আমাদের হাতের পাঁচটা আঙুল সমান? সমান নয়। এই উদাহরনটা আমরা প্রায়ই নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে আমাদের যুক্তি তর্ককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য খাঁড়া করি। ব্যাপারটা সত্য বলে মনে নিয়ে আমার একটাই প্রশ্ন, সমান না হলেও, গুরুত্ব কি কারুর কম-বেশী? ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করলেই দেখা যাবে গুরুত্ব সকলের সমান। কারুর কম-বেশী নয়। ফলে ছোট-বড়তে কি এসে যায়।
এ প্রসঙ্গে একটা কথা তোমায় লিখছি। আজ আর মনে নেই কবে কোথায় পড়েছিলাম। স্মৃতি নির্যাস করে যতটা পেরেছি উদ্ধার করেছি — ‘কল্পনা যুক্তির দ্বারা সুনির্দিষ্ট পথে হাটে, সংযমের দ্বারা নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং সত্যের মাধ্যমে সকলকে প্রভাবিত করে। কিন্তু কাল্পনিকতা? এখানে সত্যের কোন বন্ধন নেই, সঙ্গতির নেই কোন নিয়ন্ত্রন, একে এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, কল্পনার মাঝে কোন অসঙ্গতি নেই। কিন্তু কাল্পনিকতার মাঝে আছে অসঙ্গতির উচ্ছ্বল প্রকাশ। Probable impossibilities হল কল্পনা। আর Improbable possibilities হল কাল্পনিকতা।
‘যন্ত্রনা’ এক নিদারুন যন্ত্রনা আমার এই ছোট্ট বুকটার ভেতর আপন মনে খেলা করে চলেছে। বার বার ধরতে চেষ্টা করি মন প্রান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। পারি না। পারছি না। আ পারছি না। বিশ্বাস করো মাঝে মাঝে মনে হয় একটা ধারালো ছুঁড়ি নিয়ে বুকটা চিরে-চিরে দেখি কোথায় এই ‘যন্ত্রনা’ লুকিয়ে বসে আছে। পারি না। এ আমার অক্ষমতা। এই অক্ষমতা আজ নয়। ঠিক, এই মুহুর্তের ও নয়। এই অক্ষমতা আমার চিরদিনের। জানিনা এই যন্ত্রনার সমাপ্তি কোথায়? মাঝে মাঝে অবশ্য এই ‘যন্ত্রনা’ আমায় ভীষন খুশী করে। যখন সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠি। মত্ত অবস্থায় যখন নিজেকে মনে করি সুপার ম্যান তখন মনে হয় কি জান এই পৃথিবীর রূপ-রল-গল্প-স্পর্শ-শব্দ মিথ্যে। সব মায়ার খেলা। আমিই ঠিক। তখন আমার চেতনার রংটা পান্নার মত সবুজ। একটা স্বপ্ন। কিছু সুখের মুহুর্তে আমাকে কেমন আচ্ছন্ন করে রাখে। নিজে হয়ে পড়ি চলচ্ছক্তি হীন। সামান্য আবেশ আমার চারধারে ঘন কুয়াশার মত ঘিরে রাখে ।
কি ভাবছ। আবার কি পাগলের পাল্লায় পরলুম রে বাবা। এ তো নিজেও পাগল। আমাকেও পাগল করে ছাড়বে। না গো না বিশ্বাস করো আমি পাগল নই। পাগলাম করছি না। আচ্ছা, তোমার কি কখনো মনে হয় না। আমি তো আমার সমস্ত সত্বা দিয়ে সকলকে ভালোবাসি সকলকে। মন থেকে কারুর কোন দিন ক্ষতি চাই নি। যতটা সাধ্যে কুলায় নিজেকে উজার করে দিয়ে উপকার করার টেষ্টা করেছি। বলতে পারো সবই কি আমি নিঃস্বার্থ ভাবে করেছি। আমি অত বিশাল মাপের মানুষ এখন হই নি। ভগবান বা ঈশ্বরের কথায় নাই বা গেলাম। ভাবলে নিজেকে নিজে ভীষন ছোট করা হয়ে যায়। বলতে পারো আমাকে নিয়ে ‘সেই’ ভাবে কোন দিন কি কেউ ভেবেছে?
