আগোছালো কথা গুছিয়ে বলার অভ্যাসটা সঠিক ভাবে রপ্ত করতে পারি নি। প্রায়ই ধন্দেতে পরি নিজের কাছে নিজে হয়ে পড়ি কাঠ গোড়ার আসামী। চরম অনুতাপের মধ্যেও তাই বার বার বলি। ‘ভালোবাসা প্রকাশের মধ্যে ছোট হয়ে যায়, ভোগের মধ্যে হয়ে ওঠে অর্ধমৃত। ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ ত্যাগে, নীরবে-নিভৃতে চোখের জলে, নিস্তব্ধ-নিরালায় আত্মসমর্পনে। সেখানে স্রোতস্বিনী নদীর মতো শুধু একমুখী দেওয়ার পালা। চাওয়া বা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাইতো পাঁচজনের সামনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে পারি না মা… মা… মাগো বলে।
চিঠি একটা লিখব বলে বসেছিলাম। অনেক ভেবে চিন্তে বুঝলাম চিঠিটা বোধ হয় আর লেখা হয়ে উঠবে না। তাই আর চিঠি লেখার চেষ্টা না করে কিছু কথা বলার চেষ্টা করলাম। একদমই খাপছাড়া। পড়তে ভালো লাগবে। হয়তো কোন মানে থাকবে না। তবু…। সেদিন তোমার ওখান থেকে ফেরার পথে বারবারই একটা কথা মনে হয়েছিল; স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালোবাসা এসবই বড় কষ্টদায়ক। উৎস কিন্তু একই জায়গা, ভালোবাসা, এসবই বড় কষ্টদায়ক। উৎস কিন্তু সেই একই জায়গা থেকে এবং basically শুধুই ভালোবাসা। শুধু আলাদা নাম। সবচেয়ে মজার কথা হলো আমরা মানুষেরা তবুও ভালোবাসতে চাই। কষ্টও পেতে চাই। সবকিছু ভেবে চিন্তে মনে হয় আসলে আমরা জন্ম থেকেই দুঃখ প্রেমী। ব্যাপারটা সহজাত। আমরা দুঃখকে আঁকড়ে ধরে সুখের কল্পনা করতে ভালোবাসি।
বেশ অনেকটা সময় ধরে আমরা যখন কোন কিছু পাওয়ার আশা-আকাঙ্খায় দুলতে থাকি তখন আমাদের মন একটা অজানা ভয় মেশানো রোমান্টিকতায় ভরে ওঠে। আবার একই সঙ্গে নিজেকে একটা মহৎ কিছু করে তোলার চেষ্টায় উৎসুক হয়ে উঠি। এটাই বোধহয় ভালোবাসার কাহিনীতে সবচেয়ে বড় পাওয়া। আর শুধু এই জন্যেই এ ব্যাপারটাকে আমি বড় শ্রদ্ধা করি। তারপর বেশ খানিকটা মানসিক সংগ্রামের পর সেই লক্ষ্যের বেশ কাছাকাছি চলে আসি, তখন আমাদের মধ্যে একটা নিঃস্পৃহতা কাজ করে। না, ঠিক এইভাবে না বলে এই রকম বললে কেমন হয়, একটা নাম না জানা অনুভূতি কাজ করে। কি রকম যেন একটা লাগে। এই সমস্তই সময় ও মনের একাট বোঝাপড়া; অত্যন্ত সাধারন। মানুষের মন বড় চঞ্চল, লক্ষ্য স্থির থাকলেই হল। মন যা চায় ভাবুক। পাত্তা না দিলেই হল। এটা একটা অল্প সময়ের Phase তারপরে? তারপরে সবটাই বড় সুন্দর। অনেকটা রূপকথার গল্পের শেষের মতো। রাজকন্যা ও রাজপুত্র সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগল।
আমি বারবার যে জিনিষটাকে সবার উপরে রেখে এসেছি তা হল আমার Sentiment-এর জন্য আমি বহু কিছু হারিয়েছি। বোধহয় আরও অনেক কিছু আমাকে হারাতে হবে। তবে কখনই হারিয়ে আফশোষ করিনি। আমি জানি আজকাল কার যুগে Sentiment কে চিলে কোঠার ঘরে বন্ধ রেখে কাজ না করলে চলে না। এটা করেও আমি সম্পূর্ন নই। আমার mood টাই সব। নিজেকে বেশ খানিকটা শাসন না করলে চলছে না। কি করি বলতো?
