সোনাবৌদি,
বোধহয় আবার অনেক দিন পর তোমাকে চিঠি লিখতে বসলাম। আর এই লিখতে বসে যেটা সবচেয়ে বেশী করে মনে হচ্ছে তাহলো — আমি বোধহয় আগের থেকে অনেক বদলে যাচ্ছি। তাই এই চিঠির অর্থ খুঁজে পাওয়া হয়তো সেই ভাবে যাবে না। যারা বোঝে, যারা একান্তভাবে আপনা হতে, অজান্তে মনের কাছাকাছি চলে আসে তাদের কেই দেওয়া যায়।
তুমি বৌদির মতো। আবার তোমাকে নাম ধরে ডাকি। আচ্ছা তোমার একদিনও একটুও আক্ষেপ হয় নি? আমি তোমায় বৌদি বলে ডাকি না বলে। আমার মাঝে মাঝে ব্যাপারটা নিয়ে কেমন খটকা লাগে। পর মুহূর্তে ভাবি, দূর চলে যাচ্ছে তো।
জানিনা আজ হঠাৎ তোমাকে চিঠি লিখতে বসলাম কেন? হয়তো আমি কিছু খুঁজছি? অথবা এমনই। আসলে আমি নিজেকে, নিজের মধ্যে আগের মতো করে খুঁজে পাই না। তাহলে কী আমি হারিয়ে যাচ্ছি? না, হারিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
হয়তো আমার এই অবস্থাকে অনেক frustration বলবে, কিন্তু আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তার প্রতিবাদ করবো। একে frustration বলে না। তার পেছনে যে সব কারন থাকে, তার একটাও আমার ক্ষেত্রে ঘটে নি। এককথায় আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা নির্ভেজাল মিথ্যা। আসলে মানুষের সম্বন্ধে একটা ভালো ধারনা করার চেষ্টা করেছিলেম। ভীষনভাবে ঠকতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন বদলে গেছে তাতে অন্যায় দেখে দেখে, ভুলে জিনিষ, শুনে শুনে, আর বেঠিক জিনিষ অনুভব করে করে এখন যে কোন ভুল জিনিষকেই ঠিক বলে মনে হয়। কেতাবী ভাবে বলতে পারো all folse are true but any true are false জানিনা কোনটা মিলবে তোমার মনের সঙ্গে।
জন্মে জ্ঞান হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যদি একশজন লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে থাকে তার মধ্যে আটানব্বই জন basically বাজে লোক। আগে খারাপকে ভালো করে দেখার মতো ইচ্ছে এবং willforce দুইই ছিল (পারতাম কিনা সেটা পরের কথা)। কিন্তু আজ ইচ্ছে আছে, will force নেই। আমার ‘আমি’কে বাঁচিয়ে রাখার একটা উদ্দেশ্য ছিল। বোধহয় সব হারিয়ে ফেলতে বসেছি। একটা সুন্দর পৃথিবী কল্পনা করতাম। তার একটা আলাদা আদর্শ ছিল। আসলে মগজটাই ফুটো হয়ে গেছে। কল্পনাকে আশ্রয় দিই কোথায়?
আসলে এই পৃথিবী বড় হিসেবের জায়গা। প্রতিটি লোককে তার ভুলের দাম প্রতি মুহূর্তে দিতে হয়। আমার সঙ্গে তাদের তফাৎ আনেক। ফলে ভুল না করেই তার মূল্য কানা-কড়ি সমেত ফেরত দিতে হয়। জানিনা কেন আমাকে প্রতি ক্ষেত্রেই হেরে যেতে হয়। কারো ভালো না করতে পারলেও, কারো’র ক্ষতি’র চিন্তা কখনো করি না, একথা নিজের মন থেকে হলফ করে বলতে পারি। কর্মফল কথাটা যদি কিছু মাত্র সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমার এই হেরে যাওয়ার পেছনে reasone কোথায়?
