যোমরাজ একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। প্রথম সুযোগটা তুমি নষ্ট করলে। পরের সুযোগটা কাজে লাগাবার চেষ্টা করো। পাইলটের মনটা খারাপ হয়ে গেল। দ্বিতীয় সুযোগে সে যোমরাজকে স্বামী-স্ত্রীর সোহাগের দৃশ্য দেখাল। যোমরাজ দ্বিতীয় সুযোগটায় পাইলটকে বলল, এটা প্রকৃতি ‘ভালোবাসা’ ব্যাপারটা এখানে ঠিক পরিষ্কার নয়।
ব্যর্থ হয়ে পাইলট আবার তার নিজ জায়গায় ফিরে এল। দেখল সেই পাহাড়ী মিষ্টি মেয়েটি। পাইলটের নিথর দেহের ওপর পড়ে অঝোড়ে কেঁদে চলেছে। চোখের কোলে দু-এক ফোঁটা ‘অশ্রু’। পাইলট একটু থমকে দাঁড়াল। যোমরাজকে কাছে ডেকে এনে বলল, মহারজ ঐ দেখুন এটাই ‘ভালোবাসা’।
যোমরাজ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললেন, আমি তোমার তৃতীয় সুযোগটা সঠিক ভাবে কাজে লাগানর জন্য তুষ্ট হয়েছি। তোমার এই কৃত কর্মের জন্য চার বছর আয়ু বাড়িয়ে দিলাম।
***
এ হা-হুতাশ আমার সারাজীবনের সঙ্গী। আমার ছায়া সঙ্গিনী। আমার অজান্তেই চারপাশে আপন মনে তার কর্মের পরিধি বিস্তার করে চলেছে। বাধা দিই নি। বলতে পারো বাধা দেবার মতো প্রবৃত্তি আমার ছিল না। বড় ভালোলাগে যখন কাউকে আপন করে পেতে চাই। কিন্তু কিছুতেই সে ধরা দেয় না। তখন মনের ভেতর সুপ্ত অনুভূতি গুলি ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। আমায় কুড়ে-কুড়ে…। বড় যন্ত্রনা, নিদারুন যন্ত্রনার শিকার হই আমি। পারবে, পারবে আমায় মুক্তি দিতে, মুক্ত করতে?
আগের কয়েকটা চিঠিতে অনেক না বলা কথা লিখে ফেলেছিলাম বোকার মতো। হয়তো ব্যাপারটা হাস্যস্পদ। আমার কিছু করার নেই। আমাকে লিখতে হবে। আরো লিখতে হবে। অনেক অনেক অ-নেক।
আমি একটা কিছু সব সময় খোঁজার চেষ্টা করি। কি খুঁজি? কেন খুঁজি? তার কোনো হিসাব মেলাবার চেষ্টা কখনও করিনি। লাভ-ক্ষতির হিসাব করে কোন জিনিষ কখনই খোঁজা যায় না। গীতার ঐ উক্তিটার কথা মনে পড়ে ‘মা ফলেষু কদাচন।’ অর্থাৎ ফল লাভের চিন্তা না করেই তোমার কাজ তুমি করে যাও। আচ্ছা এই ‘সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা’ পৃথিবীতে একটা মানুষ আমায় দেখাতে পার। যারা ফল লাভের চিন্তা না করেই খালি কাজ আর কাজ করে চলেছে।
যদি ব্যাপারটা এই রকম হয়, তুমি তোমার কাজ করে যাও, ফল লাভের কথা তোমায় চিন্তা করতে হবে না। তোমার কাজের ফল তোমার কাছে আপনা হতেই চলে আসবে। তাহলে আর এই বিষয় নিয়ে এক লাইনও লেখা চলে না। লিখতে গেলে শুধু তর্কই বেড়ে যাবে। কাজের কাজ আর কিছুই হবে না।
জান আমাদের চাহিদার পরিমান এত বেশী যে যা পাচ্ছি, যা পাওয়া হয়েছে, তাকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় থাকে না। একটু কষ্ট করে, একান্ত ভাবে, আমাদের যা পাওয়া হয়ে গেছে; সেই ব্যাপারটা, একটু চিন্তা ভাবনা করি, তাহলে দেখবে আমরা যা চেয়েছি, তার থেকে পেয়েছি অনেক বেশী। এই সামান্য পাওয়াই হয়তো আমার সারাজীবনের পাথেয় হয়ে থাকতে পারে।
ব্যাপারটা ভীষন vague। এক কথায় বলতে পার সবটাই ‘আপেক্ষিক’। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া, সমস্ত ব্যাপারগুলিই vague। তবু মানুষের জীবনে এই ধরনের instinct গুলি বারে বারে ঘুরে ফিরে আসে।
তুমি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতো, তোমার কিসের দুঃখ? কিসেই বা সুখ? কি তুমি চাও? কিই বা তুমি পাও? ব্যাপারগুলি আমাদের জীবনে খুব স্বল্প সময়ের জন্য আসে। যদি ঠিক ভাবে চলা যায়, তহলে এই instinet গুলি আমাদের মধ্যে বারে-বারে আসবে না। হয়তো বলতে পার এত মানসিক স্থৈর্য কার আছে। আমরা সবাই কারুর না কারুর দাস।
