তুমি বলতে পার শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, বুদ্ধি দেয়, রুচি বোধ তৈরী করে সবশেষ মানুষকে পরিপূর্নতা দান করে। সত্যি কি তাই? পরমহংস দেব তো অশিক্ষিত ছিলেন তাঁর মধ্য কি জ্ঞান, বুদ্ধি, রুচির অভাব ছিল? আসল ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। শিক্ষা মানুষকে কিছুই দিতে পারে না। একজন অশিক্ষিত মানুষের কাছে তুমি যা চাইবে হয়তো তার থেকে অনেক বেশি পাবে। আবার একজন শিক্ষিত মানুষের কাছে তুমি যা আসা করবে তার কিছুই পাবে না।
ব্যাপারটা বড্ড বেশি খটোমটো। সারকথা কি জান Self Consciousness. তুমি নিজেকে যত বেশি প্রশ্ন করবে তার উত্তর নিজের থেকে বার করে আনার চেষ্টা করলে সবচেয়ে আত্মপৃপ্তি পাবে তুমি। শিক্ষার ব্যাপারটা সেই সময় ভীষন আলাগা মনে হবে। মনে হবে এই বিশ্বের তাবৎ সব ব্যাপারগুলি কেমন ফল্কা। সব, সব হালকা ভেসে বেড়ায়।
ব্যক্তি ‘আমি’র সঙ্গে অন্তরের আমি’র দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিয়ে, দূরে দাঁড়িয়ে কখনো দেখেছ কি? ব্যাপারটা অনুভূতি সাপেক্ষ। যদি কখনো তোমার জীবনে এ রকম কোন ঘটনা ঘটে; তাহলে দেখবে, এর থেকে তুমি যা পাবে, তাই’ই হবে তোমার সারা জীবনের পাথেয়।
এক নিদারুন যন্ত্রনা। দুর্বিষহ জ্বালা। আপন মনে আমার অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে খেলা করে চলেছে। শত চেষ্টা করেও তার থেকে দূরে সরে থাকতে পারি না। যখন চেষ্টা করেও তার থেকে দূরে সরে থাকতে পারি না। যখন একাথাকি, নিতান্তই একা। এককাত্ব কুয়াশার মত আমার চারপাশে নিশ্ছিদ্র ব্যুহ রচনা করে। দম আটকে আসে। মনে হয় শত কষ্টের ধন আমার ‘প্রান’ এই বুঝি যায় যায়। হাত বাড়িয়ে যাকে আঁকড়ে ধরতে চাই, মরিচিকার মতো সে পেছনে সরে যায়। এর হাত থেকে কি ভাবে নিস্তার পাওয়া যায়?
We are in reach-we are in reach-and we must find that out of a new chapter of life a new code of life. এই জন্য কি আমার এত যন্ত্রনা। যদি তাই হয়, তাহলে সেই’ই হবে আমার পরম প্রাপ্তি। দর্শনের ভাষায় যাকে বলে Sumumbonum বা Highest good.
আমি তার সন্ধানে সারাজীবন ক্ষ্যাপামো করে পরশ পাথর খুঁজে বেড়াব। শুদ্ধ পরিশীলিত কি ভাবে হওয়া যায় তার মন্ত্র তোমার জানা আছে। আমি করুন মিনতি জানাই তোমার কাছে। পারলে আমাকে লিখে পাঠিও। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব।
হিসেব করে যখন’ই চলতে শিখলাম, বেহিসাবি হওয়ার দায়টা তখনই আমার ওপর চরম ভাবে আঘাত হেনেছে। দিসেহারা হয়ে কখন বেহিসাবী হয়ে পড়েছি নিজের অজান্তে, তা বুঝতে পারি না। যাই হোক সাফাই গেয়ে নিজের ভুলটুকু সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা যায়। দোষ ঢাকা যায় না। যদি ঘটে নিজের বিবেকের কাছে আমি চরম বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকব। এর থেকে বড় শাস্তি পৃথিবীতে কি আছে, বলতে পার। টাকা-পয়সা ঘর-বাড়ি, যশ-খ্যাতি-প্রতিপত্তি, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে, একটা নিটোল সংসার। সব-সব-সব সবকিছুর প্রয়োজন আছে, মানি। কিন্তু ! এর বাইরেও একটা কিছু আছে। সে আমার সবচেয়ে আপনজন। আমায় কখনো কাঁদায়, কখনো হাঁসায়, কখনো দুঃখ দেয়, কখনো আনন্দ। আমি তার সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করি মনে হয় I am a Papet.
