আমি বলি কী তুমি ভুলতে চেষ্টা করো না। মাকে কী ভোলা যায়। সে যে তোমাকে তার সমস্ত স্বত্বা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। যেমন তুমি আমাকে গড়ে তুলেছ। তুমি তাকে তোমার সমস্ত কর্মের মধ্যে দিয়ে রূপদাও বাঁচিয়ে রেখো। তার প্রতি তোমার সমস্ত শ্রদ্ধা ভালোবাসাকে কর্মের মধ্যে দিয়ে রূপ দিও। যে কাজে শ্রদ্ধা ভালোবাসা নিষ্ঠা থাকে। সেই কাজই মানুষকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আমার সব কিছুই কী রকম অদ্ভুত অদ্ভুত লাগে। দুঃখ পেতে হবে আবার চাকরী করতে হবে। সে যাই হোক না কেন সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে তোমাদের একটা ছোট্ট ‘হ্যাঁ’ কাউকে এরকম পাইয়ে দেওয়ার যে কী অসীম আনন্দ তা বোঝানোর ভাষাজ্ঞান আমার নেই। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তারারা আমার ওপরে পুষ্প বৃষ্টি করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে রয়েছে। হয়তো বা খানিকটা করেওছে। আর সেই ফুলেরা হিম হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে। তোমাদের ঐ ছোট্ট ‘হ্যাঁ’ এর মধ্যে আমি বার বার নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।
তুমি লিখেছিলে realisation এর কথা। কথাটা ভীষন ভেক লাগে আমার কাছে। কিসের realisation? সত্যকে realise না নিজেকে। না কি সমস্ত সৃষ্টির যাকে তুমি বলেছ reality of god, যার মধ্যে অস্তিত্ব রয়ে গেছে, তাঁকে realise করা, মনে হয় সমস্ত ব্যাপারটাই একই সুতোয় বাঁধা। আমি সমস্ত ভাবে ভেবে দেখেছি। ভাবনাটা যে পথে গেছে শুধু একই উত্তর পেয়েছি, Love, Love, Love, What a mervalous fellings, এ অনুভূতি মানুষকে পাগল করে দেয়।
এতদিন প্রার্থনা করে এসেছি আমাকে জিতিয়ে দাও, আমাকে হাসতে দাও, আর যেদিন প্রথম বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম সেদিন থেকে আমি চেয়ে আসছি আমাকে হারতে দাও, আমাকে কাঁদতে দাও। কোথায় যেন সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
বেশ কয়েকদিন হলো একটা প্রশ্ন বার বার মনের আনাচে-কানাচে ঘোরা ফেরা করে, আবার কখন যে ফুরুত করে উড়ে চলে যায় বুঝতে পারি না। কিন্তু ঈশ্বর মাঝে মাঝে আমার স্মরণশক্তিটাকে নিয়ে খেলা করেন। ভুল যাই। স্মৃতিভংশ। কি করে বোঝাই। আমি…
হঠাৎ আজ সেই কথাটা মনে পড়ে গেল। লিখতে বসলাম। ভালোবাসো আরও ভালোবাসো। যতটা নিবিড় করে ভালোবাসা যায়। ভালোবাসাকে কলঙ্কিত করো না, ‘Love’, এই শব্দের সৃষ্টিকর্তা কে? আমাদের মাতৃভাষার অভিধানে এর কোন defination আছে? আমি শত চেষ্টা করেও খুঁজে পাই নি। তবে যিনি এই শব্দের সৃষ্টি কর্তা শত কোটি প্রনাম। যুগ যুগান্ত ধরে এই ‘শব্দ’ কে নিয়ে কত লেখা হয়েছে; কত কাটাছেঁড়া হয়েছে, তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। এই ‘শব্দ’টির জীবনদর্শন কি বড় জানতে ইচ্ছে করে।
হাতের কাছে এমন কিছু পাই না যার মধ্যে এই ‘শব্দে’র আসল রহস্য খুঁজে পেতে পারি। ভালোবাসার আসল তত্ব গূঢ় রহস্য কি জানো? জানি না আমার মতো কজন অবিবেচক তোমাকে এ ধরনের বোকা বোকা প্রশ্ন করেছে? আমি করলাম। না বুঝে করলাম, না বুঝেশুনে করলাম বলতে পারবো না।