খেয়াল করেছি আজকাল প্রেম ব্যাপারটা বেশ একটা মুখরোচক তেলেভাজার মতো হয়ে উঠেছে। নিয়মটা যেন এই রকম যে ভেজেই গরম গরম খেয়ে ফেলো। ধরে নাও বালীগঞ্জের লেকের ধার। সন্ধ্যার দিকটায় বেশ ফুর ফুর করে হাওয়া টাওয়া দেয়। লম্বা চওড়া গাছ অনেক পাওয়া যাবে। তারই মধ্যে জৈনিক প্রেমিক প্রেমিকাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ব্যস কিছুই নয়, দু-চারটে মিষ্টি মিষ্টি কথা-বার্তা, এই আর কী। এখানে একটা ভালো সিস্টেম চালু আছে। কিছু ছোট ছেলে ছোকরা এখানে ঠোঙায় করে ছোট ছোট করে পাথরের টুকরো বেচে। Rate টা অবশ্য আমি ঠিক জানি না । প্রেমিক-প্রেমিকা জলের ধারে বসে রোমান্টিক কথাবার্তার মাঝে একটা একটা পাথর জলে ফেলতে থাকবেন। একবার প্রমিকা পরে প্রেমিক। ঠিক উত্তম-সুচিত্রার, কোন ছবির রোমান্টিক সীনের মতো। সেখানে অবশ্য হিরোইনের দাঁতে দাঁত চেপে খড় ছেঁড়ার সীনও থাকে। বড় রোমান্টিক দৃশ্য জানো তো। আর সে সময় প্রেমালাপটা কি রকম চলে জানো। ধরো প্রেমিক একটা পাথরের টুকরো জলে ফেলেছে। স্বভাবতই জলে একটা ঢেউ খেলে যায়। এটা জানো তো প্রেমিকারা একটা আলাদা সংসার, একটা ছোট flat এসবের স্বপ্ন দেখে ফেলে। তা ঐ জলের ঢেউ দেখে প্রমিকাটি বলে বসলেন, দেখ আমাদের ছোট্ট ঘরটা যদি ঠিক ওর মাঝখানটাতে হতো তাহলে কী ভালোই হতো। তাই না? ওরে মুখ পোড়া দেশে এত ধানজমি থাকতে আবার জলের উপর বাড়ী কেন রে বাবা! তারপর এই রকম কথাবার্তার মাঝে যখন ঠোঙা খালি, পাথর শেষ, তখন ঘরে ফেরার পালা। এরা আবার মাঝে মধ্যে চিঠিও লিখে ফেলে। চিঠির শুরুটা খানিকটা এ রকম — প্রেমিকের মধ্যে আবার কবি কবি ভাবও আছে। তিনি লিখেছেন — ‘ওগো তোমার মনের ল্যাম্প পোষ্টে আমার মনের ছাগল বাঁধা।’ সে কী অবস্থা। তবু ভালো যে এর পরের লাইনে এ রকম কিছু একটা লেখেনি — ‘সে ছাগলকে তুমি আর খাসি করে ঝুলিয়ে রেখো না।’
এই বিশাল পৃথিবীতে লক্ষ কোটি মানুষ তার নিজস্ব জীবন ধারায় বয়ে চলেছে। আমরাও চলেছি। এখানে ঈশ্বরের সৃষ্টি একে অন্যের থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু আমরা সকলেই মানুষ। আমাদের শুরু শেষ সব একই জায়গায়। জানো তো প্যারিসে একটা কথা খুবই চলে। — ‘প্রেম ব্যাপারটা ঠিক কথা বলে বোঝানো যায় না, নিজে করে বুঝে নিতে হয়। কথাটা আমিও বিশ্বাস করি কাউকে একবার ভালোবেসে না ফেললে ঠিক বোঝা যাবে না ব্যাপারটা কতো মহৎ। জানো নিজেকে realise করার সবচেয়ে বড় রাস্তা এটাই।
মানুষ ঠকে শেখে। আমি একথাটা সর্বসম্মত ভাবে বিশ্বাস করি। আর এও বিশ্বাস করি জীবনে চরমতম কিছু পেতে গেলে আমাকে আমার সব চেয়ে প্রিয় বস্তুটা হারাতে হবে। এরকম চাওয়া কজনে চাইতে পারে? এ চাওয়া শুধু চাওয়া নয়, এ চাওয়ার মধ্যে থাকবে ব্যাকুলতা। তারপর তুমি যদি পাও, সেই পাওয়াই হবে তোমার পরম প্রাপ্তি।
আমাদের অনুভূতির এমন অনেক জায়গা আছে সেখানে ভাষা পৌঁছতে পারে না। Silence is some times golden. নীরবতার মাধ্যমেই দুটো প্রাণের যোগাযোগ বেশি ঘটে। আমার এ কথায় কজন বিশ্বাসী হয়ে উঠবে তা ভাববার বিষয়। যা ধ্রুব সত্য তাকে বেঁকিয়ে-চুড়িয়ে না বলে সোজাসুজি বলাই শ্রেয়।
কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ‘ভালোবাসা’ ব্যপারটা নিয়ে একটু তর্ক করেছিলাম। নিছক আড্ডামারার ছলেই তাকে প্রশ্ন করেছিলাম ভালোবাসার উৎপত্তি কোথায়? যদিও একজনকে ও ভালোবাসে।
হাসতে হাসতে আমাকে বলল, এত কঠিন উত্তরের মুখোমুখি আমি কখনও হই নি। একথা সে কথা বলার পর চট করে বলে বসল ‘শ্রদ্ধা’। আমি ওর কথার উত্তর শুনে ভীষন মর্মা হত হয়েছিলাম। তবে ওকে কিছুতেই বুঝতে দিই নি আমার মনের কথা। তবে তোমায় লিখে জানাবার লোভ সম্বরন করতে পারলাম না। হয়ত আমার এই মহৎ উদ্দেশ্য মাঠেই মারা যাবে। তবু… তারপর… এই রকম কিছু শব্দ থেকে যায়। (চলবে)
খুব সুন্দর লিখছেন।