আমি হার মানলাম। সত্যিই আমি হেরে গেলাম। জানিনা একটা অদ্ভূত ধরনের জেদ ধরে বসেছিলাম। যতদিন তোমরা কেউ চিঠি না দাও আমাকে, আমি কিছুতেই দেবো না। পরে ভেবে দেখলাম এটা অসঙ্গত। আসলে ঘর ছাড়া হয়ে কোথায় পড়ে আছি, কি করছি, এই ভেবেই যে সে বড় অভিমানী হয়ে পড়েছিল। ভাবছ হয়তো আমি কৈফিয়ত দিচ্ছি। ভেবনা, তাহলে এত জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলব একটা-দশটা-একশোটা, যে তার ধাক্কায় তোমার মনের মধ্যে কোন এক কোনায় জমে থাকা আমার জন্যে স্নেহ ভালবাসা গুলো খানিকটা নড়ে চড়ে উঠবে।
এখানে বসে তোমাদের সকলের কথা একে একে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে পড়ে, ফেলে আসা দিনগুলির কতো সোনালী স্মৃতি। তখন নিজেকে মনে হয় যেন কোন অন্যগ্রহবাসী। আর বহুদূর থেকে চেয়ে দেখি তোমরা, আমার মা, বাবা, দাদা, দিদি, সকলে কি করছে। মনে মনে ভাবি নিজের কথা। বড় ভালো লাগে পৃথিবীটাকে। আমি জানিনা, আমার এই ছোট্ট হাত দুটো কতটা তোমাদের কাজে লাগতে পারে। আর করার ব্যাপারটা বাদ দিয়ে ভালোবাসার কথাই যদি বলো, তাহলে আমি কিছুই বলবো না। শুধু মনে মনে ভাববো, … না, কি ভাববো তাও বলবো না।
বোধ হয় প্রত্যেক মানুষেরই মনের মধ্যে তার সব কিছুর ওপরে, আরো একটা সবকিছু থাকে। হয়তো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সেটা শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকার জন্যেই হয়। তবুও সেটাই হয় তার জীবনের সবচেয়ে একান্ত, নিজস্ব। সেখানে সেই রাজা, আমার জীবনের যা কিছু তুমি দেখছ তার সবটাই তার উপরের সব কিছুর জন্যেই। আমি জানি না, কে যে কখন আমার জীবনের ঐ সব কিছুর উপরের সব কিছুতে একটা ছোট্ট কথা লিখে দিয়েছিল; আর সেই কথাটা বারবার আমার কানে বেজে চলেছে, আর, বলে চলেছে — ‘ভালোবাসো, আরও ভালবাসো, শুধুই ভালোবাসো… কিছু চাই না’।
প্রশ্ন যদি কর তুমি আমার জীবনের লক্ষ্য কি? তাহলে বলব আমি সবাইকে সবকিছুকে ভালোবাসব, চেতন-অচেতন, পার্থিব-অপার্থিব যা চোখে দেখা যায় যা যায় না, যা অনুভব করা যায় বা যায় না। সব কিছুকে। এমন কি আমার চোখের সামনে যে আমার ক্ষতি করছে তাকেও। ঈশ্বর আমাকে অনেক কিছুই দেন নি; কিন্তু একটা জিনিস আমায় দু-হাত ভরে দিয়েছেন। এটা আমার জীবনের থেকেও মূল্যবান। প্রশ্ন করবে কি? ‘ভালোবাসো-আরো ভালোবাসো’। এটা আমার কাছে এতটাই অফুরন্ত যে পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্বকে দিলেও শেষ হবে না। কোন দিনও না ।
এই পর্যন্ত পড়ে হয়তো তুমি থমকে দাঁড়াবে মনে মনে ভাববে, যে আমি ঘোরতর নাস্তিক তার কল্পনায় “ঈশ্বরের” অস্তিত্ব কি করে আসে? ব্যাস আর বেশী দূর এগিও না। আমি ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আসলে আমি নাস্তিক না আস্তিক এ ব্যাপারটা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি, তবে এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, — মন্দির-মসজিদ কিংবা গীর্জায় যাঁকে আমরা প্রনাম করি শুধু তিনিই ঈশ্বর বাকী সব… কিছু নয়, একথা মন থেকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। যিনি আমার তোমার পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্বের দেহে দেহী হয়ে রয়েছেন। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি, জানিনা সেই তোমাদের পরম আরাধ্য দেবতা কিনা ।