ব্যাপারটা তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও ব্যাক্তি গত ভাবে কখনই মেনে নিতে পারে নি। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ জীবিকার সন্ধানে রোজগার করছে। জীবিকার তাগিদে যে সব কাজ-কর্ম তার মধ্যে দিয়েই মানুষ creation এর লাগাম ধরে রাখার চেষ্টা করে, এটা কি ঠিক? না — কখনই তা হতে পারে না। অভ্যস্ত জীবনের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনভ্যস্ত জীবনের রসাস্বাদনের অবলুপ্তি ঘটেছে। যারা অনভ্যস্ত জীবনের রসাস্বাদনে মগ্ন আমাদের ভাষায় তাদের বলি ‘পাগল।’ এটাও ‘আপেক্ষিক’।
ঘুগনি ওলার ছেলে কোন দিন প্রধানমন্ত্রী হতে পারে না। চেষ্টা করলে কোন সরকারী অফিসের কনিষ্ঠ কেরানী, কিংবা মেজবাবু কিংবা বড়বাবু। এর বেশী কিছু নয়।
স্মরণ শক্তিটা দিন দিন কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। বুঝছি কিন্তু করার কিছু নেই। কথায় আছে ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।’ আমার ক্ষেত্রে এর ঠিক উল্টোটাই বড়াবর ঘটে আসছে। তাই তোমায় চিঠি লেখার পর যখন লেটার বক্সে ফেলি, মনে হয় আমার এক একটা চিঠি তোমার কাছে আমার সম্বন্ধে কিছু নতুন ভাবনার ডালি নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে।
নিজের জায়গায় ফিরে নিজেকে নিয়ে চুল চেরা বিচার করতে বসে, সব ভাবনা কেমন যেন জট পাকিয়ে যায়। সে জট খেলার সাধ্য আমার থাকে না। একটা ভাবনাই মনের আনাচে-কানাচে চড়ুই পাখির মত ফুরুত-ফুরুত করে ঘুরে বেড়ায়। আমি যা করেছি যা করছি সব ভুল। এটা ভাবাবেগ ছাড়া আর কিছু নয়।
বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কথা মনে পড়ে। ভদ্রলোককে অনেকেই পাগল বলতেন। এই পাগল বলায় তার কোনওদিন কিছু ‘এসেগেছে’ কিনা আমার সন্দেহ আছে। একদিন এক সাংবাদিক তাঁর interview নিতে গেলেন। পরিষ্কার ভাবে তাঁকে জানালেন আপনি বিজ্ঞানী, কত বড় বিজ্ঞানী আমার জানার দরকার নেই। আপনি কি এমন আবিষ্কার করলেন যে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে গেলেন।
আইনস্টাইন সাংবাদিকের কথায় মুচকি হাসলেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করলেন। সাংবাদিক ভদ্রলোক অধৈর্য্য হয়ে বললেন, আপনাকে যে প্রশ্নটা আমি প্রথমে করেছিলাম তার উত্তর আপনি আমাকে এখনো দেন নি।
আইনস্টাইন গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি আমার কাছে প্রায় এক ঘণ্টা হল এসেছেন। ফেলে আসা একঘণ্টা সময় আপনাকে দিয়ে আমার অনেক ক্ষতি করেছি। ক্ষতিটাই আমার সব নয়। আপনার জায়গায় যদি কোন সুন্দর যুবতী আমার কাছে আসত, আমি তাকে এক ঘণ্টার জায়গায় দু-ঘণ্টা সময় দিতাম। পারলে সব কাজ ফেলে রেখে তার সঙ্গে সারা দিন ধরে বসে জমিয়ে গল্প করতাম। আপনার সঙ্গে গল্প করার সঙ্গে ঐ সুন্দরী যুবতীর সঙ্গে গল্প করার যে পার্থক্য, আমি তাই আবিষ্কার করেছি। সেই জন্য The fool Nobel Committee get me Nobel Prize.
বলতে পারো শিক্ষা মানুষকে কি দেয়? অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি education। হাসছ। ভাবছ কি পাগলের প্রলেপ বকছি। না ঠিক তা নয়। কয়েকদিন ধরে, বার বার এই প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে ঘোরা ফেরা করেই হঠাৎ উধাও হয়ে যাচ্ছে। (চলবে)