়ে বেশি লজ্জার অঙ্গ তার ‘বুক’। কেন?
বুঝতে পারি না এই মানসিকতা কেন আমাদের মধ্যে খেলা করে। নারী অঙ্গের অন্য কোন জায়গা এই ‘লজ্জা’র বস্তু হতে পারত। খেই হারিয়ে ফেলি। পুরুষ জাতিটা সত্যিই হেংলা, লোভী। একটু দৃষ্টি কটু ব্যাপার চোখের সামনে ভেসে উঠলেই তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা দেখার মজা উপভোগ করে আত্মসম্মান বোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের দৃষ্টি খিদের চাহিদা মেটায়।
ব্যাপার কি জানো লজ্জার প্রধান অঙ্গ কোনটা পুরুষ জাতিও জানে না, নারী অথৈবচ। আমরা ধরে নিয়েছি। বলতে পারো চিরাচরিত প্রথায় আমাদের অস্থি মজ্জায় ব্যাপারটা চলে আসছে।একটি যুবতীর লজ্জা যতখানি শরীর কেন্দ্রিক ঠিক তেমনি একটি বৃদ্ধার লজ্জা ততখানি শরীর কেন্দ্রিক নয়। সেই অর্থে দুজনেই নারী জাতির অঙ্গ। পুরুষের লোভাতুর, কামার্ত দিক গুলি থেকে নিজেকে আগলে রাখার জন্যেই নারীর লজ্জার সৃষ্টি। মাঝে মাঝে পুরুষ জাতিটাকে সেই জন্য আমার ভীষন ঘেন্না করতে ইচ্ছে করে।
আর মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া, সহনশীলতা, ধৈর্য, সবদিক থেকে নারী জাতি পুরুষের থেকে শতেক, শতেক যোজন দূরে এগিয়ে। ঠিক এই জায়গাটাতে আমি ভীষন ভাবে নারী জাতিকে হিংসে করি। কেন করি? জানিনা। তবে মনে হয় হিংসে করলে হারাবার কিছু নেই অর্জন করতে পারবো অনেক-অনেক-অনেক।
সমাপ্ত
সুন্দর।