গীতিকবিতার মতো জীবন যাপন করেছি যথেষ্ট। মাতৃভাষার অভিধান খুলে দেখি, সবই তো অ-সরল। তাই মনে হয়, শুদ্ধতা ছিঁড়ে ফেলি। যত কবিতা তার ভাবসম্প্রসারন, তার ছন্দ, গঠন ভঙ্গি, সব ভেঙ্গে ফেলি। সবই ছিঁড়ে-খুঁড়ে নতুন কিছু বানাবার কথা ভাবি। এটা আমার এখনকার আত্ম বিস্মৃতি নয়। আসলে একটা নতুন কিছু বানাবার কথা আগে ভাবতে পারতাম, এখন পারি না। তাহলে আমাকে এখন পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি লোকের মতো বেঁচে থাকতে হতো না। যারা Just নিঃশ্বাস ফেলা ও প্রশ্বাস নেওয়ার জন্যে বাঁচে, যারা চাকরি পাবে বলে পড়াশুনা করে, বিয়ে করবে বলে চাকরি করে। সংসার সংসার পুতুল খেলা খেলবে বলে বিয়ে করে। তাদের সঙ্গে আমার তফাৎটা কোথায়? আমি তো আলাদা একটা কিছু হতে চেয়েছিলাম। নিজের অক্ষমতা আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমাকে বেঁধে রেখেছে। নিজের অক্ষমতা অবশ্য বিশেষ দায়ী নয়, আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সে তো আমার হাতের বাইরে।
কি হলো? এতটা পরার পর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে মুচকি হাসলে। ভাবছ, কি পাগলের পাল্লায় পড়েছি রে বাবা? কিন্তু দেখ আমি তো অসহায়। কাউকে না কাউকে আমার এই কথা জানাতে না পারলে আমি তো দম আটকে মরে যাব। তখন, তখন কি হবে?
আচ্ছা তোমার ঐ গল্পটার কথা মনে আছে। একজন বৃদ্ধ পার্শীর অতি ভালোবাসার মাথায় টুপিটা একদিন হারিয়ে গেল। খোঁজ-খোঁজ-খোঁজ কোথাও সে তার টুপিটা খুঁজে পায় না। অনেককেই সে জিজ্ঞাসা করে কিন্তু কিছুতেই যখন কিছু হল না, তখন একদিন সে স্থির করল একটা জায়গায় গিয়ে যদি চিরদিন অপেক্ষা করা যায়, তাহলে সে তার হারান টুপিটা খুঁজে পেলেও পেতে পারে। ভাবা মাত্রই তল্পি তল্পা নিয়ে চলে এল কবরখানায়। অর্থাৎ ব্যাপার খানা যেন এরকম তুমি বাবা যাবে কোথায় একদিন না একদিন তোমাকে এখানে আসতে হবেই। তারপর? তারপর আমার টুপি আমার।
জান, নিজের ভাবাবেগকে ধরে রাখতে গিয়ে বার বার পিছিয়ে আসতে হচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিজের পা, পায়ের নখ, নিজের চুল এমনকি নিজের ছায়া পৰ্যন্ত অসহ্য মনে হয় আমার কাছে। আসলে মানুষ হিসেবে ভাবতেই নিজের মধ্যে একটা ক্লান্তি বোধ হচ্ছে। প্রশ্ন কোরো না, কেন যেন মনে হয় ঠাণ্ডায় জমে হিম না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত একটা ছুরি হাতে উন্মত্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। আসলে না ফিরে হঠাৎ একটা কিছু দেখার চেষ্টা করতাম। বোধহয় লাফাবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তবে আমার জন্ম অথবা মৃত্যুতে যদি একজন মানুষকেও শুধু ভালো করতে পারি তাহলে আমি শত সহস্রবার জন্মাতে অথবা মরতে রাজি আছি।
জানিনা এ জগা খিচুড়ি মার্কা চিঠির কোন উত্তর আদৌ সম্ভব কিনা? আসলে এটা একটা চিঠি নয়। কিছু কথা। শুধুই আমার। (চলবে)