ভাবেনি, আমি জোর গলায় বলছি কেউ কোন দিন ভাবেনি। ভাবতে শেখেনি। এটা আমারই দুর্বলতা আমি আমাকে নিয়ে ভাববার মতো কোন অবকাশ তাদের দিই নি। তুমি আমাকে নিয়ে কিছুটা ভাব। তোমার অমূল্য সময়ের কিছুটা আমার পেছনে ব্যয় কর। তাই তোমায় বিরক্ত করে মারি। বার বার বিরক্ত করব। আমাকে তুমি অন্তঃত পক্ষে ফিরিয়ে দিও না। তাহলে আমার পৃথিবীটা আমার কাছে চিরকালের মত অন্ধকারে থাকবে।
আচ্ছা আমার প্রতি তোমার এই দুর্বলতার কারন কি জানতে পারি কি? বলবে হয়তো সব দুর্বলতা সবাইকে জানিয়ে দিলে তুমি কি নিয়ে থাকবে। তোমার কথাটা মনে নিলামে। বলতো পারো কেন এই ‘যন্ত্রনা’? কেন নিজেকে ভীষন নিঃস্ব বলে মনে হয়। মনে হয় আমি এই পৃথিবীর জঞ্জাল। আপাংক্তেয়ের মত এক কোনে শুধু পড়ে আছি। চিরকাল পড়ে থাকবে। মাঝে মাঝে মনে হয় সৃষ্টির সমস্ত করতে চেয়েছিলাম। আমি সবচেয়ে বড় অপরাধ করেছি সবাইকে সামান ভাবে ভালোবাসাতে গিয়ে।
আমি তোমাকে একটা কথা বলি এই অপরাধ যদি আমার জীবনের প্রধান অভিশাপ হয়ে থাকে; আমি সৃষ্টির সেই আদি প্রান পুরুষকে কার মন বাক্যে প্রার্থনা করব, এই অপরাধের জন্য আমাকে বার বার যেন এই পৃথিবীতে আগমনের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। শত যন্ত্রনা স্বীকার করেও যদি আমাকে মরতে হয়, তবু বসব আমি চাই, আমি চাই আসতে এই যন্ত্রনার পৃথিবীতে বারে বারে।
ঠিক কি লিখতে গিয়ে কি লিখে ফেললাম বলতো? ‘যন্ত্রনা’, মাঝে মাঝে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, এর উৎপত্তিটি কোথায়? কোথায় বা এর শেষ? তল খুঁজে পাই না। বেশি ভাবতে গেলে চিন্তা শক্তিটা কেমন জট পাকিয়ে যায়। সে জাট খোলার সাধ্য তখন আমার থাকে না। বাধ্য হয়ে মনে নিই। মনে মনে বলি। যন্ত্রনা মানুষকে ত্যাগের ব্রতে দীক্ষিত করে। যন্ত্রনা মানুষকে পরিক্ষীলিত করে, চরিত্র শুদ্ধি ঘটে। মনে পড়ে বিনোদিনীর কথা। পরমহংস দেব ‘চৈতন্য লীলা’ দেখতে গিয়ে যখন বিনোদিনীর সঙ্গে পরিচিত হলেন। বিনোদিনী কি প্রার্থনা করেছিলেন আজ ঠিক মনে নেই। তবে ‘ঠাকুর’ বলেছিলেন তোর ‘চৈতন্য’ হোক।
কিসের ‘চৈতন্য’? কেনই বা ‘চৈতন্য’ হবে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিজের থেকে এখন পাই নি। পাওয়ার বহু চেষ্টা করেছি। তন্ন তন্ন করে আজও খোঁজার চেষ্টা করি। পাই নি। পাব কিনা জানি না। এ আক্ষেপ আমার থাকবেই। ক্ষমা কোরো।
জান আমাদের ‘সৃষ্টির’র প্রথম দিনটাকে আমি ভীষন ভাবে ঘৃণা করি। কেন করি জানিনা। মনে হয় ঘৃণা করার প্রয়োজনীয়তা আছে তাই করি। আর অস্বীকার করি বা কেমন করে। আমার আগে বহু বড় বড় বোদ্ধা, দর্শনিক বলে গেছেন, সৃষ্টির মধ্যেই আত্মগোপন করে আছে Sumum Bonum বা Highest good. সৃষ্টির মহৎ কর্ম যজ্ঞের ফল আমরা এক একটি মানুষ। এক একটা প্রান।
আমি মনে মনে আমাদের সৃষ্টির প্রথম দিনটাকে ভীষন ভাবে ঘৃণা করি। মনে হয় সৃষ্টির উল্লাসে মতে উঠে আমরা আর একটা প্রানকে ভীষন ভাবে কষ্ট দিই। কষ্ট দেওয়ার পর আত্মতৃপ্তিতে নিজের বুক ভরে ওঠে। মনে মনে বলি আমি সৃষ্টির আদি পুরুষ। নিজের সমস্ত কিছু দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করি। কেন করি? কি কারনে করি জানি না।
হাসছ, মনে মনে বলছ আবার পাগলাম শুরু করেছি। আমি বলি কি সত্যই আমি পাগল। জানার তাগিদেই দিন দিন এমন বেড়ে যাচ্ছে; কোনটা পাগলামি যাওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। তাই প্রায়ই আমি দ্বন্দ্বের স্বীকার হই। এ দ্বন্দ্ব কিসের? উত্তর একটাই নিজেকে নিজে আপন করে পাই না বলে। (চলবে)