ইংরাজীতে একটা কথা আছে — work is worship এই কথাটার সত্যতা আমি আগেই খানিকটা অনুভব (feel) করেছি আর এখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। উপনিষদে বলেছে, — ‘তস্মৈ নমঃ কর্মন্যে’। অর্থটা কি জান, ঈশ্বরকে (কর্মকে) প্রণাম কর। কেননা এই কর্মই মানুষকে uplift দেয়।
শেষ কথাটা সকলকে আমি বলি, তা তোমাকেও বলছি — অন্তঃত আমাকে কোনদিনও বেশী ভালোবেসো না। যার সঙ্গে তোমার কোন দেনা-পাওনার সম্পর্ক নেই তাকে যেরকম তুমি ভালোবাসো আমাকেও ঠিক ততটাই বেসো। আর একথাটার উল্টো যদি করতে চাও তাহলে বলব, আমাকে যদি বেশী ভালোবাসো তাহলে সবাইকে ততটাই বেশী করে ভালোবেসো।
তোমায় চিঠি লেখার ইচ্ছেটাকে একটা চরম পর্যায়ে নিয়ে আসতে গিয়ে চিঠিটাই লিখতে একটু দেরী হয়ে গেল। এখানে এসে যখনই তোমার কথা মনে হয়েছে তখন বার বারই মনে হয়েছে, মনের মধ্যের এলোমেলো কথাগুলোকে খামে ভরে ফেলি। কাগজ কলম নিয়ে বসেও ঠিক কি ভাবে শুরু করব ভেবে পাই না। কেবলই মনে হয়েছে এ কথা কিছুতে লেখা যায় না। এ লেখার কথা নয়।
ঠিক যে সময়টা সূর্য ঐ দূরের পাহাড়ের পেছনে আস্তে আস্তে নিজের অস্তিত্বকে মুছে ফেলে; ঠিক তখনই আমার অস্তিত্বে ‘এককীত্ব’ আমায় ধীরে ধীরে গ্রাস করে। আমি একা ভীষন ভাবে একা হয়ে পড়ি। পুরনো দিন গুলো বড্ড বেশি মনে পড়ে। সই সময় ঐ পাহাড়টার দিকে কিছুতেই তাকাতে পারি না। কেন জানি না, মনে হয় ও বোধ হয় আমার জীবনের সমস্তটাই জেনে ফেলেছে।
আসলে কি জানতো, প্রত্যেক মানুষেরই মনের মধ্যে, তার সব কিছুর ওপরে আরো একটা সব কিছু থাকে। হয়তো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সেটা শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকার জন্যেই হয়। তবুও সেটাই হয় তার জীবনের সবচেয়ে একান্ত, নিজস্ব। সেখানে সেই রাজা। আমার জীবনের যা, সবকিছু তুমি দেখেছ তা সমস্তই তার উপরের সব কিছুর জন্যেই, আমি জানিনা কে যে কখন আমার জীবনের ঐ সব কিছুর উপরের সব কিছুতে একটা ছোট্ট কথা লিখে দিয়েছিলো। আর বলে চলেছে — ভালোবাসো, শুধুই ভালোবাসো। আচ্ছা বলতে পারো ভালোবাসার নির্যাস’টা কি?
সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে মায়ের কথা। পড়ে বাবা, তোমাকে আলাদা করে মনে পড়ে না। মনে হয় সমস্ত সময়টাতেই তুমি আমার কাছা কাছিই আছ। কোথাও যেন গেছ, কাছাকাছি কোথাও হবে। এখুনি এসে পড়বে। বাকীদের মনে পড়ে একটা নিয়ম করে। আর যখন কোন কিছুই ভাল লাগে না তখন ভীষন মধুশ্রীর কথা মনে পড়ে যায়। আমি তোমাকে একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, এ পৃথিবীতে যারা অকৃতজ্ঞ আমি ভীষন ভাবে তাদের ঘৃনা করি। আমার যা কিছু দেখেছ তার সবটাই মধুশ্রীর কাছ থেকে পাওয়া। আমি ওর কাছে বড্ড বেশী ঋণী। ভালোই হয়েছে, এই ভাবে আরো কয়েকটা দিন গেলে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষনা করতে হতো। আমি মধুশ্রীর সঙ্গে প্রেম করেছি এ কথাটা ঠিক খাটে না। সম্পর্কটা খানিকটা নিয়মের মত হয়ে যায়। বলা উচিত ভালোবেসেছি। একটা জিনিষ কিন্তু বড়ই অদ্ভূত। আমি যতই মধুশ্রীকে ভালোবেসেছি ততই মনে হয়েছে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ গুলোকে আরো বেশী করে ভালো বাসি। কার জন্য কাকে ভালবাসছি? এটাই মাঝে মাঝে ধাঁধা হয়ে উঠেছে। জীবনের ধাঁধা। (চলবে)
বিশ্ব চরাচর বিশাল একটা গোলক ধাঁধা। জীবনও তার চাইতে আলাদা নয়। শিশুকাল থেকে নির্ভরশীলতা, আস্থা ,আনুগত্যতা, প্রেম, মায়া, হিংসা, ক্রোধ হতাশা, চাওয়া পাওয়া, ও ভালোবাসা নিরন্তর পরিবর্তনশীল।
অনন্য অনুভূতির প্রকাশ। মন কেমনই কথাগুলো বড়ো ভালো লাগছে পড়তে।