মাঝে মাঝে মনে হয় রক্তকরবীর সেই রাজার মতো সব কিছুকে ভেঙ্গে-চুরে দুমড়ে-পুড়িয়ে ফেলি। সেই ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ- পরিক্ষীলিত করে তোমায় সামনে এসে হাজির হই। তুমি অবাক চোখে আমার দিকে তাকাবে। চিনি-চিনি করেও চিন্তে পারবে না। কখনো মিটি মিটি হাসবে আমার জীবনে এক হয়ে যাবে। দারুন মজা হবে। সেই সময়টা আমার জীবনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিরদিনের জন্য রয়ে যাবে। বলতে পারো মানুষের জীবনে চরম সত্য কি? কি নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে? মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার রসদ কি? আমি জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে প্রশ্নটা করেছিলেন। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘মৃত্যু’। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর একটু ভেবে বলছিলেন ‘ভালোবাসা’। চতুর্থ প্রশ্নের লোভ সংবরন করতে না পেরে বলেছিলেন, মানুষের জীবনে চরম মিথ্যে কি? একটু হেসে উত্তর দিলেন, ‘বেঁচেথাকা’।
ভাবতে পারো, অত্যন্ত স্বাভাবিক নিতান্তই সাধারন ভাবে তিনি আমাকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। মানুষটাকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে ছিল বহুদিন থেকে। সময় অথবা সুযোগ দু’এর কোনটাই সম্ভব হয়ে ওঠে নি। চাইলেই পাব তারও সম্ভবনা খুবই ক্ষীন। তবে আরো কয়েকটা প্রশ্ন মনে মনে তৈরী করে, একদিন সময় এবং সুযোগ বুঝে তাঁর কাছে হাজির হলাম। আমার কপালটা চিরকালই খারপ। ও-মা গিয়ে দেখি তাঁর পরলোক প্রপ্তি ঘটেছে।
যাই হোক প্রশ্ন গুলি মন থেকে হারিয়ে যেতে দিই নি। সযত্নে প্রত্যেক দিনই তার সঙ্গে আপন মনে খেলা করেছি। যদিও দর্শক-স্রোতা আমি নিজে। তোমাকে আমার অভিব্যক্তিটা বোঝাবার চেষ্টা করেছি। দয়া করে আমায় পাগল বলো না।
মানুষের জীবনে চরম সত্য হলো ‘মৃত্যু’। এই সত্য বিভিন্নমানুষের জীবনে বিভিন্ন ভাবে অধিকার করে। এতে আমাদের কারুর কোন হাত নেই । ‘ঘটনা’ কখনো ‘অঘটন’ কখনো ‘দুর্ঘটনা’ আবার ঘটনা, ঘটনা হয়েই থাকতে পারে। থাকে যায়ও।
ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, স্ট্রোকে মৃত্যু, রোগে ভুগে মৃত্যু। কোন মৃত্যুটা সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দায়ক বলতে পারো? প্রথমেই আমি তোমার কাছে সাফাই গেয়ে রেখেছি। আমায় পাগল বল ক্ষতি নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বলোনা। বড় জানতে ইচ্ছে করে। ব্যাকুল ভাবে পেতে ইচ্ছে করে। এ তৃষ্ণাটা আমার বরাবরের।
আমার মনে হয় কি জানো? সব মৃত্যুই যন্ত্রনার। যন্ত্রনার করাল গ্রাস থেকে কোন মৃত্যুরই নিস্তার নেই। যন্ত্রনা মৃত্যুকে তার সবকিছু দিয়ে ভালোবেসেছে বসেই এত আপন হতে পেরেছে। আমার মনে হয় কি জানো অস্বাভাবিক মৃত্যুর যন্ত্রনা যত কম। স্বাভাবিক মৃত্যুর যন্ত্রনা তার থেকে শতগুন বেশি। যে মৃত্যুর যন্ত্রনা সবচেয়ে কম তাই ভালো। সবাই ইতো যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি পেতে চায়।
এ ব্যাপারে আমার একটা প্রশ্ন আছে। এ প্রশ্ন সম্পূর্ন আমার ব্যক্তিগত। আমার মনে হয়, অস্বাভাবিক মৃত্যুর থেকে স্বাভাবিক মৃত্যু শ্রেয়। কারন, অস্বাভাবিক মৃত্যুতে মৃতের শরীর এক কিম্ভূত-কিমাকার রূপ নেয়। সেই মৃত্যুর যারা দর্শক তাদের মনের পরিস্থিতির দায় ভার কার? (চলবে)