একটা গল্প পড়েছিলাম। কবে পড়েছিলাম, কি ভাবে পড়েছিলাম। আজ আর ঠিক সেই ভাবে খেয়াল করতে পারি না। যন্ত্রনার যুগে যান্ত্রিক হয়ে যাওয়াটা এখন পারি না। creation ব্যাপারটা তাই প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে। তবু পরশ পাথরের সন্ধানে আজও মাঝে মাঝে ক্ষ্যাপামো করে বেরাই। বড় অদ্ভুত লাগে ‘খোঁজার’ সেই কাণ্ডকারখানা মনে পড়লে।
একটা প্রাকাণ্ড এরোপ্লেন একদিন হাঠাৎ ভেঙে পড়ল একটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। পাহাড়ের চারিদিকে যে দিকেই তাকবে শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে দেশলাই বাক্সের মত দু-একটা বাড়ি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছাড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কেতাবী ভাষায় এই কয়েকটা বাড়ি নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘গ্রাম’। যার সৃষ্টি কর্তা আমাদেরি মত দু-চারজন রক্ত-মাংসের শরীর।
ভাগ্যক্রমে ভেঙে পড়া প্লেনের পাইলট গেল বেঁচে। কিন্তু কি ভাবে সে বাঁচল সে নিজেই জানে না। জ্ঞান ফিরে আসতে দেখল, একটা ছোটঘরে সে শুয়ে আছে। ছোট পিলসুজে জ্বলছে মাটির প্রদীপ। প্রদীপের বুকের সলতেত যে সামান্য আলো ঘরটা আলোকিত করে তুলেছিল তার নরম আলোয় এক সুন্দর নারীমূর্তিকে দেখেত পেল পাইলট। স্বপ্ন, একি মায়া! কোন যাদু মন্ত্র বলে ও এখানে? একে একে পাইলটের মনে পড়ল-বাড়ির কথা, স্ত্রীর কথা ছোট দু-মাসের ছেলের কথা। আর যান্ত্রিক গোল যোগে কিভাবে পাহাড়ের কোলে আছাড় খেয়ে পড়ল প্লেনটা।
আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল পাইলট। সেই সুন্দর নারীমূর্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটল পাইলটের স্পর্শে। ফুল যে ভাবে তার পাঁপড়ি আস্তে আস্তে বিকশিত করে সূর্যের আলোর স্পর্শে। ঠিক সেই ভাবে। কিন্তু পাইলট আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল একদিন। আবার তাকে নিয়ে আসা হলো একটা হাসপাতালে।
সেই নারীমূর্তি সর্বক্ষন তার পাশে ছায়া সঙ্গিনীর মত ঘিরে রইল। দিন শেষ হয়ে এল পাইলটের। একদিন যোমরাজ এসে হাজির। হাসতে হাসতে বলল, “বাবা, এবার চল। সময় হয়েছে।’ পাইলট একবার যোমরাজের দিকে তাকাল। তারপর পরিচয় পর্ব শেষ হলে আস্তে করে বলল, — ওই সুন্দর যুবতী আমাকে ভীষন ভালোবাসে। আমি ওকে ছেড়ে চলে গেলে ও ভীষন ভাবে আঘাত পেতে পারে। এতে আমার পাপ হবে। আমার নরক বাস হবে। আমার আয়ুটা আপনি দয়া করে আর কয়েকটা বছর বাড়িয়ে দিন।
যোমরাজ পাইলটের কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলল, দেখ বাপু ভালোবাসা কি জিনিষ আমি জানি না। আমার অভিধানেও এই শব্দটা নেই। যদি তুমি আমায় ভালোবাসা ব্যাপারটা বোঝাতে পারো আমি তোমায় বছর চারেক আয়ু বাড়াতে পারি। একটা কথা মাথায় রাখবে ব্যাপারটা বোঝাবার জন্য মাত্র তিনটে সুযোগ তুমি পাবে।
পাইলট যোমরাজের কথা accept করল। বলল, চলুন তাহলে বেরিয়ে পড়া যাক।
এটা একটা গল্প। অন্য ভেবে ভুল করো না। তাহলে দায়টা আমার হয়েই চিরকাল থাকবে।
যোমারজের সঙ্গে বেরিয়ে পাইলট প্রথম এল একটা পাহাড়ী ঝর্নার ধারে। পাহাড়ী ভাষায় এদের ‘ঝোরা’ বলে। চারিদিকে নিস্তব্ধ। ঝর্না তার আপন খেয়ালে তর তর করে এগিয়ে চলেছে। সামনের পাহাড়টা প্রকৃতির রূপ-রসে যৌবন ফিরে পেয়েছে। একজোড়া পাহাড়ী ছেলে-মেয়ে সেই ‘ঝোরা’র ধারে বসে মন দেওয়া-নেওয়ার পালায় মও। পাইলট যোমরাজের দিকে তাকিয়ে বলল, মহারাজ ঐ দেখুন ওটাই ‘ভালোবাসা।’ (চলবে)
আজকের পর্বটি খুব সুন্দর।